ফেরিওয়ালা

জয়শীলা গুহ বাগচী



দিদিভাই ও দাদারা এই বাসে যারা প্রতিদিন যান তারা সবাই আমাকে চেনেন। মানে এই যে একটা পরিচিত ভঙ্গি ,গলার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা কিছু কথার শরীর , একটা পরিচিত সুতোর জামা যার থেকে প্রায়ই কিছু মোমবাতি জ্বলে ওঠে সেসব আপনারা জানেন। আমি প্রতিদিন আসি আপনাদের মনের মতো জিনিস নিয়ে। ও দাদা একটু সরবেন আমি মাঝখানে যাই। দিদিভাইয়ের জন্য একটা জায়গা রেখেছি, ও দাদাভাই আপনার ব্যাগটা সরান এই আমাদের নতুন দিদি বসবেন। এই তো এইবার সেট। দিদিকে যেন কোথায় দেখেছি মনে হয়, এই যে আপনার ব্যাগ থেকে পুরনো কাঠের গন্ধ আসছে, তার সাথে মিশে আছে কিছুটা হাসনুহানা ফুল, এসব কোথায় যেন জেনেছি। ও মেসোমশাই আপনার ব্যাগটা বাঙ্কে তুলে দিলাম। কত গল্প থাকে ব্যাগের, মাটির জীবনের গল্প, ধোঁয়া ওঠা মানুষের গল্প, পায়ের ছাপের মতো কিছু ঘরদোরের গল্প... এবার একটু ফ্রি হয়ে দাঁড়ান । আজ আমি আপনাদের জন্য এনেছি এই সোনার চেয়েও সুন্দর চেন। দেখুন ডিজাইন , দেখুন ... দাদা দিদিরা সোনার দোকানে কেন মনের ভেতরেও এত সুন্দর চেন পাবেন না। মাত্র পঞ্চাশ টাকা খরচ করলেই পেয়ে যাবেন একটি সুন্দর সোনার মত চেন। ঘষলেও রঙ উঠবে না, জল দিলেও না। এসব তো এখন তেমন হয় না সস্তার জিনিসে। তবে কী জানেন আমি কিন্তু খুব সস্তার, তবে ওই রঙ আমার ওঠে না। একটাই। আগে খুব গর্ব ছিল এখন ভাবি আমার গায়ে যে হলুদ সবুজ ছাতাপড়া রংটা ছিল সেটা কোন বলার মতোই নয়। এই যে চেনটি এর সাথে আপনারা পাচ্ছেন আর একটি চেন ফ্রি। একটি পরবেন দিদিরা আর একটি গিফট দেবেন। দেখুন না ধরে... একটি নয় আরো তিনটি ফ্রি পাচ্ছেন দাদা দিদিরা। এমন সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। এই তো এই দাদা নিচ্ছেন আর পেয়ে যাচ্ছেন চারটি চেন ফ্রি। দিদিভাই নেবেন নাকি? আরে আপনারা ভাবছেন ফ্রি আর এমন কী ব্যাপার। বাই ওয়ান গেট ওয়ান তো লেগেই আছে। এখানে না হয় বাই ওয়ান গেট ফোর। এ আর এমন কী... কী জানেন তো দাদা আমার তো জীবনটাই ফ্রি। ও দাদা ফ্রি-এর মাল বলে আপনারা ভালো করে দেখছেন না। কিন্তু এই যে সময়টা এটা কি ফ্রি সময় নয়? আরে আমি ফ্রি আপনি ফ্রি। আমরা সবাই অকারণে এসে পড়লাম এই মাটিতে। এসে পড়লাম আর ফ্রি পেয়ে গেলাম সময়। ফ্রি সময়কে দেখতে অনেকটা কুরুশে বোনা ফুলের কাজ । আপনারা ভাবছেন দাদা দিদিরা এই লোকটা হয় বিশ্বপাকা নয় বোকা। আমি পাকাও নই বোকাই নই আমি হলাম গিয়ে আজন্ম ফ্রি। আমার সময়ও ফ্রি। আজকাল কেউ মনেই করে না যে সে এক ফ্রি-এর মাল। তাই তো কত দামে বিক্রি হয়। আমাদের পাড়ার পানুদার বিয়ের বাজারে দাম উঠেছিল পাঁচ লাখ। আমি জানি আমি ফ্রি তাই কোনো সমস্যা নেই আমার। আপনারা ভাবছেন কী যে বলছি , তাহলে শুনুন বাড়ি ফিরে আপনারা যা করেন আমি তা করি না। কারণ নিজেকে এত গুরুত্ব দেবার কিছু নেই । তাই নিজেকে কাপড় মেলা দড়িতে টাঙিয়ে দিই, ব্যাস ঝামেলা শেষ। আমার থেকে টপটপ করে ঝরে পড়ে ফ্রি-তে পাওয়া কিছু হালকা হালকা অন্ধকার। মাথা থেকে যৎসামান্য বিদ্যুৎ ঝরে। কিছু শূন্যবোধ অথবা সারাদিনের কথার মধ্যে যেসব ঝোপঝাড় জোনাকি অল্প অল্প নিঃশব্দ ফেলতে থাকে... তখন সেই ঝুলে থাকা আমিকে সত্যি ও মিথ্যায় একটু হলেও বডির মতো দেখায়। বাদবাকি বুঝলেন না? শুধু খানিক বিদ্যুৎ যা আলো জ্বালায় না। আমার বউ আগে আসতো খাবার নিয়ে, কতরকম খাবারের গন্ধ... একটা একটা বাটি রাখতো আর আমি তার গন্ধদের গায়ে মাখতাম। গা বলে তেমন কিছু কোনোদিনই ছিল না। পয়সা টয়সা না থাকলে বডি তেমন দেখা যায় না । ও দিদিভাই নিচ্ছেন তো... আপনাকে খুব মানাবে। কতরকম ডিজাইন... জানেন তো নিজেকে মেলে দিয়ে আমি একটাই কথা ভাবতাম মানে প্রার্থনা করতাম। আমার নিজের জন্য না দিদিরা। আমার বউএর জন্য আমি রোজ প্রার্থনা করতাম যাতে ওই হারগুলো সত্যি সোনা হয়ে ওঠে। একদিন অনেক হার ওকে পরিয়ে দিয়েছিলাম, কী সুন্দর ঝলমল করছিল আমার বউ। তবে ওই ঝলমলানির ভেতর টুকরো টুকরো অবিশ্বাস ছিল। যেটা বের হয়ে আসছিল ওর ঘাম থেকে। ধীরে ধীরে ঘরের বাতাসটা যখন নিজেই একটা চরিত্র হয়ে উঠলো আমি তখন বের হয়ে গেলাম। ও ওর বাতাসের সাথে গল্প করবে হয়তো। তারপরই তো হারগুলো সব সোনা হয়ে গিয়েছিল... ও মাসিমা এই তো নিন, মাত্র পঞ্চাশ টাকা। সব কিছু কি সোনা হয়? বলুন? সোনা বলে কিছু হয়? ওই তো সেদিন একটা আবছা অন্ধকার ছিল, অন্ধকারটা কেমন গায়ে লাগছিল, ঝুরো ঝুরো ছেঁড়া ছেঁড়া । আমার ভালো লাগছিল কিন্তু ওর এসব ভালো লাগে না। অন্ধকারের গন্ধও ওর ভাল লাগে না। ওকে তাই সোনার মতো আলো দিতে চাইলাম। ওর সেটাও পছন্দ নয়। আমারি দোষ, আমি নিশ্চয়ই বোঝাতে পারিনি আমাদের ঘরবাড়ির মূল স্ট্রাকচার। বলেছিলাম বোধহয়, ও শুনতে পায়নি। এই যেমন আপনারা শুনতে পাচ্ছেন না। কত কথা বয়ে যায় চারদিকে। কটা কথাই বা আমরা শুনতে পাই বলুন? কেউ কারুর কথা শুনতে পাই না বলেই তো এত সমস্যা।
এবার আপনাদের দেখাবো আরো একটি জিনিস। এটি হল সবার দরকারি। স্কুলে যাচ্ছেন কী অফিস, বাড়িতে আছেন কী বেড়াতে যাচ্ছেন , প্রেমে আছেন কী দুঃখে সাথে রাখুন হাতে রাখুন পকেটে রাখুন অথবা আঙুলে , সৃষ্টিতে বা অনাসৃষ্টিতে ... রাখতেই হবে প্রত্যেককে একটি কলম। দাম মাত্র পঞ্চাশ টাকা । না না আমি আপনাকে একটা কলম দেবো না, দেবো এক সেট কলম। পাঁচ রঙের পাঁচটি কলম আপনারা পাচ্ছেন মাত্র পঞ্চাশ টাকায়। লিখে দেখবেন দাদা? নিন লিখুন আপনার নাম। সবাই লেখে দাদা দিদি। নিজের নাম সবাই লিখতে চায়। কতশত স্বপ্নের কথা আপনি ভাবলেন মোবাইলে লিখবেন , হবে না। কলমে লিখুন হয়ে যাবে। জাদুর কলম তখনি কাজ করবে যখন আপনি আপনার ইচ্ছের কথা বার বার লিখবেন। যখনি একুশবার লিখবেন আপনার মনের ভেতরে তা চিরস্থায়ী হবে। এবার মনই আপনাকে বলবে সেই নির্দেশ মেনে চলতে। আপনি নিজের অজান্তেই চলতে শুরু করবেন আপনার স্বপ্নের পথে। শুধুমাত্র একুশবার লিখুন এই কলম দিয়ে। দেখুন কী হয় ? হ্যাঁ দিদি দিচ্ছি আপনাকে। আমার আবার স্বপ্ন ? আমি তো ওই খেয়ে পরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি। সেসব না লিখলেও চলে। আমি আর কিছুই পারি না। ও তো লিখেছিল স্বপ্ন। তাই হয়তো সফল হয়েছে। আমি তো কবে থেকে স্বপ্নেই থাকি না। ওকে দেখতেও পাই না। নিজের মতো করে একটা কিছু দেখি। এই যে দাদাভাই এই জাদু কলমে লিখুন আপনার ইচ্ছে দেখুন তারপর কী হয়। আমি তো সেদিন মন্মথকে লিখলাম, আমার বন্ধু। অনেক গল্প ছিল কবে থেকে, ওর আর আমার। একদিন আমাকে অস্বীকার করল বুঝলেন তো। আমি জিনিস বেচি ঘুরে ঘুরে... তাই হয়তো। যাক সে কথা, আমি কী দেখলাম জানেন? মন্মথ আমার পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে । আমি ওর সামনে দিয়ে গেলাম, পাত্তা দিল না। ওর লাল গাড়িটা কেমন হাঁড়ির মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটাকে দেখতে অনেকটা ওরই মতো। ধান্দাবাজ টাইপ। আমি বাড়ি ফিরে লেখাগুলো কেটে দিলাম। মন্মথ চলে গেল। যে ভেজা ভেজা অন্ধকারটা রেখে গেল সেটা আমি আনিনি। মন্মথ রেখে গেছে। আমার তো কিছুই দরকার নেই, গোমরামুখো ধান্দাবাজ টাইপের গাড়িটা আমাকে ছাড়ল না। আমি যখন আরাম করে সজনে ডাঁটা চিবোই গাড়িটা মিটমিট করে হাসে। খুব অস্বস্তিকর। মন্মথর ছেড়ে যাওয়া অন্ধকারে গাড়িটা থাকে। আপনি নিশ্চয়ই ইস্কুলের দিদিমণি? পেন তো লাগবেই। কটা সেট দেবো? আসছি দাদা, আমি আপনার ডাক শুনতে পাই, আপনারা আমার কথা শুনতে পান না।
এই যে মাসিমা আপনার জন্য কী এনেছি দেখুন। একশ ভাগ খাঁটি আমলকি মুখশুদ্ধি । না না মুখ ফেরাবেন না, এ যেমন তেমন নয়। সকাল বেলায় যারা কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে, দুপুর বেলা যাদের এলোমেলো সাঁতার হয়, সন্ধেবেলা যারা রাজতন্ত্রের ঢেকুর তোলেন, রাত্রিবেলা যাদের ঘুম আসে না, ঘুমোলেই পলিটিক্যাল দুঃস্বপ্ন আসে, তাদের জন্য অব্যর্থ ওষুধ এই আমলকি মুখশুদ্ধি। একবার খাওয়া শুরু করলেই সব পেটের রোগ উধাও। খাবার আগে খান কী খাবার পরে খান যদি সাথে থাকে এক গেলাস হালকা গরম জল ব্যাস দেখতে থাকুন । দু’রকম পাবেন আমার কাছে, নোনতা স্বাদের আর মিষ্টি স্বাদের। শরীর বড় বালাই বুঝলেন তো। শরীর থাকলেই তবে না কত কী... এই যে দাদা দিদিরা মধ্যবয়সে এই অল্পসল্প ভুঁড়ি কে মোটেই আস্কারা দেবেন না। আমলকি খান আর সক্কাল সক্কাল হাঁটতে বের হন। আমার তো শরীরের ঝামেলা নেই। আপনাদের আছে। পরিবার চাকরি কত দায় দায়িত্ব। প্রেমে ঘা খেয়েছেন তবু কেউ তো আছে আপনার চোখের জলে ভেজা রুমালটা শুকিয়ে খোলামেলা সেলাই এনে দেবে। তাহলে? তাদের জন্য শরীর, সুস্থ শরীর চাই। আর মায়েরা হাসিমুখে সবার জন্য করেন , নিজের জন্য সময় দেন কি? নিয়ে যান আমলকি। শরীর বড় বালাই বুঝলেন। আমার মা’টা অসুস্থ, প্যারালাইজড , বিছানায় শুয়ে আওয়াজ করত শুধু। ওই আওয়াজটাই আমার অভ্যেস ছিল। সকালে খাইয়ে পরিষ্কার করে রেখে যেতাম, বিকেলে ফিরে মায়ের গা থেকে অন্ধকার খুলে নিতাম, গু’মুত সরিয়ে দিতাম। রান্না খাওয়া শেষ করে মাথার ওপর জ্বেলে নিতাম জোনাকি। তখন আমরা গল্প করতাম, মা তো কথা বলতে পারে না। কিন্তু ওই সময়টা মা পরিষ্কার কথা বলত। হাওয়া দিলে আমার গায়ে চাদরও টেনে দিত। একদিন ফিরে দেখি মা আর আওয়াজ করছে না। তারপর থেকে আওয়াজ টাওয়াজ ছাড়া একলা একলা চালিয়ে নিচ্ছিলাম বুঝলেন। কিন্তু অন্ধকারটা খুব ভারি হয়ে গিয়েছিল। গায়ের ওপর এত চেপে বসতো যে সরাতেই পারতাম না। ওটাও অভ্যেস করলাম । অন্ধকারেই ওদের সবাইকে দেখতে পেতাম। এইভাবেই চলছিল, একদিন রাস্তার পাশে মালের ব্যাগটা রেখে বসেছি ,একটু চোখটা লেগে গেছিল। চোখ খুলে দেখি ব্যাগটা নেই। টাকাপয়সাও ছিল কিছু । এত দুঃখ হল, ধিক্কার এল... করেই ফেললাম কাজটা বুঝলেন। কাকে দোষারোপ করবো। এই দেশে এর থেকে বেশি আমার আর কিছু হবার ছিল না। তারপর থেকে আমার আর শরীরের ঝামেলা নেই। বেশ আছি। এই আপনাদের সাথে সুখদুঃখের গল্প করি, জিনিস বেচি। এই কাজটা আমি কখনো ছাড়তে পারবো না। ও দিদি আরো কত জিনিশ আছে দেখবেন? আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? বেশি দাম না মাত্র পঞ্চাশ টাকায় এক প্যাকেট জোনাকি... না না ইয়ে মানে...