আবছায়া

দেবদ্যুতি রায়



মিহিতার হাতে নীল রংয়ের চুড়িগুলো যেন শরতের বৃষ্টিস্নাত আকাশ। আকাশনীল কাচের চুড়িগুলো ওর ডান হাতে একটার গায়ে একটা লেগে আছে। আমি জানি ওর হাতে চুড়ির সংখ্যা ঠিক বারো। কাল শাহবাগে জরী খালার কাছ থেকে ওগুলো রনি যখন ওকে এই এক ডজন চুড়ি কিনে দিচ্ছিল, আমি তখন ওদের দুহাত পেছনে দাঁড়িয়ে উবারে কল দেয়ার মিথ্যা অভিনয় করছিলাম।

মিহিতার আজ জন্মদিন। এই মেয়েটা জন্মদিনে প্রেমিকের কাছ থেকে মাত্র এক ডজন চুড়ি চেয়ে নিয়েছে। অথচ আমি জানতাম চুড়ি টিপ পুঁতির মালা উপহারের যুগ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন মোবাইল, ট্যাব, দামি জুয়েলারির দিন। মিহিতা আর রনির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তিনশো ফিটের রাস্তায় তেল চুপচুপে চিকেন গ্রিল খেতে খেতে আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি- আচ্ছা, মিহিতা কি সত্যি বোকা?

বোকা হলেই তো ভালো রে, অয়ন। কেবল বোকা হলেই ও বুঝতে পারবে না তুই কেন ওর পেছনে এত সময় আর শ্রম দিচ্ছিস- আমার পাশের চেয়ারে বসে হি হি করে হাসছে রুষা। রুষা! এখানেও! আমি কিংকর্তব্যবুমূঢ় হয়ে গ্রিল চিবাতে ভুলে যাই।

না না, তুই খা প্লিজ- রুষা আবার বলে ওঠে। সেই সকালবেলা বের হয়েছিস, তেমন কিছু তো খাসনি সারাদিন। আমি আর উল্টাপাল্টা কথা বলব না।

রুষার চোখ সত্যি সত্যি ছলছল করে। আমি ওর দিকে একবার তাকিয়ে দু টেবিল সামনে বসা মিহিতার দিকে আবার তাকাই। এই দুজনের চেহারায় কী আশ্চর্য মিল! শুধু এই মিলের কারণেই মিহিতাকে প্রথমবার দেখেই আমি আর ফিরতে পারিনি। কিন্তু রুষা কি বুঝবে সেই কথা? জানিনা। আমি তাই সেই ভাবনায় ইস্তফা দিয়ে রুষাকে জিজ্ঞাসা করি-

রুষা, সত্যি করে বল তো, তুই কেন ফিরে এলি আবার। মানে ঠিক কোন কারণে এত বছর পর...

আমার কথা শেষ হয় না। তার আগেই গলায় এক আকাশ বিষাদ মিশিয়ে রুষা বলে ওঠে, অয়ন, তুইই বা এত বছর পর কেন এই মেয়েটার জন্য এমন করে ঘুরছিস?

চমকে উঠে আমি রুষার দিকে তাকাই। এই প্রশ্নের কোনো ঠিকঠাক জবাব কি আমার কাছে আছে? নেই। আমাদের প্রেমের দিনে রুষা আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে বলত- যদি আর কোনোদিন অন্য কোনো মেয়ের সাথে প্রেম করিস, আমি তোকে খুন করে ফেলব, অয়ন।

সেইসব দিনে ওর চোখের দিকে যে কেউ তাকালে ভাবতে পারত ও নিছক মজা করার জন্য এ কথা বলছে না। রুষা আমাকে ভালোবাসত, এমন উথাল পাতাল ভালোবাসা আমি আজ পর্যন্ত কারো মধ্যে দেখিনি। কী আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল মেয়েটার ভালোবাসার! অথচ...

রুষা চলে যাওয়ার পর ওকে কোথায় খুঁজিনি আমি? রূপম বলে আমি নাকি সেই সময়টায় একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আমার কিন্তু অতশত মনে নেই। কেবল মনে আছে সেদিন বিকেলে যখন জেনেছিলাম রুষা আর কোনোদিন আমার কাছে ফিরবে না- আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

আশেপাশের টেবিলগুলোর দিকে একবার ভালো করে তাকাই আমি। এখানের দোকানগুলোর ভিড় দেখলে কেউ ভাবতে পারবে না দেশে করোনা বলে কোনোকিছু আছে। বরং আমার মনে হয় পরশু দিন থেকে লকডাউনের ঘোষণা আসায় সবাই আরও বেশি করে ঘুরতে এসেছে, খেতে এসেছে এই জায়গায়। সবাই নিজেদের মতো গল্পগুজবে বা খাওয়ায় ব্যস্ত, আমার বিব্রত অবস্থা নিয়ে কারও মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

রুষার দৃষ্টি ধরে আমি মিহিতার দিকে তাকাই আরেকবার। রনি ওর চুড়ি পরা হাতটা ধরে হাসছে আর অনর্গল কীসব বলছে। একটা দীর্ঘশ্বাস আমার গলার কাছে পাক খেতে খেতে মরে যায়। রুষা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে- ছেলেটা ওর হাত ধরে আছে বলে তোর কষ্ট হচ্ছে, তাই না? কেন হচ্ছে, অয়ন? তুই তো আমাকে বলেছিলি আমাকে ছাড়া আর কাউকে তুই কখনো ভালোবাসতে পারবি না!

ওকে বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পাই না আমি। ওর প্রশ্নের জবাবে তাই আরেকটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে গলায়। ওর দিকে তাকাতেও ভয় পাই। কী জানি আবার কী বলে বসে!

আমি জানি অয়ন, তুই ওই মেয়েটার পেছনে কেন ঘুরছিস। ও অনেকটা আমার মতো দেখতে সেজন্য, তাই না?

রুষার গলায় দুষ্টুমি খেলা করে, মুখেও। মেয়েটা ওই একইরকম আছে, প্রগলভ, একটু দুষ্টু। আমিই কেবল অনেকটা বদল গেলাম এতগুলো বছরে!

উত্তর দিলাম না দেখে বোধহয় রুষাই আবার বলে- এমন গাধার মতো প্রশ্ন করছি কেন বল তো। ওইটাই তো আসলে উত্তর। ও আমার মতো দেখতে বলেই ওকে তোর এমন পছন্দ।

রুষা কি আজকাল সব বুঝতে পারে? আমি মনে মনে যা ভাবছি, তাও? ওকে জিজ্ঞাসা করতে ভয় করে। থাক না। সবকিছু জানতে নেই। তবে মিহিতাকে আমার ভালো লেগেছিল ওর চেহারার কারণেই সেটা অস্বীকার করার কোনো অর্থ হয় না। ওকে আমি প্রথম দেখেছিলাম আমাদের চাইল্ড অ্যাবিউজের ওপর আয়োজিত ওয়ার্কশপটায়। সদ্য পাশ করে চাকুরিতে ঢোকা মিহিতা এসেছিল ওদের অর্গানাইজেশনের হয়ে। দেখার পর ওর দিক থেকে চোখ সরাতে পারিনি কিছুক্ষণ- মনে হয়েছিল রুষাই বোধহয় ফিরে এসেছে আমার কাছে! রুষার সাথে কী অদ্ভুত মিল ওর চেহারায়! এমনকী দুই ভ্রুর ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটা টিপের আকারের তিলটা পর্যন্ত! খুব ভালো করে খেয়াল করলে অবশ্য বোঝা যায় মিহিতা রুষার চেয়ে লম্বায় ইঞ্চিদুয়েক কম আর একটু বেশি শুকনো, মুখেও একটা আলাদা গাম্ভীর্য আছে যা রুষার ছিল না। গায়ের রং, চোখ মুখও একটু আলাদাই ওদের। আর স্বভাবচরিত্রে তো দুজন একেবারেই দুই রকম। রুষার চঞ্চল স্বভাবের বিপরীতে এই মেয়ে একেবারেই চুপচাপ, মিশুকও নয় তেমন।

সেদিন ওর সাথে কথাবার্তা তেমন হয়নি। অনন্যা মিহিতা নামের মেয়েটার থেকে নিজেকে ইচ্ছে করেই দূরে রেখেছিলাম। আমার মাথা সত্যি ঘুরছিল। রুষা কিংবা মিহিতা অথবা দুজনের কথা ভাবতে ভাবতে আমি ওয়ার্কশপে মনোযোগ দিতে পারিনি একটুও।

পরদিন অফিসে দুমাসের অর্জিত ছুটির দরখাস্ত ফেলে চলে এসেছিলাম হুট করে। তারপর থেকে মিহিতার নাড়ি নক্ষত্র আমার মুখস্ত হয়ে গেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের বাইরের মিহিতাকেও আমি এই গত এক মাসে খুব ভালো চিনে গিয়েছি। ওর প্রিয় খাবার, রনির সাথে বেড়াতে যাবার প্রিয় জায়গা, বাকেট লিস্ট- প্রায় সবকিছু জানা হয়ে গেছে আমার।

শোন অয়ন, আমার মনে হয় কী, তুই আসলে মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছিস। কেবল আমার মতো দেখতে বলে নয়, ওর ভেতরে আমাকে খুঁজতে গিয়ে তুই আসলে ওকেই ভালোবেসেছিস!

রুষার গলায় মেঘের ছায়া। আজ ও সব কঠিন কঠিন কথা বলছে। এসব কথার উত্তর দেয়া আমার জন্য অসম্ভবের পর্যায়ে। আমি তাই এ কথার উত্তরে শুধু একটু নড়েচড়ে বসি। রুষাকে বাদ দিয়ে আরও সামনে তাকাই। মিহিতা আর রনি উঠে পড়েছে। মিহিতার লম্বা চুলগুলো পিঠময় কালো মেঘের মতো ছড়ানো, রনি সেই চুলে একটা হাত বুলিয়ে দেয়। আমার ইচ্ছে করে রনির হাতটা অবশ করে দিই যাতে মিহিতার পিঠ ছুঁতে না পারে কোনোদিন। কিন্তু আমি পারি না। যেমন কিছু করতে পারিনি এই সেদিনও যেদিন মিহিতা রনির বাসায় গিয়েছিল একা একা। দুই ঘণ্টার মতো ওই বাসায় ওরা দুজন ছিল শুধু, আর কেউ নয়- ঐ দুটো ঘণ্টা বাইরের রাস্তায় আমি সেদিন পাগলের মতো হেঁটেছিলাম!

মিহিতারা হাঁটতে শুরু করেছে। আমি রুষার দিকে তাকাই। ও বিষণ্ণ হাসে, এই শেষ বেলার করুণ রোদের মতো। তারপর বলে- তোরও ওঠার সময় হলো রে। যা।

আমি হঠাৎ কী মনে করে জিজ্ঞাসা করি- আমার সাথে যাবি, রুষা?

রুষা ওর হলদে কুর্তির মতোই ঝলমলিয়ে ওঠে- চল।

তারপর আমি আর ও আমার বাইকে চেপে বসি। মিহিতা আর রনিকে দেখা যায় না। ওরা অনেকখানি এগিয়ে গেছে এতক্ষণে। আমি কত জোরে বাইক চালাচ্ছিলাম জানি না, রুষা আমার কাঁধে মুখ লাগিয়ে বলে- অয়ন, অত জোরে ছুটিস না রে। ভাই সেদিন জোরে বাইক না চালালে হয়তো আমি আজ তোর কাছেই থাকতাম!

আমি এই মসৃণ পিচের রাস্তায় বাইক চালাতে চালাতে শিউরে উঠি। নয় বছর আগে পল্টন মোড়ে তাজা রক্তের মাঝখানে নিথর পড়ে থাকা রুষা আর রনোর শরীরগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠতে চায়, আমার মনে হয় আমি এবার বাইকসহ পড়ে যাব। রুষা আমাকে সজোরে চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করে- পড়িস না, অয়ন। তোর পড়ে গেলে চলবে কেন বল তো। সবারই কি অসময়ে চলে যেতে আছে?

আমি দুদিকে মাথা নাড়ি। মিহিতার মুখ মনে পড়ে আবার। ঠিক তো, অসময়ে চলে গেলে আমার চলবে কেন? রুষা আলতো হাতে আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলে- তুই খুব করে চাইলেই হবে, জানিস!

আমি বলি- কী?

রুষা ফিসফিসায়- মিহিতা। খুব করে চাইলেই ঐ মেয়েটা একদিন তোর হবে। দেখিস।

আমি আবারও থই হারাই। রুষা কি আজকাল ভবিষ্যত দেখতে পায়? মানুষের মনের ভিতরটাও? জানি না। কেবল রুষাকে সঙ্গে নিয়ে আমি প্রগতি সরণীর রাস্তা ধরে এগোতে থাকি, মিহিতার বাসাটা ওদিকেই। থিকথিকে গাড়িঘোড়া আর গিজগিজে মানুষের ভিড় কেটে আমি আলো আঁধারি রাস্তার বুক চিড়ে এগোই। আমার চোখের সামনে স্থির হয়ে থাকে একটি আবছায়া মুখ- তার কতখানি রুষার, কতখানি মিহিতার আমি বুঝতে পারি না।