একটা গল্পের ভ্রূণ ও পরবর্তী গল্পগুলো

প্রবুদ্ধ ঘোষ



-একটা গল্প দিও কিন্তু! আমাদের পত্রিকার বর্ষা সংখ্যার জন্যে।
-গল্প? কী নিয়ে লিখব, বলো? আমি কল্পনা করতে পারি না আর
-কল্পনা কেন করবে? বাস্তব নিয়েই লেখো না! এই যে ভোট চলছে, নাগরিকের অধিকার, মানুষ খুশি, প্রথমবারের ভোটারদের উজ্জ্বলতা। এবার পরিবর্তন আসবে কিনা তাই নিয়ে ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’ গোছের সমাপ্তি রাখতে পারো। রাজনৈতিক শব্দ থাকলে গল্পটা বেশ খায় কিন্তু সবাই...
-কিন্তু আমার বাস্তবে তো মানুষ মরছে, ধড়াদ্ধড় গুলি চলছে, প্রতি দফায় মাথা ফাটছে কারোর, দোকান ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর লাঠিতে দগদগে ব্যথার দাগ। ভোট মানুষ যত না দিচ্ছে, তার থেকে ভোট দেওয়ানো হচ্ছে অনেক বেশি।
-সে তো একটুআধটু হবেই। কিন্তু, খারাপগুলো বাদ দিয়েই লেখো না! শিল্পের তো নিজস্ব সুগন্ধ আছে, প্রথম দুধের মতো পবিত্র স্বাদ। তুমি কিন্তু খারাপগুলোই লেখো বড্ড, এতটাও খারাপ না পরিস্থিতি বা সমাজ। গল্পেই বা এত অন্ধকার কেন লিখবে?
-আমার লেখায় জামলো মাড়কাম নামের ওই তেরো বছরের বাচ্চাটার মুখ চলে আসে। সনি সরির যোনিতে পুলিশ পাথর ভরে দেওয়ায় ওর যন্ত্রণায় বেঁকে যাওয়া মুখ, লালগড়ে পাঁচজন দ্রোহীকে মেরে বাঁশে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়ার ছবি, আকলাখকে মারতে মারতে মেরে ফেলার সময় ওর মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে আর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান গরম সিসেয় ভরে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ওর কানে... জানো, ফালু দাস আর নরেশ কোচ জুলজুলে চোখে ওই ডিটেনশন ক্যাম্পের জাল ফুঁড়ে তাকিয়ে থাকে লেখার দিকে। জানো...

ফুরনো স্যানিটাইজারের মতো বিকেল নিভে যাচ্ছিল তখন। মাস্কের মতো সন্ধ্যে পরে নিচ্ছিল শহরের গলিঘুঁজি পথবাতিরা। ঘিঞ্জি রাস্তার বাইক-রিক্সা-সাইকেল-অটো পেরোতে পেরোতে এই কথোপকথন আদতেই কাল্পনিক। কারণ, কেউ ওকে গল্প লেখার কথাই বলেনি। আদৌ কোনও গল্প লেখেনি কোনওদিন। গল্প লেখার জন্যে যে স্থিতি আর অবসরটুকু চাই, সেটাই পায়নি। উচ্চ-মাধ্যমিক অবধি পড়েছে, তারপর হাসপাতালে কাজ। ওর শ্রমকে চাকরি নয়, কাজ বলে সবাই, ও জানে। আসগর মিস্ত্রি লেনের যে বস্তিতে ও থাকে, সেখানে উচ্চ-মাধ্যমিকের পরে কেউ আরও দু-একটা ডিগ্রি পেলে তাকে ফুল-মিষ্টি নিয়ে দেখতে আসে লোকে। নাঃ, ওর এত সৌভাগ্য হয়নি। হাসপাতালে অ্যাটেডেন্টের কাজ পেতেই লুফে নিয়েছিল, নিতে হয়েছিল। বিপর্যস্ত সংসারের ভাঙাচোরা শরীরে চোখ খুলে স্বপ্ন দেখার সময় থাকে না আর সারাদিনের ক্লান্তির পরে চোখ বন্ধ করলে স্বপ্ন আসেই না। ঘুম আসে। খুব ঘুম। শেষ চারদিন বাড়ি ফিরতে পারেনি। দিন আর রাত দু’বেলাই ডিউটি করেছে। দু’জন অ্যাটেনডেন্ট আসেনি, তাই এই বাড়তি ডিউটি। করোনার জন্যে প্রতি শিফ্‌টে ৫০ টাকা বাড়িয়েছে ওরা। এটুকু টাকাও সব পেশেন্ট দিতে পারে না, কিন্তু নিজেদের কথাও তো ভাবতে হবে। মোট ৫ জন আছে এই মেল-ওয়ার্ডে, সপ্তাহের শেষে ভাগাভাগি হয় টাকা। সে আর কত? বাড়ি ফিরে গুছিয়ে বসে গল্প লেখার অবকাশ কি মেলে? কাজের ফাঁকে দু-একবার কথা আর সংলাপের ঝলকানি ওঠে মনে। গল্প পড়তে ভালবাসত ও। গল্প শুনতে মুন্নার দোকানে বিকেল থেকে সন্ধ্যে বসে থাকত। তখনও উচ্চ-মাধ্যমিক দিতে কয়েক মাস দেরি আছে। পাড়ার কলে বিকেল ৪টেয় জল আসত, বড় জারে জল ভরে সদ্যগজানো একটা কমপ্লেক্সের কয়েকটা ফ্ল্যাটে দিয়ে আসত। নিজেদের বাড়ির জন্যে কয়েক বোতল ভরত। তারপরেই মুন্নার দোকান। কতরকম কথা শুনত! কোথায় কি কি হচ্ছে, রাজনীতি থেকে খুন থেকে খেলা সব নিয়েই আলোচনা। ও শুনত শুধু। পাড়ায় পার্তি-অফিসের বোর্ডে লটকানো কাগজ পড়ত, ইস্কুলের লাইব্রেরিতে গল্পের বই পড়ত। হাসপাতালের ছেলে-আয়া হওয়ার প্রস্তাব বাবলুদা দিয়েছিল, বাবলুদার বাবাও ওই চাকরি করত। দু’দিনের জন্যে যেতে পারবে না বলে বদলি খুঁজছিল। আস্তে আস্তে সেটাই ওর কাজ হয়ে গেল। কিন্তু, গল্পলেখার ইচ্ছেগুলো হারিয়ে যেতে লাগল। পেশেন্টের ক্যাথিটার দিয়ে যেমন পেচ্ছাপ চুঁইয়ে ব্যাগে জমা হয়, তেমনই ওর ভাবনাগুলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে আসে মাঝেমাঝে, জমা হয়। কিন্তু কোথায় যে যায়। ওই কালচে রক্ত আর হলুদ পেচ্ছাপের গন্ধের মতোই উবে যায়, লেগে থাকে হয়তো মাথার ভেতর কোনও এক কোণায়। নাঃ, লেখা হয়না। কিন্তু, সংলাপের মতো কীসব মাথায় ঘাই মারতে থাকে, অঙ্ক খাতার শেষ পাতায় যেমন রাফ আর টুকরোটাকরা লাইন লেখা থাকত; কিন্তু, কোনওদিনই সেগুলো ফেয়ার হল না, ওই টুকরোগুলো জোড়া লাগল না। চারদিন টানা দিন-রাতের ডিউটি সেরে ও ঘিঞ্জি গলির বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যের দিকে হাঁটছে। পাড়ার কলে খিস্তির বন্যা বইছে, মোটার মাকে ঝাড়ছে বাকিরা। রিকশা আর অটোর হর্নে একটু আগের ওই সাজানো সংলাপগুলো ছিঁড়েফেটে যাচ্ছে। ও আবার জোড়া লাগিয়ে নিচ্ছে। বড় রাস্তায় ভোটের মিছিল বেরিয়েছে বলে রাস্তা বন্ধ, অটোগুলো আসগর মিস্ত্রি লেনের গলি দিয়ে ওদের ঝুপড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছে। এই সবকিছু পেরিয়ে কোনওদিনই গল্প লেখার কাছে পৌঁছতে পারেনি ও। ক্লান্তিতে আর আওয়াজে ফেটে যাচ্ছিল ও, সরকারি হাসপাতালের মেল-অ্যাটেনডেন্ট।
-লেখ না বাল গল্প, এবারের হেমন্ত সংখ্যায় ছাপাব। রাজনীতির গন্ধওলা গল্প। মানুষ মরে গিয়েও খুশি রেশন কার্ড পেয়ে। ডিটেনশন ক্যাম্পে নাকি রোজ বিরিয়ানি দেয় আর এসি আছে- ভাল গল্প লেখ। বুড়ির চুলের মতো রঙ, ফুচকার টকজলের মতো স্বাদের গল্প...
-এই গল্প? ওই দেখ বাল, ফ্যালার মা বসে উকুন বাচছে। অটো কাদাজল ছিটিয়ে দিল বলে খিস্তি মারছে। ওই দেখ গুড্ডা পেছনে একটা জং-পরা মেশিন ভরে ছেনতাই করতে যাচ্ছে। হাসপাতালে আজ একটা বেহুঁশ মেয়েকে এনেছে পুলিশ, বুক আর তলপেট ছিঁড়ে গেছে মেয়েটার। নেপু, আমিন আর শুট্টাকে ভোটের দিন বোম ছোঁড়ার জন্যে ভাড়া ক’রে নিয়ে গেছে গেনুদার লোক। কয়েকমাস পরেই বস্তি খালি ক’রে দিতে হবে বলে শাসিয়ে গেছে হাজিমস্তান। এগুলো লিখব শালা?



-জানো, আমি গল্প লিখতুম! খাতাতে লিখে রাখতুম। এক-দু’বার কাগজে বেরিয়েছে।
-কী লিখতেন, দাদু? মানে, ছোটদের জন্য নাকি বড়দের জন্য?
-অত তো ভেবে লিখতুম না। যেমন মাথায় আসত। পড়াশোনা তো তেমন নেই। ক্লাস ফাইভের পরে আর... লিখতে পারতুম
-এখন আর লেখেন না? এই যে বয়েস হয়েছে এত, কতকিছু দেখেছেন জীবনে। আচ্ছা, আপনার তো হাসনাবাদে বাড়ি! তা, গ্রামের গল্প তো শুনি খুব চলে এখনও...
-হ্যাঁ, বাবা, হাসনাবাদের গ্রাম। আমাদের জমিজমা খারাপ ছিল না, জানো?! ওই ক্ষেতে কাজ করার ফাঁকে হয়তো দু’দণ্ড জিরেন নিচ্ছি, তখন কথার সুতোরা মাথায় জাল বুনত। গল্প কিনা ঠিক জানিনা অবশ্য
-এখন তো সেগুলো লিখতে পারেন। এখন নিশ্চয় অনেক সময় আপনার! গ্রামের পরিবেশ নিয়ে গল্প পড়তে খুব ভাল লাগত আমার। আমি শহরের বস্তিতে থাকি তো, তাই বোধহয় ভাল লাগত আরও। আমার মামার বাড়ি হুগলিতে, ধনিয়াখালি। কয়েকবার গেছি, খুব ভাল লাগত, জানেন... সের’ম কোনও গ্রামেই থাকেন তো আপনি। লিখুন না, গল্পটা আমায় পড়াবেন!
-কী লিখব বাবা? জমিদখলের মারামারিতে আমার সেজো ছেলেটা মরে গেছে। গেলবছর ঝড়ে বড় চালাঘরটা তছনছ হয়ে গেল, ছোটটায় কোনওমতে আমরা সবাই পাঁচদিন অন্ধকারে জলে আধডোবা হয়ে কাটালুম। সরুকারি অফিস থেকে চাল-ডাল-তেল আর ত্রিপল দিতে এসেছিল কিন্তু আমি ওদের ভোট দিই নি শুনে নাম তুলল না খাতায়। কোন অযোধ্যায় মন্দির বানাবে বলে চাঁদা নিতে এসেছিল, আমার বড় ছেলে দিতে যাচ্ছিল, আমি বারণ করলুম বলে নাম কেটে দেওয়ার ভয় দেখাল। ভয়ে থাকি, বাবা। যেদিন আমি ভর্তি হলাম তার দু’দিন পরে আমাদের ভোট ছিল। ওই দল থেকে দশ হাজার টাকা দিয়ে গেছে মেজো ছেলেকে, বলেছে ঋণ মকুব করে দেবে আর ঘর পাকা ক’রে দেবে ওদের ভোট দিলে। এই গল্পগুলোই লিখব? কিন্তু, এগুলো তো গল্প না, আমি একটাও বানাইনি, সব সত্যি, বিশ্বাস করো...

নতুন চাদর পেতে গেছে আজ। হাসপাতালের রোদ বোধহয় একটু হালকা রঙের হয়। জানলার গ্রিল আর বেডের সমান্তরাল রডগুলোর সাথে কাটাকুটি খেলে চাদরে পড়ে আরও একটু হালকা হয়ে যায়। এই পাঁচতলার ওয়ার্ডে বাইরের আওয়াজ খুব কম আসে। সকালে ওয়ার্ডবয়দের মস্করা, নার্সদের ব্যস্ততা, ইঞ্জেকশন, ট্যাবলেট আর খাবারের ট্রলি আসার শব্দে কিছুটা শব্দ থাকে। তারপর ১২টার পর থেকে ঝিমোনো ভাব, উল্টোদিকে নিউরো বিভাগের কার্নিশগুলোতে গোলা পায়রা আছে অনেক। লোকটা এইসব টুকে রাখে। আগেরদিন একজন ওয়ার্ডবয়ের সঙ্গে ওদিকের মাঝবয়সী হাইড্রোসিলের ঝামেলা হল, পেচ্ছাপের ব্যাগ হলুদ বাক্সে ফেলেছে বলে। সেটাও মনে রেখে দিয়েছে লোকটা। এগুলো থেকে যাবে, নিজের মতো সাজাবে। লোকটা এগুলো কোথাওই লিখবে না। লেখেও নি কখনও। ওই সংলাপগুলি আদৌ বাস্তব নয়। ৭৭ বছরের লোকটাকে ওর দুই মেয়ে ভর্তি ক’রে দিয়ে গেছে। তিন ছেলে বছর পাঁচেক আগে কয়েক বিঘে জমিজমা নিজেরা ভাগ ক’রে নিয়েছে। দেখাশোনা করে না আর। সেজো ছেলে মরে গেছে। তিন মেয়ের মধ্যে দু’জন খোঁজ রাখে। শহরে ওদের শ্বশুরবাড়ি। পেসমেকার বসানোর জন্যে হাসপাতালে রেখে গেছে। এই নিয়ে ন’দিন হল। মাঝে দু’দিন মাত্র এসেছিল, আধ ঘণ্টা থেকে চলে গেছে। লোকটা ওয়ার্ডে ঘুরে ঘুরে সবার বেডে যায়। কে কী করত, কার কোন রোগ, বাড়িতে কে কে আছে গল্প করে। গল্প জমায়। নিজের বাড়ির কথা বলে। গ্রামের কথা। ছেলেরা খুব ভাল। বড় ছেলে শহরের এক অফিসে পিওন, মেজো ছেলে প্রাইমারি ইস্কুলে পড়ায়। “ছোট মেয়ে রোজই আসতে চায়, আমিই বারণ করি”- ওয়ার্ডের সবাইকে বলেছে। এখন তার অফুরান অবসর। বিকেলে দাওয়ায় বসে মুড়ি-পাটালি খায়। গেলবার পঞ্চায়েতে গ্রামে গ্রামে মিটিং করেছে কত! ভোটের দিন গুণ্ডারা হামলা করতে এসেছিল, কিন্তু বাকিদের জড়ো ক’রে খেটো বাঁশ আর সাহস নিয়ে পাল্টা তেড়ে গেছে তাদের দিকে। মেজো ছেলেকে যারা দশ হাজার টাকা দিয়ে ভোট কিনে নিতে এসেছিল, তাদের খিস্তি মেরে ভূত ভাগিয়ে দিয়েছে! এই ত্তো, কথার সুতোগুলো এখনও কেমন বানাতে পারে সে! আঃ, এত গল্প জমে যাচ্ছে... গলব্লাডারে স্টোনের মতো, প্রস্টেটে সিস্টের মতো, ফুসফুসে জলের মতো, এমনকি হার্টের দরজাগুলোও বুজে আসছে নাকি; এত গল্প সারাজীবনে জমেছে। ডাক্তার অপারেশন টেবিলে নিয়ে গিয়ে আবিষ্কার করবে।
-ইশ্‌, অনেক গল্প জমে আছে তো আপনার গলব্লাডারে, ওটা তো বাদ দিতে হবে জলদি। ফুসফুসে গল্প জমছে দেখছি খুব, বাইরে বের করে দিতে হবে তো... আপাততঃ পেসমেকার, নিন, এই কাগজটায় সই...
-ডাক্তারবাবু, সত্যি গল্পগুলো নাকি বানানোগুলো? গল্পগুলো কেউ ছাপবে? আমি একবার দেখেছিলুম, অনেক গল্প একসাথে জমে আদিনাপাড়ার মসজিদটা, সেই দাদু নাকি দাদুর দাদুর আমলে তৈরি মসজিদটা, ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। একবছর আগে ওরাই শলা ক’রে শুক্কুরপাড়া আর আলিপাড়ার সঙ্গে ঝামেলা বাঁধিয়ে তুলল, এবারের ভোটের পরে নাকি বদলা নেবে বলেছে... ওই গল্পগুলো বাদ দিয়ে দিন না। জানেন, এক গল্প একবার সেই কত বছর আগে আমাদের গ্রামে এসেছিল বন্দুক নিয়ে, বই নিয়ে; সন্ধ্যেবেলা সভা ক’রে ক’রে চেতিয়ে তুলত আমাদের। রাতে দূরের এলাকার চাষীদের গল্প বলত, আমাকে ওইসব গল্পের বই পড়তে দিয়েছিল। আমার দাদা ওর সঙ্গে আরও অনেককে নিয়ে হারান জোতদারকে খুব মেরেছিল। আরও চার-পাঁচ গ্রামের চাষীদের জড়ো ক’রে জোতদার নিতাই বসুর পুলিশ-লেঠেলদের মেরে যেদিন জমি ছিনিয়ে এনেছিল, সেদিন তো উৎসব! ডাক্তারবাবু, এই গল্পটা থাক। আরেকটা গল্প...


অ্যানাস্থেসিয়ার ঘোর লাগার আগে বিড়বিড় করছিল লোকটা। সচেতন পাঠক মাত্রেই বুঝবেন যে, এই কথোপকথনটা অসম্ভব অবাস্তব। তবে, লোকটার মাথার ভেতরে এমন কিছু সংলাপ চলছিল কিনা, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তাই লোকটার ভাষা আর ভাবনাগুলোতে আমার নিজের ভাষা-ভাবনা মিশিয়ে দিতে হলো। অসঙ্গতিও কিছু কম নাকি!? অপারেশনের পরে নাকি আগেই বোধহয় ওই মেল-অ্যাটেনডেন্ট ছেলেটি লোকটির দেখাশোনা করছে। কিন্তু, লোকটা যে দিন-রাতে ৫০০টাকা দিয়ে অ্যাটেনডেন্ট ছেলেটিকে রাখতে পারবে, তা সম্ভব নাও হতে পারে। লোকটির সঙ্গে ওর হয়তো আলাপ হবেই না এই জন্যে। ওরও মাথায় ঘাই মারবে গল্পেরা, লোকটাও হাসপাতালের রোদে শুয়ে গল্প জারিয়ে নেবে আরও। আমাদের বয়ামে গল্পগুলো মজবে বা উবেও যেতে পারে। লোকটার ছোট ছেলে গতপরশু ভোট দিতে গিয়ে জওয়ানের গুলিতে মরেছে, এটা এখনও লোকটা জানে না- জানলে আরেকটা গল্প বেড়ে যাবে। ও আসগর মিস্ত্রি লেনের বাই-লেনের এক কামরার ঘরে ফিরে ঘুমোচ্ছে। স্বপ্নহীন ঘুম। ওর নাম জেনে কী হবে, বলুন? লোকটার নাম জানারও কি খুব প্রয়োজন? ও আপনি নয় বা আপনি কিছুতেই লোকটা হতে পারেন না। আমিও ও নই, তা’লে এই গল্পটাই লেখা হতো না। এইগুলো আসলে গল্পের ধরতাই। লোকটা তো রইলই, ও রইল। কখনও ঠিক কেউ না কেউ লিখে রাখবে গল্পের ভেতরে আরও গল্পের সম্ভাবনাগুলো।