বাইক

দ্বৈপায়ন মজুমদার



সকালটা বেশ ঝিম ধরা । পল্টুর এখনও ঘুম কাটেনি । কাল ফিরতে বেশ রাত হয়েছিল । রিমলির সঙ্গে বাইকে করে বাইপাসে চক্কর কাটার সময় পল্টুর নিজেকে বেশ অক্ষয় কুমার মনে হচ্ছিল । অথচ কিছুদিন আগেও এসব ছিল স্বপ্ন । হায়ার সেকেন্ডারি ফেল পল্টু । দাদার টাকায় দু'বেলা ভাত আর বৌদির খোঁচা দেওয়া কথা ছাড়া কিছু জুটত না । রিমলি স্কুলে যাওয়ার সময় পল্টু ক্লাবে ক্যারাম খেলতে খেলতে ঘাড় হেলিয়ে দেখত । ক্লাবের পচা, বিলু আওয়াজ দিত, রিমলি বৌদি যাচ্ছে ।

রিমলি ক্লাবের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুখ ঘুরিয়ে নিত, অসভ্য ফেলুর দল যত । পচা একদিন বলে, পল্টু এবার মালটাকে বল মনের কথা, যা ফিগার হয়েছে বেশিদিন ফ্রী থাকবে না । পল্টুর রাগ হয় । বলে, মাল কী? একদম এরকম বলবি না । পল্টুর নীতি কথা শুনে হ্যা হ্যা করে হাসে পচারা ।

রিমলি জানে ছেলেগুলো ভাল না । বাড়িতে বাবার প্যারালাইসিস, দাদা একটা ধূপের কোম্পানিতে কাজ করে । তার থেকেই বাবার ওষুধ, রিমলির পড়ার টাকা । বাবা অসুস্থ হওয়ার আগে এমন ছিল না । মোটামুটি স্বচ্ছল বাড়ি । রিমিলির ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হবে । এখন আর সে স্বপ্ন দেখে না । টিউশন দিতে পারেনি দাদা । তবু ভাল রেজাল্ট করে একটা ভাল সরকারি কলেজে ঢুকতে হবে । গ্রাজুয়েট হয়ে একটা চাকরি জুটিয়ে নিতে পারলে সংসারটা বাঁচে ।

পল্টু পড়াশোনাতে তেমন ভাল ছিল না । তা বলে ভালবাসায় অভদ্রতা করে না । রিমলিকে ভালবেসে ফেলেছে । রিমিলির বাড়ির অবস্থা জানে । খুব ইচ্ছে করে ওদের পাশে দাঁড়াতে । রিমলি বোঝে পল্টু ওর দিকেই তাকিয়ে থাকে । ছেলেটা কিন্তু একটু আলাদা, কেমন ক্যাবলা টাইপ ।

(২)

সজল ছোট থেকে একটাই স্বপ্ন দেখে, মোহনবাগানে খেলবে । সজলকে টপকে যেতে পারে এমন ফরোয়ার্ড ওদের মফস্বলে নেই । ওদের শহরের সব থেকে বড় ক্লাব নেতাজি স্পোর্টিং, সাধনদা কোচ । সাধনদা এক সময় ময়দানের ফার্স্ট ডিভিশন খেলেছে । সেই সাধনদা বলেছে এবার ওকে ট্রায়াল দিতে নিয়ে যাবে কলকাতার সবুজ ময়দানে । প্রথম টার্গেট ট্রায়ালে ফার্স্ট ডিভিশন ক্লাব । তারপর ওর স্বপ্ন সেই সবুজ মেরুনও হয়ত কোন দিন হবে ।

সামনের সপ্তাহেই ট্রায়াল । তাই প্র্যাকটিস বাড়িয়ে দিয়েছে পাড়ার ক্লাবের মাঠে । ময়দানে তো ভাল স্ট্রাইকারের অভাব নেই । তাদের থামাতে হবে । শুধু জমিতে নয়, ওরা হেডেও ভাল । তাই মাথার বল দখলের অনুশীলন করছে । ট্রায়ালে প্রথম দিনেই নজরে পড়তে হবে । এটাই তো প্রথম ধাপ, ওর স্বপ্ন সফল করার । ওদের শহর থেকে কেউ মোহনবাগান খেলবে, এমন কজন পেরেছে ? আর বড় ক্লাবে খেলতে পারলে বাড়ির হালও ফিরবে । বাবার দোকান থেকে কত আর আয় হয়, একটা ছোট মুদির দোকান । সজলকে বাড়ির হাল ফেরাতে হবে, ওই তো বাড়ির বড় ছেলে ।

(৩)

পল্টু ভাবতেই পারেনি একটা চাকরি জুটে যাবে, তাও পাড়া থেকেই । পাড়ার ভোলাদা পার্টির নেতা, প্রোমোটারও । শুনছে পরের বারের কাউন্সিলর ইলেকশনের টিকিটও পাবে । কাজ বিশেষ কিছু না, বালি সিমেন্ট ভোলাদার গোডাউনে আসবে । সেগুলোর হিসেব রাখা । তবে সব বালি লিগ্যাল না । তাই বাইক দিয়েছে ভোলাদা । ওই বালি ট্রাকে করে আসে, ট্রাকের সামনে বাইকে পল্টু । অবশ্য ভোলাদার সব সেটিং আছে । প্রথম মাসের মাইনে পেয়েই বাবা মাকে কাপড় কিনে দিয়েছিল । আর রিমলির জন্য ওদের স্কুলের বাইরে চকোলেট নিয়ে অপেক্ষাতে ।

রিমলি অবশ্য প্রথমে পাত্তা দেয়নি তেমন, কিন্তু কেন জানি না হেসেছিল সেদিন । তারপর সময় এগোলো, আর রিমলির মনও গলতে থাকল । রিমলিও বুঝে গেল এই পৃথিবীতে পল্টুর মত কাউকে দরকার । চাকরি কবে পাবে, তাই দিয়ে সংসার দাঁড় করাবে এসব সুখ স্বপ্ন এখন অনেক দূরের । বরং পল্টুর মত কেউ পাশে থাকলে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে কলেজ ঢুকে গ্রাজুয়েট অন্তত হবে । তার পরেরটা পরেই ভাবা যাবে । তাছাড়া যা খোঁজ খবর পেয়েছে তাতে ছেলেটা মন্দ না । অন্তত ওরা যে পাড়ায় থাকে সেই অঞ্চলের বাকি ছেলেদের থেকে ভালই । নেশা করে না, অন্য মেয়েদের সঙ্গে ঘুরেছে এমন দুর্নামও নেই । রিমলিও তাই পল্টুর ডাক বেশি দিন উপেক্ষা করতে পারল না ।

(৪)

সজলের প্রথম দিনের ট্রায়াল ভালই হয়েছিল । ময়দানের ক্লাবের কোচ পিঠ চাপড়ে বলে, ভাল, কিন্তু অনেক খাটতে হবে । সজল দেখতে পাচ্ছে সবুজ মেরুন জার্সি, সল্টলেক স্টেডিয়ামে কেউ ওকে টপকাতে পারছে না । ভেজ স্টু আর পাউরুটি খেতে দিয়েছিল ক্লাবে । খেলা থাকলে ডিম দেবে । কষ্ট করতে হবে, তবেই না মোহনবাগান ।

প্রায় মাস খানেক হয়ে গেল সজল প্রতিদিন কলকাতা আসে । অনেক খাটায় নতুন ক্লাবের কোচ । কত রকম শারীরিক অনুশীলন । বড় ক্লাবে নাকি ভাল জিমে নিয়ে যায়, খাবারও ভাল দেয় । সজল জানে প্রথম সিজন খুব গুরুত্বপূর্ণ । প্রথমেই বড় ক্লাবের চোখে পড়তে হবে ।

প্র্যাকটিস সেরে প্রতিদিন সজল হেঁটেই ফেরে শিয়ালদা । অন্তত বাস ভাড়াটা বাঁচে । এই একমাসে ওই অঞ্চলের একটা দোকানে এক কাপ চা গলায় ঢালা অভ্যেস করেছে । ভাল চা করে দোকানটা । হাঁটতে হাঁটতে একটু জিরিয়ে নিতে বসে গলির মুখে চায়ের দোকানে । ফেরার তাড়া থাকে না, প্রাকটিসের ধকলে খেলে ক্লান্ত শরীর । দোকানের লোকটার সঙ্গে ভাল আলাপ হয়েছে । টুকটাক প্রতিদিনের গল্প । অন্যদিনের মত আজকেও একাপ চা খেতে গলিতে ঢুকল সজল ।

(৫)

মৌলালির কাছে ট্রাক আটকে গেছে, পুলিশ ধরেছে বালি বোঝাই ট্রাক । পল্টু বাইক নিয়ে পালাচ্ছে, পিছনে পুলিশ । শিয়ালদা অঞ্চলের গলিতে পল্টু বড় হয়েছে, একবার ঠিক মত ঢুকলে ওই গোলক ধাঁধায় খুঁজে পাবে না ।

পল্টুর বাইক বাঁক নিয়ে হঠাৎ ঢুকল গলিতে । কাল রাতে ভাল বৃষ্টি হয়েছিল, এখনও জল জমে কিছু জায়গাতে । চায়ের দোকান পেরোতে গিয়েই ধাক্কা । একটা চিৎকার, বাইকে ব্রেক ধরেনি ভাল করে । রাস্তায় পড়ে এক উঠতি ফুটবলার, যন্ত্রনায় নিজের পা চেপে ধরেছে ।

ওই অ্যাক্সিডেন্টের পর সোজা ভোলাদার গোডাউন, পুলিশ ধরতে পারেনি । পিছন ফিরে একবার অবশ্য দেখেছিল পল্টু, একটা আর্তনাদ । চায়ের দোকানের সামনে পড়ে আছে একটা ছেলে । বাইকটা পায়ে ধাক্কা দিয়েছিল । কী আর হবে? মরে তো যাবে না । যাই হোক, পুলিশ ধরেনি এই অনেক । সোজা ভোলাদার ঠেকে বাইক নিয়ে উঠেল । ভোলাদা কেসটা বুঝে নেবে বলেছে । কিছুদিন বাইকটা গোডাউনে লুকিয়ে রাখতে হবে ।

মেডিকেল কলেজের একটা ঘরে সবুজ চাদরের উপর বেশ কিছুদিন কাটাল সজল । চায়ের দোকানের লোকটাই ভর্তি করিয়েছিল, বাড়িতেও খবর দেয় । একটা অপারেশন হলো সজলের । অবশেষে বাড়ি ফিরেছে । ফুটবল এখন শুধু টিভিতে দেখা, মাঠের ঘাস আপাতত সজলের জন্য না । কবে মাঠে ফিরবে জানে না, আদৌ কি কোনদিন ফিরবে? কাল রাতে ক্লাবের টিভিতে ইপিএল দেখতে গিয়ে পায়ে না, বুকে ব্যাথা হচ্ছিল সজলের ।

(৬)

প্রায় মাস খানেক পরে বাইক নিয়ে পল্টু কাজে ফিরেছে, আবার কাজ শুরু । বেশ কিছুদিন হলো রিমলির পরীক্ষা শেষ । রিমলিকে বাইকে চাপিয়ে সোজা বাইপাস । বাইপাস পেরিয়ে সবুজ মাঠের দেখা মিলতেই বাইক থামিয়েছিল । প্রথম চুমু, খুব আলতো করে । রিমলি কাঁপছিল, একটু ভয় পেয়েছিল হয়ত । ফেরার পথে রিমলিকে ডেয়ারি মিল্ক কিনে দিয়েছে । রেস্টুরেন্টেও যেতে চেয়েছিল, রিমলি রাজি হয়নি । দেরি হয়ে যাচ্ছিল । পল্টু আর জোর করেনি । পল্টু যেন স্বপ্নে ভাসছে । রিমলিকে বাড়ি ছেড়ে বাইকে হাত বোলায় । পল্টুর মনে হয়, এই বাইক ওর জীবন ঘুরিয়ে দিয়েছে । খুব লাকি । এই বাইকে চাপিয়েই তো রিমলিকে নিয়ে প্রথম বেরোতে পারল । কোনদিন টাকা জমাতে পারলে ভোলাদার কাছ থেকে বাইকটা কিনে নেবে ।

সজলও বাইক খুঁজছে, একটা কালো বাইক । ওর স্বপ্নগুলোকে টুকরো করা বাইক আর তার আরোহী । বাইকটা পেলে কী করবে সেটা নিজেও জানে না, কিন্তু মাঠে স্ট্রাইকারদের সজলকে টপকে যাওয়া সহজ ছিল না । ওই বাইক সামনে এলে একটা কড়া ট্যাকেল সজল করবে, করবেই ।

নীল আকাশের তলায় কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন, কোথাও আবার তৈরি হচ্ছে । অজান্তেই জন্ম নিচ্ছে স্বপ্নের ভাঙা গড়ার দুনিয়া ।