বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক

তমাল রায়



এক একটা সকাল আসে,আধখাওয়া বেদানার বিষণ্ণতা নিয়েই। আজ যেমন,এমনি তালাজো থেকে এই স্কুল বাড়িটার দূরত্ব তো তেমন নয়। সেই রাতে এসেছে। তবু জার্নিতেই খুব কাহিল লাগছে যেন! শরীর যে তেমন মন্দ তা নয়। তবে একটা ঘুষঘুষে কাশি আছে। হাল্কা জ্বরও হয়তো'বা। সে সবও নয়। মনটা অন্য কারণে খারাপ হয়তো। সেদিন ফেন্ট হয়ে গেলে পর ওরা নিয়ে গেল জেজে হাসপাতালে। আবার সেখান থেকেই তালাজো। আবার এই স্কুল বাড়ি। এত ঘন ঘন আবাস বদলালে মনের স্থিরতা থাকেনা। আরে মন তো আর জল নয়,যেখানে রাখা হবে সেই পাত্রের আকার নেবে। তারও জল বাতাস আলো হাওয়া লাগে,সেসবের সাথে এডজাস্ট করতে হয়। থিতু করতে হয়। নইলে কী আর লেখালিখি মাথায় আসে? এক ইরানি কবির কবিতা নিয়ে বসেছিলো ক'দিন। কবি তার দীর্ঘ কারাবাসের ১৮ বছরে কত উল্লেখযোগ্য কাজ করে গেছেন। টাইটেলটা ঠিকও করা হয়ে গেছিলো,ব্রাত্যজনের রুদ্ধ কবিতা। অনুবাদটা শুরু করবে ভাবছে তারপরই একের পর এক আস্তানা বদল! সময় তো বেশি নেই হাতে। কাজগুলো শেষ করে যেতে হবে। এভাবে হয়! বিরক্তিকর! মুখটা কেমন তেঁতো হয়ে আছে...আর অনেক দিন সুখলতা,মেয়েদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ ও নেই। এ পরবাসে আর কত!
- হ্যালো! গুডমর্নিং! আপনি এখনই উঠে গেছেন? এত সকালে ঘুম ভেঙে যায়?
কি করবো? অনেকের শান্তির ঘুমকে নিশ্ছিদ্র করতে,কাউকে কাউকে তো জলদি জাগতেই হয়!
- আপনি কি পুলিশ?
মৃদু হেসে তিনি উত্তর দেন,আমি পুলিশ হলে তো ল্যাঠাই চুকে যেত। বিগত পঞ্চাশ বছর,পুলিশ আমায় শত্রু ঠাউরে গেলো! আর আপনি আমায় পুলিশ বলছেন,তারা তো আঁতকে উঠবে। তা,আপনি উঠে পড়েছেন দেখছি যে ডাক্তার!
- কি আর করবো! এখানে তো শুয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু কাজ নেই। বাড়িতে থাকলে একটু হাঁটতে যেতাম পার্কে,ভোরের দিকেই যেতাম। আপনি কি রোজ এত সকালেই ঘুম থেকে ওঠেন?
- হুম। তাতে অবশ্য লাভ কিছু ছিলোনা। তবু অভ্যেস! আমার ঘরে আলো এসে ঢুকতে ঢুকতে প্রায় সকাল সাড়ে সাতটা বাজতো। খুব মোটা দেওয়াল তো।
- ওহ! আপনার বাড়ি খুব পুরনো দিনের?
- না। আমার বাড়ি নয়,ব্রিটিশদের তৈরি ঘরে আমি থাকি! আমার বাড়ি কখনও ছিলো ডাক্তার। এখন শুধুই ঘর। দশ বাই দশ ফুট।
- বুঝলাম না। আপনার পরিচয় ও জানিনা। আমি যে পেশায় চিকিৎসক তা দেখছি আপনি জানেন। কাল অবশ্য অনেক রাতে আপনাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। জানার সুযোগও ছিলোনা।
- আমি একটু আধটু পড়াই টড়াই। পড়াই বলা ভুল হল। পড়াতাম। আর সামান্য লিখি টিখি।
- মানে আপনি শিক্ষক আবার লেখকও। বাহ! মরা বা বাঁচা কি আছে কপালে জানিনা। শেষের ক'দিন অন্তত একজন লেখকের সান্নিধ্যে কাটবে। এও কি কম পাওয়া?
- দেখবেন আবার বেশি সান্নিধ্য প্রত্যাশা করবেন না। তাতে আপনারই বিপদ!
- কেন?
-গেটের বাইরে তাকান। কেনর উত্তর পেয়ে যাবেন।
- গেটের বাইরে কী?
একটু সামনে হেঁটে গিয়ে ডাক্তার মুখ বাড়িয়ে দেখে ফিরে আসেন।
- ওহ পুলিশের কথা বলছেন? সেতো থাকবেই। আমরা যাতে পালিয়ে না যাই,লক্ষ্য রাখছে। আপনি বোধহয় জানেন না,অনেক কোভিড পেশেন্টই পালিয়ে যাচ্ছে হাসপাতাল থেকে৷ তাই পাহারা!
- উঁহু,পুলিশের এত ঠেকা পড়েনি,দেশের এত অসংখ্য কোভিড রুগি,কোয়ারান্টাইনে থাকা সকলকে পাহারা দেবার। ওরা আমার জন্যই ওখানে।
- স্যার আপনি হয়তো ঠিক বলছেন। কিন্তু এটাও জানাই,আমাদের পাশের বেডের লোকটি কিন্তু একজন দাগি ক্রিমিনাল। তার জন্যও পাহারা দিতে পারে।
- ডাক্তার আপনি চিকিৎসক হতে পারেন। মানুষের শরীর আপনার চর্চার বিষয় হতেই পারে। কিন্তু তা বলে রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্ব আপনার বোঝার ক্ষমতা তো না থাকতেও পারে! আপনি ঠিকই বলছেন,আইনের মতে উনি একজন অপরাধী। কিন্তু ওনাকে প্যারোলে মুক্তি দিয়েছে রাষ্ট্রই। যাকে মুক্তি দিয়েছে। তার জন্য পাহারা থাকে না। থাকার কথাও নয়। ওরা আমার জন্যই পোস্টেড।
- আপনি তাহলে কী মাস্টার বা লেখক নন? নিজেই যে বললেন আপনি...
- আমি তার থেকেও ভয়ানক। কারণ আমি রাষ্ট্রদ্রোহী। রাষ্ট্র আমায় ভয় পায়। তাই পাহারা!
- আপনি খুব অদ্ভুত ভাষায় কথা বলেন। হেঁয়ালিপূর্ণ কথা! খুব কাশছেন! একটু জল খাবেন?
- থ্যানকিউ। কাশিও সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,কী বলেন ডাক্তার!
মুচকি হাসি ঝুলিয়ে ডাক্তার উত্তর করেন,ঠিক। তবে এ সবই ইউ আর টি,আপার রেসপিরেটর ট্র‍্যাক সিস্টেমের অন্তর্গত। আপনি কোন সিস্টেমের কথা বলছেন জানা নেই!
- অত জেনেই বা কি হবে? চলুন চা এসেছে,সদব্যবহার করি বরং। আগে ওই ভদ্রলোককে ডাকি।
- আরে,ও ভদ্দরলোক নয়!
- আমি এমন ছুঁতমার্গে বিশ্বাসী নই যে ডাক্তার! এই ঘরে ঘটনাচক্রে তিনটে বেড। আর আমরা তিনজন। তিনজনেই মানুষ। মানুষ তো মানুষই হয়। ভদ্রলোক,ছোটলোক এসব তো আপনাদের সো কলড সমাজের ট্যাগিং। আমি এই সমাজ ও তার চিন্তাকে ডিসকার্ড করি ডাক্তার। আর আপনি জানেন,জন্মমুহুর্তে ট্যাগিং থাকেনা। মৃত্যুর পরও। অহেতুক জীবনকে জটিল করেন কেন?
- সরি স্যার! এইই উঠে পড়ো। চা ঠান্ডা হয়ে যাবে। পরে আর চাইলেও গরম চা পাবে না। যা পাচ্ছো,তাই কম কই?

আপাতত চা পর্ব চলছে। এক সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ,তার চা, চিনি ও দুধ ছাড়া। বছর ষাটের প্রৌঢ়,তার চা-এ চিনি নেই,দুধ আছে। চল্লিশের মাঝবয়েসী,তার চিনি ও দুধ দুই ই আছে। বৃদ্ধর চোখ জানলার বাইরে,যেখানে অনেকগুলো শালিকের জটলা। প্রৌঢ়র বিরক্তিভরা চোখ পাশের মাঝবয়সীর দিকে। মাঝবয়েসীর চোখ অবশ্য চায়েই নিবদ্ধ। ঘরের বাইরে জনা বারো সশস্ত্র পুলিশ। চা পানে ব্যাস্ত তারাও। নিজেরা কি নিয়ে যেন যেন খোশ গল্পে ব্যস্ত৷ ৫২টা সিঁড়ি ভাঙলে একটা আয়তাকার চাতাল। সেটা পেরোলে মাঠ। খুব বড় নয়। আবার তেমন ছোট ও নয়। ইন্ডোর যেকোনো খেলা আরামসে খেলতে চাইলে খেলাই যায়। দুপাশে দেবদারু গাছ। কে বা কারা পুঁতেছিলো জানা যায় না। এটা একটা স্কুল বিল্ডিং। হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল। স্থাপিত ১৯৪৬। মানে দেশভাগ,দাঙ্গা তার মাঝেও কেউ স্কুল বানিয়ে গেছেন। মৃত্যুর সমস্ত উপকরণ থাকা সত্ত্বেও, মানুষের এই সৎ প্রচেষ্টাগুলো থাকে বলেই হয়তো আজও দেশটা মরে যায়নি! একটা কালো প্রিজন ভ্যান! মাঠের চারদিকেই বালির বস্তা তুলে অটোমেটিক রাইফেলের সতর্ক প্রহরা,হাতে ... ভ্যানের ভেতরেও জলপাই উর্দি। তার সামান্য আগে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যদফতরের গাড়ি। নীচ থেকে ওপরে তাকালে,তিন তলার জানলা দেখা যায় না। গেলে দেখা যেত,এক বৃদ্ধ ভারত রাষ্ট্র আর তার ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা যে স্বাধীনতার পরও কায়েম রয়ে গেল,তার আফটার এফেক্ট নিয়ে বুঝিয়েই চলেছেন। ডাক্তার তো আবার উচ্চ শিক্ষিত,তাই অত মনোযোগী নন,পাশের জন,যে নাকি দাগী আসামি,সে কিন্তু মন দিয়ে শুনছে...
মাঠের কাদায় চাকার গভীর দাগ। গতকাল হয়ত বৃষ্টি হয়েছিলো ভালো। এখন অবশ্য রোদ। রোদ মেখেই স্বাস্থ্য দফতরের গাড়ি থেকে নেমে আসছেন তিনজন। সম্পূর্ণ দেহ মহাকাশচারীর মত আবৃত। এগুলোকে পিপিই বলে৷ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে যাচ্ছে তারা। কোভিড টেস্ট করতে। সাথে জলপাই উর্দির কয়েকজন। একাশি বছরের বৃদ্ধ বলে,হয়তো বাড়তি সতর্কতা। সাথে পালস অক্সোমিটার,বিপি মেশিন,গ্লকোমিটার প্রভৃতি। ওরা দোতলার দিকে যাচ্ছে দেখে,জলপাই উর্দি শুধরে দিল। দোতলায় এই কোয়ারান্টাইন সেন্টারে কোনো রুগি নেই। আগে ছিলো। হয়তো তিনতলার রুগিরা ধারে ভারে বিপজ্জনক তাই দোতলা ফাঁকা করা হয়েছে। স্রেফ তিনতলাই। লোকগুলো তিনতলার ঘরে ঢুকে গেছে। টেস্ট হবে এখন।

-স্যার আপনার বাড়ি?
- ওয়ারাঙ্গল। তেলেঙ্গানা। আপনার?
- কলকাতা। মানে উত্তর চব্বিশপরগণা। ওয়েস্টবেঙ্গল।
- ওহ,ইউ আর ফ্রম কলকাতা। আই লাইক দি সিটি। দেয়ার আর সো মেনি ফ্রেন্ডস অব মাইন। দে লাভ মি। আই লাভ দেম টু৷ আই হ্যাড বিন ইন দ সিটি কাপল অব ইয়ারস ব্যাক, ইন আ সেমিনার।
- ওহ! আপনি সেমিনার ও এটেন্ড করেন? লেকচার দিতে?
- হ্যাঁ,ইট ওয়াজ আ সেমিনার অন পিপলস লিটারেচার।
- গ্রেট স্যার। আমরাও সেমিনার এটেন্ড করি৷ তবে তা কোম্পানি এরেঞ্জ করে।
- আই নো।
- স্যার,আমিও আছি এখানে। কেবল আপনারাই গল্প করবেন? আমি বাদ কেন?
- সারটেনলি নট মাই ব্রাদার। তুমি জয়েন করো। বল তোমার বাড়ি কোথায়?
- আমি স্যার পুণেরই,একটু ইনটিরিয়রে। আমার নাম সুনীল। সুনীল ধনবার৷
- ওহ গ্রেট। তার মানে তুমি মারাঠি আদিবাসী মানে সান অব দ সয়েল৷ ভূমিপুত্র।
- হ্যাঁ,আর আমরা কিছুটা ভেতরের দিকে,মফস্বল। আমাদের নিজেদের জমি আছে। চাষবাস করি। নিজেদের ক্ষেতের খাবারই খাই। এবার বহুকাল পর গেলাম বাড়িতে। সাত বছর পর।
- কেন?
- বলছি তার আগে স্যার আপনার বাড়ির কথা শুনি। কিন্তু আমি আদিবাসী আপনি বুঝলেন কী করে?
- আমার একটু পড়াশুনা করা আছে যে সুনীল। থাক সে কথা। আমার বাড়ির কথা শুনতে চাও? ওয়ারাঙ্গলের কথা কী বলবো! ভারতবর্ষের ২৫০ পিছিয়ে পড়া জেলার মধ্যে প্রথম কুড়ির মধ্যে পড়ে। যদিও পি ভি নরসীমা রাও,ওয়ান কংগ্রেসি প্রাইম মিনিস্টার অব ইন্ডিয়া ওয়াজ ফ্রম ওয়ারাঙ্গল। কিন্তু তাতে ওয়ারাঙ্গলের কিছু লাভ হয়নি। মানে সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের কথা বলি। ঠিক কতটা দারিদ্র না দেখলে,নিজ মুখে বর্ণনা করা যাবে না। একসময় খুবই উন্নত ছিলো শুনেছি। হিউ এং সান এর ভারতভ্রমণের বইতে ওরলু বলে যে অঞ্চলের বর্ণনা আছে,তা আমাদের ওয়ারাঙ্গল। মানে আনুমানিক ৮০০ খ্রীস্টাব্দে আমাদের ওয়ারাঙ্গলের অস্তিত্ব ছিলো। এবং তা ছিলো মোটের ওপর উন্নত অঞ্চল। কাকাতিয়ারা এখানেই রাজত্ব করতেন ১২০০ থেকে ১৪০০ খ্রীস্টাব্দে। ভদ্রকালী মন্দির। ওয়ারাঙ্গল ফোর্ট,হাজার স্তম্ভের মন্দির,জৈন মন্দির দূর্গা মন্দির৷ কত শত মন্দির। তাই টেম্পল সিটি বলা হয়। পরে আলাউদ্দিন খলজি দখল করলো গোলকুণ্ডা। প্রথমে সুলতান পরে মুঘলদের দখলে চলে গেল। পরে অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে হায়দ্রাবাদের নিজামের দখলে যায় ওয়ারাঙ্গল। স্বাধীন ভারতে অন্ধ্রপ্রদেশ,তারও পরে তেলেঙ্গানা। ওয়ারাঙ্গালের নিরীহ মানুষগুলো অবশ্য কখনোই স্বাধীনতা পেলো না। বড় দুঃখ লাগে বুঝলে হে! আর তাদের কথা বলতে গিয়ে আমার লেখালিখি রাষ্ট্রবিরোধী! আচ্ছা রাষ্ট্র কী কেবল ভূখণ্ড,রাষ্ট্রের মানুষ রাষ্ট্র নয়? আজ আমিই জন্মভূমি থেকে নির্বাসিত! কতদিন যাইনি,হয়তো মৃত্যুর পর আমার দেহকেও যেতে দেওয়া হবে না।
- স্যার,আপনার কথা শুনতে শুনতে মনটা খারাপ হয়ে গেল!
- আরে সুনীল মন খারাপ করলে তো হবেনা ভায়া। গোটা ভারতবর্ষই ওয়ারাঙ্গল। কালাহাণ্ডিতে যাও ওড়িশার,ডাক্তারের বীরভূম,পুরুলিয়া,বাঁকু া যাও কিম্বা তোমার মহারাষ্ট্র বা গুজরাত। অল সেইম!
- স্যার আপনি তো হিস্ট্রি জিওগ্রাফিতে দারুণ ফাণ্ডা রাখেন। হিস্ট্রি আপনার সাবজেক্ট?
- না ডাক্তার আমার বিষয় ভাষা ও সাহিত্য৷ তেলগু পড়াই।
- কতদিন পড়ান?
- প্রায় পাঁচ দশক। অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী। বেশ কিছু কাজ ও করেছি আমার মাতৃভাষা ও মাতৃভাষার সাধকদের,ভাষা দুনিয়ায় আলোয় আনতে অনেকগুলো বই লিখেছি।
- আচ্ছা মানে এনথোলজি অব তেলেগু প্রোজ এন্ড পোয়েট্রি৷ বাহ গ্রেট ওয়ার্ক! আর আপনার নিজের লেখালিখি?
- সেগুলোও আমার নিজের। ওরা কি আমার পর? অ-পর! নিজেও তো কবিতা লিখি,গদ্য। বেশি কিছু সাহিত্য ও সমালোচনার বইপত্রও আছে।
- এই ডাক্তার বাবু,সব তো আপনিই জিজ্ঞেস করছেন,আমায় একটু প্রশ্ন করতে দিন৷
- আরে,সুনীল তুমি এসব কী বুঝবে!
- ডাক্তার কাউকে ছোট করে বড় হওয়া যায় না। কেন এসব বলছেন? তাহলে আমিও বুঝিনা কিছুই। সুনীলরাই আমার বন্ধু। আপনার মত তথাকথিত শিক্ষিত,উচ্চ বিত্তদের সঙ্গ আমি এড়িয়ে চলি। এখন অগত্যা নিরুপায় তাই!
সুনীল প্রশ্ন কর প্লিজ।
- স্যার আপনার সন্তান?
- তিন মেয়ে। সহজা,পবনা আর অনলা।
- স্যার আপনার একটা কবিতা শোনাবেন?
-হুম,শোনাবো কিন্তু সে কী শুনতে ভালো লাগবে! কে জানে! শোনো:-
কসাই
আমি একজন মাংসের ব্যবসায়ী
তুমি যদি আমাকে কসাই ডাকতে চাও
তবে তা তোমার ইচ্ছে
আমি রোজ পশু হত্যা করি
তাদের মাংস কেটে বিক্রি করি
রক্ত আমার কাছে এক পরিচিত দৃশ্য
কিন্তু
সেই দিন আমি দেখেছিলাম
কসাই শব্দের আক্ষরিক রূপ
আমার এই হাত দিয়ে রোজ পশু হত্যা করি
রক্ত আমার হৃদয়কে স্পর্শ করেনি কোনদিন,
কিন্তু সেই দিন রক্ত রাজপথে গড়িয়ে পড়েনি
পড়েছিল আমার হৃৎপিণ্ডে
তুমি কি ধুয়ে দেবে সেই রক্ত ?
তোমাদের মাঝে কেউ কি আছো যে বাড়িয়ে দেবে
একটি মানবিক হাত
আর আমার হৃদয়কে করবে অবমুক্ত
সেই বিভৎস দৃশের অসহনীয় বোঝা থেকে ?
ছয়টি লাঠি তার অস্থিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করেছিল
যেন-কোন উন্মাত্ত ক্রোধে-
রাইফেলের বাট তার দেহকে দুমড়ে মুচড়ে পরিণত করেছিল
একতাল মাংসপিণ্ডে
সেই মাংসপিণ্ডের মুখ আটকে দিয়েছিল পুলিশওয়ালাদের চোয়াল
তারা তখন বলেছিল
“নষ্ট যুবকটি একটি ছুরি নিয়ে হামলা চালায়
এবং সেখানে একটি ‘এনকাউন্টার’ ঘটে”
পশু হত্যা করি আমিও
কিন্তু তাদের আমি কখনো ঘৃণা করিনি ,
আমি মাংস বিক্রি করি
কিন্তু কখনো কারো কাছে
আমি নিজেকে বিক্রি করিনি
চুঁইয়ে পড়ছে রক্তধারা
তার দেহের সহস্র ক্ষতস্থান থেকে
জলে ভরা সহস্র দৃষ্টি
কিন্তু ছেলেটির শুষ্ক চোখ
আমার ছুরির ফলার নীচে ক্রন্দনরত ছাগলের মত
সে ’ব্যা ব্যা’ চিৎকার করে ওঠে না
মনে হয় তার দৃষ্টি যেন চেয়ে আছে ভবিষ্যতের পানে
গতকালের দৃষ্টি
না, এটি ইতোমধ্যেই পরশু দিনের
এটি ১৫ই মে’র বন্ধের দৃশ্য
আমার সে স্মৃতি তাড়ানো যাবে না কোনদিন
যতদিন নিঃশ্বাস বইবে এ দেহে
আজ আমি তোমাকে অনুভব করাতে পারছি
কারণ আমি নিজের মাঝে লুকিয়ে রাখতে পারছি না
লুকিয়ে ফেলতে পারি কাল
আমার জীবিকা ওরা ধ্বংস করুক
কিন্তু সেই শিশুটি
আমাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়াবে ।
শোনো আমার ভাই, বোন, তোমরা শোনো
একটি সাপও আমরা ওভাবে মারি না
যে আমি, রোজ পাঁঠা হত্যা করি, সেদিন বুঝেছিলাম
নিষ্ঠুরতা কী, যা সম্মিলিত হয়ে ষড়যন্ত্র চালায়
একটি জীবনকে কেড়ে নেবার জন্য
আমি মাংসের ব্যবসায়ী
হ্যাঁ, আমি একজন কসাই
ভেড়ার মাংস আর পাঁঠার মাংস
আমি বিক্রি করি জীবিকার জন্য
সেই মন্ত্রী নিজে
পুলিশওয়ালাদের ভূষিত করে
পুরস্কার আর পদোন্নতি দিয়ে
পদক আর টাকার ওজন দিয়ে
মানুষের জীবন কেড়ে নেয়ার পুরস্কার হিসেবে
মন্ত্রী অর্থ সরকার
পুলিশ আমাদের রক্ষক
যাদের(যে মন্ত্রীদের) নিয়ে এ সরকার আর
যার রক্ষক হল তারা(পুলিশ)
অসীমে ভেসে চলা
সেই ছেলেটির প্রাণ
বলে গিয়েছিল আমাকে
জেনেছিলাম
প্রকৃত কসাই এর পরিচয়
রাষ্ট্র।

বোর করলাম তাই না? আমি সরি। কিন্তু আমি মানুষের জন্য লিখি। লেখা আমার লড়াইয়ের হাতিয়ার। এ ছাড়া আর কিই বা করতে পারতাম!
- স্যার আমার তো ডাক্তারের মত পড়াশুনো নেই। কিন্তু যা বুঝেছি শুনে,আমার কান গরম হয়ে গেছে। মাথায় রক্ত ছুটছে। কী বলবো আপনাকে বুঝছিনা!
- এই সুনীল এত বাড়াবাড়ি কোরোনা। স্যার ইটস আ ব্রিলিয়ান্ট রাইটিং। বাট বড্ড পলিটিকাল। কবিতা হবে ফুল ফল চাঁদ প্রেম তুমি আমি। এ বড় রুক্ষ!
- সরি ডাক্তার,আমার সাহিত্য আমার বিপ্লবের হাতিয়ার। ওসব লেখার বহু লোক আছেন। আপনি হয়তো বিরক্ত হলেন। বাট ওয়ান থিং টু সে ইউ। সুকান্ত ভট্টাচার্য,সুভাষ মুখার্জি,নজরুল,বীরেন চট্টোপাধ্যায় হ্যাভনট ইউ হার্ড নেম অব দিজ পোয়েটস?
বীরেন চট্টোপাধ্যায়ের বেশ কিছু কবিতা আমি তেলগুতে অনুবাদ করেছি। তার একটা,
ন্যাংটো ছেলে আকাশে হাত বাড়ায়
যদিও তার খিদেয় পুড়ছে গা
ফুটপাথে আজ লেগেছে জোছনা!

- থাক সে কথা,সুনীল তোমার কথা বল,শুনবো।
কী হয়েছিলো,তুমি সাত বছর বাড়ি ছাড়া!
- স্যার আমি তো মার্ডার কেসের আসামী। ফৌজদারি মামলার রায়ে আমি লাইফার! সশ্রম কারাদণ্ড! করোনার জন্য,প্যারোলে বেল দিয়েছে। অত তো জায়গা নেই!
- তুমি খুনি?
- আহ ডাক্তার,ও বলছেই তো! শুনুন চুপ করে। কেন মাঝে বলেন!
- ডাক্তার,মার্ডারের চার্জ তো আমার এগেইনস্টেও। প্রশ্ন হল সেটা সাজানো না সত্যি!
- মার্ডার সাজানো হয় কেমন করে স্যার?
- আহ! ডাক্তার আপনি পাগল না হিটলার? দেশে এ মুহুর্তে যারা জেল খাটছে,তারা সব দাগী অপরাধী,এ আপনাকে কে বললো? বরং অধিকাংশ মানুষই নির্দোষ! তারা প্লিডার দিতে পারেনি কোনো কারণে,সেটা পলিটিকাল প্রেসার,বা তার টাকা নেই, নিরন্ন মানুষ। খেতেই পায় না,তো উকিল দেবে কী করে? আর ওদিকে আপনাদের কী যেন খান,সুপারস্টার মানুষ মেরেও দিব্যি ঘুরে বেড়ায় বুক ফুলিয়ে!
- কী বলছেন স্যার!
- ঠিক বলছি ডাক্তার৷ এরপরেও আছে অন্য খেলা। আপনার টাকা থাকলে,আপনার হয়ে জেল খেটে দেবার লোকও আছে। ওই তো খানের হয়েই কে যেন বলেছিলো,সেই খুন করেছে! যাক সে সব কথা এই সুনীল,তুমি বলতে থাকো,আমার শীত করছে। জ্বর আসছে হয়তো। গলায় বেশ ব্যথা। একটু চা পেলে মন্দ হতনা। কিন্তু দেবে কে? যাক সুনীল,তুমি বল প্লিজ। তোমারটা সাজানো কেস না জেনুইন?
- স্যার,সত্যি বলবো আপনাকে, আপনি আমার বাপের বয়সী। খুন আমিই করেছি।
- তা কাকে করেছিলে খুন? জমি নিয়ে ঝামেলা?
- না,স্যার। আমি খুন করেছি আমার বউ সত্যভামাকে। নিজেরাই বিয়ে করেছিলাম,ভালোবেসেই। আমি তো মন্ডলের মেম্বার। দলের কাজে এদিক ওদিক যেতে হত। আজ এখানে মিটিং। কাল ওখানে! পরশু র‍্যালি। বাড়িতে থাকার উপায় ছিলো না...
- স্যার শরীর বেশি খারাপ লাগে? এই সুনীল দেখ তোমার কথা শুনেই স্যার শুয়ে পড়লেন যে! ঘেন্না লাগছে। ছি! দাঁড়ান পালস দেখি। পালস রেট কম! একটু কিছু খাবেন?
- ঠিক আছি ডাক্তার। ওর কথায় আমার কিছু হয়নি। আমি অনেক খারাপ মানুষ দেখেছি। ও তো তবু সৎ! স্বীকার করছে। অধিকাংশই মিথ্যেবাদী। আর আপনাকে বলি,এত বিবেক দেখাবেন না। সুনীল বলো তুমি শুনছি।
- হ্যাঁ স্যার। আমার বউটা খুব মিশুকে ছিলো। লোক বলতো ছেনাল! সবার সাথে হাসি-ঠাট্টা। আপন-পর বোধ কম। আমার যত বন্ধু তাদের সাথে গা ঢলাবে। আমি অত গায়ে মাখতাম না। কিন্তু লোকজন বললে খুব বিরক্তি লাগতো!
- সুনীল এগুলো কী পুরুষদের একচেটিয়া? নারী করলেই অন্যায়? সে সহজ হয়ে মিশতে পারে না কারো সাথে? মিশলেই দোষ?
- দেখেছেন স্যার। কী অদ্ভুত মেলশভিনিস্ট!
- উফফ! আপনি একটু থামুন তো ডাক্তার।
- না,স্যার আমি এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতাম না। আমার বিধবা বোন,সে আমাদের বাড়িতেই থাকে। আমি বাড়ি ঢোকা মাত্রই এই কথাগুলো কানে দিতো। আমার মাথা গরম হয়ে যেত। দিতাম চড়-থাপ্পর। কতবার বলেছি এসব কোরো না৷ বলে, কিছু করিনি তো! কথা বলেছি শুধু!
- তারপর?
- তারপর স্যার একদিন বউ এর পেটে বাচ্চা এলো। সাদা মনে কাদা নেই৷ খুশিই হলাম শুনে। যাক,এবার অন্তত মন দিয়ে ঘর সংসার করবে৷ কিন্তু আমার বোন বললো,যে বাচ্চাটা নাকি আমার বন্ধু, মন্ডল সেক্রেটারি ঘাসিরামের! ভরপেট মদ খেয়ে এসেছিলাম৷ মাথা টলমল! জিজ্ঞেস করলাম, এ বাচ্চা কার? বলে তোমার। তিনবার জিজ্ঞেস করলাম, কার? একই কথা। যদি বলতো ঘাসিরামের কিছু করতাম না। মিথ্যে বলবে কেন? হাতের কাছে ছুরি ছিলো,পুরো এল এঁকে দিলাম৷ শেষ!
- তারপর?
- তারপর আর কী,পালালাম। শেল্টার নিলাম মণ্ডল অফিসে৷ মণ্ডল সভাপতিকে সব বললাম খুলে। সে বললো,আচ্ছা দুদিন চুপচাপ থাক। দেখা যাবে।
- তারপর...
- সভাপতির জন্য কত খাটি। যা বলে তাই করে দিই। বাচ্চাকে স্কুল দেওয়া,আনা। বাজার দোকান। তার আবার দুটো রাখেইল আছে। তাদের কাছে,টাকা পৌঁছে দেওয়া। বড় নেতা,বিলিতি মদ টদ খায়! মদের সাথে চাটের আয়োজন। সব করি সব। সেই শালা গদ্দার একটা! আমায় বললো,সুনীল সারেণ্ডার কর্ পুলিশের কাছে। জাজ কে কিনে নেব,আমাদের সরকার। অত পাস কেন? ব্যস ধরিয়ে দিলো। ধরা পড়ার পর আর টিকিটিও দেখিনি। বুঝলেন স্যার,এই হল মানুষ! বিশ্বাসঘাতক!
- সুনীল,তুমি ঘোর অন্যায়কারী। বাচ্চা কার তুমি জানো না। বোন বললো,আর তুমি বউকে মেরে দিলে? এতবড় অন্যায় করলে,তোমার খারাপ লাগলো না? একবারও মনে হল না যে এই সত্যভামাকে তুমি ভালোবেসে বিয়ে করেছ?
- স্যার একেবারে খারাপ লাগেনি তা বলবো না! তবে মানুষ তো বিশ্বাসঘাতক হয়ও! মাথায় একে তখন প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে, কী করবো! একে আগুন তায় আবার মদ!
- স্যার, এই লোকটার সাথে আমি থাকবো না কখনোই। আপনি পুলিশকে বলুন প্লিজ। গা ঘিন ঘিন করছে!
- ওহ! ডাক্তার আর আপনি বুঝি জেলের আসামী নন? আমি কিছু জানিনা ভাবছেন? বলবো স্যার কে?
- মুখ সামলে কথা বলো সুনীল! কী বলবে,বলো। আমি যে অপরাধী সেতো প্রমাণই হয়নি৷ ইউ টি আমি। আন্ডার ট্রায়াল!
- ডাক্তার একটু চুপ করবেন। মনটা বিষিয়ে গেছে। আমায় একটু একা থাকতে দিন প্লিজ। আর যদি একান্তই ঝগড়া করতেই হয়,দুজনে বাইরে গিয়ে করুন। আমার অসুবিধা হচ্ছে। প্লিজ।

নভি মুম্বাই নতুন গজিয়ে ওঠা শহর। গরম অবশ্য ভালোই। যদিও এবার তেমন গরম পড়েনি। অথবা প্রকৃতির গরম টের পেতে শরীর মনের যে পরিমাণ সুস্থতা টের পাওয়া দরকার তা নেই কোথাও। সে ভারত, বা ইতালি, বাংলাদেশ, ইউ কে বা ইউ এস। মানুষ প্রবল আতংকে,প্রতিদিন সংক্রমণ বাড়ছে৷ বেড়েই চলেছে...অসংখ্য মানুষ মরছে প্রতিদিন। তাতে অবশ্য হেলদোল নেই কারও খুব একটা! পলিমার চেন রিএকশন না সোয়াব টেস্ট? কোনটা এক্সেপ্টেবল সেটা স্থির করতেই হিমসিম ব্যর্থ সরকার! 'পরিযায়ী' নাম দিয়ে অসহায় শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। নিজ দেশে কেউ পরিযায়ী হয় কীভাবে? আর এদিকে লকডাউন উঠতেই আবার হুড়মুড় করে বাড়ছে সংক্রমণ! রাশিয়া কে টপকে ভারত এখন তিনে। সামনে কেবল ব্রাজিল আর ইউ এস। স্কুল বাড়িতে অক্সিজেন আনা হয়েছে আপাতত। স্যারের যদি লাগে! বাড়িতে খবর গেছে৷ স্যারের জন্য একটু যেন বেশি সতর্ক প্রশাসন। কেন কে জানে! স্যারের অবশ্য এসমস্ততেই অভ্যেস আছে। কেবল বুকে একটু চাপ ব্যথা। আর মাথাটা বেবাক ফাঁকা। ইচ্ছে করলে অনেকগুলো পাখি এসে বাসা করতে পারে অনায়াস। কিচিরমিচির শুনতে ভালোই লাগে। যেমনটা এই স্কুল বাড়িতে আসা ইস্তক হচ্ছে। সেই আলো ফোটার আগে থেকে পাখিডাকা শুরু হয়। সারাদিন কত পাখি আসে,ডাকে। কিছু ডাক চেনা বাকিটা অবশ্য অচেনাই। বিপুল এ জগতের কতটুকুই বা চেনাজানা তার। আশি পেরিয়ে একাশিতে। সেই কবে ১৯৪০ এর অবিভক্ত ভারতে জন্ম। তারপর এই একনাগাড়ে বেঁচে থাকা। ক্লান্তিকর খুব। তবু তো বাঁচতে হয়। অত্যাচারিত,নিপীড়িত হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা তো সীতারাম কোন্ডাইয়ার ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। সেই শুরু। কবিতা আর রাষ্ট্র বদলের বিপ্লব,একই সাথে দিব্যি হাত ধরা ধরি করে চলছিলো। তারপর বাইরের মুক্ত দুনিয়ায় তার চলা ফেরা নিষেধ হয়ে গেলো। ১৯৭৩ এ মিশায় গ্রেফতার হলেন,সেই শুরু....কতদিনের কথা! সেটা থেকে ছাড়া পেতে না পেতেই সেকেন্দ্রাবাদ কনস্পিরেসি কেস...একের পর এক,সুখলতা ভাগ্যিস বিপ্লবের সাথী ছিলো,নইলে এত কে আর মুখবুজে সহ্য করতো! মাথার মধ্যে ঘটনাগুলো ব্যাটেলশিপ পোটেমকিং এর মত নির্বাক অথচ নড়ছে চড়ছে,আর প্যারাম্বুলেটর নেমে আসছে সিঁড়ি বেয়ে...প্যারামবুলেটরে কি শিশু ছিলো,না রাষ্ট্র...
- স্যার এখন কেমন আছেন?
- আমি তো ভালোই থাকি ভাই। সে যেখানেই যখন থেকেছি। বই আমার সঙ্গী। এখানে দুম করে আসতে হল বলে, বই নেবার সুযোগ মেলেনি। বই নির্জনতার একমাত্র সঙ্গী। তাই একটু একা বোধ করি। এই যা...
- শ্বাসকষ্ট কমলো? বুকে ব্যথা?
- না এসব বয়সের সঙ্গী। করোনার ও। উপায় কী ভায়া! ডাক্তার আপনার শরীর কেমন? সুনীল তুমি?
- স্যার আমরা আর ঝগড়া করবো না। আপনাকে আর অসুস্থ হতে হবে না।
- সুনীল ইউ আর আ মার্ডারার। বউকে মেরেছ, অনুতাপ নেই! স্যারকে নিয়ে ভাবছ? অবাক করা বিষয় তো!
- ডাক্তারবাবু বলতেই পারতাম নিজের চরকায় তেল দিন৷ তাতে ঝগড়া বাড়বে। বললাম না। আমি কিন্তু বলব না আপনি ১০০ জন কে মেরেছেন । আর তারা সকলেই শিশু। সবে জন্মানো বাচ্চা। আমি একজন কে মেরেছি। আর আপনি? কুত্তারও অধম!
- সুনীল আমি ১০০ জনকে মারিনি ফালতু কথা একদম বলবে না। ৭৮ জন! নিও-ন্যাটাল ডেথ। তাতে আমার অপরাধ কই? আমি ছুরি চালিয়ে মেরেছি? সরকারি স্বাস্থ্য অব্যাবস্থার দায় আমি নেব কেন?
- ভাবুন স্যার! ৭৮ জন বাচ্চা মরলো। কই দুঃখ ওনার? আমায় বলছেন! যা হোক সে আপনার বিষয়। আমি ওসব নিয়ে বলবো না। আপনারা সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষ। আমরা দলিত! আমার আপনাদের নিয়ে বলা মানায় না!
- সুনীল দলিত বলে মানুষ নও তা'তো নয়। আমরা দলিত প্যান্থার বলে একটা দল গড়েছিলাম। দলিতদের প্রতি হওয়া অবিচারের প্রতিবাদে। সে নিয়ে পরে বলবো। ডাক্তার আপনার বিষয়টা একটু শুনি।
- স্যার আমার কিছু বিষয় নেই। আমি শিশু চিকিৎসক। সরকারি এক শিশু হাসপাতালের দায়িত্বে ছিলাম। শহরে,আশপাশের গ্রামগুলোতে হঠাৎ এক অদ্ভুত ধরণের নিওমোনিয়া শুরু হল। সময় খুব অল্প দিতো চিকিৎসার। অনেকটা মেনিনজাইটিসের মতই। ব্রেন এফেক্ট করে যেত। এ দেশের সব সরকারই তো দায় সারা! অন্তত স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে। এন আই সি ইউতে মাত্র চারটে বেড! প্রায় ১০০ কিমি এরিয়া জুড়ে একটাই শিশু হাসপাতাল। আমি হসপিটাল সুপার। আমায়,আমার চিকিৎসকদের ঘেরাও করে রাখলো রুগির পরিজনরা৷ যেমন ইচ্ছে মারলো! এ দেশের স্বাস্থ্যনীতি, স্বাস্থ্য পরিষেবার অপর্যাপ্ততা নিয়ে আলোচনা হয় না! রুগির পরিবার ভাবে,ডাক্তার ম্যাজিসিয়ান। দে ক্যান ডু মিরাকল। ঢাল নেই তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার,ডাক্তার কী করবে? যথেচ্ছ মার খেলাম রুগির পরিজনের হাতে৷ ওরা,সে রাতে মেরেই দিতো আমাদের। বাধ্য হয়েই বলি, স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বলুন। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা স্বাস্থ সচিবকে দায়ী করুন। এই মৃত্যুর জন্য আমরা কেন দায়ী হবো? এই হলো আমার অপরাধ!
- কিন্তু তার জন্য তো ডাক্তার আপনাকে জেলে ঢোকাতে পারে না। কারণ তো অন্য কিছু,সেটা কী?
- স্যার,উনার নিজের নার্সিং হোম ছিলো। সেটাও বাচ্চাদের। চুপা রুস্তম! ডাল মে জরুর কুছ কালা হায়!
- এই সুনীল ফালতু বকোনা। যা জানোনা তা নিয়ে বল কেন? হ্যাঁ আমার একটা নার্সিংহোম আছে। সেটা শিশুদেরই। স্যার আমি উল্টে আমার নার্সিংহোম থেকে নেবুলাইজার এনে,পালস অক্সোমিটার এনে চিকিৎসারই ব্যবস্থা করি।
- ডাক্তার আপনি হেল্প করতে গেলেন,আর আপনাকে জেলে ঢোকালো? বুঝলাম না!
- স্যার,স্বাস্থ্য দফতর আর এপারেটাস সাপ্লাই যারা করে তাদের মধ্যে সাট ছিলো। যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রী স্বাস্থ্য সচিবের বিরুদ্ধে বললাম,অমনি সাপ্লায়াররা প্রেস রিলিজ করলো,আমি না'কি সরকারি হাসপাতালের এন আই সি ইউর এক্সেসরিজ নিজের নার্সিংহোমে লাগিয়েছি,পাওয়ার এর ইল-এক্সারসাইজ করেছি। অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা লাগিয়ে দিলো সরকার। আবার পেশেন্ট পার্টি লাগিয়েছে শিশু হত্যার চার্জ। দুই এ মিলে আমি বিশ বাঁও জলে!
- বুঝলাম আপনি গণশত্রু!
- না না স্যার। আমি কিছু করিনি। আমায় ফাঁসিয়েছে,বিশ্বাস করুন।
- আরে ভাই আমিও গণশত্রু। সমস্যা কই? আপনার এগেইনস্টে কটা চার্জ? আমার চার্জ এখন অবধি ৪১৭টা। তার বেশি আপনার? ইউ এ পি এ ও লাগিয়েছে। সরকার জনগণপ্রেমী,শত্রু তো আমরাই,বোঝেন না!
- স্যার ইউ এ পি এ দিয়েছে আপনার এগেইনস্টে! সে'তো সাংঘাতিক। ওহ আপনিও প্রিজনার! আমার মনে হচ্ছিলো আপনিও প্রিজনার। কিন্তু জিজ্ঞেস করিনি। আপনার অপরাধ কী?
- কেন আমি রাষ্ট্রাধিনায়ককে মারতে চেয়েছি এই শেষ বয়সে এসে! সীমা কোঁরেগাঁও দাঙ্গাও না'কি আমরা করিয়েছি। উই আর সো পাওয়ারফুল দ্যাট উই ক্যান এরেঞ্জ রায়ট টু। জানতাম সরকার যুদ্ধু যুদ্ধু খেলে প্রতিবেশী দেশের সাথে,দাঙ্গা লাগায় নিজের জনগণের মধ্যে,জাস্ট টু বি ইন দ পাওয়ার! আমরা করে কি করবো বুঝিনি!
- কী বলেন স্যার। আপনি এই বয়সে এসে এসব করবেন কেন? কী লাভ!
- এর উত্তর তো আমি দিতে পারবো না,যারা কেসেস আফটার কেস জুড়তে থেকেছে আমার বিরুদ্ধে,তারা এর উত্তর দিতে সক্ষম। আমি কী করে বলবো!
- স্যার সীমা কোঁরেগাঁও দাঙ্গাটার কথা আমি জানি। সে সময় আমি তো পুণেতেই। কয়েকজনকে পুলিশ এরেস্ট করেছিলো,মেইন কনস্পিরেটর বলে। ইউ আর এমনস্ট দোজ? স্যার একচুয়ালি হোয়াট ইজ দ প্রবলেম?
- আমার কোনো সমস্যা নেই ডাক্তার ভায়া। এ সমস্যার কথা সুনীল বলতে পারবে। পেশোয়ারা দীর্ঘদিন ধরেই দলিত ও আদিবাসীদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে আসে। সে আজ নয়,সেই শিবাজির আমল থেকেই। তারা আবার ফ্রিডম ফাইটারও। দলিত আর পিছড়ে বর্গের স্বাধীনতাটা বিষয় নয়? আরে মানুষের নেবার তো ক্ষমতা আছে। যে দলিত সে চিরকাল দলিত থাকবে,অপ্রেশড হতেই থাকবে,তাই হয়! বিলগার পরিষদের র‍্যালি উপলক্ষ্যে আমরা পুণেতে এসেছিলাম। ব্যস সরকার জুড়ে দিলো। দুই এ দুই এ চার নয় আট! পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা,আর রাষ্ট্র ছুঁলে ছত্রিশ ঘা। আর ভাই দেখুন,নিজের জন্য বেঁচে তো সবাই থাকে। পরের জন্য কজন বাঁচে। আই মেড দ নোশন ক্লিয়ার অব মাই লাইফ৷ আই উইশড টু লিভ ফর দ ডাউনট্রডেন অপ্রেশড পিপল অব মাই কানট্রি। এ আমার বহুকালের স্বপ্ন। দেশটা জন্ম নেবার পর থেকেই দুটো ভাগে বিভক্ত। এক বড়লোক দুই খুব গরীব,অন্ন-বস্ত্র-বাসস্ থানহীন। মাঝে একটা ক্লাস আছে,যে ক্লাসে পড়েন আপনারা। যারা একচুয়ালি বড়লোকদের সাথেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। আমি ওই নিপীড়িত ভারতবাসীর পক্ষে। এতে রাষ্ট্র রাগ করতে পারে,মেরে ফেলতে পারে আমায়। আমি গদ্দার নই। জান থাকতে দল ও মত পাল্টাই না! তাই এ জীবনের অধিকাংশটাই জেল খানায় কেটে গেলো। কী আর করা! আর স্যার বলবেন? নাম বলাই শ্রেয়। নাম ধরেই ডাকুন,আমার নাম পিআর। সে নামেই সবাই ডাকে। আপনারাও তাই ডাকুন৷ সমস্যা কই?
- স্যার আপনি হয়তো উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন। আমি তেমন কিছু তো বলিনি। কেবল আপনাকে কীভাবে রাষ্ট্র বিরোধী তকমা দিলো! থাক না হয়। আপনার শরীর এমনিতেই ভালো নয়।
- না,বলবো। আমি,পুজা ভরদ্বাজ,ঝুমা সেন,ডোভালকার যে যার বাড়িতেই ছিলাম। এন আই এ হঠাৎ কী সোর্সে খবর পায়,আমাদের সবার বাড়িতে রেইড করে। বিজয়েন্দ্র মানে গ্যাডলিং এর বাড়িতে রেড করতে গিয়ে নাকি একটা চিঠি পায়৷ তাতে না'কি আমরা দাঙ্গায় মদত দিয়েচি বুঝতে পারা যায়৷ সেখানেই নাকি জানা যায় আমরা রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার ষড়যন্ত্রও করছিলাম! হাসি পেয়েছিলো শুনে! এতই কাঁচা মানুষ আমরা,যে চিঠি লিখে ষড়যন্ত্রের নকশা বানাই! মজার নয় বিষয়টা? হায়দ্রাবাদ থেকে তুলে নিয়ে পুনেতে আনলো। পরে এন আই এ আর সিট তদন্ত করতে গেলে নিয়ে গেল নভি মুম্বাইতে। তালাজো সেন্ট্রাল জেল। ব্যাস এই তো।
- অদ্ভুত! স্যর,একবার প্রণাম করতে দেবেন?
- ছি! ছি! সুনীল মানুষ সবাই সমান। তুমি যা আমিও তাই। কেন প্রণাম করবে?
- স্যার আজ তো রিপোর্ট আসবে।
- হুম! তো! ডাক্তার টেনশন হয়?
- তা একটু হয় বই কী!
- আমার হয় না স্যার। আমি অবশ্য ছোটলোক। মরলেই বা কী!
- সুনীল এসব বলো কেন ভাই।
- স্যার কাল রাত থেকে আমার একটা বদল আসছে কেন জানি ভেতরে। মনে হচ্ছে সত্যভামাকে মারাটা আমার উচিত হয়নি। মারলে এই সব দুর্নীতিগ্রস্ত কালোয়ার,নেতা মন্ত্রীদের মারলে তবু আনন্দ হতো। আপনাকে দেখছি। কথা শুনছি। কাল রাতে গীতা থেকে যে পড়ে শোনালেন। তারপরই মনটা কেমন যেন হয়ে গেছে। এভাবে তো আমায় কেউ কখনও বুঝিয়ে বলেনি।
- অথচ দেখ সুনীল,জেলগুলোর নাম হয়েছে সংশোধানাগার। ওদের তো এটাই কাজ হওয়া উচিত ছিলো।
- স্যার আপনি অনেক বই লিখেছেন?
- জেল খাটতেই তো জীবন শেষ। কোর্ট,ট্রায়াল। এ জেল থেকে সে জেল। অনেক লেখার সময় কই সুনীল! তবে খুব কমও নয়! প্রথম বই ১৯৬৮। আমার আটাশ বছর বয়সে। নাম ক্যাম্প ফায়ার। তারপর বের হল পালস। এই সময়টায় ভরা যৌবন,লিখতেও পারতাম অনেক। লিখে গেছি। তারপর তো এরেস্ট হয়ে গেলাম ১৯৭৩ এ। তারপর আবার মিশায়। সে সময়ে কন্ডিশনাল বেল দিতে চাইলেও নিতাম না। সুখলতা রাগ করতো। কিন্তু উপায় কী!
- সুখলতা কে, আপনার স্ত্রী?
- হুম। শুধু স্ত্রী বললে অসম্মান করা হয়,সে আমার কর্মকাণ্ডের সহযোগীও। আমি জেলে সৃজন পত্রিকার সম্পাদনা সে করে গেছে। একজন নির্ভীক,মানুষ। যিনি সকল প্রকার স্বৈরাচার,নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলতে পিছপা হননি কখনও। আমি দিনের পর কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়েছি। তিনি সন্তানদের বড় করেছেন। আমার সন্তানরাও নির্ভীক আমারই মত।
- স্যার করোনা হলে আমার হোক। আপনি বেঁচে থাকুন। ঈশ্বর যেন শোনে আমার কথা।

কপালে হাত দিয়ে কোনো এক অদৃষ্টের কাছে প্রার্থনা জানায় সুনীল। দুপুরের খাবার দিয়েছে। তেমন কিছু নেই। চাউল,দুটো রুটি,ডাল,একটা সব্জি,আর দই। সুনীল আর ডাক্তার খেতে শুরু করে। স্যার এর খাবার ইচ্ছে নেই। মুখটা কেমন বিস্বাদ! আঢাকা খাবার পড়ে থাকে। স্যার ঘুমিয়ে যান অজান্তেই।

বিকেলগুলো কেমন অজান্তেই মরে এসেছে কিছুদিন হলো। সকালের যেমন একটা ফ্রেশনেস থাকে। তা বিকেলের অবশ্য কখনোই থাকে না। থাকার কথাও নয়। তবে জেলবন্দীর আবার সকাল বিকেল। আলোর কমা বাড়া দেখেই বুঝে নেওয়ার চেষ্টা সকাল বা বিকেল। ইদানীং পিআরের অবশ্য গুলিয়ে যায় সকাল বা বিকেল। এই যেমন এখন ঘড়িতে বিকেল সাড়ে পাঁচ। পিআর ভাবছেন সকাল সাড়ে সাত। সুখলতা আর তিন কন্যাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন ওয়ারাঙ্গল ফোর্টের দিকে। ৮০০ থেকে ১২০০ সাল অবধি যাদবরা এখানে রাজত্ব চালাতো। পরে কাকাতিয়ারা ক্ষমতায় আসে৷ কাকাতিয়ার মৃত্যু ঘটলে তার কন্যা রুদ্রামা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তিনি তৈরি করেন এই ফোর্টের সবথেকে আলঙ্কারিক তোরণ। পরে পত্রাধিপুর ক্ষমতায় আসলে কাকাতিয়াদের সুবর্ণযুগের সূচনা ঘটে। শ্রীবৃদ্ধি ঘটে ফোর্টের ও। এসব কথাই বলছিলেন সুখলতা আর তিন কন্যাকে। প্রশ্নটা বড় কন্যা করলো,বাবা ওয়ারাঙ্গল যদি রাজধানী হয়ে থাকে,তাহলে এমন করুণ হাল কেন.? বাবা বুঝিয়ে চললেন,কাকাতিয়া রাজত্ব তো অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মেরেকেটে ২০০ বছর৷ দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ শতাব্দী। তারপর আলাউদ্দিন এর চ্যালচামুন্ডারা,দখল করে সুলতানী সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন ঘটায়। তারা পুরনো ইতিহাস মুছে দিতেই পক্ষপাতী ছিলো। ভীষণ সাম্প্রদায়িক ছিল খলজিরা! সারা ভারত জুড়েই ওরা ইতিহাসের ধ্বংস করে গেছে। তবে মা একটা কথা বলি শোনো দুনিয়ার কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী হয়নি৷ সে সুলতান,মুঘল বা ব্রিটিশ! শাসক মাত্রই একই রকম অত্যাচারী ও অনিষ্টকারী। আমাদের এ দেশের বর্তমান শাসক শ্রেণীও তাই। এদের ও পতন ঘটবে। দেখে নিও।
- আর আমাদের?
হেসে ফেলে পিআর। আমরা তো পতিতই। আর কী পতন ঘটবে বলো?
- তুমি কখনও রাজা হবে বাবা?
- হুম,জনতার মনের রাজা। রাজা হতে তো আমি জন্মাইনি মা। তাই তো এত লড়াই,কষ্টস্বীকার!
কথাগুলো বলতে বলতেই কেমন একটা মন খারাপ ছেয়ে বসে। মাথায় খুব ব্যথা। আচ্ছন্নতা। ঘুম ভেঙে যায় স্যার এর। সন্ধ্যে হয়ে গেছে মনে হয়। উঠে বসতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। সামলে নেন।
- স্যার,শুয়ে থাকুন। উঠতে হবে না। আপনার খুব জ্বর ছিলো। কাশছিলেন খুব। বুকে ব্যথা বললেন ইশারায়। মনে পড়ে?
ম্লান হাসি হাসেন। না মনে নেই! তোমাদের কষ্ট দিলাম অকারণে৷ সরি।
- স্যার কী বলেন! কষ্ট কেন দেবেন৷ ডাক্তার যাই ভাবুক,বলুক,আপনি আমার স্যার৷
- তা সুনীল তোমার স্যার কিন্তু জীবনে একটাও পিঁপড়েকেও মারেনি। তুমি যে মারলে৷ এতে স্যার কিন্তু দুঃখ পেয়েছে খুবই।
- আর তো করবো না স্যার। ভুল করেছিলাম।
- মানে কী! এই হারামি সুনীল এই ভুলের কোনো ক্ষমা হয়?
- আমায় হারামি বলছেন ডাক্তার? এই ডাক্তার চুপ করুন। নোংরা মানুষ কোথাকার। স্যার জানেন,আপনি যখন বিড়বিড় করছেন,সেন্সে নেই,ডাক্তার বলছিলো বুড়োটার নিশ্চিত করোনা হয়েছে, এর জন্য আমাদেরও মরতে হবে!
- এই সুনীল ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।
- সুনীল এতে ডাক্তারের দোষ নেই। বাঁচতে কার না ভালো লাগে? সে বাঁচতে চায়। এতে অন্যায়ই বা কই? আর ওর রাষ্ট্র সমাজ ওনাকে এভাবেই বড় করেছে। শুধু নিজেরটুকু ভাবো! এতেও ওর দোষ নেই। উনি তো ওনার ক্লাসকেই রিপ্রেজেন্ট করবেন। তবে জানেন ডাক্তার আমি তো সেই ১৯৭৪ এ জেলে ঢুকি। বের হই ১৯৮৯। তখন এন টি আর এর জমানা। এম টি আর ক্ষমতায় আসার আগে মাওয়িস্টদের প্রশংসা করেছিলো। মাওয়িস্টদের সমর্থন না পেলে অবশ্য ক্ষমতায় আসা দুস্কর ও রাজ্যে। কত মিটিং সিটিং সেটিং! যেই ক্ষমতায় এলেন,ভুলেই গেলেন মাওবাদীদের অবদান। জেল ভরো শুরু হয়ে গেল। আমিও ঢুকলাম জেলে। একের পর এক কেস জুড়তে লাগলো। জামাই খন্দবাবু ক্ষমতায় এলো। ছাড়া পেলাম। এবার খন্দবাবুও বদলে গেল! আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলো আমরা না'কি বিচ্ছিন্নতাবাদী। নিজের দেশ,নিজের রাজ্য চাওয়া কী বিচ্ছিন্নতাবাদ? সেই ব্রিটিশদের কলোনিয়াল হ্যাঙওভারের ট্র‍্যাডিশন আজও এরা ছাড়তে পারেনি এখনও। সেও জেলে ঢোকালো। তেলেঙ্গানা আন্দোলন শুরু হল। আমাদের সম্বল কেবল লড়াই আর লড়াই,জানো সুনীল কতদিন আমার বাড়িতে ভাত চড়েনি। এর মাঝে সরকার পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলো,যেখানেই আমায় পাবে,যেন গুলি করে মেরে দেয়। পরে ফেক এনকাউন্টারের গল্প জুড়ে দিতো! রাষ্ট্রের মোক্ষম ওষুধ! আমার হায়দ্রাবাদের বাড়িতে অন্তত একুশবার এটাক করেছে। পারেনি। পুলিশের মধ্যেও তো আমাদের ভালোবাসার লোক আছেই। ঠিক খবর পেয়ে যেতাম। অবশেষে জয় হোলো। অতি সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কে তুমি এক দুই তিন দুশো বছর অবদমিত করতে পারোই৷ একদিন তো ছাড়তেই হয়,হবেই। এলো পি এস । নতুন রাজ্যের জন্ম নিলো। এবার নিশ্চিত আমাদের সম্মানজনক অবস্থা হবে! হয়নি। হয়না। পিএস এর মধ্যেই আমায় চারবার এরেস্ট করেছে! শাসক একই হয়,বুঝলেন ডাক্তার! তার পরিচয় সে শাসক! সে আপনার রাজ্যের বাম বুদ্ধ বা বর্তমান দিদিমণি। চেঞ্জ নেই! জানেন কি'না জানিনা,বিষেনজিকে সনাক্ত করাতে আমি নিয়ে গেছিলাম তার মেয়েকে সাথে করে। আসলে রাষ্ট্র মাত্রই হিটলার। কেবল নামগুলো আলাদা! তাই আমরা যে তিমিরে,সেই তিমিরেই রয়ে গেলাম। আবার জেলেই আমি!
- স্যার একটা কথা বলবো?
- হুম!
- কষ্ট হয়?
- নাতো। অন্যায় তো করিনি। করিনা। মানুষের জন্য বাঁচার আলাদা আনন্দ বুঝলে সুনীল। জীবন একটাই,কেউ জীবনকে টাকা কামানোর সময়কাল ভেবেছে৷ কেউ নাম কামানোর। আমি মানুষের পাশে থাকবো ভেবেছি। লিখতাম তো খারাপ না। আমার ছাত্রছাত্রী অগণিত। সাহিত্যিক হিসেবে আমি মন্দ সম্মান পাইনা। চোদ্দোটা ভাষায় আমার লেখা অনুবাদ হয়েছে। তবে মানুষ আগে। মানুষই সব। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, মানুষই অলমাইটি।
কী ডাক্তার চুপ করে আছেন কেন?
- শুনছি আপনার কথা। কেমন যেন গন্ধ পাই আপনি একজন একটিভিস্ট। প্রো নকশাল। মে বি আয়াম রং। ইউ এ পি এ কী আর সাধারণ মানুষ কে দেয়!
- ডাক্তার,ইউ এ পি এ অসাধারণ মানুষ নয়,সাধারণকেই দেয়। মার্ডার চার্জ তো আর সকলকে দেওয়া যায় না! যায়? ইউ এপি এ হল আনলফুল এক্টিভিটিজ প্রিভেনশন এক্ট। এটা হল খুড়োর কল। যার এগেইনসটে তেমন কিছু বলার নেই,তাকে ইউ এ পি এ দিয়ে দাও। কাশ্মীর কে মাথায় রেখেই ইউ এ পি এর জন্ম দিয়েছে রাষ্ট্র। দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিস্ট শক্তির যখন উত্থান হয়,সে এভাবেই জানান দেয়!
- স্যার আপনার জীবন নিয়ে লেখেন নি কেন? এত বিশাল জীবন। কত অভিজ্ঞতা।
- লিখেছি তো। বই এর নাম সহচরালু। সেটা ইংরেজি অনুবাদ হয়েছে। নাম ক্যাপটিভ ইমাজিনেশন। পেঙ্গুইন করেছে।
- পেঙ্গুইন থেকে আপনার বই হয়েছে? কই স্যার আগে তো বলেননি।
- বললে কী করতেন ডাক্তার? মাথায় তুলে নাচতেন? আজ নয় ১৯৯০ তে হয়েছে। আমার অধিকাংশ লেখাই বিবিধ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাতে কী!
- স্যার,পজিটিভ হলে আমার হোক। আপনার যেন না হয়!
- আরে সুনীল কি বল এসব! রিপোর্ট আসার সময় কী হল? তোমার এখনও কত জীবন পড়ে রয়েছে। তুমি কেন মরবে। আমি তো এমনিই মরতাম। মরার বয়স তো হল। না হয় মরবোই৷ সমস্যা কই? অত ভয় পাও কেন? তোমার হাতেই এই ভুবনের ভার। টেগোরকে সামান্য বদলে দিয়ে আমি বলি। তুমি,আমি নিতান্ত সাধারণ। কিন্তু জানো সাধারণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে,কত অসাধারণ! সুকান্ত বলেছিলো,ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। তাকে জাগালেই এই অত্যাচারী সরকারের পতন ঘটবে। মৃত্যুকে ভয় পায় কাপুরুষ। আমি তো তা নই। তাহলে তো আর পাঁচজনের মত ঘর সংসার করে সাধারণ জীবন কাটাতাম। তা যখন কাটাইনি,এ নিয়ে ভেবে কী হবে এখন? তবে আমার অনেক কাজ বাকি থেকে গেল। সেগুলো কী হবে তা তো জানিনা...

ডাক্তার ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে। মাঝেমাঝে কাঁদছে৷ আবার হাসছেও। জোর গলায় গান গাইছে রবীন্দ্রসংগীত। সুনীল চুপ করে বসে তাকিয়ে আছে স্যারের দিকে। স্যার আচ্ছন্নের মত শুয়ে। ডেলিরিয়াম... বিড়বিড় করেই চলেছেন। বুকে হাত দিচ্ছেন মাঝে মাঝে। শ্বাস পড়ছে দ্রুত। স্যারের বাড়ির লোকেরা প্রেস রিলিজ করেছে,স্যারের সম্মন্ধে কোনো খোঁজ খবরই তারা পাচ্ছেন না বলে। এপিল করেছিলো মুখ্যমন্ত্রীর, কোর্টের কাছেও সাইটেড যে ১৫৫০০ দাগী আসামীকে মুক্ত করেছে,যারা খুনী, ধর্ষণকারী, অপহরণকারী! তাহলে স্যার এর কী দোষ! ৮১ বছরের বৃদ্ধও কী এই কোভিড পরিস্থিতিতেও মুক্তি পেতে পারেন না? নিদেনপক্ষে প্যারোলে? কোর্ট অবশ্য রিজেক্ট করেছে এপিল। জাজ বলেছেন,যারা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার পক্ষে ক্ষতিকারক,তাদের মুক্তি দিলে দেশের অখণ্ডতা বিঘ্নিত হবে! যেমন সরকার তেমন বিচারব্যবস্থা! হাসি পায়!

সেই কবে আশির দশকে যখন এম টি আর আমলে জেল বন্দী হল পিআর,সৃজনের এডিটর বানিয়ে দেওয়া হল সুখলতাকেই। জেল থেকে বসেই দিব্যি লেখা পাঠাতো পিআর। সুখলতা পাব্লিশ করতো। তারপর সরকার একদিন নিষিদ্ধ করে দিলো সৃজন৷ যেমন একদিন বন্ধ করে দিয়েছিলো ভিরাসম। যেমন ওয়ারাঙ্গল যাওয়াও। তাতে কি আর পিআরকে আটকানো যায়!
আজ বহুদিন পর,এই রাতে পিআর আবার ওয়ারাঙ্গলে। রাজাপ্পার বাড়িতে।
রাজাবান্দু,রনি,ইলাম সুধাকরের সাথে ভিরাসম নিয়ে মিটিং চলছে। কবিতা,গল্প সাথে ইস্তেহারও। সুখলতা,আর তিন মেয়েকেও নিয়ে এসেছে পিআর। কতদিন জন্মভূমিতে আসেনি! কখন গুলি চলতে শুরু করেছে খেয়াল করেনি কেউই। গুলি অবশ্য ছোঁড়া হয়েছিল পিআর এর দিকেই৷ লাগলো গিয়ে অনলা আর রাজাপ্পার গায়ে। সিভিল ড্রেসে পুলিশ পাহারায় ছিলো সেই সন্ধ্যে থেকেই৷ এ তেমন গোপন মিটিং নয়৷ ভিরাসম কোনো অবৈধ কাজকর্ম নয়। তা নিয়েও পুলিশের খড়্গ হস্ত হবার কারণ অবশ্য বোঝা যায়নি। ভিরাসম এর নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে৷ হ্যাঁ সাহিত্য শুধু ব্যক্তি স্বার্থের নয়,প্যানপ্যানানি রোমান্স বা ব্যক্তিগত শোক তাপের আখ্যান নয়। তা বিপ্লবের হাতিয়ারও। এ ভাবনায় অন্যায় কই? এর জন্য মানুষ খুন করতেও বাঁধেনা রাষ্ট্রের। এটাই অদ্ভুত আচরণ! স্বৈরাচারী শাসকের এই এক ভুল কাজ। কিন্তু অনলা রক্তে ভাসছে,সুখলতা এমনিতে শক্ত খুবই। কিন্তু মেয়েকে রক্তে ভাসতে দেখে বিচলিত। পিআর এগিয়ে আসছিলো মেয়ের দিকে,তার দিকে আবার গুলি পর পর...গোটা বাড়িটাই এরপর উড়ে গেল রিমোট কন্ট্রোলে...চারদিক জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ক্ষতবিক্ষত দেহগুলো৷ কিছুক্ষণের নীরবতা...তারপর সুনীলের নেতৃত্বে বিশাল মিছিল এগিয়ে আসছে,আদিবাসী,দলিতদের। সবার মুখেই পিআর এর মুখোশ...লেখা 'আমাকে মারুন। আমি পিআর'! পুলিশ পিছু হটছে,পালাচ্ছে,লোক দৌড়চ্ছে পুলিশের পেছনে...



প্যারামিলিটারি দিয়ে আগেই রাস্তা বন্ধ করা হয়েছিল। কার্যত শুনশান পথ! ভীড় করে দুপাশে দাঁড়িয়ে লোকজন,স্কুল বাড়ির অপ্রশস্ত রাস্তা দিয়ে লাইন দিয়ে গাড়ি চলেছে,প্রথমে কোভিড রেসকিউ টিম,উইদ এসি এমবুলেন্স,স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়ি,জে জে হাসপাতালের এমবুলেন্স,পুলিশের বড়, মেজ, সেজ,ছোট কর্তাদের গাড়ি...চোখে পড়ার মত তৎপরতা...পিআর কোভিড পজিটিভ! তাকে ট্রান্সফার করা হবে জেজে হাসপাতালে...সাথের ডাক্তারও পজিটিভ। তবে সে তো চুনোপুঁটি। খুনি সুনীল অবশ্য নেগেটিভ। পুলিশ ও স্বাস্থ্য দফতরের লোকেরা,দ্রুত তিনতলায় উঠে গেছে,পিআর কে ডাকছে তারা...
স্যার...স্যার উঠুন স্যার। স্যারের সাড়া নেই। তাড়াও নেই আর জেজে হাসপাতালে যাবার...স্যার এখন হাঁটছেন ওয়ারাঙ্গলের আদিবাসী গ্রামগুলোতে। ওদের ডেকে বোঝাচ্ছেনঃ

“If you can’t fly then run, if you can’t run then walk, if you can’t walk then crawl, but whatever you do you have to keep moving forward.”
ডাক্তার কাঁদছে নিজের রিপোর্ট দেখে৷ সুনীলও কাঁদছে,চিৎকার করে বলে চলেছে,স্যার আমি পাপী লোক,আমি চলে গেলে ক্ষতি হতনা। কতবার বললাম আপনার রোগটা আমার হোক...
স্যারকে স্ট্রেচারে তুলছিলো পিপিই পরা লোকগুলো,সুনীল রে রে করে দৌড়ে এসেছে,খবরদার হাত দেবেনা আমার স্যারের গায়ে...তোমরা তোমাদের জন্যই স্যারের এই হাল...লোকটা গরীব,দলিত,আদিবাসী ভারতীয়দের মুখ ফুটে নিজের অধিকারটুকু আদায় করে নিতে শিখিয়ে গেছেন সারাজীবন,সে কি করে দেশের শত্রু হয়,দেশের শত্রু তোরা...থুতু ছুঁড়ে দিলো লোকগুলোর দিকে...চলে যা এখান থেকে...হাত দিবিনা স্যারের গায়ে...
বাজ পড়ছে,বৃষ্টি শুরু হবে হয়তো।

তেলেগু আর ইংরেজি দুই ভাষাতেই
আমি পড়েছি পুলিশ অর্থ অভিভাবক…
“যদি তুমি বিবাদ কর
(বিবাদ অর্থ বৃহতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ)
পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে তোমায়;
সাবধানে থেকো, পুলিশ মানে অসুর,”
শৈশবে মা বলত আমায়।
মায়ের কথাগুলো সত্যি হয়েছে।
পুলিশের হাতে ধরা বন্দুকগুলো জনগণকে রক্ষার জন্যে নয়
বরং তাদের ধরে নিয়ে গুলি করবার জন্যে।
অন্ধের সাদা ছড়ি,
পুলিশকে লাঠিচার্জের ফন্দি আঁটতে শেখায়
শেখায় না তাদের পথ দেখাবার রাস্তা।
এখন আমি জানি এই সরকার
বরাদ্দ করে চলেছে এসিড আর ধারালো সুঁই
বন্দীদের অন্ধ ক’রে দেবার জন্য।

পিআর ওয়ারাঙ্গলের পথে হাঁটছেন,কোভিড আতংক,সোশাল ডিসট্যান্সিং না মেনেই পিআরের সাথে হাঁটছে অগণিত মানুষ…
বাজ পড়ছে,বৃষ্টি শুরু হল।
“Lightning makes no sound until it strikes.”
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!
স্বাধীনতা আসবেই,আজ অথবা কাল।