আত্মলীন

বীরেন মুখার্জী



অবশেষে সিদ্ধান্ত নিই শিমুলের সঙ্গে সংসারযাপন আর নয়। তার মুখ দেখার রুচিও অবশিষ্ট নেই। অকল্পনীয় ওই সন্ধ্যার দৃশ্য যে কারো হাজার বছরের বিশ্বাসের প্রবাহে কঠিন পাথরের প্রতিবন্ধকতা গড়ে দিতে সক্ষম। স্বাভাবিক বিশ্লেষণে এর চেয়ে ব্যতিক্রম কোনো ভাবনায় উপনীত হওয়া বোধ করি কারো পক্ষেই সম্ভব নয়; আমার পক্ষে তো নয়ই। প্রচণ্ড জ্বরের মধ্যেও যেটুকুু স্বাভাবিকতা পাই, সেটুকু আত্মবিশ্লেষণে সঁপে দিয়ে নির্ভার হওয়ার চেষ্টা করি। এভাবে আমি যখন নিজের সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী, তখন সাবলীলভাবেই সে আমার কপালে হাত রাখে। তার আজকের স্পর্শ আমাকে অপবিত্রতার সংজ্ঞা পুনরায় মনে করিয়ে দেয়। তার সঙ্গে একই বিছানায় নিজেকে আবিষ্কার করে আঁতকে উঠি। সময়টা যেন জগদ্দল পাথরের মতো বুকে চেপে আছে! চোখ বন্ধ করে মৃতের মতো পড়ে থাকা ছাড়া আর উপায় কী! এক সময় অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রভাতের নরম আলো চেতনায় কড়া নাড়ে। আড়মোড়া ভেঙে গাছে গাছে প্রভাতের পাখ-পাখালির ডাকও শুনতে পাই। দুঃসহ রাত কতটা দীর্ঘ হতে পারে, এই মুহূর্তে আমি তার নীরব সাক্ষী! বিছানা ত্যাগ করে সোজা রাস্তায় এসে দাঁড়াই। রাত শেষে নতুন দিনের এই বিশুদ্ধ আলোয় অদৃষ্টকে ধিক্কার জানানো উচিৎ কিনা ভাবতে থাকি। যদিও আমার চোখের সামনে গোটা পৃথিবী আর পায়ের নিচে অনিশ্চিত রোডম্যাপ। আমি এলোমেলো পা বাড়াই।
প্রভাতের নরম ঘাসে পা দিয়েই চোখে-মুখে অন্ধকার ছায়া কেঁপে ওঠে, বুঝতে পারি। রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি ভর করে আছে দেহে। জ্বরের তীব্রতা কমে গেছে শরীর-মনে নিদারুণ এক ব্যথার উল্কি এঁকে। এ অবস্থায় আয়নার সামনে দাঁড়ালে হয়ত নিজেকে চিনতে কষ্ট হবে- এমন ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে। আর ভবিষ্যৎ! ওটাকে এখন আর পাত্তা দিতে চাই না। স্বৈরিণী হওয়ার বাসনাও আমার মধ্যে কখনো কাজ করেনি। নিয়তি মানুষকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করে, এটা মানতে এখন যেমন দলা পাকিয়ে বমি আসে, তেমনি ১৮ বছর বয়সেও আসত। কলেজে যাওয়া বন্ধ হওয়ার আগে, বলা যায় বন্ধ করে দেয়ার আগে বহুবারই সহপাঠীদের সঙ্গে, যাকে যাকে আমি বন্ধু ভাবতাম তাদের কাছে বলেছি আমার ব্যতিক্রমী চিন্তা এবং জীবন সম্পর্কিত তিক্ততার কথা। হেসেছে তারা। পিতা মারা যাওয়ার সময় আমার বয়স চৌদ্দ। এর দু’বছর পর মা নতুন সংসারে চলে গেলেন। যেখানে আমার স্থান হয়নি। বাবার সামান্য পেনশন এবং ফাঁকা একটি বাড়ি, আমার ভরসা হয়ে ওঠে। একা একটি মেয়ে। ফাঁকা একটি বাড়ি। একপাশে স্কুল, অন্যপাশে সংসার। তালগোল পাকিয়ে যেতে থাকে। এরপরও ভালো রেজাল্ট করে কলেজে ভর্তি হই। নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ মনে হতো মাঝে মধ্যে। হঠাৎ কলেজ যাওয়াও বন্ধ করে দিই। ওই বয়সে ভাবতাম, মানুষের জীবনে স্মৃতির মূল্য আসলে কতটুকু!
আমি কখনোই মা-কে আদর্শ হিসেবে নিতে চাইনি। তার ব্যক্তিগত জীবন আমার পছন্দের ছিল না। বাবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন কি না, আমি দেখিনি। তবে বাবাকে সব সময় পাত্তা দিতেন এমনও নয়। নিজে সঙ্গীত পছন্দ না করলেও বাবার জন্য গাইতেন। কী দারুণ বৈপরীত্য! যখন দু’জন নিজেদের ঘরে থাকতেন, অদ্ভুত এক নির্জনতায় আচ্ছন্ন থাকতো ঘরখানি। যেন স্নায়ুযুদ্ধ চলছে মহাপরাক্রমশালী দুই জগতের মধ্যে! আমার মনে হতো। যে কারণে পিতার মৃত্যুটা এত বছর পরেও আমার কাছে প্রশ্নবোধক হয়ে আছে। উজ্জ্বল চিন্তার এই মানুষটির দাম্পত্যের শীতল লড়াইটা তার জীবনীশক্তির ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছিল, কিংবা আদৌ করেছিল কিনা আমার জানা নেই। আর বাবা এখন এতটাই দূরে যে, কোনোদিনও প্রশ্নের উত্তর মিলবে না।
উত্তরসুরী হিসেবে রহিমা খালাকে পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে একা রেখে নিজের সংসারে যেতে চাইতেন না। আমি জোর করে পাঠাতাম। পিতা-মাতা হারিয়ে বুঝেছিলাম তাদের সাহচর্য সন্তানের জন্য কতটা জরুরি। খালারও একটি মেয়ে আছে আমার বয়সী। আমার যেমন মাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে, তারও করে নিশ্চয়। তার ফোন নেই কিন্তু আমার আছে। মায়ের নাম্বারও আছে। ইচ্ছে করেই আমি যোগাযোগ রাখি না। প্রথম দিকে তিনি ফোন দিলেও রিসিভ করতাম না। খুব কান্না পেত তখন। তবে এখন আর তিনি ফোন দেন না। শুনেছি, নতুন স্বামীর কর্মস্থল অন্য কোনো শহরে চলে গেছেন। ইচ্ছে করলে খুঁজে বের করা কোনো ব্যাপার নয়। আমার ইচ্ছে করে না। বেডরুমে বাবা-মায়ের যৌথ ছবি ঝোলানো ছিল। মা চলে যাওয়ার কিছুদিন পর ছবিটা থেকে মায়ের ছবি সরিয়ে দিয়েছি। শোবার সময় ছবিটার দিকে চোখ পড়লে মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। এ সময় মা-কে বড্ড বেমানান দেখায় বাবার পাশে। মায়ের জন্য করুণা হয় আর বাবার প্রতি সহানুভূতি। নিজেকে অস্বাভাবিক লাগে, যখন আমি এসব চিন্তায় আকণ্ঠ ডুবে যেতে থাকি। বাবার মৃত্যুটা কি ষড়যন্ত্র ছিল- এমন প্রশ্ন বহুবার আমাকে বিচলিত করেছে।

মনে পড়ে না, ফাঁকা বাড়িতে আমি কখনো রেপড হয়েছিলাম কিনা। একাকিত্ব কাটাতে অনেক সময় মোবাইলে নীল ছবি দেখতাম। সঙ্গমেচ্ছাও জাগত। বলা যায় কাতর হয়ে পড়তাম। ছবি দেখার পর কাঁপতে কাঁপতে ঘুমিয়ে পড়েছি বহুদিন। রাতের খাবারও খাইনি। রহিমা খালা টেবিলে খাবার রেখে গেছেন। পরদিন সকালে নষ্ট খাবার ফেলে দিয়েছি। নিজেকে নিয়ে আগের সেই উদাসীনতা এখন আরও তীব্র হয়েছে, বুঝতে পারি। কিন্তু আমার জীবনে এমন ঘটনা কেন ঘটল, কোন কর্মফলে- ঠিক মাথায় ঢুকছে না। আমিও কি বাবার মতো ষড়যন্ত্রের অংশ হতে চলেছি!

দুই.
কয়েকদিন ধরে আবিদা অনুপস্থিত। বাসায় অনেক কাজ জমে আছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। অফিস করে আমি আর শিমুল দুজনেই ক্লান্ত। করপোরেট অফিস। বসের মন জুগিয়ে না চলে উপায় নেই। এ কারণে সংসারের বাড়তি কাজে মনযোগ দেয়ার সময় কারো নেই। আবিদাও যে কি! মেয়ের জ্বর কি এখনো কমেনি! ইদানীং আবিদাকে বেশ অন্যমনস্ক লাগে। মাঝে মধ্যে আমাদের দিকেও ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়। শিমুল সেদিন অফিসে যাওয়ার আগে জিজ্ঞেসই করল-
‘কি হয়েছে আবিদা? কিছু বলবে?’
‘না ভাইজান, মাইয়াডার খুব জ্বর। তাই ভাবতেছিলাম...’
‘আগে বলোনি কেন?’ আমিও যোগ করি।
আবিদা আমতা আমতা করে কি যেন বলতে যাচ্ছিল। আমি তাকে থামিয়ে দিই। তারপর ভ্যানিটি থেকে পাঁচশ টাকার একটি নোট বের করে তার হাতে গুঁজে দিয়ে বলি-
‘টাকাটা রাখো। মেয়ের ওষুধ কিনো। আর শোনো, কাল থেকে মেয়ের জ্বর না সারা পর্যন্ত কাজে আসার দরকার নেই। আমরা কয়েকদিন বাইরে থেকে খেয়ে নেবো।’
আবিদা প্রসঙ্গে আমি অনেকটা উদার। আবিদার বয়স আমার চেয়েও কম। তবে সে যে তিন বছরের একটি মেয়ের মা, তার দিকে গভীরভাবে না তাকালে বোঝা যায় না। গুণের কারণেও ওকে আমার খুব ভালো লাগে। আবিদা ঘরকন্নার কাজে যেমন গোছাল, তেমনইভাবে রকমারি রান্নায় পারদর্শী। একদিন পেপার পড়তে দেখে আশ্চর্য হই। ভালোও লাগে। জিজ্ঞেস করায় বলেছিল, ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে। আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে ওয়ালমেট উপহার দিয়েছিল। তার নিজের সেলাইয়ে অপূর্ব দেখতে সেটি। পরদিনই বাঁধিয়ে এনে ওয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েছি। ভেবে রেখেছি, কোনো এক অকেশনে ওদের মা-মেয়েকে দামি কিছু উপহার দেবো। রহিমা খালা চলে যাওয়ার সময় আবিদাকে দিয়ে গেছে। আবিদার একাকি সংগ্রামের কথা জেনে আমরাও আপত্তি তুলিনি। আবিদা কি নিজেই স্বামীকে ছেড়ে চলে এসেছে? জানতে চাইনি কখনো। তবুও এ জাতীয় প্রশ্ন মাঝেমধ্যেই আমার ভেতরে উসখুশ করে। দুই বছর ধরে আবিদা এখানে কাজ করছে। ভোরে আসে আর সন্ধ্যায় ফিরে যায়। সত্যিই, আবিদা আছে বলে কষ্ট কমে গেছে আমার। যদিও নিজে কাজ করতেও অপার আনন্দ উপভোগ করি। এখন সময় পাই না এই যা। চৌদ্দ বছর বয়স থেকে একাকি সংসার সামলিয়ে এতদূর এসেছি। তবে এটা ঠিক, শিমুলের সাহচর্যে ধীরে ধীরে অন্য মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি। তার পজেটিভ চিন্তা-চেতনা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তার উৎসাহে নতুনভাবে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করতে পেরেছি। আজকের ‘রুমানা আফরোজ’ হয়ে ওঠার কৃতিত্বটা সম্পূর্ণই শিমুলের, যা অস্বীকার করলে মিথ্যে বলা হয়। কিন্তু এ পর্যায়ে এসে শিমুলের কেন এই স্খলন? ভাবলেই মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে।

তিন.
সংসারে মানুষ বলতে দু’জন। এখনো নতুন মুখের আগমন ঘটেনি। চার বছর কি আর এত বেশি সময়! চেষ্টা যে করিনি তা নয়। ভেবেছি লেখাপড়া শেষে অঢেল সময় মিলবে। জন্ম দিয়েই তো দায়িত্ব শেষ হয় না, সন্তানকে ভালোভাবে গড়ে তোলাও জরুরি। অথচ, লেখাপড়া শেষ করতে না করতেই, জব নিতে হলো। জবের পেছনে যতটা না আমার, তার চেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহ শিমুলের। এরপর সারাক্ষণই দৌড়ের ওপর। এটা ঠিক যে, সন্তান জন্মদানে ব্যর্থ হলে অভিযোগের তির সর্বপ্রথম নারীটিকেই বিদ্ধ করে। সমাজের এ-এক অদ্ভুত নিয়ম, একপেশেও বটে। ভেবেছিলাম, শিমুলের ক্ষেত্রে এটা ঘটবে না। চারিপাশের মানুষ কে কি বলল না-বলল, শিমুলের বিবেচনাবোধ সে সব কথাকে কখনোই ততটা গুরুত্ব দেবে না। এমন বিশ্বাসে বেশিদিন স্থির থাকতে পারিনি। বিয়ের তিন বছরেও যখন কনসিভ করতে ব্যর্থ হলাম, শিমুলই প্রথম মুখ খুলল। টেবিল থেকে অফিসের ফাইল তুলতে তুলতে সহজ ভঙ্গিতেই বলল-
‘ভালো গাইনি বিশেষজ্ঞ দেখাও।’
‘চাকরিটা আগে পারমানেন্ট হোক’
‘তখন তো বুড়ি হয়ে যাবে’
শিমুলের কথায় হাসব না কাঁদব ভেবে পাই না। কিছুটা ক্রোধও পেটের মধ্যে দলা পাকিয়ে উঠছিল। কঠিন জবাব দিতে গিয়েও নিজেকে সংবরণ করি। অবশেষে বলতে বাধ্য হই-
‘ডাক্তার তো তোমাকেও দেখাতে হবে’
‘মানে?’
‘খুব সহজ। সন্তান না হওয়ার নেপথ্যে তোমারও ঘাটতি থাকতে পারে!’
সত্যিই তো! সব সময় যে পদ্ধতি নিয়ে মিলিত হয়েছি তেমনটি নয়। তাহলে! আমার কথাটি বোধ করি পৌরুষত্বে লেগেছিল শিমুলের। এই একটি বিষয়ে পুরুষ মানুষ একাট্টা। নিজেদের দোষ স্বীকারে অপারগ। যদিও শিমুলের সঙ্গে এ বিষয়ে আর কথা এগোয়নি। সে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ঝুলিয়ে অফিসের ব্যাগ নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিল।
সেদিন অফিস থেকে ফিরে, শিমুল আমাকে অদ্ভুতভাবে আবিষ্কার করে অফিসিয়াল ট্যুরের গ্রুপ ছবিতে। সোলায়মান সাহেব, যিনি আমাদের সেকশন বস, তার ফেসবুক ওয়ালে ছবিটি আছে। আমার ওয়ালেও ট্যাগ দিয়েছেন। মাস তিনেক আগে দেয়া সেই পোস্টে শিমুল লাইক দিয়েছে, উৎসাহমূলক কমেন্টও লিখেছে। অথচ, তার দৃষ্টিতে আজ আমি সোলায়মান সাহেবের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ। কী ঘৃণ্য বিশ্লেষণ! আমি একটি জার্নালের পাতা ওল্টাচ্ছিলাম। শিমুলের কথায় বজ্রাহত হয়ে তার মুখের দিকে সরাসরি তাকাই। যে শিমুল এখন আমার মুখোমুখি, তাকে ভিন্ন জগতের মানুষ বলে মনে হলো। চোখে-মুখে যেন হিংস্রতার আগুন! রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা হেরোইনসেবী মাস্তানদের সঙ্গে আজকের শিমুলের তফাৎ কতটুকু, অনুমান করতেও ব্যর্থ হই। তার এই আচরণ কি সকালের কথোপকথনের রেশ থেকেই উত্থিত? আমি নিশ্চিত হতে চেষ্টা করি। আর যথাসম্ভব সংযত হয়ে, হাসি মুখ করেই বলি-
‘কমেন্টে কিন্তু আরও এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলে।’
‘ভুল করেছিলাম। লাই দিয়েছিলাম, মাথায় উঠেছ।’
‘মোটেও তা নই। ওটা ট্রেনিং ডিসকাসন ট্যুরের ছবি। তোমারও ইনভাইট ছিল। অফিসের ঝামেলায় যেতে পারোনি।’
‘না গিয়ে ভালোই করেছি। কিন্তু গায়ের ওপর এসে পড়বে, তা ভাবিনি।’
‘এমন ধারণা তোমার কষ্টকল্পিত’- মুখের ওপর এমন তিক্ত কথাটি ছুঁড়ে দিই। তারপর প্রতিউত্তরের অপেক্ষা না করে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে সজোরে দরজা লাগিয়ে দিই। তারপর শাওয়ার ছেড়ে ধুয়ে দিতে থাকি, তিল তিল করে জমানো চার বছরের সম্পর্কের রসায়ন। সেদিন আমি কতটুকু কেঁদেছিলাম মনে পড়ে না। মনে করতেও চাই না। সেই থেকে আজ অবধি নিজের দুর্বলতার জায়গাটি শনাক্ত করতে চেষ্টা চালিয়ে আসছি। পাইনি কিছুই। তবে আজকের ঘটনার পর আশ্চর্যজনকভাবে মায়ের মুখটা কয়েকবার মনে পড়েছে। মায়ের মতো দ্বিতীয় সংসারের ইচ্ছে আমার মোটেও নেই। প্রয়োজনে একা থাকব। নিজের ভেতর একা, সম্পূর্ণ একা। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বাবার জীবনী ঘেঁটেই পেয়েছি।

চার.
অফিসে আসা মস্তবড় ভুল হয়েছে বোধ করি। ভেবেছিলাম শারীরিক অস্বস্তিটা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সময় গড়াচ্ছে আর অস্বস্তি তীব্রতর হচ্ছে। বাসা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে মাথাঘুরে পড়ে যাবো কিনা এমন ভাবনায়ও পেয়ে বসে। আজ খুব করে আবিদার কথা মনে পড়ছে। মেয়ের অসুখের জন্য আবিদা কয়েকদিন ধরেই নেই। ও থাকলে ঝামেলা কিছুটা কমে। বাসায়-অফিসে একটানা কাজের ক্লান্তি জেঁকে ধরেছে, বুঝতে পারি। এরপরও বাসায় ফিরে কাজের পাহাড়। যা হোক, বের হওয়ার আগে শিমুলের টেক্সট পাই, ‘অফিসেই থেকো, আমি নিয়ে যাবো। ৫-১০ মিনিট দেরি হতে পারে, প্লিজ।’ ফিরতি টেক্সট করেছিলাম, ‘ডান’। মনে জোর আছে, তবু শরীর বলছে, বিশ্রাম... বিশ্রাম...। সহকর্মী সোহেলকে বললাম রিকশা করে দিতে। ট্যাক্সিতে যেতে মন সায় দিল না। শিমুল আসতে এখনো ঘন্টাখানিক দেরি। এদিকে গা গুলিয়ে বমি আসছে। ওষুধ খেয়েছি তবু অ্যাসিডিটি কমেনি। বমি হয়ে গেলে অবশ্য শরীরটা ঝরঝরে লাগতে পারে, মনে হলো। বিকালে চায়ের আড্ডার ফাঁকে সহকর্মী ইয়াসমিন একবার কপালে হাত রেখে বলেছিল, জ্বর আসতে পারে। এরপর আর সাত-পাঁচ ভাবিনি। একটু পরেই ফাইলের কাজ অসমাপ্ত রেখে বেরিয়ে পড়ি। শিমুলকে টেক্সট করার আগ্রহ পাইনি। লিফটে উঠে একবার ভেবেছিলাম ফোন করি। পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত পাল্টাই। বাসায় ফিরেই ফোন দেয়া যাবে।
টলতে টলতে বাইরে এসে রিকশায় উঠি। সোহেল আমার হাতে ব্যাগ দিয়ে সালাম ঠুকে চলে যায়। আহ্! কতদিন এমন মুক্ত আকাশ দেখা হয়নি! আকাশটা আজ বেশ মেঘলা। মেঘগুলো খানিকটা নিচে নেমে এসেছে মনে হলো! শহরের বাতিগুলো আগেভাগেই জ্বলে উঠেছে। ধূসর মেঘের গায়ে দিনের দিনের আলোর অবশিষ্টাংশ ছড়িয়ে অসাধারণ এক দৃশ্য রচনা করেছে। অসুস্থতা সত্ত্বেও অপূর্ব এক অনুরণন খেলে যায় সারা দেহে। বসন্তের শেষভাগে এমন গুমোট গরম অনুভূত হয় বেশিরভাগ সময়। রিকশা চলছে, হু হু বাতাস লাগছে সারা শরীরে, তবুও ঘামতে থাকি। প্রেসারটা বোধ হয় গরমিল করছে। হতে পারে। বাড়ি ফিরেই ফ্রেশ গোসলের চিন্তা আসে মাথায়। ছুটির দিন ছাড়া এ সময়টা সাধারণত অফিসেই থাকি। কর্মজীবীদের এই এক অসহায়ত্ব। প্রকৃতির রূপচ্ছটা দেখার সৌভাগ্য কদাচিৎ মেলে। প্রকৃতির অগোছালো রূপরহস্য দেখে মনে হলো কিছুক্ষণের মধ্যে ঝড়ো হাওয়া শুরু হতে পারে। রিকশাওয়ালাকে দ্রুত পা চালাতে অনুরোধ করি। রিকশা ছুটছে, আমি ওপরে তাকিয়ে আকাশে মেঘের অপেরা দেখতে থাকি। এর ঠিক পনের মিনিটের মধ্যে রিকশা এসে থামে বাড়ির সামনে। মুক্তবাতাসে থেকে দেহের অস্বস্তি ভাব কিছুটা কমে এসেছে। আমি ভাড়া মিটিয়ে পা রাখি বাড়ির সবুজ লনে। ততক্ষণে আবছায়া আঁধার নেমে এসেছে চারিপাশে।
হঠাৎ আমার চোখ যায় গাড়ি গ্যারেজের দিকে। আমাকে অবাক করে দিয়ে শিমুলের অফিসের খয়েরি টয়োটা গ্যারেজের সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। শিমুল কি বাড়িতে? তার তো অফিসে থাকার কথা! সন্ধ্যায় মিটিং আছে বলেছিল। ওর যা ভুলো মন, নিশ্চিত প্রয়োজনীয় ফাইল ফেলে গেছে! কৌত‚হল জাগে। ভাবি, দারুণ সারপ্রাইজ দেয়া হবে আজ। দরজায় নক করবো এমন সময় ফিস্ফাস শব্দ শুনি। ভেতরে শব্দ হলেও স্পষ্ট বুঝতে পারি নারীকণ্ঠ। শরীর হিম হয়ে আসতে থাকে। চাবি বের করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকি। না, ড্রয়িং রুমে কেউ নেই। হলুদাভ আলো ছড়িয়ে সদ্য কেনা ডিমলাইটটি একাই জ্বলছে। শব্দের উৎসস্থল আমার বেডরুম, নিশ্চিত হই। কিংকর্তব্যবিমুঢ়ের মতো এগিয়ে যাই। বেডরুমের দরজা ভেজানো, তবে ঈষৎ ফাঁকা। বাতাসের তীব্রতায় পর্দা কাঁপছে। আমার শরীরেও আশঙ্কার কম্পন। মনে জোর রেখে পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকি। এ কী! আমার বেডে বসে আছে আবিদা। জড়োসড়ো, বিমর্ষ। আমাকে দেখেই সে তড়িঘড়ি উঠে মাথা নিচু করে সরে দাঁড়ায়। আবিদা আসবে আমি জানি না কেন, নিজেকে প্রশ্ন করি। শিমুল কোথাও নেই! আমি হতবিহ্বল। আমি তল খোঁজার চেষ্টা করি। হঠাৎ করেই আবিদা আমার পা ধরে কাঁদতে শুরু করে।
‘আপা, আমারে মাফ কইরা দ্যান। সব দোষ আমার।’
আবিদা এমন করছে কেন? মুহূর্তেই আমার মাথাটা ভারী হয়ে আসে। ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার একটানা শব্দ ভেসে আসে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমার মনে হতে থাকে পায়ের নিচের মাটি ক্রমেই সরে যাচ্ছে। আমি দেহের ভার সামলাতে পারছি না। টলতে টলতে ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় আবিদার শরীর ঘেষে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ি। চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে আবিদা। আমি চলচ্ছক্তিহীন, ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে চেতনা। আমার উপস্থিতি ওয়াশরুম থেকেই টের পেয়েছিল শিমুল। আমি পড়ে যাওয়ার পর আবিদাকে বকতে বকতেই সে দ্রুত বেরিয়ে আসে। এরপর দু’জন মিলে ধরাধরি করে বিছানায় তোলে আমাকে। আবিদার চাপা কান্নার ভেতর দিয়ে অচেতনে ভেসে যেতে যেতে আমি বাবার করুণ মুখটি স্পষ্ট দেখতে পাই। আর সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ার আগে নিজেকে মনে হয়, ঘূর্ণিস্রোতে ভেসে যাওয়া গন্তব্যহীন কচুরিপানা।