ধরণী দ্বিধা হও

আনোয়ারা আল্পনা



"ধরণী দ্বিধা হও’- এই অনুভূতি কখনো হয় নাই, এমন কাউকে মনে হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে ধরণী তো দ্বিধা হয় না সিধা হয়েই থাকে। শেষ দিন যখন আর দরকার নাই, তখনই কেবল তাকে দ্বিধা করা যায়। কিন্তু মানুষের এই বোধ খুব প্রাচীন হলেও, এটা খুব গোপন বোধ। ধরণীকে জোরে বলাও যা মনে মনে বলাও তা। সশব্দে এই কথা কেউ বলেছে কিনা, জানার উপায় কী?"

সে থামল, থামাটা এমন যে বোঝা যায় না, কতক্ষণের জন্য থামল। ঢাকার জ্যামের মতো। আবার হঠাৎ জ্যাম ছেড়ে দেওয়ার মতো সে বলল, "আমার মনে হয়, সীতা প্রথম এই কথা সশব্দে উচ্চারণ করেছেন। পাবলিক ট্রায়ালে রাম যখন সীতাকে আগুনে দিল, তখন কিন্তু সে বলে নাই, হে ভগবান আমাকে তুলে নাও, বলেছে, ধরণী দ্বিধা হও। কাঠের চৌকির মঞ্চে যে যাত্রাপালা হয়, সেখানে চোকির একটা পাটাতন আলগা থাকে, ওখান দিয়ে সীতাকে সরায়ে নেওয়া হয়। মনে হয় সীতাই প্রথমে মুখ ফুটে ধরণীকে দ্বিধা হতে বলেছিলেন। না হলে ও কথা মনে মনেই বলাই দস্তুর।"

রুম্মানের সাব-এডিটরের কানে সীতার সশব্দে বলার বিষয়টা রিপিট শোনাল। মনে হল, হয় আগেরটা না হয় পরেরটা এডিট করে ফেলে দিতে হবে। আবার তুমি আপনি মেশানোও কানে লাগল।

আবার থামল কথক, চায়ে চুমুক দিয়ে খুব কায়দা করে সিগারেটে টান দিলো। তারপর বলল, "কিন্তু জীবনে দুই বা ততোধিকবার এই অনুভুতি হলে, প্রথমবারের কথা মনে থাকে?"

রুম্মান আবারও এডিটরের নাক গলাল- জাম্প! মনে মনে যদিও। সীতা থেকে সরাসরি পাবলিকের একাধিক ধরণি দ্বিধা ফিলিংসে নেমে আসা ঠিক হয় নাই। ওই কী জানি বলে- ছন্দপতন হইছে।

"আমার স্পষ্ট মনে আছে, ক্লাস সিক্সে প্রথম!" শ্রোতাদের মধ্যে মৃদু আলোড়ন দেখা গেল, ক্লাস সিক্স! কথক বলল, "হ্যাঁ অত ছোট বয়সে এতো রিডিকুলাস অনুভুতি হওয়ার কথা না।"

পর পর কয়েকটা নিউজ এডিট করে মাথা হ্যাং হয়ে গিয়েছিল বলে কড়া চা খেতে নিচে নেমেছিল রুম্মান। আজ মাসের এক তারিখ। এতো কাজের চাপ এতোদিন ছিল না, তাদের বিভাগের একজন অন্য অফিসে চলে গেছে, আজই সে ছাড়া প্রথম দিন। অন্যদিন এই সময় অফিসের পানসে লাল চা-ই খায়। এখানে রোজই দুপুর দুইটার সময় আড্ডা বসে কিনা, জানে না তাই। কথক লোকটাকে আগে কখনও দেখেছে কিনা মনে করতে পারল না সে। বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বুড়াদের মতো নয় একদম। বসে আছে, তবু বোঝা যাচ্ছে, যথেষ্টই লম্বা; ভুঁড়ি নেই। নিখুঁত সাদা শার্ট ঠিকঠাক কড়া ইস্ত্রি করা; ক্লিন শেভড। দাড়ি থাকলে সাদাই থাকতো। গোঁফ আর অর্ধেক মাথা চুল সব সাদা। অফিসের গেটাপই, শুধু গুলতানি মারার জন্য এত ফিটফাট হয়ে এই অঞ্চলে আসে না কেউ। এ ধরনের বুড়া লোক অবসরে চলে যাওয়ার কথা। পত্রিকা অফিসে অবশ্য কিছু স্মার্ট বুড়া লোক দেখা যায়। এ এলাকায় রুম্মানদের অফিস ছাড়া আর কোনো পত্রিকা অফিস নাই।

কিন্তু ক্লাস সিক্সে ধরণী দ্বিধা হওয়ের মতো বেকায়দা বোধ কীভাবে হয়েছিল, সেটা না বলেই, কথক উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, "আজ এ পর্যন্তই।" দোকানের বিল দিয়ে হাঁটা ধরে হাত নেড়ে টা টা ভঙ্গিতে বলল, "চললাম, ফের দেখা হবে।"

রুম্মানেরও অফিসে ফেরার তাড়া ছিল, ফিরে এলো অফিসে। কাজে ডুবেও গেল। কিন্তু কাজের ফাঁকে ফাঁকে চিন্তার তলা দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলল নিজের ধরণী দ্বিধা-ফিলিংসের পয়লা কিস্তির খোঁজ। খোঁজের ফাঁকে ফাঁকে আবার ফাঁকিবাজিও চলল, কী হবে খোঁজ করে। তার চেয়ে কাল ওই বুড়ার ক্লাস সিক্স ফিলিংস শুনতে যাওয়াই নিরাপদ ঠেকল।

অফিস শেষ করে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হল রুম্মানের। দুই ব্যাচেলরের বাসা, বাসা তো বাসা না কোনোরকম থাকা চলে। তাও আবার আরেকজন আজ নাই। কীভাবে কীভাবে এই জঘন্য ঢাকা শহরে এসে সে ফেঁসে গেছে, সেসব ভাবার জন্য আজকের রাত একেবারে পারফেক্ট। বিচ্ছিরি চেপেধরা গরম, অথচ গ্রামে গ্রামে এখন অক্টোবরের শেষ। এই শহরে হেমন্ত শব্দটা উচ্চারণ করতেও কষ্ট লাগে। তার উপরে এই বুড়া কথকের ধরণী ফাঁক হওয়া মাথায় তক্ষকের মতো ক্ককক্কক করেই যাচ্ছে। জামা কাপর বদলে, ফ্রেশ হতে হতে ঠিক করল, বুড়াকে এখন থেকে তক্ষক ডাকবে।

কাল বুধবার, রুম্মানের সাপ্তহিক ছুটির দিন। ছুটি যে আবার শুক্রবার ছড়াও হয় প্রথমবার মাকে বোঝাতে অনেক ধকল গেছে রুম্মানের। তবু মায়ের মাথায় শুক্রবারই রয়ে গেছে। শুক্রবার সকালেই ফোন করে নিয়ম করে। মায়ের কথা মনে হতেই আবার ধরণী দ্বিধা চলে এল।

নিজেকে সে বলল, রুম্মানের দুইভাগ মাটির কথা কাউকে গল্প করা যাবে না। কিন্তু বলা না গেলেও সে গল্প তো আর নাই হয়ে যায় নাই; আছে। ভাল ভাবেই আছে, তেল কমে আসা ট্রাকের শব্দের মতো আছে। কিন্তু সেসব নিয়ে এখন ভাবতে বসা যাবে না। কাল বুধবার হলেও অফিসে যেতে হবে, একজন চলে গেছে বলে। আরেকজন কবে আসবে কে জানে। অফিস অবশ্য বলেছে এটা ঐচ্ছিক। মানে অফিস করলে একদিনের বেতন বেশি পাওয়া যাবে, না করলে ছুটি কাটা যাবে না। একদিনের বেতনের লোভে না, তক্ষকের ক্ককক্কক শোনার জন্য হলেও যেতে হবে ভেবে জোর করে ঘুমিয়ে গেল।

পরেরদিন অফিসে গিয়ে ধুমধাম কাজ করল আর বারবার ঘড়ি দেখল সাব-এডিটর রুম্মান। দুইটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে নীচে নামল দৌড়ে দৌড়ে। চায়ের দোকানে দাখিল হয়ে অবাক হয়ে গেল। রোজই গতকালের মতো আড্ডা বসে ধরেই নিয়েছিল সে। কেউ নেই আজ ! খোকন বসে বসে ঝিমাচ্ছে। চা দিতে বলে খোকনের ঝিম ছাড়ালো। চুমুক দিয়ে বলল, ‘কালকের গল্পবাজ বুড়া আজ আসে নাই?’ খোকন বলল, ‘আইজ অন্য কুনোহানে বইছে য্যান !’ রুম্মান মনে মনে হায় হায় করে উঠল। কই খুঁজবে এখন বুড়াকে? সে নিজের ব্যাকুলতা চেপে রেখে বলল- ‘আর কই কই বসে হেরা?’ খোকন সিধা রাস্তা দেখিয়ে দিল। মানে রুম্মানকে চলে যেতে বলল না, হাত তুলল গলিটার শেষমাথা বরাবর। রুম্মানকে মানে উদ্ধার করে নিতে হল- এই গলির যেকোনো চায়ের দোকানেই বসতে পারে আড্ডা। রুম্মান চায়ের কাপ রেখে টাকা না দিয়েই হনহন করে হাঁটা শুরু করল সামনের দিকে, খোকনের দোকান পিছনে ফেলে। দুই তিন চার নম্বর দোকানে গিয়ে পেয়ে গেল। বুড়াকে দেখে মনে হল, রুম্মানের জন্যই অপেক্ষা করছিল।

শুরু হলো ক্লাস সিক্সের ধরনী দ্বিধা হও। তক্ষক বুড়ার মুখে এক ধরনের আলোআঁধারি খেলে গেল মনে হল রুম্মানের। শৈশবের দুঃখের স্মৃতিও মধুর এ কথা যারা বলে, তারা জানেই না, বাকি জীবনের সব খারাপের সাথেই শৈশবের যোগ থাকে। রুম্মানের মনে হল, খুব জটিল কিছুই শুনতে যাচ্ছে সে।

"সেদিন বিকালে ফুটবল খেলে এসে বাড়ি ঢুকেই একসঙ্গে তিনজনের সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। আব্বা, আম্মা ভাইজান তিনজনেই এই সময় বাড়িতে, কাহিনি কী? তাদের দেখে মনে হয়েছিল, আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমাকে দেখে খানিক বিব্রত, আমি বাড়িতে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে, পড়তে বসব না কিছু খাওয়াদাওয়া পাওয়া যাবে ভাবতে ভাবতে আম্মাকে ডাক দিয়েছিলাম। আম্মার বদলে আব্বা সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। আব্বার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম- ঠোঁট না খুলেই আব্বা বলেছিল, মাজেদ মাস্টার আর মতিলাল বাবুর সাথে বাজারে দেখা হইছে আইজ।"
থামল তক্ষক বুড়া, চায়ে চুমুক দিল, সিগারেটে টান দিল। স্রোতারাও দম নিল, চা সিগারেট তাদের হাতেও। কিন্তু ওই বালককে ঠিক কী পরিস্থিতিতে ফেলে রেখে শ্রোতারা ব্রেক নিয়েছে, সেটা না জেনে চা সিগারেটের স্বাদ যেন ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। বুড়ার বিড়িতে দম দেওয়া দেখে মনে হচ্ছে, গলা শুকিয়ে কাঠ।

চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বুড়া বলল, "মাজেদ মাস্টার আমাদের স্কুলের ইংরেজির স্যার আর মতিলাল বাবু অংকের। স্কুল ছুটির পর দুই ব্যাচ প্রাইভেট পড়িয়ে বাড়ি যান। ছয়মাস ধরে বাড়ি থেকে প্রাইভেটের বেতনের টাকা নিয়েছি, কিন্তু একদিনও যাই নাই। বাজারে আব্বার সাথে দেখা হলে, ছেলের লেখাপড়ার খোঁজ নিতে গিয়ে থলের বেড়াল বেড়িয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেছে। ঠিক এই সময়ে আমার মনে হয়েছিল- হে মাটি দুইভাগ হয়ে যাঃ না হলে আজ আমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।"

"টাকা কী করছিস?- আব্বার হুংকারে আম্মা দৌড়ে এল। আব্বার হাতে মাইর খেলে বেশি খাব ভেবে আম্মাই শুরু করল ; আম্মার হাতের মাইর বেশি জোরে লাগে না ভেবে আমিও মনে মনে যাক বেঁচে গেছি বলতে না বলতে আম্মার হাত থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে আব্বা শুরু হয়ে গেল।"

আবার সিগারেট ধরালো বুড়া, শ্রোতারাও। সেই সময় রুম্মানের ফোন বেজে উঠল, অফিস থেকে রনি ভাই বলল, ‘কই গেলা? কাজ শেষ করবা না? ডে অফের দিন, রাত পর্যন্ত অফিস করবা?’ রুম্মান বলল, ‘ধরনী দ্বিধা হও !’ রনি বলল- ‘কাম সারছে !’

বুড়া বলল, "মাইর খেতে খেতে আমার চোখে ভাসতে লাগল, চারটা পকেট উপচে চকলেট, লজেন্স পড়ে যাচ্ছে আমার আর আমার বন্ধুদের। আম্মার কাছ থেকে প্রাইভেটের টাকা নিয়ে ওদের নিয়ে দোকানে যেতাম, কত টাকায় কত চকলেট হয় জানি না, দোকানদারকে সব টাকা দিয়ে দিলে ইচ্ছামত চকলেট নিতে দিত। প্যান্টের দুই পকেট, শার্টের দুই পকেট ভরে, বইখাতা সামলে দুইহাত ভরে চকলেট নিয়ে বেরিয়ে আসতাম আমরা রাজার মতো।" লম্বা দম নিয়ে বুড়া বলল, "স্কুলব্যাগ ছিল না।"

দমবন্ধ শ্রোতারা বেদম মাইর খেতে থাকা বালকের কাছেই তখন, চকলেটে মন ফেরে না। কিন্তু এটা তো বলা যায় না, ‘সেদিন কি মরে গেছিলেন?’

বুড়া গল্প শেষ করে দেওয়ার ঢঙয়ে বলল, "না মরি নাই সেদিন, মরে যাওয়ার আগ মুহূর্তে ভাইজান এসে বলেছিল, আব্বা ও তো মইরা যাইতাছে !"

আগের দিনের মতোই হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বুড়া বলল- "চললাম।" ভেঙে গেল আসর। রুম্মান অফিসের দিকে দৌড় লাগাল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে নিজের ধরনী দ্বিধা হও ফিলিংস আর বেদম মাইরের এক বাল্যদিন ফিরে এলো। ফিরে এসে ঘাড়ে চেপে বসলেও অফিস করতে হলো। ঘন হয়ে আসা সন্ধ্যায় একা একা অফিস থেকে বেরোতে হলো। নিজের ঘাড়ে নিজেকেই হাত বোলাতে হলো। তবু ছেড়ে গেল না, একটা আসর জমিয়ে গল্প বলতে ইচ্ছা করতে লাগল, বেদম প্রহারের বাল্যস্মৃতির দিন আজ।

অফিস থেকে বেড়িয়ে এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে অনেকক্ষণ পরে খেয়াল হলো, বাসার উল্টা দিকেই যাচ্ছে সে- এদিকে গুলিস্থান। ফুটপাত দিয়ে ঘামেভেজা লোকেদের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে এক সময় সে পৌঁছে গেল একটা গোল হয়ে গল্প করতে বসা আড্ডায়। একটা মামুলি চায়ের দোকান ঘিরে কয়েকজন মানুষ মনের সুখে গল্প করছে। পান, চা, বিড়ি, বিস্কুট, বান আর মুখ ভরা হাসি। একটা চা চেয়ে রুম্মান ভিড়ে গেল তাদের সাথে। চায়ে চুমক দিয়ে গলা খাঁকারি দিল এবং বিনা ভুমিকায় বলল, ‘ছোটবেলায় আমার মাথা বড় ছিল!’ এই একটা বাক্য গাছের সুবিধাজনক ডালে দড়ির একমাথা ছুঁড়ে দিয়ে, অন্যমাথায় গিঁট দিয়ে দোলনা বানিয়ে ফেলার মতো কাজ করল। আড্ডা অবাক হয়ে রুম্মানের ভদ্রগোছের মাথার দিকে তাকাল। একজন বলল, ‘কী বলেন ভাই! মাথা তো শক্ত জিনিস!’ আরেকজন বলল, ‘পেট হইলে না হয় বুঝতাম বড় হয়ে কমে গেছে, অনেকেরই ছোটকালে পেট বড় থাকে। কিন্তু মাথা!' রুম্মান হাসতে হাসতে বলল, ‘আমি বড় হইছি পরে মানায়া গেছে।‘ আড্ডা আরেকবার বোকা হয়ে ভাবল - আরে তাইতো! এবার দোকানদার স্বয়ং বলল, ‘কিন্তু আচানক ছুডোবেলায় মাথা বড় আচিলো, এই কথা ক্যান কইলেন?’ রুম্মান তক্ষক বুড়ার মতো বলল,'তাইলে শোনেন।' এতগুলি আগ্রহী মুখের দিকে তাকিয়ে রুম্মানের মনে হল, গল্প বলতে পারা খুব আরামের কাজ।

চাওয়ালার আরেকবার তাগাদায় রুম্মান বলতে শুরু করল, 'ছয় বছর বয়স পর্যন্ত হাঁটতে শিখি নাই আমি, মাথা এত বড় ছিল বলে ব্যালান্স রাখতে পারতাম না। দুই একটা শব্দ ছাড়া কথাও বলতে পারতাম না ; কিন্তু বুদ্ধিজ্ঞান ছিল টনটনা। রাস্তার সাথে লাগা বাড়ি আমাদের, সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে জানালা দিয়ে মানুষ দেখতাম আর ছেঁড়া ছেঁড়া কথা শুনতাম। শুনতে শুনতে এমন হল যে, চেহারা না দেখেই গ্রামের সবার শুধু কণ্ঠ শুনে চিনে ফেলতাম। টুকরা কথা শুনলেও পুরা কথা বুঝতে পারতাম। ফলে অনেক গোপন কথা জমা হয়ে গেছিল আমার কাছে। হাঁটতে শিখে আমি ফটাফট কথা বলাও শিখে গেছিলাম, আর কথা সব বড়দের মতো কথা বলতে শুরু করেছিলাম। ফলে আমার জায়গা হয়েছিল বড়দের মজলিসে। এক মজলিসে একদিন বড়দের মতো এক বেফাঁস কথা বলে ফেলায় পিটাতে পিটাতে আমাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিল আমার আব্বা। আমার তখন সাত বছর বয়েস, সেদিন প্রথম মনে হয়েছিল, মাটি নিজে নিজে ফাঁক হয়ে গেলে আমি ঢুকে বেঁচে যেতাম।'

আড্ডা নির্বাক। গল্প বলে ফেলে রুম্মানের খুব আরাম হল, আর বুঝে গেল ওই তক্ষক বুড়া কেন ঘুরে ঘুরে অচেনা লোকেদের গল্প শোনায়। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, একদিন তক্ষক বুড়ার সঙ্গে একা কথা বলতে হবে।

দুই সপ্তাহ পরে অফিসে নতুন লোক জয়েন করার পর, দম ফেলার সুযোগ পেয়েই বুড়ার খোঁজে পুরা দৈনিক বাংলা আর পল্টন মোড়ের সব চায়ের দোকান চষে ফেলল রুম্মান। তক্ষক বুড়ার দুপুর দুইটার আড্ডা এখন কোথায় বসে কেউ বলতে পারে না। রুম্মানের পুরা জেদ চেপে গেল, যেভাবেই হোক বুড়াকে খুঁজে বের করার জেদ। দিনের পর দিন কাটতে লাগল বুড়াকে খুঁজে খুঁজে। পুরা মতিঝিল এলাকার প্রত্যেক চায়ের দোকান দুপুর দুইটার মিশনে রুম্মানের সঙ্গী হলো।

যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে, তখন এক গণপিটুনির মচ্ছবে তাকে পেয়ে গেল। গোল হয়ে দাঁড়িয়ে এক পকেটমারকে গণধোলাই খেতে দেখা জনতার মাঝে মুখে স্বর্গীয় আরাম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তক্ষক বুড়া। রুম্মান ভিড় ঠেলে তার পাশে দাঁড়িয়ে নিজেও কিছুক্ষণ কিছুক্ষণ নেতিয়ে পড়া পকেটমারের মাইর খাওয়া দেখল। তারপর বুড়ার হাত ধরে টেনে ভিড় ছেড়ে দূরে চলে এলো। বুড়া অবাক হয়ে বলল, "আপনি কে?"
রুম্মান হাসতে হাসতে বলল, 'আমিও ধোলাই খাওয়া পাব্লিক ! আমারও ধরণী দ্বিধা হও ফিলিংস আছে।'

তক্ষক বুড়া ফিক করে হেসে বলল, "ধোলাই খাওয়া দেখা খুব মজা, না?"

রুম্মান খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলল- ‘খুউব !’