সময়ের গল্প

ধ্রুপদী রিপন



[১]
একদিন গল্প দেখবে বলে সবাই চড়ে বসলো সময় যন্ত্রে; হ্যাঁ তুমিও।। অপেক্ষার পালা শেষে মনোযোগ দিয়ে গল্প দেখতে থাকলো সবাই। মনোযোগের সুযোগ নিয়ে অনুভূতিও দখল করে নিলো ভাবনার জগৎ।। কোমল, মোটা ও ভারী গলায় কেউ একজন অনবরত গল্প বলে যায়।। তার বলে যাওয়া গল্প নিয়ন্ত্রণ করে চলে সময় যন্ত্র।।
[২]
একদিন শকুন রাজা পায়ের ক্ষত সারাতে হন্যে হয়ে দূর্বা ঘাসের সন্ধান করতে থাকবে। সংসারের আনাচে-কানাচে সন্ধান করে নিজেকে ব্যর্থ ঘোষণা করার পূর্বে সে আশ্রয় নেবে পানি বেষ্টিত এক দ্বীপে। সবুজে ঘেরা সমকোণী ত্রিভূজ আকৃতির সে দ্বীপে শকুন রাজা করতে থাকবে দূর্বা ঘাসের সন্ধান। সবুজে ঘেরা সে দ্বীপ শকুন রাজাকে নিরাশ করবে না। দ্বীপের কেন্দ্রে একটি সাজানো বাগানে হাজারও বেনামী ঘাসের ভিড়ে একটি অর্ধমৃত দূর্বা ঘাসের সন্ধান পাবে শকুন রাজা। দূর্বা ঘাসটির পাশে দাঁড়িয়ে শকুন রাজা তুলবে তৃপ্তির ঢেকুর। তবে পরক্ষণেই কি যেন ভেবে বিচলিত হয়ে উঠবে শকুন রাজা। দূর্বা ঘাসটি সাথে না নিয়েই উড়াল দিতে উদ্যত হবে আকাশে। এমন সময় দূর্বা ঘাসটি মুচকি হেসে বলে উঠবে, ভেবেছো ঔষধিগুণ বিলীন হয়েছে? দূর্বা ঘাসের কথা শুনে শকুন রাজা থামে।। বাঁকা হাসি হাসে।। বলে, তোমার আমার পার্থক্য তো এখানেই। উপকারীদের বিলীন করতে এসে যদি তোমার কাছেই উপকার গ্রহণ করতে হয় তবে তার অর্থ দাঁড়ায়- আমি পরাজিত; তুমি তো জানো আমি জয়ের নেশায় মত্ত! শকুন রাজার কথা শুনে দূর্বা ঘাসটি মুচকি হাসে।। হেসে বলে, পরাজয়ের ভয়ে তুমি কাতর। বলছি পায়ের ক্ষত চিহ্নের দিকে একবার তাকাও! শকুন রাজা হাসে শব্দহীন বাঁকা হাসি।। অদ্ভূত অঙ্গভঙ্গিমায় শকুন রাজা বলে, মাথা আমার কিন্তু ব্যাথা তো দেখছি তোমার করছে! ...মতলব কি শুনি? শকুন রাজার কথা শুনে দূর্বা ঘাসটি হাসে সাবলীল হাসি। বলে, যার কাজ উপকার করা তার আবার মতলব কিসের? দূর্বা ঘাসের কথা শুনে শকুন রাজা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।। তার হাসিতে যেন কেপে ওঠে বাগানের ত্রিকোণ, হা হা হা... মৃত্যুর পূর্বেও দেখছি নিজের জয় নিশ্চিৎ করতে চাও! বিমর্ষ হাসি হেসে দূর্বা ঘাসটি বলে, তোমার ভাবনা তো তোমার মতোই হবে এবং এটাই স্বাভাবিক। দূর্বা ঘাসের কথা শুনে শকুন রাজা হাসে ঠোঁট বাকানো হাসি, মন্দ বলো নাই। তবে সত্য এটাই যে আমি তোমার উপকার গ্রহণ করতে আসি নাই। তোমার অবস্থান থেকে মৃত্যুর দূরত্ব মাপতে এসেছি।
- তবে বলে যাও যা মেপেছো।
- পরিমাপ তো বলে অপেক্ষা করার কথা।
দূর্বা ঘাসটি মুচকি হাসে, ভাবতেই কষ্ট লাগেÑ তোমাকে অপেক্ষার যাতনা বহণ করতে হবে বলে! দূর্বা ঘাসের কথায় বাঁকা সুর খুঁজে পায় শকুন রাজা। মাড়ি শক্ত করে বলে, আমার বুদ্ধি তো তোমার মতো হাটুতে নয়! তোমার উপকার নিয়ে তো তোমার মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ হতে পারি নাÑ যেখানে তোমার মৃত্যু এখন সময়ের দাবি।। একথা বলেই শকুন রাজা উড়ে যাবে আকাশে, যাবে দূরে, বহুদূরে। এরপর চলতে থাকে সময় আপন গতিতে।।
[৩]
সময়ের চলার গতির সাথে দূর্বা ঘাসটিও অতিবাহিত করে মৃতপ্রায় জীবন। সময় চলতে থাকেÑ আপন গতিতে চলমান থেকে ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে বর্তমান আর বর্তমান হয়ে যায় অতীত। হয়ে ওঠা সেই বর্তমানে দেখে নেয়া দূর্বা ঘাসের অবস্থান আজ অতীত হলেও তৃপ্তির ঢেকুর তোলে সংসার।।