কাওলা

আসমা চৌধুরী



লতা নদীর মাঝামাঝি এসে দেখা গেলো হু হু করে পানি ঢুকছে নৌকার খোলে। তখন পড়ন্ত বিকেল। মাঝি সেকান্দর ফিসফিস করে আয়েশার বড় খালাকে বলছে পানি সেচেন। খালা তসবির দানা গুনতে গুনতেই ভয়ে নীল হয়ে গেলেন। নৌকার অনেকটা অংশ জুড়ে গুলিবিদ্ধ তারেক মামা শুয়ে আছে। অন্য অংশে ওরা চারভাইবোন, আয়শার আম্মা আর বড়খালা। পুরুষ মানুষ বলতে গুলিবিদ্ধ তারেক মামাই রয়েছে।
বড়খালা গোপনে এসেছিলেন ওর মামাকে দেখতে। তারই ভেতরে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে গেছে যে আজই ওদের ঘর ছাড়তে হলো।

তারেক মামা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ঘর ছেড়েছেন আয়শারা কেউ জানতো না। তিনি আর্মিতে চাকরি করতেন, সেখান থেকে পালিয়ে এসে গৌরনদীর নিজামউদ্দীন কমান্ডারের দলে যোগ দেন। মেহেন্দিগঞ্জে অপারেশনে এসে থানা ঘেরাও অভিযানে গুলিবিদ্ধ হন। তারেক মামাকে খুব সকালে যখন তার সাথীরা দুই মাইল রাস্তা হেঁটে মাথায় করে গ্রামের গোপন পথে ওদের বাড়ি নিয়ে আসে তখন কেবল ফজরের নামাজ শেষে আয়শা ঘরের সামনে লাগানো চারাগাছগুলোতে বদনা দিয়ে পানি দিচ্ছে। হঠাৎ চোখে পড়ে মানুষের মাথায় তারেক মামার রক্তাক্ত শরীর। কিছু না বুঝেই জোরে একটা চিৎকার দেয় আয়শা। মুক্তিযোদ্ধারাই এনে বিছানায় শুইয়ে দেয়। সাধারণ বিদ্যা দিয়েই ক্ষত পরিষ্কার করে। অনেক সাবধানে একজন এল এম এফ ডাক্তার নিয়ে আসে। গুলি বেরিয়ে যাওয়ায় একটা সান্ত্বনা পাওয়া যায়, তা না হলে অপারেশন করা ছিলো ঝুকিপূর্ণ।

তারেক মামা সৈনিক মানুষ। শরীরের যন্ত্রণা সহ্য করে যাচ্ছিলেন। স্যালাইন,ঔষধ চলছিলো। যথাসম্ভব পুষ্টিকর খাবারও। যদিও তিনি খাওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না।মুক্তিযোদ্ধারা রাতের আঁধারে ঔষধ দিয়ে যেতেন। আয়শা ভেবেছিলো মুক্তিযোদ্ধা কেমন যেন হবে।বাস্তবে দেখে লুঙ্গি গামছা পরা সাধারণ মানুষ। তবে তাদের সাথে সবসময় অস্ত্র রয়েছে। কোন অস্ত্রের কি নাম আয়শা জানে না, তবে বন্দুক, রাইফেল ততদিনে চিনে গেছে।

তারেক মামার অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে পেটের ক্ষত থেকে রস বের হচ্ছে। এরই মধ্যে থানায় মিলিটারি এসে আগুন লাগায়। সবাই পালাতে থাকে। আহত মুক্তিযোদ্ধা আছে জানলে সবাইকে শেষ করে দিবে। অবস্থা খারাপের দিকে গেলে বড়খালা সিদ্ধান্ত নেয় তাদের বাড়িতে নিয়ে যাবে। সেখানে গ্রামের ভেতরে অনেকটাই নিরাপদ। মিলিটারি আসছে শুনে আয়শারা যে নৌকায় উঠে তার ফুটো দিয়ে ঢোকা পানি এতক্ষণ আয়শা আর তার বড়খালা সেচেই যাচ্ছে।
আয়শার আম্মা চামচ দিয়ে তারেক মামার মুখে পানি দিচ্ছে, তারেক মামার কোন সাড়াশব্দ নেই। এই গরমেও তার শরীর কাঁথা দিয়ে ঢাকা।মাঝি ফিসফিস করে বলে,' নৌকার ভেতরে থাহেন,মুখ ঢাহেন,নদীতে গানবোট টহল দিচ্ছে। রাজাকারেরা টের পাইলে সব শ্যাষ।'

ক'দিন থেকে আয়শা এমনিতেই ভয়ে আছে। মিলিটারি আর রাজাকারের ভয়।ওরা মেয়েদের উঠায়ে নেয়, নির্যাতন করে,মেরে ফেলে। আয়শা মুখ ঢেকে একেবারে পুটলি হয়ে আছে। চেনা মাঝি সেকান্দরকেও বিশ্বাস করতে পারে না। সবাই এখন পয়সার জন্য রাজাকারদের হয়ে কাজ করে। এই নদীটা পার হতে পারলে কাদিরাবাদ যেতে আর ভয় নেই। পাশদিয়ে একটা দুটো নৌকা যায় আর ওরা দম বন্ধ করে বসে থাকে।অন্য নৌকাগুলোও নিঃশব্দে চলে যায়। মাঝিরাও মাঝিদের সাথে কথা বলে না। দূরে গানবোটের হুইসেল শোনা যায়। পানি সেচে আয়শার হাত ব্যথা করে তবুও বিরাম নাই।একটা নৌকা পাশ দিয়ে যেতে যেতে মাঝিকে প্রশ্ন করে, কারা যায়?

আয়শা নৌকার খোলে দম বন্ধ করে ঢুকে যায়। অন্ধকার হয়ে এসেছে, কারা যেন টর্চ মারে। আস্তে করে নৌকাটা এনে পাশে লাগায়। জিজ্ঞেস করে কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাচ্ছে? নৌকা থেকে খালে ঢোকার পথ কাছেই, এমন একটা সময়ে এসব কী হচ্ছে। আয়শার দম বন্ধ হয়ে আসে।

ওপাশ থেকে আবারও প্রশ্ন, এই তোমার নাম সেকান্দর?
---সেকান্দর চুপ করে থাকে।
আয়শার বড় খালা জোরে জোরে আয়াতুলকুরসি পড়তে থাকে। হঠাৎ ধমক খেয়ে মাঝি কেঁদে উঠে বলে,আমি গরীব মানুষ। নৌকা বাইয়া খাই।
---তারেক ভাই এখানে আছে?
আয়শার আম্মা বলে,না। আমরা বাপের বাড়ি যাচ্ছি।
ভয়ে ভাইবোনেরা কেঁদে ওঠে। তারেক মামার ঘুম ভেঙে যায়। কিছু না বুঝে বলে, কে কি হয়েছে?
নৌকাটি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে কেউ একজন বলে,মাঝি দাঁড়াও মনে হচ্ছে তারেক ভাইয়ের গলা শুনতে পেয়েছি।


২.
বড় খালার বাড়ির কেউ জানতো না আহত তারেক মামা সহ আয়শারা এভাবে চলে আসবে। স্বাভাবিক ভাবে খালুর বাবা, মা বিষয়টি পছন্দ করেনি। বড়খালু কোনভাবে সবাইকে ম্যানেজ করে। এ বাড়ির সবাইর মন খারাপ। নদীতে ভেঙে যাচ্ছে জমি আর বাড়ির অনেকটা অংশ। আয়শার কিছুই ভালোলাগে না। তারেক মামার শরীর আরো খারাপ হয়েছে। সেদিন অনেক বিপদ মাথায় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা নেয়ামত নৌকা নিয়ে দ্রুত এসে ওদের নৌকায় ঔষধগুলো পৌঁছে না দিয়ে গেলে আরো সমস্যা হতো। ওরা ভেবেছিলো রাজাকারের নৌকা,তারেক মামার কণ্ঠস্বর শুনে মুক্তিযোদ্ধা নেয়ামত সবাইকে বুঝিয়ে বলে ঔষধের বাক্স দিয়ে যায়। আহত তারেক মামাকে নিয়ে এতটা ছোটাছুটি উচিত হয়নি,ক্ষতস্থান আরো খারাপের দিকে চলে গেছে। এখানে ডাক্তার পাওয়া অসম্ভব। নাদিয়া খালা দিনরাত সেবা করে যাচ্ছে। নাদিয়া খালা বড় খালার ননদ। তারেক মামার সাথে কথা বললে তাকে সবাই বকাবকি করে, তিনি কারো কথায় কান না দিয়ে সেবা করছেন। আয়শাও তাকে সাহায্য করে।

দুপুরে তারেক মামা ঘুমালে নাদিয়া খালার সাথে নদীর ভাঙন দেখতে যায় আয়শা।চারপাশে অনেক গাছ উল্টে পড়ে আছে। কয়েকটি সুপারি গাছ, জামরুল গাছ,আম গাছ। আমগাছে গুটি অনেকটা বড় হয়েছে , জামরুল গাছে সময়ের আগেই সেমাইয়ের মতো ফুল এসেছে। নাদিয়া খালা আয়শার হাত ধরে বলে, তারেক ভাই ভালো হবে তো?এ প্রশ্ন তো আয়শারও।

ঘরে ফিরে আয়শা দেখে তারেক মামার গায়ের জ্বর অনেকটা বেড়েছে। নাদিয়া খালা তার মাথায় পানি দেবার জন্য একটু গুছিয়ে নিচ্ছে। তারেক মামা জ্বরের ঘোরে যুদ্ধের কথা বলছে। আরো কিছু অচেনা নাম বলছে। হয়তো তারা মুক্তিযোদ্ধা হবে।হঠাৎ নাদিয়া খালার হাত ধরে লাল চোখে বলে, নাদিয়া আমি মরে গেলে আমার কথা ভুলে যেও। এ বাড়ির কেউ তো চায়ওনি তুমি আমার বউ হও। নাদিয়া খালা অসহায়ের মতো আয়শার দিকে তাকায়। তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়ে।

কেমন করে যে নববর্ষ চলে এলো। আগে এসময় সব বাড়িতে নানা আয়োজন হতো।ঘর পরিষ্কার করা,দোকানে হালখাতা করা,পিঠা তৈরি করা। শেষ চৈত্র থেকে তিনদিন মেলা হতো। সংসারের প্রয়োজনীয় টুকিটাকি কেনা হতো। বড়খালার শাশুড়ি আক্ষেপ করছেন সকাল থেকে, তার কয়েকটি ছোট বড় বাঁশের ঝাঁপি দরকার।ডালা দরকার,সিকা দরকার। আজ সে কাঁচা কাঁঠালের এঁচোড় রান্না করবে। একটু পোলাউ মাংসও করবে। আমের ডালও করবে। রান্নাঘর আগলে বসে সে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। তারেক মামা আর আয়শার বয়সের ব্যবধান ছয় বৎসর। নানির সবচেয়ে ছোট সন্তান। আয়শার সাথে অনেকটা বন্ধুর মতো সম্পর্ক। আয়শাদের বাড়ি মেহেন্দিগঞ্জে এলে সারাদিন গল্প করে সময় কাটতো। নববর্ষের সময় তারেক মামা প্রায়ই এখানে চলে আসতো।মেলা থেকে মাটির হাঁড়ি, কাঁচা আম কাটার ছুরি, ছোট দা,বটি কিনে দিয়েছে কতবার। মিলিটারিতে চাকরি হবার পরে সিফনের শাড়ি কিনে দিয়েছে। তবে তারেক মামা খুব দেশ নিয়ে চিন্তিত ছিলো।

তারেক মামার শরীরটা আজ খুবই খারাপ। আয়শার আম্মা লুকিয়ে কাঁদছে।বড়খালা জায়নামাজ বিছিয়ে কোরান শরিফ পড়ছে। আয়শার নানি এখনো জীবিত।সে এসব খবর কিছুই জানে না। ছেলে কখন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে,কখন গুলিবিদ্ধ হয়েছে কিছুই তার জানার কথা নয়। কারণ তারেক মামা আর্মি থেকে অনেক ঝুঁকি নিয়ে পালিয়েছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই গৌরনদীর নলচিড়া গ্রামে নানিকে খবর দেয়া সম্ভব নয়। বড়খালার শ্বশুর বাইরে থেকে এসে ঘোষণা দেয় বাড়িতে আজ কাওলা আনবে। কাওলা মানে জিন। এখানের সবাই জিনকে বলে কাওলা। গ্রামের একজন কাওলা আনতে পারে। জিন অনেক কথা আগাম বলতে পারে। তারেক মামার শরীর অনেক খারাপ। তাকে নিয়ে আয়শার আম্মা ও বড়খালা বসে আছে। নাদিয়া খালাও তাদের সাথে আছে। কাওলা আনা হবে কাচারি ঘরে। কাচারি ঘর বড় ঘরের একটু সামনে। খালু খুব রাগারাগি করছে তার বাবার ওপর। তারেক মামার শরীরের এই অবস্থা, তা ছাড়া খালু জিন-ভূত বিশ্বাস করে না।

নববর্ষের দিন সন্ধ্যা হলে এক একজন করে লোক জমা হয় কাচারি ঘরে। কেউ আসে বিশ্বাস করে কেউ আসে তামাশা দেখতে। আজ নিশ্চয়ই আশ্চর্য কিছু ঘটবে। সবাই নিঃশব্দে অপেক্ষা করে। জিন আসার আগে ঘর অন্ধকার করে দেয়া হয়। সাবধানে প্রশ্ন করতে হবে। জিন সব প্রশ্নের উত্তর আবার দেয়ও না। অন্ধকারেও বোঝা যায় ঘর লোকে ভরে গেছে। মেয়েদের জন্য আলাদা বসার জায়গা আছে। কেউ যেন বাতি না জ্বালে সে জন্য অনুরোধ করে জিন আনা লোকটি নানা আয়োজনে চেষ্টা করতে থাকে। আয়শা একটি প্রশ্ন মনে মনে ঠিক করে এসেছে, তারেক মামা কেমন করে ভালো হবে?

অন্ধকার ঘরে বড়খালুর বাবা নদী ভাঙার প্রশ্ন দিয়ে শুরু করে। তাদের বাড়ি কী নদীতে ভেঙে যাবে? জিন চিকন সুরে বলে, ভাঙবে। খালুর বাবা কাঁদতে শুরু করে।আয়শা কেমন করে প্রশ্ন করবে ভেবে পায় না। এর মধ্যে অনেকে মিলে ঠিক করে যেহেতু জিন অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয় না তাই একটিই প্রশ্ন করবে। সকলের হয়ে একজন প্রশ্ন করে, বঙ্গবন্ধু কী ভালো আছে?দেশ কী স্বাধীন হবে?

জিনের উত্তর দেয়ার আগেই বড় ঘর থেকে নাদিয়া খালার চিৎকার ভেসে আসে।