সুড়ঙ্গ

পায়েল চ্যাটার্জী



বিদীপ্তর একটা সুড়ঙ্গ আছে। আলো-আঁধার মেশানো। বিদীপ্ত বুঝতে পারেনা সুড়ঙ্গর ওপারে কি আছে! তবে কল্পনা করে নেয়। ওর ইচ্ছেডানাগুলো ছেঁটে রাখা আছে বোধহয়। গুছিয়ে, সযত্নে। ম্লান আলো এসে পড়ে ওর সুড়ঙ্গে।

বিদীপ্ত রোজ পূর্ব দিকের জানালাটার সামনে বসে। বন্ধ জানালা। খোলে না ও।ওর প্রিয় রং হলুদ। ও কল্পনা করে জানালার বাইরে হলুদ আঁচল উড়ে বেড়াচ্ছে। মুক্ত, পাখির মত। ঋতশ্রীর ফোনে ওর কল্পনার জাল ছিঁড়ে যায়। "কিরে কখন বেরোবি?" । ঋতশ্রী বিদীপ্তর বন্ধু। কেমন বন্ধু? পূর্ব দিকের জানালা আর হলুদ আঁচলের বন্ধুত্বের মত। দুটো সমান্তরাল মনের বন্ধুত্ব। ঋতশ্রী হলুদ আঁচলের কথা জানে।

"দীপ্ত, টেবিলে খাবার রইল"। মায়ের অফিসের সময় হয়েছে। তাই এসব গুঁড়ো গুঁড়ো কথা। কথারা আজকাল বিদীপ্তকে ছুঁতে পারে না। হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় শুধু। আজকাল মা অনেক কথা বলে। মায়ের অফিস, বিদীপ্তর কলেজ, ওদের এই বাড়ি, ইলেকট্রিক্যাল লাইনের সমস্যা, আরো কত কি। শুধু হলুদ আঁচলের কথা বলে না।

বিদীপ্ত দরজা দিয়ে মায়ের চলে যাওয়া দেখে। নীল পাড় তাঁতের শাড়ি। ঘি'য়ে রঙের ব্লাউজ। বিদীপ্ত মায়ের আলমারির কাছে যাবে এখন। মায়ের আলমারিতে গোলাপী গন্ধ আছে। বিদীপ্তর বড় প্রিয়। এরপর বাস, কলেজ, ক্লাস, ঋতশ্রী। শুধু মাঝে মাঝে হলুদ আঁচলের কথা মনে পড়বে। গোলাপি গন্ধরা বাতাসে উড়ে বেড়াবে। যে বাতাস বিদীপ্তকে ছুঁয়ে থাকে। ক্লাসের পর আবার কথাদের উৎসব শুরু হবে। ঋতশ্রী কথা বলতে ভালোবাসে।

''কিরে! আজও নিশ্চয়ই কাকিমার আলমারির কাছে দাঁড়িয়েছিলি''। ঋতশ্রী জানতে চায়। বিদীপ্ত এড়িয়ে যায়। ঋতশ্রী আবার কথা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
"নিশ্চয়ই হলুদ আঁচলের কথা ভাবছিলি।" বিদিপ্ত সযত্নে এড়িয়ে যায় কথা।
আসলে ঋতশ্রী জানে, মাও জানে। তবে এরা বিদীপ্তর সুড়ঙ্গকে পার করতে পারে না। যে এই সুড়ঙ্গটা খুঁজে দিয়েছিল, সে চলে গেছে। বিদীপ্তর বাবা। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে অটোতে উঠলেই বিদীপ্ত বাবার গন্ধ পায়। বাবাও অটো করে ফিরত। হাতে নীল প্যাকেট থাকত।

"রিমোট গাড়ি নিবি?''। বাবার সেই নীল প্যাকেট থেকে বেরিয়ে আসতো টুকরো-টুকরো আদর। হলুদ প্রজাপতিগুলো বিদীপ্তর জানালার বাইরে উড়ে বেড়াতো তখন। সঙ্গে ও নিজেও উড়ে বেড়াতো। হলুদ স্কার্ট পরে। মায়ের বাক্স থেকে নতুন কানের দুল পরে। মাথায় একটা গোলাপী রঙের হেয়ার-ব্যান্ড। বিদীপ্ত তখন বারো। ওর পূর্ব দিকের খোলা জানালা। দৃশ্যকল্প। কল্পলোকের সুগন্ধ।

বিদীপ্তর পছন্দ ছিল গাঢ় হলুদ স্কার্ট আর গোলাপি রঙের জামা। ''বাবা, রিমোট গাড়ি নয় গোলাপি জামা নেব, সঙ্গে হলুদ আঁচল"। একদিন আচমকাই বায়না করে বসেছিল বিদীপ্ত। মায়ের হলুদ শাড়িটা দেখে মনের মধ্যে প্রজাপতিরা ডানা মেলতে শুরু করেছিল। তাই বায়না।

তারপরই বাড়ির পরিবেশটা বদলে যায়। মায়ের কথা, আদর ফুস-মন্তরের মত ভ্যানিশ। তারপর বাবার অ্যাক্সিডেন্ট। বাবা তার আগের দিন নীল প্যাকেটে গোলাপী জামা, হলুদ স্কার্ট আর সঙ্গে হলুদ আঁচলের মত ওড়না এনে দিয়েছিল। কিন্তু সেদিন বাড়ির আলোগুলো মা তাড়াতাড়ি নিভিয়ে দিয়েছিল। নীল প্যাকেটটা আর খুঁজে পায়নি বিদীপ্ত।

বিদীপ্তর এখন ঊনিশ। সাত বছর ধরে ও খুঁজে চলেছে সেই নীল প্যাকেটটা। হলুদ আঁচল, গোলাপী স্কার্টসমেত প্যাকেট।

ঋতশ্রী এইসব জানে। ও বিদীপ্তর জানালাটা খুলে দিতে চায়। কিন্তু বিদীপ্ত পারেনা।

মা এখন কথা বলে বিদীপ্তর সঙ্গে। 'স্বাভাবিক' কথা। বাবা চলে যাওয়ার পর বুঝিয়েছিল মা। 'স্বাভাবিক' হতে হয়। মা এখন ‘স্বাভাবিক’ হওয়ার চেষ্টা করে।

আজ আট বছর আগে বাবার চলে যাওয়ার দিন। ঋতশ্রীও আজ চলে যাচ্ছে। দিল্লি। উচ্চতা ছুঁতে। বিদীপ্তর কি ছোঁয়ার কিছুই নেই! হলুদ আঁচল, প্রজাপতি, গোলাপি হেয়ার-ব্যান্ড সব হারিয়ে গেছে।
সকাল থেকেই মেঘ করেছে। বৃষ্টি। মা অফিস যায়নি।
বিদীপ্তর পাশে মা বসে আছে। মা খুলে দিয়েছে পূর্বদিকের জানালাটা। আলো এসে পড়েছে দুজনের চোখে। মায়ের হাতে সেই হলুদ আঁচলসমেত নীল প্যাকেট। বিদীপ্তর চোখে মুক্ত-কণা। ও দেখতে পাচ্ছে। মায়ের চোখে আলো। সেই আলোয় সুড়ঙ্গর ওপারের অন্ধকারটা মিলিয়ে যাচ্ছে। রূপান্তরিত হচ্ছে হলুদ আলোয়।