স্নিগ্ধকুঠার

রাণা রায়চৌধুরী




স্নিগ্ধকুঠার


লোকটা ঘুমিয়ে পড়েছিল অনেক দিন আগে।
ঘুম আর ভাঙে না।

লোকটা কাঠুরে। গভীর জঙ্গলের ধারে তার বাস। লোকটার খেয়াল নেই পাশের ঘরে অসুস্থ পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৌ একা বিছানায় শুয়ে আছে।

লোকটা বরাবর আনমনা।

কিছুদিন আগে লোকটা ঘুমিয়ে পড়েছিল। এখনো ঘুমোচ্ছে। অনেকদিন ধরে ঘুমোচ্ছে। জানে জঙ্গল অরণ্য, অরণ্যের সবুজ ও জীবজন্তুরা তার পাশে আছে।

তাই সে নিশ্চিন্তে অনেক দিন ধরে ঘুমিয়ে আছে।

নতুন রিসর্ট নতুন হোটেল ট্যুরিস্ট লজ তৈরি হতে হতে প্রায় অরণ্যের কাছে তার ঘুমের কাছে চলে এসেছে।

নানারকম মেশিনের শব্দে ব্যবসায়ীদের চিৎকারে মানুষের কোলাহলে অরণ্যেরও ঘুম ভাঙছে, বনের সবুজ ভাঙছে, তারও অনেক দিনের পুরনো ঘুম ভাঙল।

ঘুম ভেঙে তার খেয়াল হল, তার একটা অসুস্থ বৌ আছে। সে দরমার বেড়ার ওপারে তাকিয়ে দেখল - একটা নেকড়ে। তার রুগ্ন বৌয়ের খাটের ধারে মাটির মেঝেতে নেকড়েটা বসে আছে। লেজ নাড়ছে।

তার রুগ্ন বৌকে নেকড়ে মুখে করে জল এগিয়ে দিচ্ছে। তার বৌ ইশারায় ওষুধ দেখাল নেকড়েকে, নেকড়ে ওষুধ মুখে করে এগিয়ে দিচ্ছে।

লোকটার নেকড়ের ওপর খুব রাগ হল। নিজেকে খুব একা লাগছে তার, নিজেকে স্বার্থপর মনে হচ্ছে।

কুঠার হাতে বাইরে বেরিয়ে দেখল গাছ নেই, অরণ্য নেই। শুধুই কংক্রিটের ট্যুরিস্ট লজ।

লোকটা ঘরে ফিরে নিজের কুঠুরিতে ঢুকল। কুঠারের ধারালো ইস্পাতের খিদে পেয়েছে।
কুঠারটা গাছ না-পেলে তাকে খাবে।

কুঠার চুঁইয়ে রক্ত পাশের রুগ্ন বৌয়ের ঘরে গড়াচ্ছে। রক্ত গড়াতে গড়াতে নেকড়ের কাছে আসতেই নেকড়ে জেগে উঠল আসল নেকড়ে হয়ে।

ব্যবসায়ীরা এসে দেখল, দুটো পচাগলা ছিন্নভিন্ন মানুষের দেহ, আর একটা দুঃখী ম্লান কুঠার, আর একটা রোগা অসুস্থ নেকড়ে শুকনো রক্ত মেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিন আগে এরা দুজন ঘুমিয়ে পড়েছে। জাগবে না আর।

ব্যবসায়ীদের বুলডজার ভারী হাতুড়ির শব্দে তৈরি হচ্ছে আরো একটা ট্যুরিস্ট লজ। পরে যার নাম হবে 'স্নিগ্ধকুঠার'!


ঢপবাজ

এটা গলা খাঁকারি না ব্যঙ্গ সময় সময় বোঝে না অনুপম। গলার কফে কথা আটকে গেলে এ হেঁ এ হেঁ করে খাঁকারি মেরে মানুষ নিজের স্বরকে বের করতে চায়। নিজেকে প্রকাশ করতে, নিজেকে বলতে চায়। কিন্তু অন্তরায় ঐ শালা কফের বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চার থেকেও বেশি প্রতিক্রিয়াশীল ও মৌলবাদী।

তো গলা খাঁকারি, এঁহেহেহে করে বা ওহহহহ করে বিভিন্ন মানুষ ভিন্ন রুচি ও শিক্ষার মানুষ এই গলা খাঁকারি দিয়ে, নিজের মূল্যবান চিরস্থায়ী মতামতকে ব্যক্ত করতে চায়।

উল্টোদিকের মানুষ বোঝে, কফ সরে গেল। এইবার দামী কথা বা বার্তা বক্তা বলবেন বা দেবেন, বা পাদের মতো ছাড়বেন অথবা ছড়াবেন। উল্টোদিক মানে শ্রোতা যে, সে তো বরাবরই বোবা। সে শুধু শোনে ও কফ-মেশানো কথাকে অব্যর্থ ভেবে জীবনে তা পালন করে।

অফিসে অনুপম যখন বক্তা নয়, চারপাশের বিভিন্ন শব্দের সে যখন শ্রোতা; যেমন কাপ ভাঙার শব্দ বা অফিস পিয়নের খৈনিতে ত্থাপ্পড় মারার শব্দ বা পাশের টেবিলে সূত্রধর-এর সিগ্রেট ধরানোর জন্য দেশলাই জ্বালানোর শব্দ তার মধ্যেই হয়তো শিবু ঘোষ গলা খাঁকারি দিল - অনুপম-এর কানে এলো তা।

অনুপম ওরফে অনু (মলি ঘনিষ্ঠ মূহুর্তে ঐ অনু বলেই ডাকে, অনুপম অবশ্য ঘনিষ্ঠতার শেষ মুহূর্তে 'অনু'কে 'হনু'ও শোনে কখনো কখনো) বুঝতে পারে ঘোষের এই গলা খাঁকারির মধ্যে কোনো পাপ নেই, একটা দুষ্টু কফের দলাকে সে কন্ঠনালী থেকে সরাতে চাইছে মাত্র! এতে ভাষণ নেই বা বিদ্রূপও‌ নেই, সে নিশ্চিন্ত হলো।


কিন্তু ঐ গলা খাঁকারিই - ঐ উঁহুহুহু বা এঁহেহেহে-র শব্দ মাঝেমাঝে তার কাছে তীব্র ব্যঙ্গ বা অপমানের।

অফিসে অনুপম-এর ঢপবাজ বা গ্যাঁজা মারার বদনাম বা সুনাম আছে। ঢপ বা গ্যাঁজা বা জল মিশিয়ে বার্তা দেওয়াটাও একটা আর্ট এবং এ-ব্যাপারে অনুপম-এর প্রায় পি এইচ ডি লেবেলের দক্ষতা ও খ্যাতি আছে এবং সেটা শুধু অফিসে নয়। অনুপম-এর এই ঢপের খ্যাতি বাড়ি পাড়া ইত্যাদি ছাড়িয়ে প্রায় আন্তর্জাতিকস্তরে পৌঁছেছে।

সেদিন অনুপম ওরফে মিলির ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের অনু - কানু মিত্তিরকে বলছিল, 'কাল সাত কিলো ইলিশ একবারে কিনে ও কেটে ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিলাম! অনেক দিন চলবে।' মিত্তির চুপচাপ শুনছিল, জল মেশানো জেনেও শুনছিল। কিন্তু ঐ দাস, মন্টু দাস - সে তার বিখ্যাত গলা খাঁকারি দিল অনুপম-এর সাত কিলো ইলিশের উত্তরে। দাস-এর গলায় কফ নেই, ফলস উঁহুহুহুহু দিল দাস। মিত্তির একটু মুচকি হাসল। অনুপম, দাস-এর ওই বিশ্বমানের গলা খাঁকারিতে সাত কিলো ইলিশ সমেত পুরো পদ্মার জলে খাবি খাচ্ছে তখন।

মন্টু দাস-এর গলা খাঁকারি কফহীন, এটা অনুপম জানে। দাস-এর ওই কারো কথায় জল থাকলেই 'চুপচাপ ফুলে ছাপের' মতোই, চুপচাপ উঁহুহুহু উঁহু উঁহু বা এঁহেহেহে-র মতো বিষাক্ত বাণ অফিসের এই ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে।

ফলে দাস ঘরে না-থাকলে অনুপমকে আর কে দেখে! পৃথিবীর তিন ভাগ জলের পুরোটাই সে সেদিন কথায় মিশিয়ে ছাড়বেই। তার মধ্যেই অল্পবিস্তর-খচ্চরেরা অবশ্য মন্তব্য করে, 'আজ দাস নেই না?' অনুপম এই 'দাস নেই'-য়েরও মানে বোঝে। কিন্তু এইসব এক-দু টাকার হ্যাটাকে সে পাত্তা দেয় না।

সেদিন মলিকে বলল, 'এবার সিমলা যাবো! এল টি সি নিয়ে!' মলির গলায় কফ আটকে নেই, তবু সে উঁহুহুহু এঁহেহেহে গলা খাঁকারি দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। কারণ, অনুপম এর আগে একবার ঐ দিঘা ছাড়া বিয়ের এই চব্বিশ বছরে কোথাও বেড়াতে যায়নি। ফলে মলির 'সিমলা' একটা অবাস্তব ও দূর গ্রহের না-দেখা নক্ষত্র। তাইই মলির ঐ উঁহুহুহু গলা খাঁকারি দিয়ে রান্নাঘরে চলে যাওয়া।

মলির এই তাচ্ছিল্যর দাম কতো অনুপম ভেবে পায় না। মলি তো আর অফিসের 'মন্টু দাস' নয়! তাই সে মলির তাচ্ছিল্যকে দাম দেয় একটু বেশি, তিরিশ টাকার হ্যাটা। ঐটুকু হ্যাটা সে রাত্রে ছেলে ঘুমিয়ে পড়লেই তিরিশটা জিরো টাকায় নামিয়ে আনবে। মলি তার এই ঢপ বা মিথ্যে বলার অভ্যেসকে কিছুটা মায়ার চোখেও দেখে, অনুপম জানে তা।

অনুপম (ত্রিবেদী নয়) দাশশর্মা, অনেক ভেবে দেখেছে সে কেন এই অকারণ‌ ঢপ বা গ্যাঁজা বা জল মিশিয়ে কথা বলে? এ তো মুখে দুর্গন্ধের মতো রোগ। না তার মুখে দুর্গন্ধ নেই, কিন্তু কথায় দুর্গন্ধ আছে, ফলত লোকে গলা খাঁকারি দিয়ে তাকে বিদ্রুপ করে।

এর কোনো চিকিৎসা নেই? সে হোমিও এ্যলো আয়ুর্বেদিক অনেক করেছে, এমনকি লন্ডন ফেরত ডাক্তারের এন্টিবায়োটিক কোর্স করেও, তার এই ঢপের অভ্যাস যায়নি।

আসলে ঢপের অভ্যেস স্বপ্ন থেকে আসে। সাত কিলো পদ্মার ইলিশ বা সিমলা বেড়াতে যাওয়া এইসব স্বপ্নের ঢপ হয়ে বহিঃপ্রকাশ।

একবার বনগাঁয় সেজদির বাড়ি বেরিয়ে এসে - 'পুজোর কটাদিন তো বম্বে ঘুরে এলাম!' দুটোই 'ব'! বম্বেও 'ব' দিয়ে, আবার বনগাঁও 'ব' দিয়ে, সুতরাং অসুবিধা কোথায়? বম্বে ঘোরার কথা বলতেই, মন্টু দাস-এর উঁহুহুহু গলা খাঁকারি বম্ব ব্লাস্টের মতো অনুপম-এর কানের পর্দা প্রায় ফাটিয়ে দিল।

অনুপম গলা খাঁকারি কে ভয় পায়, সমীহ করে, সে অনেকক্ষণ চুপ করে সেদিন বসে রইল। মানুষের অসহায়তা যে খুব দামী ও টেঁকসই জিনিস সে তা টের পেলো আবার।

ইদানিং অনুপম-এর অবচেতনে চেতনে ক্রমাগত বিভিন্ন মানুষের উঁহুহুহু এঁহেহেহে গলা খাঁকারি প্রতিনিয়ত বাজে। সে একা থাকলেও শুনতে পায় কে যেন গলা খাঁকারি দিচ্ছে তাকে লক্ষ্য করে, তাহারে লক্ষ্য করে।

অনুপম গুটিয়ে যাচ্ছে। শুকিয়ে যাচ্ছে গলা খাঁকারির শব্দে।

পৃথিবীতে কেউ খারাপ নয়। মন্টু দাস নয়, মলি নয়। ব্যঙ্গ বিদ্রূপও খারাপ নয়। আওয়াজ করে গলার কফ সরানোর অভ্যেসও খারাপ নয়। শুধু অনুপম-এর এই মিথ্যা বলার অভ্যাসটাই খারাপ, খারাপ কি? হতে পারে।

একদিন এই হাজার ঢপের অভ্যেস - মিথ্যা গ্যাঁজা মারা ও জল মেশানো কথা নিয়েই সে, মানে অনুপম (ত্রিবেদী নয়, দাশশর্মা), এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। লোকে, শোকের মধ্যেও বলবে - 'লোকটা একটা নাম্বার ওয়ান ঢপবাজ ছিল!'

অনুপম যখন শেষ নিঃশ্বাস ছাড়বে, বা খবরের কাগজের ভাষায় নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে, তখন তার মনে হবে হয়তো, 'পৃথিবীতে একটু ঢপ‌ ও মিথ্যা ও জল মেশানো কথা থাক না, থাকুক না! ক্ষতি কি!'

সত্যিই তো - সবটাই সত্য হলে এ জগতে আলো জ্বলবে না। সত্যমেব জয়তের মধ্যেও অনুপম-এর যাবতীয় ঢপ মিথ্যা ও জল মেশানো কথা - একটা ছোট চারাগাছ হয়ে দুলবে, দুলেছে তো এতকাল!'