প্রলাপ

চিত্রালী ভট্টাচার্য



না, আর কোন গল্প নেই আমাদের। ঠাকুমার ঝুলি ধুলো উড়িয়ে চলে গেছে দূরে। পড়ে আছে শুধু অন্ধত্ব আর অনুকরণ। এক অন্যধরনের খেলায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আমরা।
ওই যারা মঞ্চ আলো করে অর্নগল বলে যাচ্ছে প্রত্যয়, তাদের দিকে তাকিয়ে আছি মন্ত্রমুগ্ধের মত। কি গতিময় তাদের চলন! কি ঝলমলে ওদের প্রস্তাবনা! যখন কথা বলছে গম গম করে উঠছে চারিদিক। ঝম ঝম করে বেজে উঠছে শব্দেরা। ওরা চেঁচিয়ে বলছে আমরা--- আমরা----আমরা---, আমরাই তোমাদের ত্রাতা, আর অমনি সে ধ্বনি দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে প্রতিধ্বনি হয়ে। সকলে অবাক হয়ে দেখছি সে ভানুমতি। সকলের শরীর কেমন টান টান ,মন উদ্বেল, স্নায়ু উত্তেজিত!
আসলে জাদু কে না ভালবাসে বলুন তো? যে চাষির ফসল ডুবে গেছে বন্যায় , সেও তো শুকনো মুখে দাওয়ায় বসে বসে ভাবে – যদি কোন জাদুতে সব ঠিক হয়ে যায়! যদি আবার গোলা ভরে ওঠে সোনালি ধানে! যদি আবার অজস্র মৌসুমী ফসল---- হায়রে।
আর শহুরে যারা তারাও মুখে যতই লজিক্যাল এক্সপ্লানেশন কপচাক,ভেতরে ভেতরে কিন্তু সেই ভানুমতির মায়াতেই আবিষ্ট। ছোট বড় এম-এন-সির কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে বাধ্যতামূলক হৈ চৈ আর আনন্দবাজারের দিকে যেতে যেতে তারাও ভাবে – যদি একদিন সব ছেড়ে ছূঁড়ে স্কর্পিওটা নিয়ে বেড়িয়ে গিয়ে সুবর্ণরেখার ধারে মুখের লাগামটা খুলে রেখে পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিতে পারতাম! ওদের প্রত্যয় শুনতে শুনতে কি নিষ্পাপ শিশুর মত হাসে তখন।
কিন্তু সব খেলাই তো আর আলোর খেলা নয়। খেলা চলতে চলতে কখন যে অন্ধকার শুরু হয়ে যায় ঠাহর হয় না। আমাদের মত্ত রেখে ওরা লুট করে নেয় আমাদেরই। তখন নিজেকেই চিনতে পারিনা আমরা। কে আমরা? কি নাম আমাদের? আমরা কি এই দেশের নাগরিক নাকি বহিরাগত? আমাদের মাতৃভাষা কি ছিল? – সব, সব গুলিয়ে যায়। এক স্ব-নির্মিত ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি হয়ে যাই আমরা। আর কোনদিন বেরোতে পারি না। আমাদের গর্ব ,আমাদের জাত্যাভিমান, আমাদের মাতৃভূমি সব বন্ধক রেখে বাঁচাতে চাই নিজেদের। কেউ কেউ পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নি কোন তীব্র বরফের দেশে।
কিন্তু সব হারিয়ে সকলেই মনে মনে নিরাশাকে জাপতে ধরি, আর আবার ভাবতে শুরু করি যদি কোন মন্ত্র বলে সবকিছু একদিন------!খুব গোপনে ভেতরে ভেতরে একটা সুর বাজে – আমরা করব জয়----- আমরা করব জয় একদিন----।
ভানুমতি তবু চলতে থাকে, চলতেই থাকে।