গোমাতা

অর্ক চট্টোপাধ্যায়



চিরঞ্জীব রোজই গরুটাকে দেখতো। গ্রীষ্মের দুপুরের চড়া রোদ কিংবা সন্ধ্যের আধ-মিয়োনো অন্ধকারে। একেকটা বন্ধ দোকান বা অর্দ্ধেক ভেঙে ফেলা পুরোনো বাড়ির সামনে, সামনের পা'দুটো একটু এগিয়ে দিয়ে অদ্ভূত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে। দেখে মনে হতো বয়েস ভালোই হয়েছে। পেটটা অস্বাভাবিকরকম ফোলা। গরুটা কারুর দিকে তাকাতো না। নিজের মনে থম হয়ে থাকতো। পাড়া যখন আগে মফস্বল ছিল তখন আশেপাশে অনেকগুলো গোয়াল ছিল। চিরঞ্জীবের মনে পড়ে ছোটবেলায় ইঁট নিয়ে আসতো গরুর গাড়ি। এখন মফস্বল সমাহিত। শহরের শরীর গ্রাস করেছে তাকে। তাই যত্রতত্র অসহায় একাকিনী গোমাতা। বর্তমান সরকার যে তাকে মাদার ইন্ডিয়া বানিয়ে রেখেছে এই গরুটা কি আদৌ তা জানে? মনে এরকম প্রশ্ন জাগতো চিরঞ্জীবের।

ছোটবেলা থেকে বেশ কয়েকবার বাড়িবদল। যেসব খেলনা, বই, পেন বা অন্য নানা কিছু একেকটা দিন সঙ্গে না থাকলে রাতে ঘুম হতো না সেসব কতদিন হয়ে গেলো চোখের আড়াল। এখন মনেই পড়ে না সেসব জিনিস আদৌ কখনো ছিল কিনা। হঠাৎ এটা ওটা খুঁজতে গিয়ে পুরোনো বাক্স-প্যাঁটরার মধ্যে তাদের ভগ্নাংশ চোখে পড়লে মৃত্যুর কথা মনে হয়। মৃত্যু কি শুধু মানুষেরই হয়? কিংবা প্রাণীর? বস্তুর কি মৃত্যু হয় না? কই সেও তো ক্ষয়ে যায়, হারিয়ে যায়। তার বেলা? একেকসময় কত অজিজ হয়ে থাকার পরে ঠিক ততটাই গুমনাম হয়ে যায়। চিরঞ্জীব বুঝতে পারেনা পুরোনো খেলনার ঐ ভাঙা টুকরোগুলো কিসের মৃত্যুর কথা বলে? খেলনার? নাকি একটা সময়ের? স্মৃতির অপলকা হাওয়ায় সদাসর্বদা নিষ্পলক মৃত্যুর গন্ধ।

একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় দেখলো, গরুটা একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চতুর্দিকে চুন-সুড়কি-ইঁট। গরুর এগিয়ে দেওয়া পায়ের সামনে পুরোনো ভেঙে ফেলা বাড়ির শেষ স্মৃতির মতো একটা বন্ধ দরজা। দরজায় লাগানো তালাটা চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে। গরুটা যেন একদৃষ্টে তাকিয়েই আছে ঐ বন্ধ তালার দিকে যার বন্ধ থাকার আর কোন অর্থ নেই। গরুটাও কি এখন একটা সময়ের মৃত্যুর কথা ভাবছে নাকি সবটাই চিরঞ্জীবের আন্থ্রপোমরফিক আরোপ? পূর্ণিমায় স্বচ্ছ ভারত অভিযান চলছে।

বেসামাল সেই মধ্যিরাতে বন্ধুর বাড়িতে দেখা ঐ অসহায় হাত তার মনে থাকবে। হাতের ওপর কয়েক ফোঁটা জল চিকচিকাচ্ছে। কোমরের একটা অংশ প্রশ্নের মতো এগিয়ে আছে। সেখানকার উত্থিত হাড়েও জল লেগে রয়েছে। বাকি শরীর পাশের ঘরে। হাতটা প্রাণপণ দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করছে। যাতে পাশের ঘরের নগ্নতা এঘরে না ঢুকে পড়তে পারে। ব্যাস এইটুকুই। আর না। একটা গল্প জমাট বাঁধার আগেই তাকে হত্যা করার মধ্যে যে উল্লাস থাকে তার সবটাই ধর্ষকামী নয়। কখনো কখনো তা নৈতিকও হতে পারে। গল্পের মৃত্যুর কথা গল্পকারমাত্রেই জানেন। তা সে মৃত্যু তিনি ঘটান আর নাই ঘটান। চিরঞ্জীব, সেও কি আর জানে না, প্রতিটি মুখ যাকে সে প্রতিদিন দেখছে, রাস্তা-ঘাটে, ট্রেনে-ট্রামে-বাসে, তাদের সবারই গন্তব্য মৃত্যু। এই গন্তব্য অজানা তবু নিশ্চিত। এরা কি সবাই সবসময় সেই গন্তব্যের কথাই ভাবছে? ভাবছে, জীবন কিভাবে তাদের নিয়ে যাবে সেই পথে? মৃত্যুর কি আদৌ কোনো চেতনা হয় নাকি শয়নে স্বপনে জাগরণে সে আমাদের অবচেতন বন্ধু হয়েই থাকে। আমরা মৃত্যুর জন্য কি আর বাঁচি নাকি? বাঁচি তো বেঁচে থাকারই জন্য। তারপর একদিন শান্তি-অশান্তির মধ্যে মৃত্যু এসে দাঁড়ায়। চিরঞ্জীব গুনগুন করে ওঠে:

একটা দিন ছিল, একটা দিন।
ছিলো না কোন হারাবার ভয়।
ছিলো না কোন ভবিষ্যতের ভাবনা ছিলো না।
ছিলো না সারা শরীরে সংশয়।

ওর মনে পড়ে বহু দশক আগের বয়ঃসন্ধির সেই মাঝরাতে হঠাৎ ঘেমে নেয়ে উঠে যখন বিছানার চাদরের গোল গোল ডিজাইনের দিকে তাকিয়েছিল। সেই তার সচেতন জীবনে মৃত্যুভয়ের প্রথম মুহূর্ত। কেন যে সেদিন ভয় পেয়েছিল আজো বোঝেনি। স্বপ্ন দেখেছিল নাকি অন্য কিছু? কিন্তু কেন জানি না মৃত্যু বলতেই তার ঐ হলুদ গোল গোল ডিজাইন মনে হতো। তারপর অনেকটা সময় কেটে গেছে। এখন আর মৃত্যুর কোন ভয় নেই চিরঞ্জীবের। বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে সে বন্ধু হয়ে গেছে একরকম। ছোটবেলার অমরত্ববোধ নেই, তাই হয়তো মৃত্যুভয়ও সেলাম ঠুকে বিদায় নিয়েছে। মা'র মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কয়েক বছর আগে মৃত্যুকে বেশ কাছ থেকে দেখেছে চিরঞ্জীব। যেমন এখন দেখছে গরুটাকে। একটা বন্ধ ওষুধের দোকানের সামনে সিমেন্টের চাতালে পা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর পেটে যেন দুনিয়ার গল্প ভরা রয়েছে। প্রসবহীন সেসব গল্প নাড়িভুঁড়ি ছুঁয়ে মৃত্যুর হলুদ বৃত্তের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে।

সেদিন বাড়ি ফেরার পর পুরোনো ড্রয়ার ঘাঁটতে ঘাঁটতে মার জিনিসের ভেতর একটা সাদা খাম পেলো চিরঞ্জীব। বেশ কয়েক বছর আগের হবে। হলদেটে হয়ে এসেছে কাগজ। খুলতেই একগাছা পুরোনো ৫০০ টাকার নোট বেরিয়ে এলো গান্ধীর অধুনাবাতিল হাসি সহযোগে। সব মিলিয়ে ৭ হাজার টাকা। ভারতবর্ষে সম্প্রতি ডি-মানিটাইজেশন নামক এক খাদ্য বিপ্লব হয়ে গেছে যাতে নয় নয় করে মাত্র ১০০ লোক ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে পুরোনো নোট বাতিল করতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ দিয়েছেন। মহামান্য প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে গেছেন সবুর করার কথা। চিরঞ্জীব নিজেও ছিল সেইসব লাইনের স্বাক্ষী। এখন ঝড় স্তিমিত। মা মারা যাবার পরই সেইসব নোটবন্দীর কেসপত্র হয়েছিল। যতটা পেরেছে পুরোনো নোট বদলে নিয়েছে চিরঞ্জীব কিন্তু এই নোটগাছার কথা সে জানতোই না। মার স্বভাব ছিল বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে টাকা রাখা। যাক এখন তো এই পুরোনো টাকা বদলানোর আর কোনো সম্ভাবনা নেই। সব ডেডলাইন অনেকগুলো মাস হলো পেরিয়ে গেছে। টাকাগুলো নিয়ে কি করবে ভাবছিলো চিরঞ্জীব। রেখে দিলে ৫০ বছরে কিউরিয়ো হয়ে উঠবে ঠিকই কিন্তু ৫০ বছর তো অনেকটা সময়। অতদিন সে নাও থাকতে পারে। এই নোটগুলো এখন মৃত। কে জানে আগামী ৫০ বছরে আরো কতবার এমন নোটমৃত্যু ঘটবে। এইসব ভাবতে ভাবতেই মাথায় এলো আইডিয়াটা।

রাত তখন প্রায় ১১ টা। চিরঞ্জীব বাড়ি থেকে বেরিয়ে গরুটাকে খুঁজতে লাগলো। দেখলো ঐ ওষুধের দোকানের সামনেই এখনো দাঁড়িয়ে আছে। গরুর কাছে গিয়ে তার মাথার দিকে মুখের নিচ বরাবর নোটের বান্ডিলটা রেখে দিলো চিরঞ্জীব। গরুটা মাথা নামিয়ে বান্ডিলটা দেখলো। তারপর মাথা ঘুরিয়ে চিরঞ্জীবকে দেখে নিলো একবার। চিরঞ্জীব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো গরুটা বাতিল নোট খায় কিনা। সে কি আর জানে নাকি বাতিল নোট? সে কি আদৌ নোট বোঝে? নাকি ওগুলো তার কাছে স্রেফ কাগজ? আস্তে আস্তে চিরঞ্জীব দেখলো গরুটা কিভাবে সন্তর্পণে একটা একটা করে নোটগুলো মুখে পুরে দিলো। নোটগুলো তার পেটে গেলে কি পেটের গল্পগুলো বেরিয়ে আসবে? ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না চিরঞ্জীব। আকাশে তাকিয়ে দেখলো চাঁদ নেহাৎই ক্ষীণ, একটা ফালি। পরদিন সকাল থেকে গরুটাকে আর কোথাও দেখা গেলো না।