ভার্জিনিয়া! ভার্জিনিয়া!

নভেরা হোসেন



কম্পিউটারের স্ক্রিন গলে ঝাপসা মতো নারী, বয়সটা ঠিক বোঝা যায় না, ছবিতে স্পেশাল ইফেক্ট দিয়ে ঝাপসা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। চোখে-মুখে ধারালভাব। প্রথম দেখাতে শঙ্খিনী সাপের কথা মনে হয়, ভঙ্গিটা পুরানো দিনের সিনেমার নায়িকাদের মতো। কয়েকদিন শুধু মুগ্ধ হয়ে ভার্জিনিয়ার লালাভ পপি ফুলকে দেখা। পপি পুড়ে পুড়ে যে ছাই হয় তার পোড়া গন্ধও একটু একটু করে নাকে আসতে লাগল। মেসেজটা প্রথমে এলো ওয়াল্ডেন পন্ড এর সূত্র ধরে। ফেসবুকে ওয়াল্ডেন পন্ড এই ঠিকানাটা আজকাল ব্যবহার শুরু করেছিল শিবব্রত। কে জানত সেই হারানো পুকুরের খোঁজে ভার্জিনিয়ার কোনো এক তরুণী না মধ্যবয়সি দিনরাত ছোট খুকির মতো ছটফট করছে।
ইজ ইট ওয়াল্ডেন পন্ড? আই অ্যাম লুকিং ফর দ্য অ্যাড্রেস।
শিবব্রত কী বলবে বুঝতে পারছিল না প্রথমে। হ্যাঁ বলাতে আবার মেসেজ আসতে লাগল।
মেয়েটা জানতে চায় ওয়াল্ডেন পন্ডে কি করে যাওয়া যায়? সেখানে সে যেতে চায়। তারই খোঁজে এতকাল। কত অ্যাড্রেস কত গল্প কিন্তু কেউতো বলতে পারে না ওখানে কিভাবে যাওয়া যায়...
শিবব্রত বলে কেউ জানে না তাই বলতে পারে না, কিন্তু আমি জানি কি করে যাওয়া যায়। কেউ যদি সত্যিকারভাবে মনে-প্রাণে কোথাও যেতে চায়, সে পারে!
লালাভ পপি তন্ময় হয়ে শুনতে থাকে শিবব্রতের কথা আর বলে চলে; সে হচ্ছে এমন এক পপি যে ভার্জিনিয়ার পাথুরে জমিতে ফুটে থাকে, নিঃসঙ্গ একা। মৃত্যুর এক ছায়া তাকে ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ কিন্তু কখনো তার মৃত্যু হবে না, অনন্ত তার জীবন, সে অনন্ত সিসিফাসের দরকার লুকানো ওয়াল্ডেন পন্ড; সে জলে ডুবে মরবে নয়তো ফিরে পাবে নতুন জীবন। লালাভ পপি আরও লেখে শরীর নয়, মন নয়, চুম্বকের মতো তাকে যা টানে তা অন্য কিছু আর তার খোঁজে নিজের তৈরি পৃথিবীতে সে ঘুরে বেড়ায় একাকী এবং দিশেহারা।
শিশুদের কোয়েস্ট ফর ক্যামলেট এর ওই গান এর মতো...
Like every tree
Stands on its own
Reaching for the sky
I stand alone
I share my world with
No one else, all by myself
I stand alone
I know the sound of each rock and stone
And I embrace what others fear
You are not to roam in this forgotten place
Just the likes of me are welcome here
Everything breathes,
And I know each breath
For me it means life
For others, it's death
It's perfectly balanced
Perfectly planned
More than enough
For this man

এই হচ্ছে তার জীবন, আর কিছু নয়, অন্ধ ছেলেটির মতো সে একাকী পাথরের কথা শুনতে পায়, তার কান্না শুনতে পায়।
লালাভ পপির অবয়বটা বাঙালি মেয়েদের মতো, চোখে তীক্ষèদৃষ্টি কিন্তু কথাবার্তায় কেমন অচেনা ধাঁচ। শিবব্রত জিজ্ঞেস করে ফেলল, রেড পপি বাই এনি চান্স আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ?
এরপর অখ- নীরবতা। কাস্পিয়ান সাগরের নীরবতা। ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। শব্দহীন। ঝড় ভেতরে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। শব্দহীন। ঝড় যে শব্দহীন, গন্ধহীন, বর্ণহীন তা এতদিন জানা ছিল না শিবব্রতের। একের পর এক মেইল, মেসেজ দিয়ে যাচ্ছে, কোনো সাড়া নেই, শিবব্রত একেবারে অস্থির হয়ে উঠল এবং দার্শনিক কান্টের সাহায্য নিয়ে জানতে পারল, কোনো অজানার আকর্ষণকে কাটিয়ে উঠতে দৃষ্টিটাকেই বদলে দিতে হবে। ভোরে জেগে প্রাণায়াম শুরু করল। কয়েক সপ্তাহ, মাস কেটে গেল ঢাকার রাস্তার ভিড়ে। অফিসের একঘেয়ে কাজের ক্লান্তিতে ভার্জিনিয়ার লালাভ পপিকে সে যখন প্রায় ভুলতে বসেছে তখন এক মাঝরাতে ফেসবুকে মেসেজ চেক করতে গিয়ে সেই অ্যাড্রেস। একেবারে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল সে মেসেজ বক্সে। না একটা নয় দুটো চিঠি।

প্রিয় ওয়াল্ডেন পন্ড
সবিনয় নিবেদন এই যে, হ্যাঁ আমি বাঙাল মুল্লুক হতে পনের বছর আগে পাথুরে ভার্জিনিয়ায় অবতরণ করেছি। তারপর আজ অব্দি মাত্র দুবার দেশে গেছি। তংশু আর সিমবাকে রেখে দেশে যাওয়া সম্ভব হয় না। ওরা আমাকে ছাড়া নাওয়া খাওয়া ভুলে যায়। না এরা কিন্তু মানব শিশু নয়। কোলকাতার রাস্তার নেড়ি কুত্তা বলা যায় তংশুকে, ওকে কুড়িয়ে পেয়েছিল কাকাবাবু। আর সিমবা বিদেশি জাতের; একটা বাড়ি থেকে চেয়ে নেয়া। কিন্তু আমি জেনে অবাক হচ্ছি যে ওয়াল্ডেন পন্ড আজকাল বাংলাদেশেও গজাচ্ছে আর পড় তো পড় তার জন্য পাগল প্রায় মতিচ্ছন্ন এক চল্লিশোর্ধ নারীর ঘাড়েই পড়ল। তা এর জল খেতে তিতা না মিঠা?
বিনীত
ভার্জিনিয়া.কম

লালাভ পপির এইরকম আশ্চর্যজনক চিঠির পর শিবব্রত অফিসের কাজে যার পর নাই গতি ফিরে পেল এবং বিদ্যুৎ গতিতে কাজ করার সুবাদে গার্মেন্টস মালিকের সুদৃষ্টিতে পড়ল। অন্য যে চিঠিটা তা ছিল এক গান, যেন পপির মনের কথা সব।

I've seen your world
With these very eyes
Don't come any closer
Don't even try
I've felt all the pain
And I've heard all the lies
But in my world there's no
Compromise
Like every tree
Stands on it's own
Reaching for the sky
I stand alone
I share my world
With no one else
All by myself
I stand alone,
All by myself
I stand alone,
All by myself
I stand alone,

শিবব্রত কী বোর্ড চেপে দ্রুত লিখতে থাকে ...

লালাভ পপি,
আমিও জেনে আশ্চর্য হয়েছি যে বঙদেশে কোনো এক কালে পপির চাষ হতো আর তারই এক বীজ পড়ল গিয়ে সুদূর মার্কিন দেশে। হ্যাঁ স্বীকার করতেই হয় মার্কিন দেশের জল হাওয়া কম উর্বরা নয়। তা খেয়ে লালাভ পপি যেন এক ফুটন্ত রক্তাভ পপি ফুলে পরিণত হয়েছে আর সারমেয়র প্রতি তার ভালোবাসা দেখে মানুষ জন্মকে ধিক্ দিতে ইচ্ছে করছে। এর মধ্যে তেত্রিশটি বসন্ত কেটে গেল কিন্তু কেউ এই ওয়াল্ডেন পন্ডকে মনে রাখা দূরে থাক চোখ ফিরিয়েও দেখেনি। পচা-ডোবা ভেবে দুনিয়ার যত এঁটো, আবর্জনা, স্তূপ করে ফেলে গেছে। তার নিচে বয়ে চলেছে ফল্গুধারা, নিঃশব্দে।

শিবব্রত

উত্তরে লালাভ পপি জানাল তার নিজেকে মনে হয় যেন এক ভোঁকাট্টা ঘুড়ি, সমুদ্রের শীতলতায় যার বাস, প্রতিনিয়ত শুধু নিজেকে ছিটকে নিয়ে চলা উড়ন্ত সসার। বিরাম নেই, এঁকেবেঁকে চলেছে মৃৎ কঙ্কালের সারি, তাদেরই একজন হয়ে লেফট-রাইট, লেফট-রাইট।
এমন অজানা, অচেনা ফুল তার কিছুই বুঝতে পারে না শিবব্রত। বৃতি নরম কোয়ার মতো ঘিরে রেখেছে পাপড়িকে। দিন-রাত পাপড়ির ওঠানামা, কখনো এক হয় না তারা, নির্ঘুম সারা রাত, বছরের পর বছর! চোখেমুখে একটা হল্কা এসে লাগে আবার আইসবার্গের শীতলতা। রিকশা, বাস, ট্রাক দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা। পোলার গার্মেন্টসের সারি সারি ঘর, মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে, শ্রমিকরা মেশিন অপারেট করছে, উল উপরে উঠছে, নামছে। হাতের যন্ত্র ডান থেকে বাম, বাম থেকে ডান। অফিসের হিমশীতল ঘরে শিবব্রত ঘামতে থাকে, চিবুকের কোণে বিন্দু বিন্দু জল জমতে থাকে। মাইগ্রেনের প্রচ- ব্যথা। এ কী! পুরো অফিস ঘরে ধোঁয়া ধোঁয়া। রাতের অন্ধকার নেমে এলো। ব্ল¬্যাক-আউট হল নাকি? ট্যাঙ্কের শব্দ, ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে বাবা-মার সাথে ছুটছে ছোট শিবব্রত। রাস্তায় পুলিশ আর পুলিশ, জলপাই রঙের আর্মি নেমেছে শহরে। গুলির শব্দ, মাথার ওপর বোমার বিকট আওয়াজ। বাবার হাতে বড় সুটকেস টানতে পারছে না, মা শিবুকে মুঠির মধ্যে ধরে রেখেছে শক্ত করে। কত ঘণ্টা এভাবে এ গলি, সে গলি, এ রাস্তা সে রাস্তা পেরিয়ে রায়েরবাজারের ঘাটে এসে নৌকা পারাপার। কত যে মানুষ! হাতে গুলি খাওয়া এক ছেলের রক্তে শিবব্রতর বাবার শার্টের হাতা ভিজে উঠল। ঐ পারে বছিলা হয়ে নওয়াবগঞ্জ, ওখানে চার্চে থাকার ব্যবস্থা। এক রাতে বাবা নদী পার হয়ে ঢাকায় ফিরতে চাইলে পাকবাহিনীর হাতে পড়ল, তারপর বাবার আর কোনো খোঁজ নেই। শিবব্রত আর তার মা খবর পেয়ে দৌড়ে ইছামতির পারে গিয়েছিল। নাহ্ আর কোনো দিন বাবার দেখা মেলেনি। শিবব্রত মাথার যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে, ধীরে ধীরে ঘরের ধোঁয়ার কু-ুলি মিলিয়ে যায়, হাতে কী বোর্ড, ক্রমাগত লিখতে থাকে। লালাভ পপি আমার যন্ত্রণার কারণ হয়তো জানি কিন্তু তার কোনো উপশম কি নাই? তুমি জানো? কোনো উত্তর আসে না, সায়েন্স ল্যাবের জ্যামে বসে থাকে শিবব্রত। একটু পর পর ফেসবুকের মেসেজে ক্লিক করে, কোনো চিঠি নেই। এক গাদা গ্রুপের লিঙ্ক আসতে থাকে। হঠাৎ একদিন বিকালের শেষে অফিস শেষে বের হওয়ার পথে ভার্জিনিয়ার অ্যাড্রেস থেকে চিঠি; সে তার প্রোফাইল বদলেছে। একটা বন মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে স্কার্ট পরা, ঝাপসা। লালাভ পপি লিখেছে কোনো ব্যথার উপশমই তার জানা নাই। যে জীবন দোয়েলের, ফড়িং-এর মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা। তবে তার সাথে দেখা হয়েছিল এবং দোয়েলের। তার দোয়েলের বাস সমুদ্রের অনেক নিচে, হিমাঙ্কের পারা যেখানে নামতে থাকে, যেখানে শ্যাওলার কোনো রঙ নেই, সূর্যের আলো যেখানে পৌঁছায় না সেখানে দোয়েলের ঘর, এমনকি হয়তো সে দোয়েল সে নিজেই। সে পারে শিবব্রতকে তার সঙ্গী করে নিতে। শিবব্রত কি সেই মৃত্যু শীতল জলে যাত্রা করবে তার সাথে? হয়তো কোনো সামুদ্রিক শৈবাল তার ক্ষতকে সারিয়ে তুলতে পারবে।

শিবব্রত ঘুমের মধ্যে জলে ভাসতে থাকে, সবকিছু খুব হালকা মনে হয়, মাথা ভারশূন্য, গ্রাভিটেশন টের পাওয়া যাচ্ছে না। জলে ভাসতে ভাসতে পায়ে একটা বড় পাথরের চাঁইয়ের সাথে ধাক্কা লাগে, ঘুম ভেঙে যায়। ঘড়িতে রাত তিনটা, মোবাইল সাইলেন্টে দেয়া। ঘরের মধ্যে সুন্দরবনের একটা বিশাল পোস্টার। নাম না জানা কিছু পাখি উড়ে যাচ্ছে। এসব পাখিরা কোনো এক সময় অন্য দেশ থেকে এখানে আসে তারপর খাবারের সন্ধান পেয়ে থেকে যায়। একটা বড় আয়নায় নিজেকে সম্পূর্ণ দেখতে পাচ্ছে শিবব্রত। মাঝরাতে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে কেমন অচেনা লাগতে থাকে। ফ্রিজ খুলে দুটো বিয়ারের কৌটা নিয়ে বারান্দায় বসে শিবব্রত; কী করছে এখন পপি ফুল? সে কখনো ফোনে কথা বলতে চায় না, এমনকি তার পরিচয়ও পুরোপুরি দেয় না, একটা রহস্য ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ। শিবব্রত বুঝতে পারে না কেন এই আলো-ছায়ার খেলা। কেমন আছো আজ? কি করছ? তুমি কি নিজেকে কখনো আমার কাছে প্রকাশ করবে না! এ ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাদায়ক। অন্তত একবার কথা বলো।
সাথে সাথেই মেসেজের উত্তর এলো, আমার আসলে যন্ত্র জিনিসটা একেবারেই ভালো লাগে না। টেলিফোনে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। হয়তো কথা হলে হাই হ্যালো বলে বলব, এখন রাখি। শিবব্রত উত্তরে জানায় কিন্তু তুমি যেখানে থাকো সারাক্ষণইতো যন্ত্রের সাথে বসবাস, যন্ত্র দিয়ে তুমি আরেকজন মানুষের কাছে পৌঁছাও, এমনকি আমার সাথেও তো যন্ত্রের মাধ্যমেই যোগাযোগ।
হুঁম ...
মন ভালো আজ?
শিব আমার মন কখনোই ভালো থাকে না। সে জন্যই কারো সাথে শেয়ার করতে চাই না। কেউ বন্ধু হলে ভালোবেসে ফেলে, জানতে চায়, আর আমি মধ্যাকর্ষণ থেকে ছিটকে পড়তে চাই। একটা বিষধর সাপ সারাক্ষণ আমাকে জড়িয়ে রাখে। তুমি কেমন আছো? ওখানে কি কাশফুল ফুটেছে? আমার বাগানে অনেক কাশফুল। পাখিরা কিচিরমিচির করছে বাগানের একটা গাছে।
নাহ আমার কাশফুল নেই। তবে তা ফোটাই আমি মনে মনে যখন ইচ্ছে হয় আবার যখন ইচ্ছে হয় না ...
কিন্তু কাল রাতে কমলা রংয়ের চাঁদ উঠেছিল। তুমি ভেবে নাও কোথাও কেউ নেই, দূরে একটা ল্যান্ডস্কেপ আর সেখানে কমলা রংয়ের একটা চাঁদ একাকী জেগে আছে। সিলভিয়া প্লাথই কিন্তু শেষ কথা নয়। অসংখ্য দামামা বাজছে দূরের আকাশে।
শিবব্রত স্বপ্নের মধ্যে দেখে এক্কা গাড়ির ভেতর সে আর লালাভ পপি। এক্কা ছুটছে শহরের পথ ছেড়ে গ্রামের রাস্তায়। মাদাম বোভারি যেন জীবন্ত হয়ে তার পাশে। মাদামের রক্তিম ওষ্ঠে শিবব্রত শব্দহীন মিশে যায়। মাদাম উড়ন্ত স্কার্টের নিচে ঢাকা পায়ে নাচের ঘূর্ণন তোলে। শিবব্রত ক্রমশ ডুবে যেতে থাকে মাদামের নরম স্তন যুগলের ঘ্রাণে। একটা হল্কার মতো গরম আঁচ শিবব্রতকে উন্মাদ করে তোলে। এক্কা গাড়িটা প্রচ- গতিতে ছুটছে। গাছপালা, বাড়ি-ঘর, জনপদ পেরিয়ে ছুটছে; শিবব্রত একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ল যেন নিজের শরীরে। ঘুম ভেঙে শিবব্রত দেখে সারারাত বাথরুমের কল খোলা ছিল পানি এসে শোয়ার ঘরের কার্পেট ভিজে চুপচুপ, অন্য ঘরগুলোতেও পানি ঢুকে পড়েছে। ভোরবেলা ঘরের পানি সরাতে সরাতে ক্লান্ত হয়ে শিবব্রত ডিভানের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে। বেলা দশটায় মোবাইলে অফিস থেকে কল আসলে হুড়মুড়িয়ে ওঠে। অফিসে জানিয়ে দেয় বাসায় সমস্যা হয়েছে আজ যেতে পারবে না। তারপর সারাদিন একটার পর একটা বিয়ারের কৌটা খুলে শেষ করতে থাকে, ঘর সিগারেটের ধোঁয়ায় ভরে যায়। লালাভ পপিকে খুব মন খারাপ করে লেখে, তুমি কেন এলে এমন ঝড় হয়ে! কী যে নরম তুমি, শাপলা ফুলের মতো ফুটেছিলে দিঘির জলে, আমি তোমার ভেতর প্রবেশ করলে জলপ্রপাতের মতো ঝরছিলে অবিরল!
লালাভ পপির কোনো সাড়াশব্দ নেই। দিনরাত শিবব্রত কম্পিউটারের সামনে বসে থাকে। লালাভ পপি কোনো উত্তর পাঠায় না। অস্থিরতার কানা উপচে পড়তে থাকে। সন্ধ্যায় উন্মত্ত হাতির মতো পথে নামে শিবব্রত, হাঁটতে হাঁটতে নীলক্ষেতের মোড়ে এসে উপস্থিত হয়, লাইটপোস্টের নিচে কমলা রংয়ের শাড়ি পরা কমলা টিপের এক মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাছে যায়। লাইটপোস্টের কমলা আলোয় কালো মেয়েটি ঝলসে ওঠে। শিবব্রতকে দেখে মেয়েটি চোখে-মুখে একটা আবেদন ফুটিয়ে তোলে। কমলা রংয়ের কাঠ খোদাই করা মেয়েকে ল্যাভেন্ডার ফ্লাটে নিয়ে আসে শিবব্রত। সারারাত শীৎকারে শীৎকারে ভরে ওঠে ঘরের বাতাস! এত জীবনী শক্তি মেয়েটির। শিবব্রত দুহাতের মুঠোয় মেয়েটির কালো স্তন যুগল নিয়ে বুভুক্ষুর মতো আদর করতে থাকে। কমলা মেয়ে উরুসন্ধির মধ্যে শিবব্রতকে আটকে রাখে আর ক্রমশ তার হৃদকম্পন বাড়তে থাকলে শিবব্রত মিশে যেতে থাকে তার শরীরের পরতে পরতে। গরম লাভার মতো তরল গড়িয়ে পড়ে শিবব্রতের ঊরু, বুকে। কমলা মেয়ে জহুরির মতো শিবব্রতের শরীরের অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়ায় আর এক অদ্ভুত ভালোলাগায় তার দু-চোখ বন্ধ হয়ে আসে। পৌরাণিক কালো নারী তাকে জাগিয়ে তোলে। এতদিন ভেতরে যে ভিসুভিয়াস ফুঁসছিল তার সতিচ্ছেদ করে পথপাশের গোলাপ।

এরপর দিনগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে থাকে। শিবব্রত ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে রাখে। ফোন, মোবাইল, ল্যাপটপ সব বন্ধ। সাত দিন পর ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে বড় বড় পা ফেলে নীলক্ষেত মোড়ে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। সকালের রোদ তলোয়ারের মতো ঝলসাতে শুরু করলে শিবব্রতের চোখ ছোট হয়ে আসে, পিপাসায় ক্লান্ত হয়ে তেহারির দোকানে ঢুকে ঢক ঢক করে টেবিলে রাখা পানি খেয়ে নেয়। দিন দিন অফিসে অনিয়মিত হয়ে পড়ে, কাজে মন নেই, মাথা ব্যথার জন্য কড়া ওষুধ খেতে হয়। লালাভ পপিকেও বহুদিন লেখা হয় না। ফেসবুকের মেসেজ বক্সে লালাভ পপির অসংখ্য চিঠি এসে জমা হয়। শিবব্রত দু-একটা খুলে পড়ে কিন্তু উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না।
লালাভ পপি উত্তর না পেয়ে উদগ্রিব হয়ে লেখে, কী হয়েছে তোমার, লেট মি নো, কেন বালটিক সাগরের গম্ভীরতা! জানো তোমার সাথে যোগাযোগ হওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছে কোথায় যেন টুপটাপ শিউলি ঝরছে, বরফ শাদা শিউলির ঘ্রাণ চারদিকে, ভার্জিনিয়ার পাথুরে জমিতে ঝরে পড়ছে অবিরত। আর দোয়েলের সেই হিমশীতল রংজ্বলা পৃথিবীতে ইচ্ছাপূরণের কোনো পুকুর কি লুকিয়ে আছে? শিবব্রত লালাভ পপির চিঠিটা পড়ে নিয়ে অ্যাকাউন্টটা ক্লোজ করে দেয়। সন্ধ্যার ঝিরঝিরে বাতাসে বারান্দায় বসে একটার পর একটা সিগারেট খেতে থাকে। আর কোথাও কোনো লাইটপোস্টের নিচে, অন্ধকারে কমলা রংয়ের শাপলা ফুটে থাকে নক্ষত্রের আলোতে।