হত্যা অথবা আত্মহত্যা অথবা কিছুই কিছু নয়

প্রসূন মজুমদার



--- আমি খুন করেছি।
--- ও আচ্ছা। তারপর ---
--- মানে? আপনি অবাক হননি? ভয় পাননি?
--- না। আপনি খুন করেছেন জেনে আমি অবাক হতে যাব কেন?
--- বলেন কী! আপনার কথা শুনে তো আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি।
--- সেটাও হওয়া উচিৎ না কিন্তু। খুন আমিও অনেক করেছি। এবং ফ্যাক্টটা হল একটু পরে আমি আরও একটা খুন করতে যাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে।
--- তাহলে আমি বোধহয় ভুল জায়গায় এসে পড়েছি। চলি স্যার।
--- আরে! বসুন, বসুন। আপনি ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। আপনার জড়তা কাটানোর জন্যে আপনাকে একটু চমকে দিলাম আর কি।
--- তাই বলুন। আমি তো --- যাক। দেদার ঘাবড়ে গেছিলাম। একটু জল ---
---- নিন, জল খেয়ে বলুন তো সমস্যাটা কী আপনার। খুন করেছেন কীভাবে?
--- একটা বাচ্চা ছেলে, ধরুন একুশ - বাইশ। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি গুলি করে দিয়েছি।
--- গুলি! বন্দুক পেলেন কোথায়?
--- আমি সি,আই,এস,এফের ৬ নং ব্যাটেলিয়ানের ৮ নং রেজিমেন্টের ---।
--- বুঝলাম। ওই ফায়ারিং-এর কেসটায় আপনি ছিলেন তাহলে!
--- এখন কী করব? আমি কলের তলায় হাত পাতলেই রক্ত দেখতে পাচ্ছি।হাজার ধুলেও উঠছে না। শুধু রক্ত। রক্তের স্রোত।
--- বুঝলাম। কিন্তু ভাই, আপনি তো খুন করেননি! আত্মরক্ষার জন্যেই তো আপনারা গুলি চালিয়েছিলেন!
--- আচ্ছা,আপনার কী মনে হয় ভাড়াটে খুনিরা অন্যকে রক্ষার জন্যে গুলি চালায়? সকলেই তো আসলে নিজেকে রক্ষার জন্যেই অন্যকে খুন করে তাই না ?
--- বুঝলাম। আপনার চিন্তাভাবনা স্বচ্ছ। স্বচ্ছ বলেই আপনি ফাঁপরে পড়েছেন। বেশ, তাহলে বলুন তো আপনি গুলি চালাতে গেলেন কেন?
--- নির্দেশ ছিল। ফায়ার অর্ডার। বেচাল দেখলেই গুলি।
---- তার মানে ছেলেটা বেচাল দেখিয়েছিল?
--- না তো! ছেলেটা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল।
--- অকারণে আপনি তাকে গুলি করে দিলেন?
--- ঠিক অকারণে নয়। আসলে একটা ঝামেলা হচ্ছিল। একটা মব আমাদের ঘিরে ধরেছিল।
--- তাহলে তো আপনার কোনও দোষ নেই। আপনি তো গুলি চালিয়ে নিয়ম কিছু ভাঙেননি! বরং বলা যায় উচিৎ কাজই করেছেন।
--- একটা নির্দোষ ছেলের গায়ে গুলিটা লেগেছে। স্পট ডেড।
--- তাহলে ব্যাপারটা হল, গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। রামের বাবার কেস আর কি?
--- রামের গুলিটা কারও গায়ে লাগেনি। ও তাই বেঁচে গেল।
--- রাম তো গুলি চালায়নি কখনও। চালালে ওরও এমন হতে পারতো।
--- কে বলল চালায়নি? ওর মতো ট্রিগার - হ্যাপি লোক গুলি চালাবে না! ও হল রাম সিং, গুলি না চালাতে হলেই ওর মন খারাপ হয়।
--- এই দেখো! আমি তো রাম বলতে রামায়ণের রামচন্দ্রের কথা বলছিলাম।
--- তাই বলুন! সিয়ারাম। ওর বাবার কী হল?
--- ওর বাবা সেই একবার শব্দভেদী বাণ মারতে গিয়ে হরিণ ভেবে ভুল করে অন্ধমুনির পুত্রকে মেরে ফেলল না?
--- তা হবে। আমি জানি না। কিন্তু আমি এখন কী করব? আমি হাত ধুতে পারছি না।ধুতে গেলেই রক্ত।
--- আপনি নিজেকে দোষী ভাববেন না। গুলি চালানোটাই আপনার কাজ। সীমান্তে যুদ্ধ বাঁধলে কি আপনারা গুলি চালান না! ভাবুন, কেবল আপনার ডিউটি পালন করেছেন।
--- অন্য দেশের আর্মিকে গুলি করা আর নিজের দেশের লোকেদের গুলি করাটা এক জায়গায় আনতে চান?
--- না। তা কেন? কিন্তু ওরা তো দেশবিরোধী কাজ করছিল?
--- দেশ নয় বলুন রাষ্ট্রবিরোধী।
--- হ্যাঁ তাই। কিন্তু ভাবুন, আপনি তো রাষ্ট্রের রক্ষক। রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ আপনি মেনে নিতে পারেন না।
--- আচ্ছা,আমি যদি রাষ্ট্রের রক্ষক হই, তাহলে ওরা তো রাষ্ট্রেরই অংশ। ওদের রক্ষা করা তো আমার কাজ। কিন্তু আমি ওদের হত্যা করেছি।
--- ধুর বাবা! এতো বেশি বুঝে গেলে তো মুশকিল! শুনুন এতো বোঝার দরকার নেই। আপনি নির্দেশের বশ। নির্দেশ এলে আপনাকে ট্রিগার টিপতেই হবে। এই তো সিম্পল। এতো ভাবতে যাচ্ছেন কেন, আপনি?
--- তা বটে। নির্দেশের বশ। রাষ্ট্র! যন্ত্র! হত্যা! আচ্ছা, আমি এখন আসি।

রাম সিং - এর সহযোদ্ধা বেরিয়ে আসে। নদীর কাছে যায়। এই সেই গঙ্গা! এই নদীই ধারণ করে আছে একটা শহর, একটা রাজ্য, একটা দেশ। ঢেউ ভাঙতে থাকে। ও--ই রাম সিং,ও--ই তার পাশে সহযোদ্ধা। ঢেউ তাকে ভাঙছে। ভাঙতে ভাঙতে ছায়া এক থেকে অনেক হয়ে যায়।
রামের সহযোদ্ধা এবার কানের কাছে রাইফেল ঠেকায়। ট্রিগার হ্যাপি আঙুল অমনি এসে ঠিক জায়গায় ছুঁয়ে ফেলে। নির্দেশের অপেক্ষা করছে সে। অদৃশ্য কোনও হাতে অদৃশ্য কোনও পাতায় অদৃশ্য কোনও সই নির্দেশ পাঠাবে আবার। ট্রিগার প্রস্তুত। অনেক ছায়ার একজন মানুষ ভেসে যাচ্ছে ঢেউএ, গঙ্গায়। শুধু নির্দেশ আসে না আর। নির্দেশ কখন আসবে তা কেউ, কোনওভাবেই বলতে পারে না।