স্টেশন

নূর কামরুন নাহার



নাম স্টেশনগাঁ। জায়গাটা অদ্ভুত। এটা আসলে একটা স্টেশন। স্টেশনটার নাম নেই। নাম ছিলো কিনা কেউ জানে না। কেউ বলে একটা নাম ছিলো। এখানে এসে থামতো মধ্যরাতের ট্রেন । চশমা চোখে বসে থাকতেন স্টেশন মাস্টার।
ঐ যে নদীটা। রেল লাইনের পাশ দিয়ে, এটার নামও কেউ বলতে পারে না। নদীটা এখন আঁকাবাঁকা এক রেখা। মৃত এক অজগর। কেউ বলে এ নদীর শরীর ছিলো ঘন নীল। ভরন্ত ভর যৌবনা নীল নয়না দুকূল ছাপিয়ে কলকল করে বইতো। এখানে এসে ভিড়তো নকশা আঁকা গয়না। পাড় ধরে হেঁটে বেড়াতো শৌখিন ভ্রমণবিলাসী,পর্যটক। লাস্যময়ী নারীদের খলখল হাসির শব্দ শোনা যেতো। স্টেশনগাঁকে ভালোবেসে তারা থেকে যেতো কয়েকদিন। তারপর আবার চলে যেতো দূরদূরান্তে।
এখন স্টেশনটা একা। এখনে কোনো গাড়ি থামে না। কোনো কোলাহল নেই। যারা থাকে তারা জগৎ বিছিন্ন আশ্চর্য এক জনপদের বাসিন্দা। তারা কোথাও যেতে চাইলেই যেতে পারে না। আর কেউ আসতে চাইলেই এখানে আসতে পারে না। বাতাসে পাতার মরমর ধ্বনির মতো জীবন মৃদূ সঙ্গীত নিয়ে বেজে চলে। তারা শোনে প্রকৃতির ছন্দ। নদীর পাড়ের ডোলকলমী, ইকর, কেয়াকাটা, কইয়ালতার সাথে কথা বলে। মৃত নদীর পাড় ধরে হেঁটে যায় দিগন্তের দিকে দেখে কালো আকাশে লক্ষ জ্বলজ্বলে তারা। অসংখ্য জোনাকীর আলো। শোনে ঘন বাঁশ ঝাড়ে বাতাসের শনশন আওয়াজ, আকাশছোঁয়া লম্বা গাছের শাখায় শাখায় বেজে চলা বাতাসের সঙ্গীত। পাখি আর ঝিঝি পোকার ডাক। নিঃশব্দ নীরবতার ভেতর পরস্পরের হৃদপিন্ডের ধুকধুক। আর শোনে এই জনপদ এই নদী, বৃক্ষ লতা মাটি আর সমস্ত আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া আশ্চর্য করুণ এক সুর। পনের বছর ধরে তারা এই সুর নিয়ে ঘুমায় এই সুরেই তাদের ঘুম ভাঙ্গে।
এখানে নতুন মানুষের আগমন নেই। তবু এক সকালে ঝোলা হাতে দেখা যায় এক লোককে। এখানের মানুষেরা কোনোদিন হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার নাম শুনেনি। তারা জানেও না যাদুর বাঁশির কথা। আর লোকটা দেখতে কোনো যাদুকর বা বাঁশিওয়ালার মতো নয় । খুব সাধারণ একজন। পরনে লুঙ্গি আর ঢোলা ফতুয়া টাইপ জামা। খালি পা। দুই চোখে আশ্চর্য জ্যোতি। মুখে মরমী ভাব। স্টেশনগাঁর সব লোক তাকে ভিড় করে দেখতে আসে। তারা ভাবে লোকটা এলো কেমন করে ? তবে কি সত্যিই এখানে থেমেছিলো মধ্যরাতের কোনো ট্রেন? লোকটা নেমে এলো ট্রেন থেকে। তারপর স্টেশনগাাঁ এব মাটিতে। লোকটা কারো সাথে কথা বলে না। স্টেশনের বারান্দার এক কোণে বসে থাকে। তারপর সন্ধ্যায় নদী পাড়ের অন্ধকারে মিশে থাকে। স্টেশনগাঁর লোকেরা কিছুতেই ভেবে পায় না কে এ। কেমন করে এলো? তখন কেউ কেউ বলে মধ্যবরাতের ট্রেনের কথা । তারা বলে তাদের বাপ-দাদাদের কথা। তারা প্রত্যক্ষ করেছিলো ট্রেন। কিন্তু তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারে না। সবশেষে তারা নিজেরাই নিশ্চিত হয় না তারা কি সত্যি দেখেছিলো!
নদীর এপাড়ে কাফিলা গাছের তলায় লোকটা থাকে। ভারি মিষ্টি তার হাসি। কথায় মধু ঝরে। কিন্তু তবু তারা রহস্য ভেদ করতে পারে না। লোকটা কে?
তারা জিজ্ঞেস করে- আপনার বাড়ি কই?
মৃদূ হেসে সে বলে- বাড়ি কে চেনে।
আপনে কেমনে আইলেন?
আমি কি আর আইছি, আমারে আনছে।
কেডা আপনেরে আনছে?
যে আমারে আনছে তারেই তো খুঁজি।
এই সব কথা, বোঝা না বোঝা কথা নিয়ে লোকজন কিছুদিন কথা বলে। তারপর আর কেউ কিছু বলে না। সে যেন এই স্টেশনগাঁয়েরই লোক। সবাই জন্ম থেকেই তাকে দেখছে। যখন স্টেশনগাঁয়ে আর নতুন কোনো বিষয়ই থাকে না। তখন আবার এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। একদিন সকালে নদীর পাড়ে দেখা যায় এক নারীকে। স্টেশনগাঁয়ের মানুষ অবাক হয়ে তাকে দেখে। তারা ভাবে মেয়েমানুষটা এলো কিভাবে? তবে কি রাতে এই নদী জোয়ারে পূর্ণ হয়েছিলো এখানে এসে ভিড়েছিলো কোনো শৌখিন গয়না? তখন কেউ কেউ বলে তারা খুব ছোটবেলায় এই নদীর ঘন নীল পানি দেখেছিলো,দেখেছিলো পানসী। এসব কথার কোনো চাক্ষুস প্রমাণ তারা দিতে পারে না। এইসব কথা বলতে বলতে স্টেশন গাঁয়ের মানুষেরা ক্লান্ত হয় কিন্তু মেয়ে মানুষটা একটা কথাও বলে না।
সেদিন রাতে আরো এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। আধো ঘুম আধো জাগরণে স্টেশনগাঁর মানুষেরা শুনে অদ্ভুত এক সুর। তারা ভেবেই পায় না এ সুর কোত্থেকে ভেসে এলো।
সকালে তারা দেখে কাফিলা গাছের নীচে সেই লোক ঠায় বসে আছে। আর সুর ছড়িয়ে পড়ছে স্টেশনগাঁর নদী আকাশ মাঠ আর দিগন্ত জুড়ে।
তারা অবাক হয়ে বলে- সুর কি আপনে তুলেন?
সে হাসে মধুর হাসি- সে আইছে।
কে আইছে?
যারে খুঁজি।
স্টেশনগাঁয়ের মানুষের কাছে কিছুই ষ্পষ্ট হয় না। তারা বাঁশি ছাড়া আর কিছুই চেনে না। সে ঝোলার ভেতর কী রাখে আর কী বের করে। ঐ যন্ত্রের নাম কী ? তারা জানে না। তারা শুধু ভাবে এতো সুন্দর সুর সে তুলে কেমনে?
লোকজন প্রতিদিন সুর শুনে ঘুমাতে যায় সুর শুনে জেগে ওঠে তারা আবার বলে- আপনে সুর তুলেন কেন?
ভালোবাসি।
কারে ভালোবাসেন।
যারে খুঁজি।
কারে খুঁজেন?
যারে পাইছি।
নদীর ঐ পাড়ে ওলা মান্দার গাছের নীটে ডালপাতার ছাউনিতে এক ঝুপড়ি হয়। সেখানেই থাকে ঐ মেয়েমানুষটা সে কোনো কথা বলে না। এক শরীর রূপ নিয়ে বসে থাকে। লোকজন ভাবে, সে খায় কী? বাঁচে কেমনে? মাঝে মাঝে তাকে কলা খেতে দেখা যায় ।
কলা তারে দেয় কে?
নদীর এইপাড়ে থাকে লোকটা । ঐপাড়ের দিকে উদাস তাকিয়ে থাকে চেয়ে সুর তোলে
লোকজন আবার বলে— এই সুর কারে শোনান?
তারে শোনাই যারে ভালোবাসি, যে আমার দয়িতা।
কে আপনের দয়িতা ?
যে আমার চোক্ষের ছবি। যারে চোক্ষে চোক্ষে রাখি।
এইসব ভাবের কথা তারা বোঝে, আবার বোঝে না। তারা ভাবে এইবার ওরা ঘর বাঁধবে কিন্তু তারা ঘর বাঁধে না। প্রতিরাতে বাতাসে বিরহী বেহাগ বাজে। তারা সুর শুনে ঘুমাতে যায়, সুর শুনে ঘুম থেকে জাগে।
তারপর আবার বলে-আপনারা ঘর বান্ধেন না কেন?
এইখানে বান্ধনের হুকুম নাই।
এইটা কী কন।
এক ইস্টিশনে তার দেখা পাইছি আরেক ইস্টিশানে তারে পামু।
সেইডা কেমন ইস্টিশান ?
জানা নাই।
পনের বছর ধরে রাতে অদ্ভুত এক সুর ওঠে কাফিলা গাছের নীচ থেকে। আকাশ বাতাস নদীতে সুর ছড়িয়ে পড়ে। একটা মৃত নদীর এপাড়ে ওপাড়ে মিলনের প্রতীক্ষায় থাকে দুই মানব-মানবী। স্টেশনগাঁর মানুষ অপেক্ষা করে একদিন রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে ঝিকঝিক আওয়াজ তুলে আসবে মধ্যরাতের ট্রেন । মৃত নদীর দুকুল ছাপিয়ে আসবে জোয়ার, স্বচ্ছ নীল জল। আর তারা দেখা পাবে নতুন এক স্টেশনের।