অসুখ

নিবেদিতা আইচ



এই হল ডুবডুবির বিল। মুখভর্তি পানি নিয়ে আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারতে মারতে তায়েব প্রায়ই ভাসতে থাকে এর স্বচ্ছ টলটলে জলে। একটু দূরে জঙ্গলের আভাস। তার আড়ালে কিছু ঘর বাড়ি। মাঝেমাঝে মেয়েছেলে, মহিলারা বেরিয়ে এদিকটায় আসে। তায়েব তখন খুব অন্যমনস্ক হয়ে ওঠে। যেন চারদিকে শুধু জল আর জল। আর কিছু নেই। তারপর ডুবডুবিতে গোটা কয়েক ডুব দিয়ে উঠে এসে উল্টোদিকে হাঁটা দেয়।

ওর পেছন পেছন চলে ফুলকি। এমন ছ্যাঁচড়া স্বভাবের মেয়ে আর দেখেনি তায়েব। যত লাথি ঝাঁটা খাক না কেন সারাদিনে কয়েকবার করে ওর পিছু নেবেই নেবে।

তোর মনে হয় শরম টরম নাই রে বেটি!

ফুলকি মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে মুখ তুলে রাখে। ঘ্যাচঘ্যাচ শব্দ করে ঘাড় চুলকায়। তারপর চোখ ছোট ছোট করে তাকায় ওর দিকে।

অমন কইরা চাইবি না কইলাম!

ফুলকির ভাব দেখে মনে হয় তায়েবের দিকে তাকিয়ে সে খুব কুৎসিত কিছু ভাবছে। তায়েব রেগেমেগে হাত বাড়াতেই ছিটকে দূরে সরে যায় ফুলকি।

যেতে যেতে গান গায় -'রসিয়া বন্ধুরে, তুমি কেন সোহাগমতির মালা হইলা না!'

বদ বেটি! দাঁত কিড়মিড় করতে করতে তায়েব উঠে দাঁড়ায়। রোদের তেজে চোখ মেলতে কষ্ট হয়। মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। ভেজা চুল, শরীর এরই মধ্যে শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেছে। দুই হাতের ছায়ায় চোখ রেখে চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখে সে।

ডুবডুবির জলে বেশ কয়েকটা নৌকা। নৌকায় চেপে প্রেম করতে এসেছে লোকজন। গলুইয়ের ভেতর দুজন হলেও মিলেমিশে একজন হয়ে গেছে। এমন চাঁদি ফাটা রোদে ওদের খুব সুবিধা। এই রোদ অবশ্য পড়ে যাবে কিছুক্ষণের মাঝে। তখন ভিড় আরেকটু বাড়বে।

জলের ধার ধরে হাঁটে তায়েব। হাওয়া মাখে গায়ে। খুব চেনা এই হাওয়া। পচা লতাপাতা আর জঙ্গলের ঘ্রাণমাখা। এদিকটা এখনো নির্জন। ডুবডুবির বিল সবার কাছে এখনো সেভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। তবে তায়েব জানে আর বেশিদিন এমন থাকবে না। রাতারাতি লোকজন এর খোঁজ পাবে। আর প্রচণ্ড ভিড় কর‍তে শুরু করবে।


নৌকার ভেতর থেকে খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে আসে। তায়েব ঢিল ছোড়ে কয়েকবার। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পানিতে পড়ে নানা সাইজের বৃত্ত তৈরি করে মাটির ঢেলাগুলো।

হালারপুতেরা, পিরিতি মারনের আর জাগা পায় নাই!

তায়েবের খুব রাগ লাগলেও রোজ এদিকেই ঘুরঘুর করে সে। ভিড় হোক আর জনশূন্যই হোক ডুবডুবির ধারে তার আস্তানা। আর যাবে কোথায় সে! বাড়িতেও কেউ অপেক্ষা করে বসে নেই ওর জন্য।

যখন বাড়িতে ছিল তখন বাপ দিনরাত কথার ফোড়ন কাটত। বলত-ভাদাইম্যার পুত, বৌ গ্যাছে ত কি তর প্যাডের খুদাও লগে লয়া গ্যাছে? এমুন গতর নিয়া বইয়া বইয়া খায় হালায়!

বাপকে কষে দুঘা দিয়ে সেদিনই বাড়ি ছেড়েছে তায়েব। বাপ কি জানে বৌ হারাবার জ্বালা! নিজে তো ওরকম মুড়মুড়ে হাড় নিয়েও মাকে রোজ রাতে জ্বালাতন করে। এই তাগড়া শরীর নিয়ে তায়েব কী করে রাত কাটায় বুড়ো বাপের সে বোঝার সাধ্য নেই। রাগের চোটে এমন ধোলাই দিয়ে এসেছে, লোকটা আর পারবে না ঐসব করতে। কথাটা ভাবলেই পেটের ভেতর থেকে ভুসভুস করে হাসির ফোয়ারা ছোটে ওর।

হাসতে হাসতে 'তাগড়া' শব্দটা নানাভাবে উচ্চারণ করে তায়েব। শুরুর দিকে সোহাগের সময় বৌ বলত- আমার তাগড়া জোয়ান!

ফুলকি ওকে জিজ্ঞেস করে- তাগড়া মানে কী তা?

তায়েব একটু সরে বসে। না শোনার ভান করে। ফুলকির স্বভাবটাই এমন। একদম গা ঘেঁষে বসবে। আর ঠিক ব্যথার জায়গাতেই খোঁচাবে। এসব না করলে শান্তি হয় না বেটির। তাগড়া শব্দের মানে দিয়ে তোর কী রে!

কইলা না? আমার মনে অয় তাগড়া মানে হইল তোমার মতন এমন শক্ত শইল!

বলতে বলতে নরম হাতটা ওর গায়ের ওপর রাখে। তায়েবের ভেতরটা কেমন শিরশির করে ওঠে।

শাকিলা ছুঁলে এমন লাগত। অমন তুলতুলে শরীর ছিল শাকিলার। তখন তায়েবের অসুখটা ছিল না। দুরন্ত সব দিন ছিল ওদের। তারপর ধীরে ধীরে কী থেকে যে কী হয়ে গেল সে নিজেও ভেবে ভেবে বুঝে উঠতে পারে না। এমন শক্তপোক্ত শরীর যে ভেতরে ভেতরে অক্ষম তা প্রথমবার শুনে কেউ বিশ্বাসও করতে পারে না।

ফুলকিকে দেখলে সেই দিনগুলির কথা মনে পড়ে। সারারাত চৌকাঠের বাইরে বসে নখ দিয়ে দরজায় আঁচড় কাটত মেয়েটা। শাকিলা চলে যাবার সময় ওকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বেশরম বেটি বারবার ঘুরেফিরে এখনো তায়েবের কাছে আসে। ওকে দেখলেই শাকিলার কথা আরো বেশি করে মনে পড়ে।

প্রথমদিকে শাকিলার কথা ভেবে ফাঁকা বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে তায়েব সারারাত কাঁদত। মা তখন কয়েক দফা ধরনা দিতে গিয়েছিল ওর শ্বশুরবাড়ি। অনেক সাধাসাধি করেও শাকিলাকে আনতে পারেনি। মেয়েকে ফেরত পাঠায়নি ওর বাপমা৷

শেষবার সবকিছু শুনে এসে মা আর এ নিয়ে একটা কথাও বলেনি কখনো। বাপ মাঝেমাঝে বলত বটে ছেলেকে আবার বিয়ে দেবে, মোটা অংকের যৌতুক নেবে৷ এসব কথা শুনেও অনেকদিন চুপ থেকেছে মা। শেষমেশ একদিন ঝগড়ার সময় মুখ ফসকে বলে ফেলেছে ছেলের অসুখের কথা।

বাপ শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকেছে। তারপর বলেছে- হালায় দেহি আসলেই ভাদাইম্যা!

এর পরদিনই লোকটার সাথে ঝগড়া করে, মেরেধরে ঘর ছেড়েছে তায়েব। এলাকায় আগে কানাঘুষা থাকলেও সেদিনের পর ওর অক্ষমতার কথা সবাই জেনে গেছে। বাড়ির দিকে ঘেঁষার কথা তাই ভাবা মুশকিল।

এদিকটায় থাকার সুবিধা হল জঙ্গলের ফাঁক গলে মাঝেমাঝে শাকিলাকে দেখা যায়। শাকিলা বেড়াতে আসে বান্ধবীর বাড়িতে। ডুবডুবির ধারে আসে হাওয়া খেতে। তায়েব দূর থেকে ওকে দেখে। এগিয়ে কাছে যেতে সাহস পায় না। কিন্তু শাকিলার চোখমুখ দেখে নিজেকে সংযত রাখা কঠিন হয়। এখনো সেই আগের মত প্রশ্রয় দেখতে পায় শাকিলার ভাবভঙ্গিতে।

তায়েবের মনটা খারাপ থাকে ইদানিং। সেই যে ওকে দেখেছিল মাসখানেক আগে এরপর আর মেয়েটা আসেইনি এদিকটায়। আগে প্রায় সপ্তায় এক দু'বার করে হলেও আসত। এদিকে ফুলকিটার হাবভাবও অদ্ভুত লাগছে। কেমন চুপচাপ, অন্যমনস্ক ভঙ্গি। কথায় কথায় গান গেয়ে ওঠে না আগের মত। তায়েব জিজ্ঞেস করে- তোর কি শইল খারাপ?

লম্বা লম্বা শ্বাস নেয় ফুলকি। কথা বলে না, গায়ের কাছে ঘেঁষে না। তায়েব ধমক দেয়-তোর হইছেটা কী কইবি তো?

পিটপিট করে চোখ তুলে তাকায় ফুলকি। চোখের তারা দুটো যেন আরেকটু বেশি ঘোলাটে। কিছুক্ষণ এদিক ওদিকে তাকিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে জঙ্গলের দিকে চলে যায় ফুলকি। ওর শরীরটা কেমন ভারী দেখায় আজকাল। স্বভাবটা তো ভাল নয়। কোথায় কোন অপকর্ম করছে কে জানে!

তায়েব মুখ ফিরিয়ে নেয়। পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকে আরো অনেকক্ষণ। শাকিলার কথা মনে পড়ে ওর। ফুলকির মত অমন ‘কটা’ চোখ মেয়েটার। মা মুখ বাঁকিয়ে বলত- বিলাইয়ের মত চক্ষু।
আর সে বলত- আমার দুই টুকরা হীরা।


অল্প কদিনের মধ্যেই বর্ষার মৌসুম শুরু হয়। এসময় ডুবডুবির দু'ধার সত্যিই ডুবে ডুবে যায় এমন দশা। চারদিক ঘিরে মেঘের পাহাড়, আকাশ মাটি এক হয়ে সমুদ্রময় হয়ে ওঠে। এরকম সময়ে একদিন তায়েবের মায়ের সাথে দেখা হয়ে যায়। মা ওকে বাড়ি ফিরতে বলে। রোগের উপর তো কারো হাত নেই৷ আর আজকাল চিকিৎসাও নিশ্চয়ই আছে। শহরে নিয়ে বড় ডাক্তার দেখালে একটা কিছু ব্যবস্থা হবে। এইসব আশ্বাস দেয় ছেলেকে। তায়েব ঘাড় গোঁজ করে শুনে থাকে। একটা কথাও বলে না। শেষমেশ মা খেপে ওঠে। রাগের মাথায় শাকিলার নাম ধরে গালমন্দ করে। আবাগির বেটি বিয়ে বসতে যাচ্ছে, আর তার ছেলে ডুবডুবির জলে ডুবে মরার উপক্রম। বিয়ের রাতেই যেন বিধবা হয় এই মেয়ে!

তায়েবের তখন মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা। কেউ যেন আলকাতরা লেপে দিয়েছে চারপাশ জুড়ে। তুমুল বৃষ্টির জলেও সেই কালি ধুয়ে যাচ্ছে না। ভিজতে ভিজতে জঙ্গলের দিকে এগোয় তায়েব। এখুনিই ছুটে গিয়ে শাকিলার বান্ধবীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে সে, সত্যিই ওর বিয়ে হচ্ছে কিনা৷

থিকথিকে কাদা মাড়িয়ে অর্ধেক পথ গিয়ে বোধোদয় হয় ওর৷ আচ্ছা, শাকিলাকে আটকাবার সাধ্য কী তার? কীসের জোরে সে বাধা দেবে! এবার অন্তত সুখী হোক মেয়েটা। আনন্দে ভরপুর একটা সংসার পাক। বছর ঘুরতেই সন্তানের মা হোক।

মাথায় হাত দিয়ে তায়েব কাদার মধ্যেই বসে পড়ে একসময়। আকাশ ফুটো করে জলের ধারা নেমেছে। জল আর কাদায় মাখামাখি হয়ে ওর কান্নাটাও ভেসে যেতে থাকে।

সন্তানের খুব শখ ছিল শাকিলার। তিন চারমাস যেতে না যেতেই অস্থির করে তুলেছিল তায়েবকে। তায়েবের তখন নিজের শরীরের সাথে বোঝাপড়া চলছিল।

কানের কাছে ফিসফিসিয়ে শাকিলা বলত-দিবা না একটা ছাওয়াল?

তায়েব ছিটকে দূরে সরে যেত।দিনের পর দিন এই এক আকুতি থেকে পালিয়ে বেড়ানোর শুরু সেই সময় থেকে। মাঝেমাঝে ঘুমের ভেতরেও তাড়া করত কথাটি।

শাকিলা চলে গেছে প্রায় এক বছর হয়ে এসেছে। ওকে একবার দেখার জন্য সারাদিন ছোঁকছোঁক করলেও মনে মনে অনেকটা সামলে উঠেছিল তায়েব। আজকে মায়ের মুখে বিয়ের খবরটা জানার পর সব তালগোল লেগে গেছে। নিজেকে কিভাবে সামাল দেবে বুঝে উঠতে পারে না সে। শাকিলাকে সামনে পেলে একবার জিজ্ঞেস করত শুধু শরীর আর ছাওয়ালই কি সব?

তীর্যক জলের অবিরাম ছাট থেমে যায় একসময়। তায়েবের মাথার ভেতরের ঝড়টাও দুর্বল হয়।এবার সে দেখতে পায় ফুলকিকে। কেমন জুলজুল করছে চোখ দুটো। ওর সময় প্রায় হয়ে এসেছে। যেকোন দিন ব্যথা উঠবে। জলের ধারে আজকাল আর আসেই না ফুলকি। জঙ্গলের মুখে বসে দূর থেকে তায়েবকে দেখে। বেশিক্ষণ বসে না, ফিরে যায় তাড়াতাড়ি।

তায়েব এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। আজকে বোধ হয় মেয়েটার নড়তে চড়তে খুব কষ্ট হচ্ছে। তায়েব ওকে ইদানিং এটা ওটা খেতে দিত। আজকে দেবার মত সাথে কিছু নেই। তবু সে এগিয়ে যায় ফুলকির দিকে।


ফুলকি ভয় পাওয়া ভঙ্গিতে একবার নড়ে ওঠে। কিন্তু সরে যেতে পারে না৷ কিছু বুঝে উঠবার আগেই সাদার মাঝে বাদামি ছিটে দেওয়া ছোট শরীরটা রক্তের স্রোতে ভাসতে শুরু করে।

তায়েব ঘোরলাগা চোখে দেখতে পায় ফুলকির পোয়াতি শরীরটা চোখের নিমিষে কেমন শাকিলার মত হয়ে যাচ্ছে। স্বামীর সোহাগে বেশ নির্লজ্জ রকমের ভরন্ত গতর হয়ে উঠেছে মেয়েটার।

নিথর দেহটা দেখতে দেখতে তায়েব এবার টের পায় ওর চারপাশ দুলছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। গাছের গুঁড়ির ওপর মাথাটা থেঁতলে দেয়ার সময় শেষবারের মত যে গেয়ে উঠেছিল 'রসিয়া বন্ধু রে', সে কি ফুলকি না শাকিলা তা ঠিক মনে করতে পারছে না সে।