তক্ষক

গৌতম চৌধুরী



১.
দরোজা বন্ধ ছিল। জানালাও। অথচ কীই বা বিত্তিবেশাদ, আর কেই বা তস্কর। তাহলে কেন যে এভাবে সবদিক সেঁটে রাখা। সে কি জিনিস খোয়ানোর ভয়ে, না কি জানের দায়ে শামুকের মতো আঁটসাঁট একটা খোলসের ভেতর ঢুকে পড়া? আগলগুলো সব যদি উদোম ক’রে খোলাই রইত, কেই বা আসত। হয়তো বড়জোর ছুটে আসত খানিক হুহু হাওয়া।
শীত চলে গেল যাই যাই ক’রে। গ্রীষ্মের আবছা ইশারা এখন রোদের উথলে ওঠা চাহনিতে। হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে আমবউলের গন্ধ। যেন আসমান অবধি চইচই ক’রে সাঁতরে যাচ্ছে ঝাঁকবাঁধা সুগন্ধের হাঁস। বসন্ত। সেই লাজুক ছেলেটি। দু’পাশে দুই ডাকাবুকো মুরুব্বির মাঝে, সে যেন জঙ্গলমহালের ছুটে-বেড়ানো সেই গান-গাইয়ে। দু’এক দিনের জন্য দেখা দিয়েই যে উধাও। তার বুকের ভেতর শাল-মহুলের দীর্ঘশ্বাস। তার চোখের তারায় পলাশ-শিমুলের আভা। আসত নাহয় সেই বসন্তের হাওয়াটুকু। তার রঙিন নিশানের পিছু পিছু ঢুকে পড়ত নাহয় পাতাদের ফিসফিসানি, ফুলেদের ঝিকিরমিকির আর বউলের ছমছমে সুগন্ধ। পিছু পিছু হয়তো ঢুকে পড়ত কোথাকার কোন উছলে ওঠা মাদলের শব্দ আর ঝলকে ওঠা ঝুমুরের সুর। এইসব হাওয়ায়, রঙে, গন্ধে, সুরে, খুব কি তছনছ হয়ে যেত পরিপাটি ক’রে গোছানো ওই ঘর?
পরিপাটি ক’রে গোছানোই বটে। কী এমন রয়েছে ওই ভাঙাচোরা ঘরে! আগলে রাখার মতো কিছুই তো নেই। কিছুই নেই, বাজারে যা বিকোতে পারে কানাকড়ি দামে। আছে, শুধু সারি সারি বয়মভর্তি কিছু তিত তিত আরক – কালচে, খয়েরি, নীল। আছে, কাঠের তোরঙ্গের নিচে চাপাপড়া কিছু চোখ লাল লাল জ্বর। আছে, কয়েকটা চুপসানো বেলুন, চিড়েচেপ্টা নৌকা, ছেঁড়াখোঁড়া ডাকটিকিটের খাতা, আর ম্যাজিক দেখানোর সরঞ্জাম ভর্তি একটা মান্ধাতা-আমলের ঘুণধরা বাকসো। পোলাপানদের ভয় দেখানোর জন্য একটা কঙ্কালও যেন ছিল! কিন্তু সেটাও তো আসল নয়। প্লাস্টিকের। নাকি তাও নয়, এক টুকরো কালো কাপড়ের ওপর চকখড়ি বুলিয়ে আঁকা। স্রেফ জঞ্জাল। কে আর কিনবে এসব? দুধের খালি মোড়কও ১২টাকা কিলো। খবরকাগজ ৬টাকা। খাতাপত্তর ৪টাকা। শিশি বোতল ২টাকা। ভালো জিনিসের বোতলের কিন্তু দাম ভালো – মাথাপিছু ১টাকা। কিন্তু এইসব আবর্জনা – কে কিনবে এসব হাবিজাবি? আর বিক্রিই যদি না হয়, চুরিই বা করবে কে! এক যদি কেউ পাগল না হয়। আছে কি তেমন কোনও পাগল এই চারচৌহদ্দিতে? কেউ নেই।
এসব জঞ্জাল তাহলে ঘর-ঝেঁটিয়ে বাইরে ফেললেই বুঝি ভালো হ’ত। কিন্তু তারও কি জো আছে! যেখানে সেখানে ময়লা ফেললেই হ’ল? পথের নানা মোড়ে দাঁড়িয়ে, নানা ভেকের পাহারাদার। কড়া তাদের নজর। ঘরের নোংরা বাইরে চালান করতে গেলে, প্রথম কাজ চালান ভর্তি ক’রে তাদের ভাঁড়ারে ট্যাক্‌সো জমা দেওয়া। তারপর লম্বা লাইনের পিছনে দাঁড়িয়ে, ক্রমে এগিয়ে যাওয়া বিধিবদ্ধ আস্তাকুঁড়ের দিকে। সেখানে সারি সারি নানান রঙের ডিব্বা। তিত আরকের বয়ম – নীল ডিব্বা। চাপা পড়া জ্বর – লাল ডিব্বা। ম্যাজিকের ঘুণধরা বাকসো – সবুজ ডিব্বা। আসল কিংবা নকল কঙ্কাল – কালো ডিব্বা। বিবিধ – সাদা ডিব্বা। উল্টোপাল্টা হলেই লাল আলো জ্বলে উঠবে। সাথে সাথে পাহারাদারের কাছে গালি, আর আবার জরিমানার চালান লেখা খসখস।
হঠাৎ কোথা থেকে ডেকে উঠল একটা তিনকেলে তক্ষক। মনে হয়, সে-ই এ-ঘরটার আদি বাসিন্দা। এখানকার সমস্ত জঞ্জালের একমাত্র মালিক। এভাবে দরোজা-জানালা বন্ধ ক’রে, অন্ধকারের ভিতর ডুবে থাকতে থাকতে তার দম আটকে আসে না! যেই না এমন প্রশ্ন মনে আসা, অমনই সে ডেকে উঠল আবার, আর জানিয়ে দিল – সমস্ত অন্ধকারের মুখে ছাই দিয়ে সে দিব্যি বেঁচে আছে!


২.
তাহা হইলে মোদ্দা ব্যাপারটা কী দাঁড়াইল? যে-আবর্জনা খালাস করিবার নিমিত্ত গুনাগার প্রদেয়, তাহা প্রাণপণে আগলাইয়া রাখা হইল। তাহা খোয়া যাইবার ভয়ে তটস্থ হইয়া ঘরের সকল দরোজা-জানালায় খিল আঁটিয়া রাখা হইল। ঘরে এখন হিম অন্ধকার ভারি হইয়া জমিয়াছে। দেওয়ালের কোণে কোণে মাকড়সার কালাতিক্রমী ঝুল। কীট ও পতঙ্গের তীর্থভূমি হইয়া উঠিয়াছে কক্ষগুলি। ইহারই ভিতর কোথা হইতে ডাকিয়া উঠিতেছে একটি প্রাচীন তক্ষক। সে-ই এ-বাসভূমির সকল মায়া ও মরীচিকার রচয়িতা। ও একমাত্র উপভোক্তাও বটে। যেগুলিকে আবর্জনা বলিয়া সাব্যস্ত করা হইল, বাজারে যাহার মূল্য কানাকড়িও নহে, সেগুলিকে আগুলিয়া রাখা ভিন্ন আর কোনও শুভকাজ সে খুঁজিয়া পায় নাই হয়তো। যে-তস্কর কদাপি আসিবে না, তাহাকে প্রতিহত করিতে, সকল অর্গল রুদ্ধ করিয়া, অন্ধকারের মণ্ডের ভিতর ডুবিয়া থাকিয়াও তাহার শ্বাসরোধ হয় নাই। সে যে দিব্য বাঁচিয়া আছে, তাহা জানান দিবার জন্যই বুঝি, সমস্ত অন্ধকার ভেদ করিয়া থাকিয়া থাকিয়া সে ডাকিয়া উঠে।
এসকল বৃত্তান্ত তো মোটামুটি বুঝা গেল। কিন্তু যাহা আদৌ বুঝা গেল না, এই প্রতিবেদক তুমিটি কে! যে-তুমি সহসা তক্ষকের ডাক শুনিলে। যে-তুমি এই ঘটনাপরম্পরার ভিতরে আসিয়া সহসা রেফারিগিরি করিতে উদ্যত। যে-তুমি উড়িয়া আসিয়া জুড়িয়া বসিতে চাহিতেছ নির্বিরোধী তক্ষকটিরর স্বেচ্ছানির্বাসিত একান্ত জীবনে। সে যদি তাহার অকঞ্চিৎকর সামগ্রীগুলিকে পরম মুল্যবান ভাবে, যদি সে সেগুলি অপহৃত হইবার ভয়ে দিবারাত্র দরোজা-জানালা সাঁটিয়া রাখে, তবে তোমার সুখনিদ্রার ব্যাঘাত ঘটে কীভাবে? তুমি বুঝাইতে চাহিতেছ, ওইগুলি আবর্জনা মাত্র। এবং যত শীঘ্র সম্ভব উহাদের বিদায় করা যায়, ততই মঙ্গল। প্রশ্ন – মঙ্গল কাহার? সে কি শুদ্ধ তাহার, না কি ইহার ভিতর তোমারও কিছু স্বার্থ জড়াইয়া আছে? কারণ, দেখা যাইতেছে কিঞ্চিৎ ভীতিপ্রদর্শনের পথও তুমি লইয়াছ, এই তথ্যের মাধ্যমে, যে, কথিত ‘আবর্জনা’ নিজ উদ্যোগে বাহিরে ফেলিতে গেলে, উল্টিয়া গৃহকর্তার উপর মাশুল গণিবার দায় বর্তাইবে। এইস্থলে ইঙ্গিত এই যে, জঞ্জালরাশি চুরি হইয়া যাওয়াই উত্তম বিকল্প। দ্বিতীয় ভীতিপ্রদর্শন – উপযুক্ত তস্করের অভাব। কারণ বাজারে যাহার কানাকড়ি মূল্য নাই, পাগল না হইলে সেইসব দ্রব্য কেহ গ্যাঁড়াইতেও সম্মত হইবে কি না সন্দেহ। এখন, এরূপ হুমকির ইঙ্গিতটি যে কী, ইহাই কিছুটা রহস্য। তোমার প্রতিবেদনে ইহা বড় একটা খোলশা কর নাই। সেই রহস্যমোচনের দায় অতঃপর আমাদের উপর বর্তাইতেছে দেখিতেছি। সে-কাজ আমরা সাধ্যমতো করিতে চেষ্টা নিব অবশ্যই। কিন্তু খুবই সঙ্গতভাবে অনন্তর আর একটি প্রশ্ন উঠিবেই, আর তাহা হইল - আমরাই বা কে!
একটি সরল বিষয়কে অযথা জটিল করিয়া তুলিয়া, তাহার পর আয়াস করিয়া একটি আপাতসরল সমাধানে পৌঁছাইয়া, হয়তো মানুষ একপ্রকার বিমূর্ত তৃপ্তি অনুভব করে। অন্যথায় সে ধাঁধা বানাইত না। বা, অন্তত শ্রুতিবাহিত ধাঁধায় ক্ষান্ত হইয়া, হাতেকলমে খেলিবার জটিল খেলেনাগুলি বানাইত না। যেরূপ, একটি তারের জটিলতার ভিতর হইতে একটি ক্ষুদ্র নোলককে নিষ্ক্রান্ত করিবার খেলেনা। খেলিতে খেলিতে বুদ্ধি শাণিত হইল কি না বুঝা গেল না, তবে সাফল্যে একটি জমপেশ আনন্দ যে পাওয়া গেল, সন্দেহ নাই।
যেকোনও রহস্য সমাধানের ভিতরই এক প্রকার আনন্দ আছে সত্য। তাই বলিয়া উল্লিখিত খেলেনা বা কোনও সুবিন্যস্ত গোয়েন্দা-উপাখ্যানের মতো, সব রহস্যই কিছু পূর্বনির্মিত মাত্র নহে। বস্তুত অধিকাংশই তাহা নহে। জ্ঞাত ও অজ্ঞাতের এলাকাগুলির ভিতর যেহেতু কোনও আয়তনিক প্রতিতুলনা চলে না, অজ্ঞাত এতদূরই গভীর ও সুবিস্তৃত, রহস্যও তাই অফুরন্ত ও নানাবিধ। সমাধানগুলিও বঙ্কিম, অল্পবিস্তর বা সুদীর্ঘ প্রয়াসের প্রার্থনা থাকে তাহাদের স্বভাবে। কেহ বা ধরাই দিতে চাহে না শত রক্তক্ষরণেও। অথচ ধরা দিবার পর তাহাদের সহজ সরল রূপটি দেখিয়া কে বলিবে, ইনিই লুকোচুরি খেলিতেছিলেন, সর্বদা ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার মতো কোনও বিধুরকোমল আঙ্গিকে মাত্র নহে, অন্বেষকের কালঘাম ছুটাইয়া দিতেও প্রায়শই কসুর ছিল না তাঁহার। তদুপরি, মনন ও মেধার তারতম্যের কারণে, কাণ্ডজ্ঞানের হযবরলয়, নিতান্ত স্বতঃসিদ্ধও কোনও কোনও নিরীহ সমাধানকারীর নিকট অকারণে জটিল হইয়া উঠে। তথাপি আনন্দই যেহেতু শ্রমের প্রাপ্তি, এমন কি সাফল্যের শেষ সোপানটিতে পদপাত না ঘটিলেও, স্রেফ মাথার ঘাম পায়ে ফেলিবারও একপ্রকার তৃপ্তি আছে, তাই রহস্যের মুখোমুখি হইলে তাহার সমাধানে লিপ্ত না হইবার কোনও বিকল্প নাই (যদিও নিন্দুকেরা ইহাকে গাধার খাটুনি বা বোকার মরণ বলিয়া থাকে)!


৩.
সুতরাং অতঃপর আমরা আমাদের তথাকথিত রহস্যটির দিকে নজর ফিরাইতে পারি। সমাধানপ্রয়াসটিকে কথঞ্চিৎ জ্যামিতিক সুরত দিতে, প্রথমেই একটি ত্রিভুজ আঁকিবার প্রয়াস লওয়া যাইতে পারে, যাহার তিনটি বাহু যথাক্রমে – সে, তুমি ও আমরা।



সমস্যার উপলক্ষ্য যেহেতু আপাতদৃষ্টে কোনও এক সে-র উপাখ্যান, সেহেতু ত্রিভুজের ভূমি, অর্থাৎ ‘কখ’ বাহুটি, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সেই সে-র জন্য বারদ্দ রাখা যাক। অতঃপর, যেহেতু সেই সে-র ঘর-দুয়ার-অভাব-স্বভাব ইত্যাদির আদি পর্যবেক্ষক তুমি, তাহার ‘সমস্যা’গুলি প্রতিপাদন এবং উপস্থাপনও করিয়াছ তুমি, কাজেই ত্রিভুজের ভূমির বামদিকের ‘খগ’ বাহু সেই তুমি-র জন্য ধার্য হইল, কারণ ঘটনাপ্রবাহকে অনুসরণ করিতে ঘড়ির কাঁটার অভিমুখে যাওয়াই রীতি।
আমরা আসিয়াছি সবার শেষে। ১২টার শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করিবার পর, ঘড়ির কাঁটা আবার নিচে নামিতে আরম্ভ করে। আমরা সেই পতনের সঞ্চারপথ। ভূমি-অভিমুখী ‘গক’ বাহুটি তাই সেই আমরা-র দ্যোতক।
তাহা তো নাহয় হইল। কিন্তু এই ত্রিভুজটি আমাদের কীভাবে সাহায্য করিতেছে? তিনটি পরস্পরবিচ্ছিন্ন রেখার উপর তিনটি পরিচিত নাম লাঞ্ছিত করিলেই কি একটি সম্পর্কসূত্র গড়িয়া উঠে? উত্তরে বলা যায়, রেখাত্রিকে খোদিত নামগুলি কোনও না কোনওভাবে সম্পর্কিত বলিয়াই ত্রিভুজটি রচনার অবকাশ ঘটিল। জ্যামিতিকভাবেও ত্রিভুজটি ত্রিভুজ হইয়া উঠিয়াছে রেখাগুলির মিলনের মধ্য দিয়া। আর সেই মিলন সূচিত হইয়াছে তাহাদের স্পর্শবিন্দুগুলিতে। অঙ্কিত চিত্রটির দিকে একবার তাকাইলেই দেখা যাইবে, প্রতিটি বাহুই তাহার দুই প্রান্তবিন্দু দিয়া অপর দুই বাহুকে স্পর্শ করিয়া আছে। যেমন সে ও তুমি-র স্পর্শবিন্দু হইল ‘খ’। তুমি ও আমরা-র স্পর্শবিন্দু হইল ‘গ’। আর আমরা ও সে-র স্পর্শবিন্দু হইল ‘ক’। এই তিনটি বিন্দুর ভিতর, প্রথম দুইটিকে (‘খ’ ও ‘গ’) আমরা আমাদের আখ্যানে মোটের উপর সনাক্ত করিতে পারি।
প্রথমে দেখা যাউক, ঘটনাপ্রবাহের ভিতর ‘খ’-বিন্দুর অবস্থানটি ঠিক কোথায়। আখ্যানের সূত্রপাত হইতেই কোনও একটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে কোনও একজনের অবস্থানের কথা উঠিয়া আসিতেছিল। একজন কথক, কথিতের সেই অবস্থানের বর্ণনা দিতেছিলেন এবং সে-বিষয়ে মন্তব্যও করিতেছিলেন। কথিতের স্বরূপ তখনও স্পষ্ট নহে। স্পষ্ট নহে কথিতই স্বয়ং কথক কিনা! বর্ণনা ও মন্তব্য কাহাকে লইয়া তাহা স্পষ্ট হইল, যখন সহসা তক্ষকের ডাক শুনা গেল। প্রতিভাত হইল, কথক ও কথিত সমরূপ নহে। ওই ডাক তাহাদের (কথক ও কথিত) বিশ্লিষ্ট করিল। কাজেই এই ঘটনাটিকে আমরা ‘খ’-বিন্দু, অর্থাৎ সে ও তুমি-র স্পর্শবিন্দু বলিয়া চিহ্নিত করিতে পারি।
অতঃপর ‘গ’-বিন্দুর অবস্থানটি নিরূপণ করা যাইতে পারে, যাহা কিনা তুমি ও আমরা-র স্পর্শবিন্দু। হয়তো বা ‘গ’-বিন্দুর পূর্বেও আমরা ছিলাম, ছিলাম ‘খ’-বিন্দুরও পূর্বে, কিন্তু আমাদের অস্তিত্ব এইভাবে জানান দিবার প্রয়োজন হয় নাই। তুমি যদি তোমার কথাই বলিয়া যাইতে, বা সে বলিয়া যাইত তাহার কথা, হয়তো আমরা এই উপাখ্যানটিতে আসিয়া উপস্থিতই হইতাম না। আড়ালেই রহিয়া যাহিতাম। যে-মুহূর্তে দেখা গেল, তাহার কণ্ঠস্বর রহিয়াছে বটে, কিন্তু তাহা শুধু আপন অস্তিত্ব জানান দিবারই জন্য। তাহার যাবতীয় অবস্থানকে বিশ্লেষিত ও মূল্যায়িত করিতে সেই কণ্ঠস্বরের কোনও ভূমিকা নাই, সে-কাজ করিবার ভূমিকা লইয়াছ তুমি, তখন আমরা আর চুপ রহিতে পারিলাম না। ‘তুমি’ চিহ্নিত হওয়া মাত্র ‘আমরা’ও হাজির হইলাম। তুমি ও আমরা-র স্পর্শবিন্দু এই ‘গ’-বিন্দুটিও তাই ঐ তক্ষকের ডাক হইতেই সূচিত হইল।
এখানে স্মরণ করা যাইতে পারে, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অমীমাংসিত রাখিয়াই আমরা এতদূর অগ্রসর হইলাম। প্রশ্নটি হইল – আমরা কে? একটি কাজচালানিয়া উত্তর আপাতত খাড়া করা যায় – আমরা পরিদর্শক মাত্র। আরও একটি বিষয় লক্ষ করিবার। ‘খ’- এবং ‘গ’-বিন্দু লইয়া কথা উঠিলেও, ‘ক’-বিন্দুর প্রসঙ্গ এখনও উত্থাপিত হয় নাই। অথচ ত্রিভুজের ৩টি বিন্দুর উহাও অন্যতম। চিত্র অনুযায়ী ঐ ‘ক’-বিন্দুতে আমরা ও সে-র মিলিত হইবার কথা। সেই সাক্ষাৎকারের দিকে আমাদের হয়তো আরও খানিক অগ্রসর হইতে হইবে।




৪.
কাজচালানিয়া পরিদর্শকমশাই অনেকক্ষণ ধরে অনেকরকম বাকতাল্লা ঝাড়লেন। যদিও সবই বললেন একটা তথাকথিত ‘আমরা’র আড়াল থেকে। সবাই বোঝে ঐ বহুবচনটুকু আসলে একটা ভব্যতার ঠার। ‘আমি’র একবচনকে আড়াল করার একটা সামাজিক প্রয়াস। আসলে কিন্তু কথা বলছিলেন কোনও ‘আমরা’ নয়, পরিদর্শকমশাই নিজেই, অর্থাৎ একজন একক ‘আমি’। কাজেই তাঁর আঁকা ‘কখগ’ ত্রিভুজের ‘গক’-বাহুর দ্যোতিত গৌরবার্থক ‘আমরা’টি কেটে এইবেলা যথাযথ ‘আমি’কে বসানো যাক।



আমি, তুমি, সে – এ সবই তো সর্বনাম। জানা-অজানা কিছু নামের বদলে ব্যবহার করা কিছু বিকল্প শব্দ। কথা বলার অবস্থানের ওপর আবার শব্দগুলোর ব্যবহার পালটে পালটে যায়। এখনকার তুমি যখন আত্মপক্ষে বলতে শুরু করে এখনকার আমি-র প্রতি, তখন এখনকার তুমি হয়ে যায় তখনকার আমি, আর এখনকার আমি হয়ে যায় তখনকার তুমি। এখনকার সে-ও একইভাবে জায়গা বদলাতে পারে। জায়গা তো কারও একচেটিয়া নয়, জায়গা বদলাবেই। এখনকার আমি বা এখনকার তুমি না চাইলেও বদলাবে। সকলেই একদিন না একদিন বলবে তার নিজের কথা। তৈরি থাকতে হবে। সবাইকেই তৈরি থাকতে হবে সবার কথা শোনার জন্য। তৈরি থাকতে হবে অবস্থান পালটে নেওয়ার জন্য।
বর্তমান আখ্যানে কথোপকথনের সেই নানা অবস্থানে, আমি-তুমি-সে এই সর্বনাম ত্রয়ীর আড়ালে কারা কখন কীভাবে কতটুকু রয়েছে, তা একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে।

আমি
কথা বলতে চাওয়া মানুষই তো সংখ্যায় বেশি। আর, যে যখন কথা বলে, সে-ই তখন কোনও না কোনও আমি। কাজেই এ-পৃথিবী আমি-ময়। তেমনই কোনও এক আমি হয়তো এই কথকতা শুরু করেছিল। কিন্তু নিজের কথা না-বললে তো কোনও আমিকে রক্তমাংসে টের পাওয়া যায় না। এ-কথকতার কথকের অস্তিত্বও তাই অধরা, কোনও উত্তম পুরুষোচিত উচ্চারণের আত্মঘোষণা নেই তার।
আখ্যান সামান্য এগোনোর পরই কিন্তু ঘটে গেল একটা বাচিক ক্যুদেতা। কথক-আমিকে সহসা দেখা গেল মধ্যম পুরুষের ভূমিকায়। আর তার উদ্দেশ্যে কথা বলতে শুরু করল এক ছদ্মবেশী উত্তম পুরুষ। সামাজিক অভিভাবকতার ঢাল-তলোয়ার হাতে এই নতুন আমি কেবলই নানাভাবে অভিযুক্ত করতে থাকল এই নতুন তুমি-কে। কিন্তু কথকতার ভেতরকার রহস্য উন্মোচনের তথাকথিত চেষ্টায় নেমে সেই আগন্তুক-আমি দেখল – গোটা ঘটনাক্রমে তার নিজের অবস্থানও বেশ অস্পষ্ট, হয়তো বা নিছক এক পরিদর্শকের!
তাহ’লে এই আখ্যানে এ-পর্যন্ত দু’রকম আমি-র দেখা পাওয়া গেল। ১. কথক আমি, যে-আমি অনুচ্চারিত, অধরা। ২. পরিদর্শক আমি, যে কথকের বিচারে প্রবৃত্ত।

তুমি
সংসারে তুমি-র বড়ই অভাব। তুমি, মানে, যাকে ডেকে দুটো কথা শোনানো যাবে। সবাই নিজের কথা নিয়েই ব্যস্ত, অন্যের কথায় কান দেওয়ার অবসর কই? সকলেই উত্তম, মধ্যম পুরুষ হওয়ার খায়েশ কারও নেই। অনেক সময় অবশ্য অনেক তুমি-র মুখ দেখা যায় না। আমি-র পেটের ভেতর যখন বলার কথা গজগজ করে, তখন ঐ নৈর্ব্যক্তিক তুমি ছাড়া বকমবাজ আমি-র আর গতি নেই। কথক ঠকুররা তখন কণ্ঠ ছেড়ে কলম ধরেন, আর এক মুণ্ডহীন তুমির দিকে তাকিয়ে লিখে যান পাতার পর পাতা। যদি কেউ কোনও দিন দয়া ক’রে পড়েন সেসব! দূরদিগন্তের সেইসব ছায়ামূর্তিগুলি হলেন পাঠিকা-পাঠক। তাঁরাই কলমচি-কথকের অধরা তুমি, যে-তুমি অনুচ্চারিত।
আমাদের আখ্যানের আদি কথকও সেই অনুচ্চারিত তুমির দিকে তাকিয়েই তার কথা শুরু করেছিল। কিন্ত ঘটনাচক্রে তার সেই কথকতা বেশীদূর এগোনোর আগেই ঘটে গেল পালাবদল। কথককে নিয়েই বসল বিচারসভা, যেখানে সে সহসা হয়ে দাঁড়াল মধ্যম পুরুষ, কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক অভিযুক্ত-তুমি!
তাহ’লে দু’রকম আমি-র মতো, তুমি-ও এ-আখ্যানে দু’রকম। ১. পাঠিকা-পাঠক তুমি, যে-তুমি অনুচ্চারিত, অধরা। ২. অভিযুক্ত তুমি, যে-তুমি আদিতে ছিল কথক।

সে
আমি আর তুমি নিজেদের নিয়েই বিভোর। কারণ তারা রয়েছে মুখোমুখি, কি লড়াইয়ে কি আপোশে, কি বিরহে কি মিলনে। এইভাবেই পৃথিবীর সব নটেগাছটি মুড়োলে দিব্যি হ’ত। কিন্তু তার কি জো আছে! সেই নিভৃত কথোপকথনেও মাঝেমাঝেই ছায়া ফেলে যায় অনুপস্থিত একজন। কখনও আবার সেই গরহাজিরকে নিয়েই চলে আমি-তুমি-র কাজিয়া। মুখোমুখি না-থেকেও এইভাবে থেকে যাওয়া অস্তিত্বটাই হ’ল, প্রথম পুরুষ – সে।
এখানে সেই আড়ালে থেকে যাওয়া প্রথম পুরুষটি হ’ল – তক্ষক। তার অবস্থানকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে নানারকম আমি-তুমি-র দ্বান্দ্বিক বিস্তার।
সে, এখানে একজনই।


৫.
কথার বিস্তার বহু সময় প্রকৃত কথামুখটিকেই আড়াল করিয়া দেয়। যেন বা ধুনুরির হস্তের তুলা, শুধুই উড়িতেছে, ছড়াইয়া পড়িতেছে আঁশ, কোথায় বা তাহার কেন্দ্র আর কী বা অভিমুখ! তবু নিরবয়ব পাথরখণ্ড হইতেই ধিরে ধিরে বাহির হইয়া আসিবে রূপ, এই প্রত্যাশায় ভ্রমিয়া চলে স্থপতির ছেনি। কথা হইতে এইভাবে যদি বাহির হইয়া আসে কোনও বার্তা, সেই ভরসায় কথা চলিতে থাকে।
এইভাবেই আমাদের কথা চলিল, আমি-তুমি-র ভিতরকার নানা স্তরের নান টনাপোড়েনের কথা। দুই তরফই কথা বলিলাম বিস্তর, পরস্পরের বিরুদ্ধে যুক্তি শানাইলাম, আপনাকে যত না প্রকাশ করিলাম অপরকে নস্যাৎ করিলাম অধিক। কিন্তু সকলই ঘটিল আমি-তুমি-র ভিতর। সে-র কোনও বয়ান ইহার ভিতর নাই।
অথচ তুমি কথা শুরু করিয়াছিলে সে-কে লইয়াই। জানাইয়াছিলে, সে হইল তক্ষক। আমি প্রশ্ন তুলিয়াছিলাম তোমার অবস্থান লইয়া। কিন্তু স্বীকার করিতে বাধা নাই, আমি প্রসঙ্গের গভীরে যাইতে পারি নাই, প্রশ্ন তুলিতেছিলাম উপরিতল হইতে। তক্ষকের স্বরূপ আমি বুঝি নাই। নিজের বোধগম্যতার সেই অসম্পূর্ণতা কিছুটা আন্দাজ করিতে পারিতেছিলাম বলিয়াই আমার আঁকা ত্রিভুজের ‘খ’ এবং ‘গ’ বিন্দু লইয়া কথা তুলিলেও, ‘ক’ বিন্দু প্রসঙ্গে নীরব রহিতে হইয়াছিল।
প্রিয় পাঠিকা-পাঠকের সুবিধার্থে বিন্দু-বৃত্তান্তটি কিঞ্চিৎ ঝালাইয়া লওয়া প্রয়োজন। সে, তুমি ও আমি (আমরা নহে, কবুল করিলাম) – এই তিন বাহুসম্বলিত একটি ত্রিভুজের তিনটি বিন্দু হইল ক, খ ও গ। ‘খ’-বিন্দুটি হইল সে ও তুমি-র স্পর্শবিন্দু। তুমি ও আমি-র স্পর্শবিন্দু হইল ‘গ’-বিন্দুটি। আর ‘ক’-বিন্দুতে আমি ও সে-র মিলিত হইবার কথা। সেই সাক্ষাৎকার অসম্পূর্ণ ছিল বলিয়াই, এই স্পর্শবিন্দুটি রচিত হয় নাই।
তাহা হইলে বাহির হওয়া যাক সেই প্রথম পুরুষের সামান্য স্পর্শ অর্জনের জন্য। ইতোপূর্বে বলিতেছিলাম, আমি ও তুমি-র ওতোর-চাপানে, সে-র কোনও বয়ান টের পাওয়া যায় নাই। এখন মনে হইতেছে কথাটা হয়তো পুরা সত্য নহে। তোমার কথকতা জুড়িয়া তো সে অর্থাৎ তক্ষকেরই কথা। তুমি তুলিয়া ধরিতেছিলে একটি বিপন্নতার ভাষ্য, গভীর মমতায় পুরানো সঞ্চয়গুলি, স্মৃতিগুলি, আঁকড়াইয়া ধরিয়া বাঁচিয়া থাকা এক অস্তিত্বের উপাখ্যান। আসিয়াছে বসন্তের কথাও। হয়তো নতুন করিয়া বাঁচিয়া উঠিবার কোনও ইঙ্গিত ছিল সেখানে। এমন সময় ডাকিয়া উঠিল তক্ষক। বুঝা গেল, তাহারই কথা হইতেছে। কথক আর কথিত আলাদা করিয়া প্রতিভাত হইল। কিন্তু হইতে তো পারে, ইহা তোমার কথকতারই একটি কৌশল।
এমত অনুমানে আমরা দুইটি সম্ভাবনার মুখোমুখি হই। হয়, কথিতই তাহার কথা বলিতেছে কথকের কণ্ঠস্বর কর্জ করিয়া। নতুবা, কথক তাহার নিজের কথাকে রসগ্রাহী ও নৈর্ব্যক্তিক করিয়া তুলিতে গিয়া কথিতের কল্পিত চরিত্রটি খাড়া করাইয়াছে। যেদিক দিয়াই আগাই, কথক ও কথিতের সমরূপতা ক্রমেই কায়াধারণ করে।
সম্ভাবনাটিকে আপাতত এই পর্যায়ে ছাড়িয়া, একবার বিবেচনা করিয়া দেখি, তক্ষকের জীবনের অর্জনগুলির প্রতি তোমার মনোভাবটি ঠিক কীরূপ। আপাতদৃষ্টে যে তাহা ইতিবাচক কিছু নহে যেকেহই সেটি টের পাইবে। তুমি সেগুলিকে আবর্জনাই বলিতে চাহিয়াছ। বুঝাইয়াছ, চলতি বাজারে সেগুলির কোনও বিক্রয়মূল্যই নাই। অথচ এইসব ‘অকিঞ্চিৎকর’ সামগ্রীর সঞ্চয়কর্তা হিসাবে তুমি যে তক্ষকের উপর আদৌ বিরূপ তাহা কিন্তু মনে হয় না। বরং যেন এক পরোক্ষ শুভার্থীরই অবস্থান তোমার। তুমি চাও এক ‘জঞ্জাল’মুক্ত তক্ষকসদন, যতই সে-গৃহ ভগ্ন জীর্ণ হউক। আত্মজীবনীর তিক্ত স্মৃতিগুলি, অবদমিত কামনাগুলি, বিবর্ণ ও হতশ্রী স্বপ্নগুলি হইতে তক্ষককে নিষ্কৃতি দিতে পারিলেই যেন তুমি খুশি। তোমার এই সদিচ্ছার গূঢ়ার্থটি কী? বোধ করি এক পুনরুজ্জীবিত তক্ষকের উত্থান সুনিশ্চিত করা। তাই বুঝি তাহার অন্ধকূপের ভিতর বসন্তের এলোমেলো বাতাস ঢুকাইয়া দিবার প্ররোচনা!
পরহিতব্রত ব্যক্তিমাত্রেরই অল্পবিস্তর থাকে, পাত্রভেদে তারতম্য হয় মাত্র। তোমারও অনুরূপ চিৎপ্রবৃত্তি লইয়া কোনও প্রশ্ন উঠিতে পারে না। প্রশ্ন উঠে তাহার আতিশয্য লইয়া। তক্ষকের সারা জীবনের সঞ্চয় যে মূল্যহীন, শুধু এইকথা কহিয়া তুমি ক্ষান্ত হও নাই। সেগুলি বিদায় করিবার তরিকা লইয়াও তুমি চিন্তিত। ছি ছি এত্তা জঞ্জাল বলিয়া, সলিল চৌধুরীকৃত নবনির্মাণে ক্ষিরোদপ্রসাদের কালজয়ী গানটির সুর ভাঁজিতে ভাঁজিতে সবকিছু ঝাঁটাইয়া বিদায় করিলেই হয়। তাহারও পর আবার কাহার কোথায় কত জরিমানা আর পেরেশানি, এত অনুপুঙ্খতাতেই সন্দেহ আসিয়া জুটে। সন্দেহ ঘনীভূত হয় তোমার এবংবিধ আশংকায় যে, চোরেও তো এ-মালামালের প্রতি প্রলুব্ধ হইবে না, তাহা হইলে কী হইবে উপায়, ইত্যাদি! মনে হয় বুঝি বা তুমি নিজেই নিস্তার পাইতে চাহিতেছ এক অনতিক্রম্য শ্বাসরুদ্ধতা হইতে। তক্ষকের বকলমে মুক্তির যাবতীয় শিরঃপীড়া বুঝি তোমারই। তাহা হইলে তো তোমার ও তক্ষকের সমরূপতা সংক্রান্ত পূর্বকথিত সম্ভাবনাটি পুনর্বার প্রবলতরভাবে জাগিয়া উঠে।
একটি খটকা অবশ্য রহিয়া যায়। তুমি আর তক্ষক যদি সমরূপই হইবে, এতাবৎকাল পুষিয়া রাখা স্মৃতি-কামনা-স্বপ্নের অপচ্ছায়াগুলি দূর করিবার জন্য তক্ষককে উদ্বুদ্ধ করিতে গিয়া তোমার পক্ষে মৃদু ভীতিপ্রদর্শনের প্রয়োজন পড়িল কেন? একবার নহে, দুই দুই বার। একবার মাশুলের ভয়, দ্বিতীয় তস্করের অভাবজনিত ভয়। কেহ কি নিজেই নিজেকে ভয় দেখায়? অবশ্য এগুলিকে ভয় দেখানো না-বলিয়া সতর্কীকরণ বলিলে, মামলা বহুদূর সহজ হইয়া আসে। বিশেষ আজকাল তথ্যের সার্বজনীন অধিকার যখন স্বীকৃত। এই অধিকার প্রয়োগ করিয়া, প্রতিটি সম্ভাবনার অগ্রপশ্চাৎ জানিয়া রাখা ভালো। সঠিক সময় সঠিক কাজটি করিবার সঠিক সিদ্ধান্তটি লওয়া যায়।
ইতোপূর্বেই বলিয়াছি, মাশুল প্রসঙ্গে তোমার সতর্কীকরণ বরং বহুদূর অবধি বোধগম্য। পরামর্শ এইরূপ যে, জানিয়া রাখিতে হইবে জঞ্জাল বাহিরে ফেলিলেই মাশুল দিতে হয়, তবে যদি নিখরচায় সারিতে চাও, চুরি হইয়া যাইতে দাও। বলা বাহুল্য, মাশুল বলিতে তো আর কোনওরূপ অর্থনৈতিক দায়ভারের কথা উঠিতেছে না। নিজ অকৃতির হাত হইতে চাহিলেই যে নিস্তার পাওয়া যায় না, যত্র তত্র নামাইতে চাহিলেই যে সেসকল বোঝা ঘাড় হইতে নামে না, তাহার জন্য বিস্তর কাঠখড় পুড়াইতে হয়, এই হুঁশিয়ারিই তুমি দিতে চাহিয়াছ। এরূপ কথা অবশ্য কেহ স্বচ্ছন্দেই নিজেকে নিজে শুনাইতে পারে। সুতরাং এই সামান্য ভীতিপ্রদর্শনের সাক্ষ্য, তক্ষকের সংকট যে তোমারই আত্মসংকটের প্রতিরূপ - এমন একটি অনুমানকে খারিজ করিয়া দিবার জন্য পর্যাপ্ত নহে।
তথাপি নিরপেক্ষ বিচারের স্বার্থে এখনও ধরা যাউক, তুমি ও তক্ষক, দুইটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। কোনও কথকতাবহির্ভূত-অভিসন্ ি তোমার নাই। তুমি এক নির্ভেজাল কথক মাত্র। আর, তক্ষক প্রাথমিকভাবে তোমার আখ্যানের কেন্দ্রীয় ও একমাত্র চরিত্র। দ্বিতীয়ত, যেহেতু তুমি শুধু তক্ষকের অবস্থান বর্ণনাই কর নাই, তাহা লইয়া ধারাবাহিক মন্তব্য-প্রস্তাব-পরাম ্শও দিয়া গেছ, তক্ষক কোনওভাবে তোমার শ্রোতাও হইয়া উঠিয়াছে। এখন ঘটনাচক্রে তক্ষক যদি তোমার পরামর্শগুলি মানিয়া লয়, তাহার সম্মুখে কোন বিকল্পগুলি পড়িয়া থাকে? আবর্জনা তো বাহিরে চালান করা যাইবে না। কিন্তু সমস্ত বন্ধ দরোজা-জানালা খুলিয়া রাখিয়া দিলেও কি কোনও মহান তস্কর আসিয়া নিস্তার দিবে তাহাকে? তুমি কিন্তু এক ঘোর রহস্যের ভিতর আনিয়া ছাড়িয়া দিয়াছ তক্ষকের নিয়তি। ইহা ভেদ করিতে না পারিলে তক্ষকের সহিত আমার মোলাকাতও অসম্পূর্ণ রহিয়া যায়। আর আমার আঁকা সেই ত্রিভুজটিও আর আমি-তুমি-সে-র সম্পর্কসূত্রটি জুতসইভাবে ব্যাখ্যা করিয়া উঠিতে পারে না। বুঝিতে পারিতেছি, জীবনের ব্যর্থতাগুলিকে আগলাইয়া বসিয়া থাকার কোনও অর্থ হয় না। সেগুলির মায়াবী বন্ধন হইতে মুক্ত হইতে হইবে। কিন্তু সে-দায়ভাগ হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া কিছু সহজ কাজ নহে।


৬.
কথা যখন শুরু করেছিলাম আমি, শেষ করার দায়টাও আমিই নিই। প্রথমেই তোমাকে তারিফ জানাতে হয় এইজন্য যে, তুমি কিন্তু প্রায় সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত অবধি চলে এসেছ। আর সামান্য এগোলেই মনে হয় পাওয়া যাবে একটা সমাধানসূত্র।
আমার মুখের কথা ধরেই চলছিল তোমার বিশ্লেষণ। তাই বলে ভেবে বস না, সব প্রশ্নের সব উত্তর আমার কাছেও তৈরি আছে। তোমার কাটাছেঁড়ায় যেন একটু একটু ক’রে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল আমার নিজেরই মুখ। এখন টের পাচ্ছি, সেই মুখের একদিকে আছ তুমি আর অন্যদিকে আছে সে বা তক্ষক। তুমি এক হাতে আমাকে ছুঁলেও, তোমার অন্য হাত তাই তক্ষককে খুঁজেই পেল না। তক্ষকের নাগাল তুমি পাবে কীভাবে? আমরা তো আসলে ত্রিভুজের তিনটি বাহুমাত্র নই। বিসমিল্লায় গলদ রয়েছে তোমার ঐ ত্রিভুজের ছক কাটায়। আমার আর তক্ষকের সম্পর্কটা তাই ধরি ধরি করেও অধরা থেকে গেল!
এখন দেখা যাক, যে অবধি এসে তক্ষকের পরিণতি তোমার কাছে ‘ঘোর রহস্য’ময় ঠেকেছে, তার পর আমরা আর এগোতে পারি কি না। আচ্ছা, এমনও তো হয়, অ যদি আ-এর কোনও একটা মহার্ঘ জিনিস কম দামে বা বিনা দামে হাতাতে চায়, সে প্রথমেই জিনিসটাকে অবমূল্যায়িত করে। সেই কতদিন আগে কবিকঙ্কন এঁকে গেছেন তার এক অসামান্য ছবি – ‘সোনা রূপা নহে বাপা এ বেঙ্গা পিতল।/ঘসিয়া মাজিয়া বাপু কর্‌য়্যাছ উজ্জ্বল’।। তাহ’লে কি মুরারি শীলের মতো কোনও বানিয়ামন, তক্ষকের সঞ্চয়গুলির বাজারদর আগাম খাটো ক’রে তার ওপর একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে চেয়েছে, কমিয়ে দিতে চেয়েছে তার দরাদরির ক্ষমতা? তাই কি এই উক্তি – ‘কিন্তু এইসব আবর্জনা – কে কিনবে এসব হাবিজাবি?’
এমন একটা সম্ভাবনার কথা উচ্চারণ করা মাত্র পরপর যে-বিস্ময়আহত প্রশ্নগুলি এসে আছড়ে পড়ে, তা হ’ল – ১.ওই উক্তিটি কার, সে কি নির্ভেজাল আমারই নয়? ২.স্বেচ্ছাবন্দি তক্ষকের জীবনপ্রণালীর যে-নেতিবাচক ছবি আমি প্রথমাবধি এঁকেছি, তা কি তবে এক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অতিকথা মাত্র? ৩.তক্ষকের সঞ্চয়ে আদৌ মূল্যবান কিছু আছে কী যা কোনও চোরকে প্রলুব্ধ করতে পারে? ৪.তক্ষককে পুনরুজ্জীবিত করার প্ররোচনার আড়ালে আমার নজর কি আসলেই পড়ে ছিল তার মালামালের প্রতি? ৫.সেক্ষেত্রে, তক্ষকের সাথে আমার সমরূপত্বের প্রকল্পটি স্থায়ীভাবে খারিজ ক’রে দেওয়া যায় কি না? যাঁরা সংক্ষিপ্ত উত্তর পছন্দ করেন তাঁদের জন্য বলি – ১.হ্যাঁ, ২. হ্যাঁ এবং না, ৩.হ্যাঁ, ৪. না এবং হ্যাঁ, ৫.না।
এবার আমার নিজেরই স্বার্থে উত্তরগুলি এক এক ক’রে দেওয়ার চেষ্টা করা যাক। ১.আমি-তুমি-সে ইত্যাদি সর্বনামের ব্যক্তিগত আবহাওয়া থেকে বেরিয়ে এসে বলি, ওই উক্তিটি অবশ্যই এ-আখ্যানের কথকের। ২.তক্ষক যে-অন্ধকূপের জীবন বেছে নিয়েছিল, তাকে ইতিবাচক বলা যায় না। কথকের বিবরণ যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ও, তবু তা অতিকথা নয়। ৩.তক্ষকের সঞ্চয়ের তালিকায় ভালো ক’রে চোখ বোলালেই এমন দু’একটা জিনিস চোখে পড়ে, যা যথেষ্ট কৌতূহল জাগায়। যেমন, ডাকটিকিটের খাতা, ম্যাজিক দেখানোর সরঞ্জাম ভর্তি বাকসো, একটা প্লাস্টিকের বা চকখড়ি দিয়ে আঁকা কঙ্কাল! ৪.দুটোই দু’রকম সত্যি। তক্ষকের বর্তমান জীবনের ভিতর কিছু আলোবাতাস খেলিয়ে দেওয়ার কথাগুলি প্ররোচনা মাত্র ছিল না। কথক হয়তো তা আন্তরিকভাবেই চায়। সাথে সাথে এও সত্যি যে, তক্ষকের দু’একটি সম্পত্তির ওপর তার এক ধরনের ছেলেমানুষি প্রলোভনও রয়েছে। ৫.এইটিই হ’ল জটিলতম প্রশ্ন। কথকের সাথে তক্ষকের সম্পর্কের স্বরূপ নিয়ে এই প্রশ্ন আগেও বারবার উঠে এসেছে। কিন্তু উত্তরের কাছে পৌঁছেও ভেস্তে গেছে সমাধান। আপাতত এইটুকু বলা যাক যে, সম্ভাবনাটি এখনই সম্পূর্ণ বাতিল করা যাচ্ছে না।
কথকের নৈর্ব্যক্তিকতা থেকে আবার আমিত্বে ফিরে আসা যাক, যাতে তোমার সাথে কথোপকথনের আরামদায়ক পরিসরটা নেওয়া যায়। ফিরে যাওয়া যাক তোমার সেই ‘ঘোর রহস্যময়’ বিন্দুতে। দেখা যাক, আমার সদ্য দেওয়া বিস্ফোরক স্বীকারোক্তিগুলির প্রেক্ষিতে সেই রহস্য কোন দিকে মোড় নিতে পারে। অবশেষে একজন সম্ভাব্য চোরকে তো খুঁজে পাওয়া গেল। কিন্তু এ-চোর আবার খুব বাছিয়ে মানুষ। শুধুমাত্র বাছা বাছা কয়েকটি জিনিসের প্রতিই তার নজর। তাহ’লে বাকি মালামালের কী হবে? বদ্ধ জীবনের কটূ স্মৃতি, চাপা কামনা আর রংচটা স্বপ্নগুলোই যদি মাটি কামড়ে পড়ে থাকে, তবে আর পুনরুজ্জীবিত তক্ষকের উত্থান ঘটে কীভাবে? এদিকে চোর অর্থাৎ আমি কিন্তু আন্তরিকভাবেই নতুন আলোবাতাসের মধ্যে উদ্ভাসিত এক তক্ষককে দেখতে চেয়েছি। প্রশ্ন তুলেছি – ‘এভাবে দরোজা-জানালা বন্ধ ক’রে, অন্ধকারের ভিতর ডুবে থাকতে থাকতে তার দম আটকে আসে না!’
এ কি তাহ’লে এক স্ববিরোধ! তাছাড়া তো আর কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না নিজের মনোভাবের। নিজের মনের খবর কে-ই বা সহজে টের পায়! সে অতল দরিয়ায় ডুবুরির মতো নেমে গিয়ে আঁতিপাতি খুঁজেও হয়তো হাতে উঠে এল সামান্য একটু শৈবালদাম, দু’একটুকরো নুড়িপাথর। কখনও হয়তো আলস্যে আর ভয়ে ঊর্মিমত্ত উপরিতলের দিকে আদিগন্ত তাকিয়েই কেটে গেল বেলা। কখনও আবার মনে হ’ল, মনের খবরে কাজ কী, বাইরে পড়ে আছে এতবড় নিখিল চরাচর, জানা যাক বরং তাকেই। টেরও পেলাম না, এই পরামর্শও উঠে এল মনেরই গভীর থেকে। আর কী আশ্চর্য, সেই মনও তো চরাচরের অংশ। মনকে জানলেও তো অংশত চরাচরকেই জানা হয়।
তাহলে আমি-র জায়গাটা ঠিক কোথায়? আমি-র মনটা তো আমি-রই, কিন্তু সেই মনের অনেকখানিই আমি-র অজানা। এই অজানা মন সমেত আমি আবার এই অজানা চরাচরের অংশ। আমি যখন সেই অজানা চরাচরকে জানতে চাই, বার্তাটা আসে আমার অজানা মন থেকেই। এইভাবে অজানা চরাচরকে জানতে জানতে আমি আমার অজানা মনের হদিশ পাই। আবার অজানা মনকে জানার আয়াসেও ফুটে ওঠে অজানা চরাচরেরই সামান্যতম আভাস।
তাহলে একটা আমি লুকিয়ে আছে আমার মনেরই গভীরে। সে এক গহন আমি(= সে)। আর এই আমি-টা বাইরে বসে খাই দাই গান গাই তাইরে নাইরে না, অর্থাৎ কথকতা করি। এই হল কথক আমি(= আমি)। তারপর একসময় তার সব কথা ফুরিয়ে যায়। মনে পড়ে যায় ভুলে থাকা গহন আমি-কে। তখন ডুব দিতে হয় মনের গভীরে। তাহলে আমার বাইরের কাজকর্ম সব সামলাবে কে? কে নজর রাখবে আমার পাঠানো বার্তার দিকে? সেসব দেখাশুনোর জন্য তাই রেখে যেতে হয় একজন পর্যবেক্ষক আমি-কে, আর সেই পর্যবেক্ষক আমিটিই হচ্ছ তুমি।
ব্যাপারটাকে ছবিতে আঁকলে দাঁড়াবে ৩টি এককেন্দ্রিক বৃত্তের মতো। কেন্দ্রের সব চাইতে কাছের বৃত্তটি হল গহন আমি (= সে)। মাঝখানে আছে কথক আমি (= আমি)। আর, একেবারে প্রান্তে রয়েছে পর্যবেক্ষক আমি (= তুমি)।



তাহলে তোমার আঁকা ত্রিভূজের ৩বাহু থেকে আমরা এসে পৌঁছলাম আমার আঁকা ৩বৃত্তের চক্করে। ত্রিভুজের ছকে আমি-তুমি-সে ছিলাম ৩টি আলাদা সত্তা। আমি আর তুমি তো শুধু তর্ক-বাহাসই করে গেলাম। উপলক্ষ, তক্ষক অর্থাৎ সে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সে-র স্বরূপ রয়ে গেল অধরা। অথচ এখন দেখছি, আমরা ৩পক্ষ আসলে একই অস্তিত্ত্বের স্তরপরম্পরা মাত্র! একই কেন্দ্রকে ঘিরে দাঁড়ানো ৩টি বৃত্তের মতো।
তাহলে তক্ষক? সেই কি তাহলে গহন আমি? তাই যদি হয়, তাহলে তার ঘরের সকল দরোজা-জানালা বিলকুল সাঁটা কেন? আবার কথক আমি একদিকে সেই বদ্ধ ঘরে আলোবাতাস বইয়ে দিতে চায়, অন্যদিকে মনে মনে সে-ঘরেই চুরির ফন্দি আঁটে। হেঁয়ালিই হেঁয়ালি! ত্রিভুজ এঁকে তুমি বলেছিলে ঘোর রহস্য, আর বৃত্ত এঁকে আমি বললাম হেঁয়ালি। তাহ’লে ফয়দাটা কী হ’ল?
যেই না এমন প্রশ্ন মনে আসা, অমনই সেই তিনকেলে তক্ষক ডেকে উঠল আবার, আর জানিয়ে দিল – সমস্ত অন্ধকারের মুখে ছাই দিয়ে সে দিব্যি বেঁচে আছে!
আছে, আছে, সেই গহন আমি আছে। তার কথা ভুলে মেরে দিলেও সে আছে। ভুলে থাকলেও যতদিন যতখন দিব্যি চলে যায়, ততখন কে মনে রাখে তার কথা! ততখন শুধু আমিতে-তুমিতে, কথকে-পর্যবেক্ষকে বকবকম। তারপর যখন টের পাওয়া গেল, নতুন কথা তো আর কিছু নেই, সব খতম, তখন রাগ বিরক্তি ঘেন্না। কে আর নিজের ওপর রাগ ক’রে বসে থাকতে পারে? কে আর ব্যর্থতার দায়ভাগ বইতে রাজি নিজের ঘাড়ে? তখন তৈরি করা গেল এক তক্ষক, গহন আমির ভিতর কথক আমির একটা অস্পষ্ট ছায়ারূপ। শুরু হ’ল আত্মচিকিৎসার এক জটিল প্রক্রিয়া।
তক্ষক যেন এক আত্মবিস্মৃত আমি, অনন্তকাল ধরে যে অজানা-মনের দিকের জানালা দরোজাগুলি বন্ধ করে রেখেছে। তার রহস্যময় ঐশ্বর্যগুলিকে তুলুমূল্য ক’রে ফেলেছে, অন্ধ অভ্যাসের অপস্মৃতিগুলির সাথে। সেই সম্পদগুলি অজানা মনের দান, তাই সেগুলিকে উদ্ধার করতে হবে। সেই ডাকটিকিটের খাতা, সেই ম্যাজিক দেখানোর সরঞ্জাম ভর্তি বাকসো, সেই প্লাস্টিকের বা চকখড়ি দিয়ে আঁকা কঙ্কাল ইত্যাদি। আর ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে সেইসব আবর্জনার রাশি, যা এক চক্ষুহীন ভূগোলে এনে স্থাপন করেছে তাকে। দূর করতে হবে সেই সারি সারি বয়মভর্তি নানা রঙের তিতকুটে আরক, তার বদ্ধজীবনের বিস্বাদ যত স্মৃতি। সেই তোরঙ্গের নিচে চাপাপড়া চোখ লাল লাল জ্বর, তার যুগান্তরের অবদমিত যত কামনা। সেই চুপসানো বেলুন, চিড়েচেপ্টা নৌকা, তার যতসব বিবর্ণ স্বপ্ন। একি আর যে সে চোরের কাজ, পাগল না হ’লে পারবে কেন!
সত্যিই এক আপাত স্ববিরোধী কাণ্ডকারখানা বটে। গহন মন কখন যে কী খবর পাঠায়। যেটুকু শুনলাম, তাই বললাম। তুমিও শুনে যাও চুপটি ক’রে। ঐযে, আড়াল থেকে সেই তক্ষক ডেকে উঠল আবার, আর জানিয়ে দিল – জেগে থাকা হ’ল বহুদিন আমি জাগব...