ন-পুরুষ ন-নারী

নাহিদা নাহিদ



লালকে যখন প্রথম দেখি তখন তার বয়স সতের বছর আট মাস তেরো দিন। কিন্তু প্রথম দেখায় তাকে অতটুকু ছোট মনে হয়নি আমার। বয়সজনিত জটিলতায় তখন সে প্রবেশনারি স্টেজে ছিল। দণ্ডপূর্বকালীন বয়ঃবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় ছেলেটার বয়স রোজই যেন কয়েকগুণ করে বেড়েছে। কেন, সে এক রহস্য। অথচ তার সেই মন্দ থাকার সময়ে তার গাল চুপসে যাওয়া কথা, চোখের নিচে গাঢ় অন্ধকারের কয়েক পরত প্রলেপ পড়ে যাওয়ার কথা কিন্তু লালে ক্ষেত্রে এসব কিছুই হয়নি বরং তার উদ্ধত সৌন্দর্য বাড়াবাড়ি রকম অহংকারে ক্রমশ প্রকাশ্য হয়েছে দিনের পর দিন। তার প্যারোল চাওয়া হয়েছে, প্রথমে আদালত তার সে আবেদন খারিজ করে দিলেও আইনের মারপ্যাঁচের সাথে ডাক্তারি কিছু হাইভোল্টেজ সাজেশানে শেষপর্যন্ত তার গৃহবাস নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়েছে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। আমার দায়িত্ব ছিল তার কৈশোরিক অন্তর্গত সমূহ অবসাদের মধ্য থেকে অপরাধ মনস্তত্ত্বের কারণ খুঁজে বের করে তার উপর চাপিয়ে দেয়া শাস্তি লঘু করায় বিবাদী পক্ষকে সাহায্য দান। রাষ্ট্রীয় দণ্ডবিধি আর মানবতাবাদী সংগঠনের দুই তরফা টানাটানিতে তাকে সাবজেক্ট করে একারণে বেশকিছু সময় আমাকে ঘুরতে হয়েছে লালের ঘর এবং তৎসলগ্ন বলয়ে। বলা যায় এইসব অ্যাসাইনমেন্ট তখন আমার যাবতীয় কর্মবৃত্তে মাকড়শার মত জাল বিছিয়ে তীব্র লালায় টেনে নিয়েছিল আমার হাত, পা, চোখ, মুখ এমনকি পুরো শরীর। কিশোর সংশোধন সংক্রান্ত মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে সর্বজন স্বীকৃত যে প্রশংসা, তা আমাকে সেই কর্মব্যস্ত জীবন দিয়েছিল, দিয়েছিল মোহ উত্তেজনা আর অন্ধকারে বসবাসের তীব্র স্বাদ। যেহেতু আমি ডিভোর্সি, সংসার বলতে গেলে লালের মত একই বয়সী একটা ছেলে, কিন্তু এই সত্য আমার জন্য পুরোপুরি সত্য ছিল না। আমার পূর্বকার অতীত বিস্মৃত হয়ে কোন প্রসিদ্ধ গবেষণাগারের বিরাটকায়
মাইক্রোস্কোপ হওয়াই যেন আমার নিয়তি হয়ে দাড়িয়েছিল তখন, যার প্রধান কাজ লালদের মত কিশোদের মগজ খুলে খুলে খুঁজে দেখা কোথায় তাদের সংরাগ, কোথায় ক্রোধ, কোথায় জিঘাংসা।

ছেলেটার দিকে তাকালেই কিছুটা সময়ের জন্য আমি ভুলে যেতাম আমার বয়স। কপালের টিপ, শাড়ির কুচি কিংবা বসনের আর অন্যান্য সকল কিছুর প্রতি অতিরিক্ত সচেতন হয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখতাম লালের মুখ। তাকে দেখে আমার কেবলি মনে হতো তার এই উদগ্র সৌন্দর্যে ঐশ্বরিক মারপ্যাঁচের বাইরেও আছে গভীর কোন গাণিতিক সূত্র, যা তাকে তার নিষুপ্ত সকল অন্ধকারেও জ্বেলে রাখে উজ্জ্বল অঙ্গিস্ফুলিঙ্গের মত, সেখানে নারী কেবল পতঙ্গ মাত্র। থেমে থেমে লালের শ্বাস পড়ত তপ্ত! আমি দেখতাম। সে তাকাত ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। বয়সের তুলনায় চওড়া কাঁধ এবং চিবুক নিয়ে লাল যেন ভীষণভাবে বলে যায় তার অতৃপ্তি আর তৃষ্ণার কথা। তার সেইসব হর্ষ-বিমর্ষের অদ্ভূতুরে জগত ঘেটে আমি কোন পাপ খুঁজে বের করতে চাইতাম না কেনো যেনো। স্নেহান্ধ নয় মোহান্ধ হয়েছিলাম তার প্রতি। এছাড়াও তার প্রি-হিস্ট্রি এমন ছিল না, যা তাকে এক দুগ্ধপোষ্য শিশুস্বরূপ বালকের পরিচয় অতিক্রম করে তার শিশুকামী বা শবকামী চরিত্রটি আমার সামনে এনে দেয়ার মতো অবস্থা তৈরি করে। নথি অনুযায়ী লাল ছিল মানসিক বিকারগ্রস্ত। যদি আমার তা মনে হয় নি। কিছু একটা চলে ওর ভেতর একথা সত্য; সিজোফ্রেনিক বা কোল্ডেড এট্যিউচুড কোনটাতোই ওর পুরোপুরি স্থিরতা ছিল না। প্রথম যখন প্রবেশনারি ক্যাম্পে ওর অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে তখন কেয়ারটেকার ভেবেছিল ছেলেটার মৃগীরোগ। সব সময়ই ভালো শুধু হঠাৎ খুব অল্প সময়ের জন্য অন্যরকম হয়ে যায়। নিজের হাত-পা নিজেই কামড়ায়। রীতিমত অসম্ভাব্য দৃষ্টিতে আর সকলেও দেখতে আসতো তার প্রকৃতিবিরুদ্ধ আচরণ। ছেলেটা ধর্ষক, খুনি তবু যেন তার সেসব পরিচয় মুছে গিয়ে ওর প্রকাশ্যে প্যান্টের জিপার খুলে হাতের তালুতে ঘষতে থাকা সুষুম্নায় নাটকীয় মৈথুনে লোকের করুণা হত, আহা অত সুন্দর ছেলে এমন করে কেন! যেহেতু এখন পর্যন্ত এদেশে এই বিষয়ে আমিই একটু করে টরে খাই তো মানবাধিকারের কর্তাব্যক্তিরা আমাকেই খুঁজে পেলো এর রহস্য সুরাহা করবার। এনজিও থেকে এক বছর সময় দেয়া হয়েছিল। এক বছর বেশ অনেকটা সময় হয়তো!

লাল ঘুমিয়ে গেলে প্রায়ই আমি নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখতাম ওর কেমন কেমন করা শরীর ও মনের গতিবিধি। কোমরের গিঁটের কাছে বিশেষ অঙ্গ ছুঁই ছুঁই মন্ত্রসিদ্ধ হাড়, বাজুবন্ধে বেঁধে রাখা তক্ষকের মৃত চোখ, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের অদ্ভুত সব বৈসাদৃশ্যময় মিশ্রণ। এই সব বাঁধাবাঁধি ওর মায়ের করা। আমার হাসি পেত 'মা' শব্দটায়। আজকালকার দিনে এসবও চলে। ছেলেটার মাকে আমার কেমন যেন অশিক্ষিত, আনকালচারড মনে হত, অথচ চলনে বলনে তিনি আমার সমগোত্রীয় না হলেও পীর ফকিরে বিশ্বস্ত মেনে নিতে কষ্টই হত।
আমি লালের ঘরে গেলে মাতা-পুত্রের মুখভঙ্গি এমন হয়ে যেতো যেন আমি এক কুৎসিত তেলাপোকা কেবলি উড়ে উড়ে পড়তে চাই তাদের গায়ে। অথচ আমি জানি আমার সংস্পর্শ আনন্দদায়ক। মানুষকে মোহময় আকর্ষণের মাপা হাসি, চাপা ভ্রুকুটির জাদুর কৌশল আমার রপ্ত। নেহায়তই অল্প বয়সে গৃহছাড়ার রোমাঞ্চে বিভোর হয়ে বিয়ে বা সংসার আমার হলেও আমাকে কখনোই সংসার বাঁধেনি কিংবা সংসারকেও বাঁধিনি আমি। আমার ভেতরের পালাই পালাই মন আমার সকল কিছুর মাঝেও উপচে উপচে পড়ে গোপন সংকেতে; শুধু পুরুষ বোঝে তার ভাষা। অথচ লালের অনাগ্রহ প্রবল প্রতাপে নাড়িয়ে দিত আমার আত্মবিশ্বাসের ভীত। সে তার ঘরের দেয়ালে ঝুলানো ভয়াল-দর্শন বাইসনের মাথার দিকে তাকিয়ে একা একা কাটিয়ে দিতে চাইত সময়ের প্রতিটি স্থবির মুহূর্ত। আমিও স্থবির আবেগে চাইতাম, তাকে আবিষ্কারের সকল মন্ত্র আমার হোক। বুঝতাম না লালের প্রতি আমার সেই অন্যরকম আকর্ষণের পেছনে কি কাজ করত? হয়তো তার নেগেটিভ ক্যারাক্টারিস্টিক ইমেজ অথবা এট্রাকশন এট ফার্স্ট সাইট অথবা তার অতিরিক্ত পুরুষালি চিবুক বা চোখ। কি জানি কোনটা। তবে এটা টের পেয়েছি লালের ক্ষেত্রে আমার চৌকস ব্যাপারটা আমি ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে পারিনি। কেবল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওর মাকে জেরা করাটাই প্রধান কর্তব্য মনে হত-

"আচ্ছা, আপনি তো ওর মা, সবচে' কাছের মানুষ হবার কথা। আপনি একদম প্রথম কবে টের পেয়েছেন এসব বলতে পারেন?"
" কিরকম?"
"এই ধরুন অ্যবনরমাল সেক্স ইনটেনশন বা ভায়োলেন্স টেন্ডেন্সি এগুলো তো এক দু'দিনের ব্যাপার নয়। একটা লং প্রসেসে শৈশব থেকেই একটু একটু করে এগুলো কারো মাথার ভেতর, আই মিন ক্যারেকটারের ভেতর সেট হতে থাকে। আপনারা প্রথম কবে ওর অস্বাভাবিকতা টের পেয়েছেন? "
লালের মায়ের চোখের মণি ঘুরে যায় ৪৫ ডিগ্রী কোণে, অতীত কাটছাঁট করে যতটুকু আমাকে বলা যায় তার পরিমিতি হিসেব করবার মাঝখানে আমিই আবার বলে বসি-
" আপনার কি আমার কথা কঠিন লাগছে? বোঝাতে পারিনি বোধ হয়''
"না ম্যাডাম, বুঝতে পেরেছি। আসলে তেমন কিছুই কখনও চোখে পড়েনি।"
"আই সি...আপনি সবটুকু বলছেন না। দেখুন, আপনার ছেলের সুস্থতার জন্যে আমাকেই আপনার জানাতে হবে সব। যদি আপনি চান শাস্তি লঘু হোক..। আর তাছাড়া আমি নিজেও একজন মা, ড. হিসেবে না হোক একজন নারী হিসেবে আমাকে বলতে পারেন সব।

যদিও নিজের মা পরিচয়ে আমার অস্বস্তি হয় তবু এরচেয়ে নিরাপদ অস্ত্র আপাতত আমার হাতে আর কিছুই ছিল না তখন।

এবারে ভদ্রমহিলা একটু টললেন বোঝা যাচ্ছে। তবু তার ইতস্তততার মধ্য দিয়ে যা বেরিয়ে এলো তা অনেকটাই ফিল্টারাইজড। মনে হলো কোটি বছরের সভ্যতার ইতিহাসেও যত পরত থাকে না লাল নামক এক কিশোরের জীবনের প্রতি ভাঁজে তারচেয়ে অধিক পর্দা, গোপন সব দরজা! লাল নবম শ্রেণিতে উঠবার পর পরই তার জন্য একজন হাউজ টিউটর রাখা হয়েছিল, কমল; বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র। ওরা খুব ঘনিষ্ঠ হয়েছিল, বাড়তি বেতন, শৌখিন উপহার এবং আদর কমলকে টানত এবাড়ি! হ্যাঁ আদর! তখন পর্যন্ত ওটাকে যৌনতা মনে হয়নি কারো। ছেলেটাকে ছাড়িয়ে দেওয়ার পর লাল সারাদিন মুখ গুঁজে রাখতো মোবাইল স্ক্রিনে অথবা ল্যাপটপে, সেখানে কেবল কিছু সফটওয়ার আর কিছু শো করা কিংবা হাইড করা মেমোরিজ। সেবারই তার প্রথম সুইসাইড অ্যাটেম্প এবং এর পর কমলের সাথে লালের বেশ কয়েকমাস এক হয়ে থাকা।

ইয়ার ড্রপ করে লালকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেয়া হয় শেষ পর্যন্ত। আশ্চর্য রকম শীতলতায় কোন দ্বিমত ছাড়াই সেবার সে হোস্টেলে চলে যায় । যদিও লালের সাথে খুব বেশি কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়না, তবু প্রতিনিয়তই তার উপেক্ষার পারদ ঠেলে যতটা কাছে গেলে দুএকটা উত্তর পাওয়ার মত জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় ততটা হয় আমার। তেমন একদিন বেশ অনেকটা সময় ধরে দেখি তার ঘুমন্ত আচরণবিধি। অসীম আবেগে আস্তে আস্তে হাত রাখি লালের কপালে, কোমল। তীব্র এক সম্মোহনী প্রশ্বাসে আমি ক্রমশ তলিয়ে যাওয়ার আগে অনুভব করি ছেলেটা ঘুমের ঘোরে মা মা বলে কাঁদতে কাঁদতে আমার হাত জড়িয়ে ধরছে। বিদ্যুৎপৃষ্ঠে তড়িতাহত হওয়ার যন্ত্রণায় আমি ছিটকে আসি ঘর থেকে। আমি বুঝে যাই ওর অস্তিত্বে ও কত গভীরভাবে একা। কেউ কেন ওর থাকে না একান্তে, সে রহস্যে কেন যেন আমার ওর মাকেই দায়ি করতে ইচ্ছে হয়। তার প্রতি এক তীব্র ঈর্ষায় আমি ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাই, যদিও আমি কখনো চাই না লালের আমার প্রতি কোন মা রূপেন অনুভূতি হোক। তারপরও বিশ্রী লাগে আমার, কুৎসিত লাগে লালের স্পর্শ।

লালের হোস্টেল থেকে ফিরে আসার কারণ জেনেছি আরো অনেক পরে। স্কুল ছেড়ে আসার জন্য ওর মা 'হেরিয়েট' নামক একটা কাল্পনিক চরিত্র বার বার সামনে নিয়ে আসত। লালকে ভিকটিমাইজ করার চেষ্টায় তার আইনজীবীরা এই অপ্রকৃতস্থ কাল্পনিক ব্যাপারটাকে ব্যাবহার করতে চেয়েছেন। লালের কাছ থেকে জানতে পারি একাডেমির কোন একটা নাটকে তার প্রিন্সিপলের তৈরি করা 'হেরিয়েট' নাটকে লাল মূখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিল। দ্বৈতসত্তা এবং বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত পিশাচিনী সে। অভিনয় মঞ্চ থেকে নামার পর লালের সাথে অথবা লাল কর্তৃক কিছু একটা হয়েছিল যা ছিল অস্বাভাবিক। হস্টেল-মলেস্টেশন স্ক্যাম, বা হোমো সেক্সুয়াল ব্যাপারগুলো আবাসিকের জন্য নতুন কোন বিষয় নয়। কিন্তু লালের বাসায় উপর্যুপরি 'নট অ্যালাউ ইন হস্টেল' টাইপ চিঠি আসতে শুরু করলে বিষয়টি আর হাল্কা থাকে না। অবশ্য লালের মাকে কোন তরফ থেকে যেন বোঝানো হয়েছিল সময়ের সাথে সাথে ছেলেতে-ছেলেতে বা মেয়েতে-মেয়েতে এইসব ঘটনা এখন চলে। লালের এডিকটেড হয়ে ওঠাটাও নাকি ওই বয়সের দোষ, সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে সব।

কী যে ঘটেছে আর কী যে ঘটেনি তা শুধু একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয় করে রাখার সুকৌশল চেষ্টায় এর বেশি তারা আমায় আর কিছুই জানতে দেয়নি। সুন্দরের মাঝে পাপ আর পংকিলতার সহাবস্থানের জেন্ডার ভিত্তিক হাইপোথিসিসে আমার কাছে যেসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোর কোন কুল কিনারায় না করতে পেরে আমার মস্তিষ্ক ক্রমশই বিরক্ত হয়ে ওঠে। আমি বুঝতে পারছি না কেন লালের কেসটায় আমি এত বেশি অসহিষ্ণু। কোথায় যেন লালের সাথে আমি আমার নিজের একটা সম্পর্ক সূত্র খুঁজে পেতাম বলেই কি লালকে আড়াল করার আমার এত বেশি তাড়া? আসলে আমার কৈশোরও ছিল এমনই বিক্ষিপ্ত ও উগ্র। আমার জীবনে উপর্যুপরি সকল পুরুষই প্রেমিক। সঙ্গোম ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছায় যা-ই ঘটেছে আমাকে তলিয়ে নেয়নি কোনটা।তাহলে লাল কেন ধর্ষক হয়ে উঠলো, পুরুষ বলে। লাল সম্পর্কে এইটুকুও জানা যায় শেষবার সে যখন হোস্টেল থেকে আসে তখন থেকেই লাল মাত্রাতিরিক্ত এডিকটেড। হয়তো হোস্টেল তারজন্য কমফোর্ট জোন ছিল না কিন্তু সেক্সুয়াল প্রেকটিসাইজড প্লেয়ারের অভ্যস্ততার সুখ সে বাসায় এসে হারিয়ে ফেলে। লালের মায়ের ভাষ্যে সেবারই প্রথম লাল তাদের যৌন জীবন এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত অধ্যায় সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠে। যা কিছু অনৈতিক বিভৎস, তার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণে লাল যেন ক্রমেই রূপান্তরিত হয়েছিল এক অন্য লালে। লালের মা ঘুণ্নাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি তার নিজের সন্তান তারই ঘরে লাগিয়ে রেখেছে গোপন চোখ। এই কুৎসিত ঘটনার পর-পরই তাকে ডাক্তার দেখানো জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু ততদিনে সে হাতের কাছে কোন বেড়ালের বাচ্চা বা তার প্রিয় পেট খরগোশের যৌনাঙ্গ কেটে দেয়ার মত নিষ্ঠুরতায় উন্মত্ত হয়ে উঠছিল। এসব দেখে ভদ্রমহিলা আর সাহস নিয়ে আগাতে পারেনি ছেলের কাছে। আদতে তার ক্রুর হিংস্র চোখের সাথে এইসব আচরণ আমার কাছে খুব বেশি অস্বাভাবিকও মনে হয় নি। তার অবদমিত আকাঙ্ক্ষা বা বয়ঃসন্ধির সংকট ব্যাপারটা ওর সাথে ঠিকঠাক মানানসই না হলেও এই ধরনের পরিবর্তন আমার কাছে অপ্রত্যাশিত লাগে নি। আমার আফসোস হয়েছিল, ছেলেটা মাত্রাতিরিক্ত বোকা কিংবা নির্বোধ না হলে সস্তা চটির নোংরা চটুলতা কীভাবে তার মগজ খেয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে, অদ্ভুত!
যত যাই হোক আমার কেন জানি মনে হত লালের মায়ের কাছে লালের প্রি-অবসেসড সাইকোলজির কোন গুরুত্ব ছিল না। একবার নাকি লাল কাকে বলেছিল অ্যানাল এক্সপেরিয়েন্স করতে চায় সে। বিকজ হি নো এবাউট দিস ফ্রম হিস মাস্টার; হিজ প্রিন্সিপল, হি ওয়ান্ট টু বি অ্যা পারফেক্ট পার্টনার অ্যাজ হি লাইক হিজ মাস্টার লাভ অফ হ্যারিয়েট। ঘন্টার পর ঘন্টা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লাল চেঁচিয়েই গেছে 'আই অ্যাম নট দ্যা হেরিয়েট, অ্যা অ্যারোগেন্ট উইচ অফ প্রিন্সিপল। আই ওয়ন্ট টু বি হিউম্যান বিং অ্যা স্মার্ট লুকড বয়"। সেসময় মায়ের সামনেই তার নিন্মাঙ্গ থেকে গড়িয়ে পড়ত ঘন ফোটা সাদারক্ত। মা জাপটে ধরতো তার সদ্য কৈশোর পেরুনো কোলের শিশুকে যার এখনো পুরুষ হওয়ার বয়সই হয়নি। লাল এত বেশি অসহনীয়, এত বেশি দানবীয়, লালের পাশে দাঁড়ায় এ সাধ্য। অতঃপর ভদ্রমহিলা যা করল তাকে কী বলা যায়? সবকিছু জানার পর আমি দ্বিধায় ছিলাম চিকিৎসা কার দরকার লালের, লালের মায়ের না আমার?

লালের মনস্তত্ত্ব বুঝতে আমি ঘুরে ঘুরে অনেকবার লালের চিত্রকর্মগুলো দেখেছি। রঙের খেলায় কী যেন এঁকে রেখেছে ক্যানভাসে! জীবনের এমন অনেক কিছুই সে এঁকেছে যা হয়ত সে আঁকতেই চায়নি। স্যুপের বাটিতে ঘোলাটে ধূসর পাথর, স্যাঁতস্যাঁতে পানির ভেতর দেঁতো কোনো খয়েরি অক্টোপাস, গাঢ় সবুজ বিমর্ষ সাদায় গলিত ব্যাঙ অথবা মৃত কুকুরের মুখ। কোথাও সে মুখ বাবা, মা কিংবা হ্যারিয়টের আদল। বিছানায় ঠায় বসে থাকতো সে। নড়তেও চাইতো না ! তার চোখে চোখ রেখে রেপিড মুভমেন্ট মাপতে মাপতে মাঝে মাঝেই আমার কেমন বিমর্ষ লাগতো। পচে যাওয়া মৃত মাছের মত তীব্র ওর নিঃশ্বাসে কেবল ক্ষয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
ওর ঘরে আমি আর ওর মা ছাড়া কোন নারীর প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। এমনকি প্রবেশন অফিসারও ওর ঘরে আসতে কেমন অস্বস্তি বোধ করতো। তার বাবা একটা সাহায্যকারী ছেলে ঠিক করে দিয়েছিল। আমার পরামর্শেই নানারকম আলোর বাতি লাগিয়ে দিয়ে যেত ছেলেটা। দেয়াল জুড়ে লাগানো পর্দায় আমি মাখিয়ে রাখতাম সাদা রং। সে ঘুম থেকে জেগে উঠবার আগেই ঐসব আলোহীন দেয়ালে গেঁথে রাখতাম সুইচ বোর্ড। চোখ খুলেই জ্বলে উঠত এলোপাতাড়ি আলো। হতবিহ্বল ছেলেটা মুহূর্তে মুহূর্তে পাল্টে যাওয়া দেয়ালে খুঁজতো পরিচয়হীন কোন অচেনা জগত। আমি দেখতে চাইতাম ঐসব শব্দহীন ভূতুরে আলো-আবছায়ায় তার ভয়, আনন্দ বা বিরক্তি কেমন প্রতিক্রিয়া করে। ছেলেটার আসলে চোখ বলে কিছুই ছিল কিনা এ নিয়ে ক্রমশই আমার সংশয় বাড়ে। এন্টিফ্র্যাজাইল ট্রিটমেন্টে ধীরে ধীরে টের পেয়েছি ওর যৌনপ্রীতি অথবা দানব হয়ে ওঠার প্রথম রহস্যে ওর অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা নয় বরং মা বাবার কোন অস্বাভাবিক সম্পর্কই যেন মূল ভূমিকায়। ছেলেটা তার ক্ষোভ প্রকাশের উপযুক্ত ক্ষেত্র পায়নি, বলেই এই আত্ম -বিধ্বংসী মৈথুন আশ্রয়।

ও যখন প্রথমবার প্যানিস অ্যাটাক অ্যাটেম্পট নিল তখন ওর জ্ঞান ফিরতেই চিৎকার করে ওর মা বলেছিল ওকে মেরে ফেলো এক্ষুনি মেরে ফেলো, ও আমার ছেলে নয় ও একটা দানব। লালের হাতে তখন ওর নিজেরই পৌরুষদণ্ডের বিষাক্ত লাল রক্ত সসের মত লেপ্টে ছিল। কুৎসিত পিচ্ছিল সে কদর্য নিয়েও লাল বলেছিল 'আই উড বি অ্যা এক্সপ্লোরার, আই হেভ টু বি এ 'এনাল ফাকার', হোয়াই আই অ্যাম সো অ্যালোন" লালের মা সেই অপ্রকৃতস্থ স্মৃতির ভার তেঁতো মুখেও স্বীকার করতে চাচ্ছেন না যেন। তবু তিনি লালের জন্য যোগাড় করেছিলেন এক নারী। না ভুল বললাম নারী নয় শিশু। বোবা কালা শিশু। প্রতিরোধহীন এক অসহায় প্রতিবন্ধী। লালের বাবা কী জানতেন না সব। তবু তার আকুতি এমন, থাক গোপন থাক সব। কেন যেন লালে তার বাড়াবাড়ি রকম নীরবতা, সাথে গোপন প্রশ্রয়ও। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের মীমাংসা করার জন্য যতটুকু যুক্তি তর্ক করা প্রয়োজন ঐটুকুতে আমি পৌঁছুতে পারিনি। আইনের মারপ্যাঁচেও খোলাসা হয়নি পিতা পুত্রের অন্তর্নিহিত কোন রহস্য। কিছু একটা ছিল হয়তো তাদের পারিবারিক অথবা বংশগত অস্তিত্বের সাথে জড়িত যা আমার কাছে অস্পষ্ট বা অপঠিতই ছিল শেষ পর্যন্ত। লালের এই ফ্রাঙ্কেস্টাইন তৈরি হওয়ার পেছনে তার বাবা নামক লোকটার ভূমিকা অনেকটাই চুপচাপ ধরনের নিঃশব্দ মনে হয়েছে। ঠিক আমার বাবার মত। ওরা কী লালকে এমন কিছু বানাতে চেয়েছিল যা ওর জন্য হয়ে ওঠাটা ছিল অসম্ভব? আমার বাবা যেমন তার কোন কল্পিত পূর্বপুরুষের আভিজাত্য বয়ে বেড়ানো নিয়ে অবসেশনে ভুগতেন, কে জানে লালের বাবাও হয়তো তাই। আসলে খুব গরিব ঘর থেকে যারা একটু ধনী হয়ে ওঠার পথে আগায় তাদের ভেতর তো এ ধরনের বিভ্রম থাকেই। তারা রূপকথার সেই রাজাদের জীবন কিনতে কিনতে দাস হয়ে যায় রাজকীয় মিথে। কিন্তু চাইলেই কি সব হয়। টাকায় যত সহজে বাইসনের মাথা কিনে বসার ঘরের দেয়ালকে অভিজাত করা যায় চাইলেই অত সহজে পূর্বপুরুষের অতীত ইতিহাস বাদ দিয়ে বর্তমানে আভিজাত্যের ছাপ ফেলা যায় না। পাঁচপুরুষ লাগে। আমার বাবা আমাকে পুতুলের মত দেখিয়ে দেখিয়ে অভিজাত হতে চেয়েছেন। সফলও ছিলেন। লোকজন ঘরে এলে প্রথমেই আমাকেই বাজিয়ে দেখত। বাবা খুব খুশি হতেন মেয়ের চমৎকারিত্বে। লালের বাবাও কি তাই? কি জানি মনে হয় না তো। আমাকে খুব শৈশবে ভর্তি করা হয়েছিল মৃত্তিকাগন্ধী শৈল্পিক নামের এক দেশীয় চিত্রকলার স্কুলে। এরপর পাঠানো হয়েছে ইংরেজি শিক্ষার হাইস্কোরড একাডেমিতে। জগদ্বিখ্যাত উস্তাদ দিয়ে আমাকে শেখানো হয়েছে গান। আমার কণ্ঠে ছিল এমন সব সুর যা ছিল নিতান্তই অপ্রাকৃত জগৎ থেকে ছিটকে আসা কল্পিত সুরমূর্ছনাপল্লব। আমি জানি আমার বইয়ের তাকের রূপকথারা জীবন্ত। তবু আমার এত বেশি সুন্দরের মাঝে আমি খুব গোপনে বয়ে চলি লালের মতই খুব বেশি অসুন্দর। কেন? তার উত্তরও আমি জানি। এখানে লাল কি আর আমি কি!


অবশেষে আমি সেই বোবা কালা মেয়েটার মায়ের সন্ধানও পেয়ে যাই। নসুর মা। লালের মায়ের সামনে মহিলাকে যখন ডাকা হয় সে ভীত হয়ে ওঠে খুব। তার ম্রিয়মান অবয়বে জান্তব ভয়। লালের অন্ধকার ঘরে তার নিঃশ্বাস গাঢ় হয়ে ওঠে। বহু সাধনায় লালের পক্ষের আইনজীবীকে সামলে-সুমলে লালের চিকিৎসার স্বার্থে নসুর মায়ের সাথে বসার সুযোগ ঘটেছে আমার। তার বয়ানে আমার সামনে একে একে খুলে যায় লালদের এক অন্য জীবন। লালের বাবা ব্যক্তি জীবনে ন-পুংসক ছিলেন এই তথ্য আমাকে খুব বেশি চমকিত করে না। কেন যেন আমার পূর্বানুমান এমনই ছিল। আমি যেন জানতামই লালের এই অযাচিত অপৌরষত্ব তার মায়েরই লোভের ফল। পত্রিকার প্রতিবেদনে নসুর মায়ের যেটুকু বর্ণনা সবিস্তারে এসেছে তার চোখ তার মেয়ের কথা বলতে গিয়ে তারচেয়েও বেশি করুণ হয়ে উঠেছে। তার নসু স্থুল শরীরের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি মেয়ে। মেয়েটাকে বাসায় রেখে কাজে আসতো মহিলা। কিন্তু লালের মা খুব আন্তরিকভাবেই বলেছিলেন মেয়ে নিয়ে তাদের সাথে থাকতে। ঘরের কোনা কানচায় কত বাড়তি রুম। মেয়েটাকে কাছে কাছে রাখার সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞ হয়েছিলো নসুর মা। তার এলোমেলো কথাগুলোকে গোছানোর পর অবশেষে যা উদ্ধার হয় তা অনেকটা এমন-
"আফা আমার এই বাড়ির কাম ছাড়া যাওনের কোন জায়গা ছিল না। মায়াডারে এতদিন গ্রামে মায়ের কাছে রাখলেও পাগল মাইয়া লইয়া শহরে থাকার সুযোগ কে ছাড়ে। বড় আম্মায় কইছে বাকি জীবন খাইয়া-পইরা বাঁচার মত টাকা-পয়সা দিয়া রাখব। এই বাড়িতে আম্মাই সব। যদিও আম্মারে এই বাড়ির কেউই দেখতে পারে না। ডরায় খালি। তবু মাইয়া নিয়া বড় আশায় আসছিলাম। সবই ভালো খালি বড় আব্বা আর আম্মার ঝগড়া বানলে ভাইজান জানি কেমুন করত, ছটফট ছটফট। ঘরের মইধ্যে বিড়ি সিগারেট, নেংটা মাইয়াগো ছবি নিয়া হ্যায় কাটাকুটি করে। বেশি বিরাগ উঠলে আমারে রান্ধন ঘরে আটকায়া আমার মাইয়াডা লইয়া যাইত ঘরে। আফা আম্মার ভয়ে আমি কোনদিন কিছুই কইতাম না। আমার মাইয়ার সারাশইলে দাগ আর দাগ। শেষকালে মাইয়া আমার মইরা গিয়া নিজেও বাঁচল আমারেও বাঁচাইল। দুঃখডা কি জানেন আফা, আমার মরা মাইয়াডারে হ্যায় ছাড়ে নাই। এই এট্টুক পোলা! আব্বায় লোক ডাইকা দরজা না ভাঙলে মাইয়ারে শইলের বিরাগে কাঁচা খায়া ফেলত লাল ভাই। আমার মাসুম মাইয়্যা, গায়ে গতরে বড় হইলেও হ্যায় ছোড ছিল গো আফা ছোড ছিল। আম্মার টেকার জোর আছে হ্যার পোলা হ্যায় বাঁচাইব কিন্তু আমার মাইয়া?"

আমার আর নসুর মায়ের কথা শোনার সাধ্য হয়নি। মনে হয়েছে কোন ফুটন্ত লাভায় আমার চামড়া অস্থি মাংস পুড়ে গলে গলে পড়ছে, দারুণ তীব্র দহনে আমি নীরব হয়ে যাই। হুরমুর করে মনে পরে আমার প্রথম জীবনের সব অচেনা কালো অধ্যায়। আমার বেলায় সব উল্টো ছিল। আমার ভয়ংকর বাবা ছিল আমার আর আমার মায়ের ভাগ্য বিধাতা। আমার গরীবঘরের মাকে যখন তখন মারত খুব, একবার তালাকও দিয়েছিল। মা রাগ করে তার বাপের বাড়ি গেলে আমিও যাই সাথে। মায়ের এক পাগল ভাইকে ঘরেই বেধে রাখা হতো সব সময়। পল্টু মামা। কী মনে হতে এক দুপুরে আমি একা একা হাজির হয়েছিলাম মামা দর্শনে। হায় তখন আমার সবে সাড়ে এগারো। এখনো আমি ঘুমের ঘোরে অজস্র দুঃস্বপ্নে ভিড়ে দেখে যাই এক লিকলিকে কুৎসিত কালো পৌরুষদণ্ড, এক অপ্রাকৃতস্ত লালাঝরা মানুষের শরীর মুচড়ে মুচড়ে লুঙ্গির গীট খোলার কুৎসিত আনন্দ।

"আফা জানেন পরথম পরথম আমার মাইয়ার ছেপে-লোলে লাল ভায়ের শরীর জবজবা হইলে আম্মায় আমারে বকত। কইত মাইয়া পরিষ্কার রাখতে পারস না। আমার মাইয়ারে হেরা ঘিনাইত আফা খুব। এমনকি লাল ভাইজানও। আমার নসুরে ঘাটানোর পর হ্যায় কেমন করে। খালি ওয়াক ওয়াক। এইসব করলে কোনবারই আমার মাইয়ার হুঁশ থাকত না। খালি রক্ত আর রক্ত গো আফা, লাল রক্তের দরিয়া।
নসুর মা আরো কি কি যেন বলেছিল কিন্তু কোন কথা আমার কানে ঢোকে নি! আমি যেন চমকে চমকে চমকে চলে গিয়েছিলাম কখনো অতীতে কখনো বর্তমানে। মনে হয়েছে আমিও যেন কোন এক নসু এই আমার বুকে পিঠে অজস্র সিগারেটের দাগ, স্তনের বোটায় ছিঁড়েখুড়ে ঘা করার হিংস্রতা। এক গাঢ় বিষাদ-বিহ্বলতায় আমি লালের মায়ের মুখপানে চেয়েছিলাম খানিকটা। সে আপন মনে বিড়বিড় করে বাতাসে শুনিয়ে যাচ্ছে তার আক্ষেপ-- "আমার ছেলেটা এককালে খুব রোদ ভালবাসতো, ওর মুখে রোদ পড়লে ছোট ছোট ঠোঁট চিকচিক করে উঠত সোনালি আলোয়। অথচ আমার সেই সোনার পুতুল আজ! আমার লাল!''

আমি স্পষ্ট দেখতে পাই লালের মায়ের চোখে মুখে পুত্র কর্তৃক নোংরা ছোঁয়ায় কী কুৎসিত ঘৃণ্য অনুভূতি উপচে উপচে পড়ছে। হায় আমাদের পুতুল জীবন হায় আমাদের অসুন্দরের অসুখ! পল্টু মামার ঘটনায় আমার বাবার মুখও এমন তেঁতো হয়েছিল। আমি বুঝে যাই এখানে রোগ অথবা রোগীর চিকিৎসা অনাবশ্যক। চিরাচরিত কোন নিয়ম এখানে আমার অঙ্কের সূত্রের মত নিয়মমাফিক মিলবে না। সমীকরণের ফলাফল শূন্য মেলাতে এখানে আমার সকল সূত্র শূন্য শূন্য হয়ে যাওয়া আটকায়; এই সাধ্য কার!

এরপর লালের জেল হয়েছে না ফাঁসি ; সে তথ্য জানার আগেই লাল বিষয়ক সকল কৌতূহলের ইস্তফা দিয়ে আমি ঢুকে যাই আমার পরিবার একান্তই গোপন জগতে। কারণ ততদিনে আমার আনলাকি থারটিন বয়সের পুত্র আফ্রিদ আমারই প্রবল প্রতাপের মানবসেবার অন্তরালে ঘরের গৃহকর্মীর সাথে অযাচিত যৌনাচারে বেশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এবং নতুন এক অন্ধ কারাগারে অক্ষম মা হিসেবে আমার পেরোলের আবেদনপত্র অতি সঙ্গোপনে নামঞ্জুর করে দিয়েছে সে।