অপেরা হাউস

আকতার জাভেদ



সারা বছর এই শহরে আনন্দ উৎসব চলে অপেরা হাউসজুড়ে।

পাহাড়ের ঢাল শেষে যে সমতল সেখানে একের পর এক অনুষ্ঠানে যেন পুরোটাই ঝলমলে। কদিন আগেও ছিল লোকারণ্য। যে কয়জন মানুষ এখনো রয়ে গেছে তারা ভুলে গেছে এ কদিনে নিজেদের অবস্থান। তারাও এতদিনে ভুলে গেছে বর্ণমালা। শহরের অপেরা হাউস আজ তাই নিশ্চুপ!

এই ফাকে শীতের শেষটা ফিরে এলো আবার, জানুয়ারী হতে ডিসেম্বর পেরিয়ে মার্চ অবধি। চারদিকে থমথমে ! মৃত মানুষেরা চলে যেতেই শুরু হলো তার অলিন্দের অপারেশন । সাফিন তখন দাঁড়িয়ে ভবন থেকে আলতো বের হওয়া বারান্দায়। মৃদু ধোয়াশায় তাকায়। আনমনে ভাবে, বিড়বিড় করে বলে ওঠে-

- হৃদয়ের সব কিছু ক্লিন হয়ে গেলে কি থাকে আর?

- থাকে কি মানুষ; প্রিয় বা অপ্রিয়?

শুন্য করিডোরের দূর থেকে দেখা যায় থরে থরে মোড়ানো কালো পলিথিন। তুলিকে নিয়ে একটা এম্বুলেন্ঠচলে গেলে পুরো ভবনের কোথাও কোথাও সফেদ শুভ্রতায় ছাপ পড়ে।

বাদামী রংয়ের মোড়ানো তেলাপোকার হেঁটে যাওয়া পথে চিত্রটা বেশ তৎপর। বললাম তাকে, সেদিনের কথাটা।

সেও জানে- অনেকদিন হল এলকোহলিক স্পষ্টতায় শুদ্ধ হওয়া যায়নি। কোথাও কোন স্যানিটাইঠার নেই, কোথাও কোন মুখোশ!

আজ সন্ধ্যায় না হয়, হোক।

পথে বেরোয় সে, সুনশান ! থেমে থেমে ঘন কুয়াশা যেন মুড়ে রেখেছে বিষণ্ণতার হলোগ্রাম। কোথাও কোথাও নগ্ন উচ্ছ্বাসে প্লাবিত ঘৃণা। অন্ধকার রাত্রিতে শুনছে প্রেতাত্মঠর হেঁটে চলা। পথে পথে বিড়াল-à¦•à§à¦•à§à °à¦—à§à¦²à§‹ মত্ত। সাফিন প্রশ্ন করে নিজেকে-

- শুনছো কি হে মানুষ?
- কোথায় তুমি হে ?

উত্তর নেই, সে জানে। এই তো গতকাল সে বলেছিলো তুলিকে, চল শহরতলীর অদূরে বসতি গড়ি। তুলি মানে তার হিমশীতল বারান্দার পাখি। যাকে সে তুলি বলে ডাকে। এমন সময়ে পুরো শহরটা আজ নিস্তব্ধ, একে একে নামছে পর্দা। অসম্ভব হয়ে পড়া কিছু অচেলা অনুভূতি, সম্ভাব্য অনেক কিছু হতে হতে হোঁচট খায়। ধ্বংস হওয়া এক একজন মানব যেন বদলে যাওয়া সামাজিক মানচিত্রেঠকথা বলে। আমরাও বলছি বটে। কোথাও কোথাও দুষ্টু হাতের পোষ্টারে অসংলগ্ন মানবচিত্র, পাতায় পাতায় একটা দীর্ঘ বলি রেখা, বয়সের ছাপ বোধ হয়।

কোথাও কোথাও অনমনীয় সাযুজ্যে একদল অতিকায় মানব উঠে আসেন গলির মুখে। কিছু অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষায়- কেউ কেউ দেখে জোনাকির আলো।

আর ওদিকে একে একে আঙ্গুলের ডগায় পুড়ছে নিকোটিন। ছাইয়ের হেলানো টাওয়ারজুড়ৠযেন আসন্ন প্রলয়। একটু ছেকা লাগতেই সম্বিত পায় সে। সাফিনকে আনমনা দেখে তুলির প্রশ্ন,

ভাবছো কী, কেউ এসে টোকা দেবে তোমার দরজায়?

না, ত ! সাফিনের উদাসী উত্তর।

সামনের আকাশে একটা চিল উড়ে গেলো, অনেকগুলো শকুন ঘুরছে - কোথাও যেন মৃত প্রাণের উৎসব; হাঁটতে হাঁটতে পার করছে প্রতিটি অপেরা হাউসের দরজা।

- নগরে আজ নিস্তব্ধতা !

মিতু আর সুজন কেমন আছে?
রুমানা অথবা হামিম?
আমার বন্ধুরা?
প্রিয় পাখিটা কি এখনো গান গায়?

(০২-২০ মার্চ ২০২০)