হারায়ে যাওয়া ম্যাপের গল্প

নাহিদ ধ্রুব



আমাকে খুঁজে বের করতে হবে ম্যাপ, যা আমি হারাইনি, এমনকি দেখিনি কোনদিন। তবু কোন এক রাত রাত ভোরে কিংবা এমন সময়ে যখন ঘড়িও ঠিকঠাক বলতে পারে না সময়, এমন কোন মুহূর্তে আমাকে ধরে বেঁধে নিয়ে আসা হলো এই বনে। এই বনে যেখানে বাফারিং করে করে হাওয়ারা আসে। ভ্যাপসা গরম, হতে পারে কোন রেইনফরেস্ট কিংবা ম্যানগ্রোভ বন। আশেপাশে অসংখ্য নাম না জানা গাছ, তবু কেউ একটুও ছায়া দেয় না। ক্যাম্পিংয়ে এখানে কেউ সচেতনভাবে আসবে না কখনও। আমিও কী আসতাম? হয়তো টাকার বিনিময়ে আসতাম। টাকার জন্য মানুষ কতো কিছুই তো করে। তবে, যখন আমি বনে, বাতাস আসবে আসবে করেও আসে না এইখানে, আর গাছেদের মনে নেই একটুও মায়া তখন মনেপ্রাণে খুঁজছি এই বন থেকে পালানোর পথ।

খুঁজলে নাকি খোদাকেও পাওয়া যায়, আমিও হয়তো খুঁজে পাবো বন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা, কিন্তু চাইলেই কী বন থেকে বের হওয়া যায়? আমাকে খুঁজে বের করতে হবে হারায়ে যাওয়া কোন এক ম্যাপ। কেউ কেউ ধারনা করে ম্যাপটি হারায়ে গিয়েছে এই বনে। সে কেমন ম্যাপ, কী তার রঙ, কাগজে লেখা নাকি মেঘেদের মন, কে জানে! আমাকে তো দেয়া হয়নি কোন দিক নির্দেশনা, শুধু বলা হয়েছে এই বন থেকে খুঁজে বের করতে হবে হারায়ে যাওয়া সেই ম্যাপ। ম্যাপ খুঁজতে গিয়ে তাই আমি খোদার নাম ধরে ডাকি, কাঁদি একমনে। খোদা আমার জন্য পাঠায় নরম সূর্যের আলো, খোদা আমাকে দেয় চাঁদের সুবাস, বুনো ফুল আমাকে ভালোবাসে, এমনকি অনেকদিন পর আমি খুঁজে পেয়েছি বন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ, কিন্তু কোথায় সে’ই ম্যাপ? ম্যাপের কোন অস্তিত্ব আমি খুঁজে পাই না।

খুঁজে পেয়েছি একটা গুহা, পাথরে পাথর ঘষে সেখানে আগুন জ্বালিয়ে রাতে থাকি। শেয়ালের ডাক শুনি মাঝেমাঝে। রাতে এই বন খুব শীতল হয়ে আসে। সামান্য শব্দ শুনলে মনে হয় আমাকে ঘিরে ধরেছে ক্ষুধার্ত হায়েনার দল। প্রতি রাতে আমি ভাবি, যাই হোক এই বন থেকে বের হয়ে যাবো ভোরের সাথে। যদিও জানি, এখান থেকে ম্যাপ ছাড়া বের হলে, আমার শাস্তি নির্ঘাত মৃত্যুদণ্ড। রাত্রিতে ঘুম আসেনা। আমি জেগে জেগে কল্পনা করি আমার মৃত্যু দৃশ্য। কীভাবে ওরা হত্যা করবে আমাকে? গর্দান নেবে নাকি আমি ঝুলে থাকবো কোন গাছের ডালে?

এমন ভাগ্যের জন্য আমার করুণাও হয় মাঝেমধ্যে। আমার তো এখানে থাকার কথা না। কেন আমাকে এইখানে ফেলে রাখা হলো, এই প্রশ্ন মনে আসে ক্ষণে ক্ষণে। মনে পড়ে, বহুকাল আগে, যখন আমি শিশু তখন বালুর ভেতর থেকে কুঁড়িয়ে পেয়েছিলাম একটি পাথর কিংবা তারও পরে একবার পুকুরের জলে ডুব দিয়ে প্রেমিকার জন্য তুলে এনেছিলাম একটি ফুলের মালা। হায়, এসব কারণেই কী ওদের ধারনা হয়েছে, এই ম্যাপ যা এখানে আছে অথবা নেই, তা কেবল আমার পক্ষেই খুঁজে বের কড়া সম্ভব? কেন কুঁড়িয়ে পেয়েছিলাম এই পাথর, এই রাগে আমি চিৎকার করি গলা ছেড়ে, আবার কোন অচেনা শব্দ শুনে গিলে ফেলি সেই চিৎকার।

ওরা যারা আমাকে এইখানে ফেলে গেছে, মুখে আনতে নেই তাদের নাম। হতে পারে এখনও এইখানে চলছে স্বৈরাচারী কোন রাজার শোষণ কিংবা এটা হয়তো গণতান্ত্রিক কোন দেশ, সভ্য সমাজ চারপাশে। তার মাঝে, আমাকে অজ্ঞাত কোন অপরাধে দেয়া হয়েছে এই শাস্তি! সে যাই হোক, আমি জানি ওরা আমাকে ছেড়ে দেবে না সহজে। যেভাবেই হোক আমাকে খুঁজে বের করতে হবে ম্যাপ। আমি জানি না, সে ম্যাপ দেখতে কেমন। আমি জানি সে ম্যাপ সন্ধান দেবে কোন এক গুপ্তধনের।

আমি তন্নতন্ন করে খুঁজি এই বন। আমার পাগল পাগল চোখ, সজারুর মতো চুল দেখে ঝোপঝাড় আজকাল নিজে থেকেই ছেড়ে দেয় পথ। আমি উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটি, ধ্বংস হয়ে যায় মাটি, যেখানেই পা রাখি। সুড়ঙ্গ কেটে তৈরি করি সুড়ঙ্গ আর বেদনাকে টেক্কা দেই বেদনা দিয়ে। এইভাবে একদিন আমার হাতে আসে তা, যার আশা আমি করিনি কস্মিনকালেও। গুপ্তধন। মণি, মুক্তা , হীরা আরও কতো মূল্যবান জিনিস তো ছিলও, সেখানে আরও ছিল ভবিষ্যতে ভালো থাকার দিকনির্দেশনা। এইসব পেয়ে, জানি না কতদিন বাদে আমি ফিরে যাই লোকালয়ে।

তাদের হাতে তুলে দেই গুপ্তধন, যারা আমাকে ছেড়ে এসেছিল এইখানে। পিঁপড়ের মতো জড়ো হতে থাকে শহরের সমস্ত মানুষ। আমার মনে হয় ওরা এখনই আমার নামে স্লোগান দেবে, আহা এসব যেন স্বপ্নদৃশ্য। ঘাসের মুখে জমে থাকা শিশিরের মতো আমার মুখে জমা হয় তৃপ্তি আর তখন ওরা মানে যারা ছিল খমতায় তারা পড়তে শুরু করে ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা। অনেক দীর্ঘ সে তালিকা, মানুষ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পরে, মানুষ শুনতে শুনতে গান করে, এভাবে একসময় পড়া শেষ হয়। ওরা ফিরে টাকায় আমার দিকে এবং ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা থেকে পড়ে শোনায় একটি বাণী।

‘যাকে যে কাজ করতে দেয়া হবে, সে যদি সে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।’

আমাকে খুঁজে আনতে বলা হয়েছিল ম্যাপ, আমি নিয়ে এসেছি গুপ্তধন। আমি ব্যর্থ। ভবিষ্যতের মানুষেরা আমার এই অপরাধ ক্ষমা করবে কেন? শহরে আমার নামের বদলে গমগম করতে থাকে কেবল একটি শব্দ মৃত্যু।