চেয়ে আছো কে?

মেঘ অদিতি



বহুদিন ডুবে আছি সঙ্গ বা নৈঃসঙ্গে, আলো-অন্ধকারে, মধ্য সূর্যের দিনে- রঙছুট বুদ্বুদ হয়ে জলের কাছাকাছি।
আঙুল জড়ানো আছে বিষাদ সেতারে।
ভেসে আসছে বেগম আখতার, মেরে হাম-নাফাস মেরে হাম-নাভা মুঝে দোস্ত বানাকে..

খেলে যাচ্ছে জল। খেলছে জলের তল। খেলছে রঙের মাছ।


দিনগুলো ভাসমান আলো মেশা অন্ধকার ছুঁয়ে মাস্তুলে লেগে থাকা দ্বিধার। দিনগুলো নিভৃতে ফুরিয়ে যাবার। অথচ.. আমার সমস্ত গতিবিধিতে দৃষ্টি রাখে সে। আমার ছায়ার সাথে মিশে আমাকেই ছুঁয়ে থাকে সে বহু গোপনতায়। যেখানে পা ফেলি দেখি বকুল বিছানো। যেদিকে তাকাই দেখি ছুঁয়ে আছে চোখ। কি জানি কেন সে আড়াল ভালবাসে। আয়নায় নিজেকে দেখি। শান্ত চোখের পাতা ছুঁয়ে শিরদাঁড়া বরাবর নেমে আসে শীতল স্রোত। দুপুর বাড়ির স্তব্ধতা ছুরিতে ফালাফালা করে তখন ভেসে আসে কোলাহল। কারা যেন ধমকে ওঠে। প্রখর তাপের দুপুর বারান্দা থেকে দেখি, আহার-নিদ্রাহীন, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত, বসন্ত যে ওই একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে অহর্ণিশ, তাকে ঘিরেই ছোট খাট ভিড়, মধ্যমণি সেই উন্মাদ।

বাইরে ভীষণ রোদ! ঘরে ফিরে আসি।

তৃষ্ণার্তের মতো ছুটে আবার জানলার পর্দা তুলে দিই। লেটার বক্সে বিনবিনে তখন ঘাম জমেছে। নীল নয়, বক্সে চুপচাপ সাদা খাম। খাম খুললে সুগন্ধ ছড়িয়ে বেলফুলের মালা, ছোট্ট চিরকুট।

‘ভালো আছি জানো! খুব, খুব ভালো। কেবল মাঝরাতে বৃষ্টি এলে মনে পড়ে..ইচ্ছে এক রেলগাড়ি। আর এবার গন্তব্য পাহাড়’।

কী যে বলতে চায় ঠিকানাবিহীন এই চিরকুট ঠিক বুঝি না। কেবল রোজ নেশাগ্রস্তের মতো এই চিরকুটের টানে নেমে আসি বাড়ির সদর দরজায় আর তারপর সারাদিন মাথা ঝিমঝিম, হৃদয় তোলপাড়। একটা হরাইজেন্টাল লাইন ধরে লালপিঁপড়ের মিছিল এগোয়। ওদের সাথে হাঁটি। কী একটা যেন বুকে কাঁটার মতো বিঁধে থাকে পুরো বিকেল আর সন্ধ্যা জুড়ে। সমস্ত অর্থহীনতাকে পাশ কাটিয়ে মনে পড়ে অনির কথা। ও বলত, তোর মনে নেই কিছু। ভুলে গেছিস.. সব। সত্যি আমি ভুলে গেছি সব। ভুলে যাই। কিছুতেই মনে করতে পারি না, সকালবেলা ঘাসে বিছানো শিউলির জাফরান বোঁটাতে কতটা শিশির লেগে থাকত। কবে সেই শিশিরগুলো ঠোঁটে শুষে নিতে নিতে ও বলেছিল, জানিস..আমার তো বিশ্বাস ছাড়া আর কিছু নেই। ওতে ভর করেই পৌঁছে যাব ঠিক চাঁদে।

অনি! তুমি কি পৌঁছাতে পেরেছ?


শেকল ঝনঝন, হাওয়া ওঠে জলে।
ধুলো ওড়ে। মেঘ ওড়ে। ঈশান কোণে ঘন হয়ে আসে অভিমানী মেঘ।
দৃষ্টিতে ভ্রান্তি কত, অলীক সুতোর টানে খুলে যায় হৃদয় আগল।
ডুবি যত নিজেকে অন্ধ ভেবে রঙের মেলায় ছিটকে উঠি তারও অধিকবার।
আহহ.. বদলে গেলে রঙ আমাকে ছুঁয়ে যায় ভুল পুণর্বার।


রাতভর বৃষ্টি। রাগ ব্যতিহার থেকে খুলে পড়ছে সুরের ঝালর। বাতাসের তীব্রতা ক্রমে শিস কেটে যায় জানলার কাচে আর ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ। আজকাল আমি ইনসমোনিয়াক। উঠে জানলায় দাঁড়াই। অন্ধকার চিরে বিজলি হাসে খলবল। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে বৃষ্টির ছাঁট আর হাওয়া, বুকের ওপর আড়াআড়ি হাত রেখে দম নিই চোখ বন্ধ করে। চোখ খুলি, বাজ পড়ে কোথাও। আর চোখ ধাঁধানো আলোয় তখুনি চোখ পড়ে-
শরীর ভিজে একসা। তবু ঠায় দাঁড়িয়ে...
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করি। পর্দা টেনে দিই জানলায় টানটান। শূন্যঘর। নীলাভ আলো জ্বেলে সফেদ বিছানায় পাশবালিশ আলতো ছুঁয়ে শূন্যে লাল নীল বৃত্ত আঁকি। কিন্তু শূন্য ঘর কোথায়। সে তখন আমার সাথেই আবার ঢুকে পড়েছে এই চার দেয়ালে, বিছানা বালিশে, বজ্র ও বিদ্যুৎ সাথে নিয়ে।
অতঃপর দুটো ক্লোনাজিপাম। এক গ্লাস জল। কানে বালিশ চেপে বলি, আমি ঘুমোবো। আমাকে ঘুমোতে হবে।


শীত শীত করে বহুদিন পর। উঠে আসি ডাঙার সংসারে।
ভিজে শরীর, যে পথ ধরেই হাঁটি তাতে পড়ে কৌণিক ছায়াযুগল।
চমকে তাকাই। কেউ নেই। বাতাস থেমে আছে।
নিজেরই ছায়া তবে! ‘নিজের ছায়ার চেয়ে তুমি বাস্তবিক বড়ো নও’- না, নই।
কিন্তু ও কি সত্যি আমারই ছায়া?


অনি আসে ভোরের দিকে। দূর থেকে ওর ঝাপসা হাসিমুখ দেখি। ও খুঁড়িয়ে চলে। হাতের মুঠো থেকে গলে পড়ে কিছু বিষণ্ণ জুঁই। উচ্ছ্বাসের বিপরীতে জমে থাকা অন্ধকার সরাতে সরাতে অবিরত গ্রহণ করি সেই মুখ যে আমাকে ভেবে প্রতিটি মুহূর্তে বেঁচে উঠেছে একটু একটু করে। আর আমি জল ছেড়ে কখনও ডাঙায় কখনও শূন্যে ভেসে এঁকে গেছি ভ্রান্তির ছবি।

ঘামে ভিজে সপসপে শরীরে ঘুম ভেঙে চমকে তাকিয়ে দেখি বেলা বেড়েছে কত। উহুঁ অনি নেই... কোত্থাও নেই। কখন মিলিয়ে গেছে হাওয়ায় আবার।

জানলার পর্দা সরাতে গিয়ে চোখ পড়ে রাস্তার নির্দিষ্ট কোণে। আছে। উদাস দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে তিনতলার ব্যালকনিতে। গতকাল যেতে যেতে শুনেছিলাম, কে আউড়ে চলেছিল, জীবন তেমন আর বড় হলো কই, তবু যেটুকু পাই তোকেই খুঁজে যাই..

এক ছুট্টে নিচে নেমে ডাকবাক্স খুলি।
সকালের ডাকবাক্সে পেয়ে যাই তাকে। লেখা থাকে, কোথাও কেউ আছে যে তার সবটুকু নিয়ে তোমারই প্রতীক্ষায়...


জলে ডুবে ডুবে শরীরে নিই দহন বারবার। জল এক নেশা। আশ্চর্য মোহটান।
পৃথিবীর হাত ধরে হেঁটে যেতে যেতে বয়স বাড়লে সন্ধ্যা নেমে আসে।
ঘিরে থাকা কুয়াশাকে দু’হাতে সরাতে দেখি আলো মরে জেগে ওঠে হাওয়া!
ডাঙা থেকে জল, জল থেকে সমুদ্র, পাহাড় বা বনতল, চেয়ে আছো কে?


হাইওয়ে ধরে এবার ছুটে চলেছে অরণ্যপ্রেমী মেঘ। চোখে ঝলক রেখে পিছিয়ে যাচ্ছে রাস্তার দু ধারের গাছ পালা। যা কিছু দেখা তাতে রোদচশমার আড়াল আছে। ঘাসবিন্দুর হাসি আছে। আর আছে রোদ্রছায়ার চোরটান। রোদচশমা তবু, চোখের ভিজুয়ালাইজেশনে আকাশের রঙ পালটে যাওয়াটুকু আটকায় না। রঙ গুনগুন, শান্ত সবুজ। থেকে থেকে মন তবু কেন যে পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় একটু আবার ব্যালকনি ধরে। বুকের পাঁজর ধরে ভাবনার কেন্দ্রে বসে থাকে তার রেখে যাওয়া প্রতিটি চিরকুট। আজও খুব ভোরে বেরোবার আগে.. লেখা ছিল, কেউ কারো জন্য প্রতিটি নয়া পয়সার মতো জমা করেছে এক একটি দিন আর অবিশ্বাস্য সুগন্ধী হাওয়া।

হুস করে ঠিক তখুনি আবার মাথা তোলে অনি, বলে- দ্যাখ আমার শরীরে কত শ্যাওলা জমেছে। তুই তো দেখবি না। অথচ তোকে খুঁজতে খুঁজতে পায়ে পিষে গেল গাড়ির চাকা। কতসব যন্ত্রণার পথ পেরোতে গিয়ে কতবার আমি অসুখ যাপনে। গাড়ি চাপা পড়ছি, মানুষ চাপা পড়ছি, পড়ে যাচ্ছি, উঠে দাঁড়াচ্ছি আবার। বুকের পাঁজর চির খেয়ে জাগছে ব্যথার পাহাড়। আর ওই ছোট্ট টুনটুনি সেও জানছে রক্তে ভেসে ভেসে আমি তলিয়ে যাচ্ছি কোন অন্ধকারে অথচ তুই.. আমার তো তুই ছাড়া কোথাও আর কেউ ছিল না।


জড় আঙুলের ভাঁজে যেভাবে আর্দ্রতা আনে সুরের সেতার,
আমাকে ছুঁয়ে এক উন্মাদ জাগে পুণর্বার।
আরবী ঘোড়ার খুরে ধুলো ওঠে খুব, শার্সিতে পড়ে ফের হারানো রোদ্দুর।
অনিবার্যতার টানে ভেসে যায় উড্ডীন ডানা, পাতার মর্মর..


হাওয়াঘরে সন্ধ্যা নেমে আসে। সবুজ ডগার ঘাসে আবার এক ফুলস্টপ। চোখের তলে জমাট ক্লান্তি সন্ধ্যার নুনজলে ধুয়ে চুপ করে বসি। আজ আবার অনি এসেছিল। যা স্বভাব, ঠোঁটের কোণে হাসি জমিয়ে জানতে চাইল, কী রে! এবারও আমায় চিনতে পারলি না! তোর দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে আবার তো আঙুল অসাড়.. কেমন সে নাছোড়বান্দাই থেকে গেলাম ভাব!

এল। সামনে দাঁড়াল। আবার মিলিয়ে গেল।

চমকে দেখি সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে এল। পায়ে পায়ে সামনে এগোলাম।
আছে। যেভাবে ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকে, আজও তাই। স্ট্রিট লাইটের আলোয় জেগে আছে ব্যালকনির আঁধার।

আমার হাতে ধরা সে চিরকুট। আবার পড়লাম, জেগে আছি, ডানা ঝাপটে প্রতি পল জেগে আছি দেখো।

সমস্ত প্রতিরোধ বুঝে ভেঙে যায়..

আড়াল ভেঙে পায়ে পায়ে এবার চাঁদে পৌঁছে যাচ্ছে অনি...