নদীরা

শতাব্দী দাশ



-ক্যানিং-এর ইস্টিশনে নেমিই কি আমার বাড়ি? ফাস্ সকালির টেরেন ধললি ক্যানিং নামব ঘণ্টাটাক বাদে। পঁয়তাল্লিশ মিনিট অটোয় চড়লি চুনাখালি। তাপ্পর জলেই থাকতি হবে তিন ঘণ্টা। সে কি জ-অ-অল গো দিদি! হানা নদী পেইরে বিদ্যেধরী। বিদ্যেধরী পেইরে দুর্গামঙ্গল। এক নদী থেকি অন্য নদীতে পড়লি জল রঙ বদলায়। আমরা চিনতি পারি। তোমরা পারো না।

নদীর স্মৃতি হাতড়ায় বুবুন। পাহাড়ি নদীর ঝিরঝির একটানা শুনেছিল সিরিখোলায়। সে নদী একা। ক্ষীণকায়া, তবু চঞ্চল। ব-দ্বীপে জালিকা বিস্তার করে, হাত-ধরাধরি করে যে নদী-ভগিনীরা, তাদের সঙ্গে সে একাকিনীর বিস্তর তফাত।

-তোমাদের নদী সারা রাত গান গায় সবিতা?

-গর্জায় দিদি। বড় গর্জায়। রান্নাঘর ঘর ভেঙি দেয় বছর বছর। নদীরে ভয় পাই। ভালোও বাসি। নদীরে ভালো লাগে বাড়ি ফেরার দিন। দুর্গামঙ্গল পেরুলেই মোল্লাখালির ঘাট। বাছা আমার 'মা মা' ডেকি ছুটি আসে।

যে ভেঙেচুরে দেয়, তাকে ভালোবাসা যায়? অধীরকে ভালোবাসা যায়? সে কি মর্ষকাম নয়? অধীরকে ভালো না বাসতে গেলে অনেক পাতা ছিঁড়ে ফেলতে হয় গানের খাতা থেকে৷ যেমন সিরিখোলার ঝিরঝির সুরের পাতা৷ সে গান অধীরের পাশে বসে শোনা।

লকডাউন ঠিকে মেয়েটার কাজ খেল। যেভাবে নদী খায় রান্নাঘর, বছর বছর। ওরা ট্রেনে যাতায়াত করে। গায়ে গা, মাস্কহীন, নির্ভয়। প্রাণপণে মরণ চাইলেও অত সহজে মরবে না, এমন ট্র‍্যাজিক প্রত্যয় ওদের আছে। বুবুন তাকে মাইনে দিয়ে বাড়ি বসিয়ে রেখেছিল তিন মাস। তারপর ট্রেন চলল। সে আসতে চাইল কাজে। বুবুন ভরসা পেল না। বৃদ্ধা শাশুড়ি বাড়িতে। ভালো-মন্দ কিছু হলে অধীর বলবে, 'তোমার ফাঁকিবাজির জন্যই…'

অধীর ওয়ার্ক ফ্রম হোম করে নিবিষ্ট, বেডরুমে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা। সেইটুকু যোগ বুবুনের সঙ্গে। বুবুন হাঁফিয়ে ওঠে চব্বিশ ঘণ্টা এক ছাদের তলায় থাকার বাধ্যবাধকতায়। অধীরের কাজে যাওয়ার দিনগুলি ভাল ছিল৷ বেডরুমটা, লাগোয়া বারান্দাটা, দুপুরের পরে নিজের করে পেত সে৷ এ বাড়িতে তিনটে ঘর। একটি শাশুড়ির। ঢুকলে হাসপাতালের দুপুর মনে পড়ে৷ জ্বর, ওষুধ, পথ্য, বেডপ্যান। ও ঘরের নাম 'অসুখ'। আরেক ঘরের নাম কি 'সুখ'? যৌথতায় সুখ নেই, একজনই সে ঘরে সুখযাপন করতে পারে, একা। বুবুন যেমন একদা সুখী দুপুর-বিকেল যাপন করত অধীর-বিহীন। অধীরও যেমন ও-ঘরে ওয়ার্ক-ফ্রম-হোমের অছিলায় দিনমান কাটায় এখন, বুবুন-বিহীন। তৃতীয় ঘরের দেওয়ালে স্টেনসিল পাখিরা দোল খায়। সিলিং-এ চাঁদ-তারা। যার ঘর, সে আসেনি কখনও। ও ঘরের নাম হতে পারত 'স্নেহ৷'

শেষে মিসেস দত্ত বুদ্ধিটা দিলেন৷ চব্বিশ ঘণ্টার কাজের লোক রাখলে হয়। তাহলে তার যাওয়া-আসার পথে সংক্রমণের হ্যাপা নেই। খরচ পড়বে কিছু বেশি। কিন্তু কতদিন আর এভাবে…

সংসার ফেলে কে থাকতে রাজি হবে? ঠাঁইনাড়া হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। বুবুনের পা দুটি যেমন প্রোথিত সংসারে। শিকড় উপড়ে যতবার নিজেকে পৃথক করতে চায়, খামোখা রক্তাক্ত হয়। অসহায়,সম্বলহীন কাউকে পাওয়া যেতে পারে, আয়া সেন্টার আশ্বাস দেয়। কতটা অসহায়তায় মানুষ শেষ আশ্রয় বা তার বিভ্রমটুকুও ঝেড়ে ফ্যালে?

বুবুন আশা করেছিল স্বামীহারা বা সন্তান-পরিত্যক্ত কোনো প্রৌঢ়াকে। অথচ সেন্টার পাঠালো নদীর ঘ্রাণ মাখা বছর চল্লিশের সবিতাকে। স্বামী-পুত্র-সংসার সবই আছে তার৷ বলা চলে, বেশিই ভরন্ত সংসার৷ চার সন্তান। চাষাবাদে সংকুলান হয় না৷ তিন ঘণ্টা জলপথ পাড়ি দিয়ে, আরও দু ঘণ্টা স্থলভ্রমণ শেষে সবিতা তাই ভিড়েছিল মিতালি আয়া সেন্টারে। কাজ ধরতে গেলে চব্বিশ ঘণ্টারই ধরতে হয়। ডেলি প্যাসেঞ্জারি সম্ভব নয়। তদুপরি টাকা বেশি, থাকা খাওয়া মুফত৷

সবিতা আসার পর বুবুন হালকা হয়েছে৷ যে ঘরের দেওয়ালে স্টেলসিল পাখি দোলে, সে ঘরে সে দুপুরবেলা চুল এলিয়ে বই পড়তে পায়। কী আশ্চর্য, অধীরের সঙ্গে তারও চা জোটে বেশ ক'বার। রাতে ল্যাপটপ শাট ডাউন হলে, শোবার ঘরে ফেরে বুবুন। পাখি-ঘরে তখন শুয়ে পড়ে সবিতা৷ যে ঘরের নাম হতে পারত স্নেহ, সে ঘর দুবেলা পরম স্নেহে আশ্রয় দেয় দুই নারীকে।

সবিতা নদীর কথা বলে। ঝড়ের কথা বলে। বলে বছর বছর নদী রান্নাঘর ভেঙে দেওয়ার পর, সেই নদীর বুক থেকেই মাটি ছেনে আবারও হেঁসেল গড়ার কথা৷ যে বাঁধ বাঁধাই হয় ভাঙার তরে, তার কথা বলে। বলে বান এলে গ্রামসুদ্ধু মানুষের ঘর ছেড়ে ইস্কুলবাড়ির দোতলায় পালানোর কথা৷ লবণজল ঢুকলে পুকুরে মাছেদের লাশ যে আলপনা রচনা করে, তার কথাও বলে৷ বলে আম্ফানে হারানো ছাগলছানার কথা।

বুবুন বলে না৷ শোনে৷ অন্য দেশ, অন্য জল, নোনা হাওয়া ও প্রলয় সে শুষে নেয় সবিতাকে ছুঁয়ে৷ সবিতা যখন ছেলেমেয়েদের কথা বলে, যে ঘরটির নাম হতে পারত স্নেহ, সে ঘর হেসে ওঠে বহুদিন পর৷ ছোট মেয়েটিকে চোখে হারায় সবিতা৷ যেন নাড়ি কেটে এই মাত্র তাকে গেছে গর্ভ থেকে। দুই বেলা ফোন আসে। বালিকার কলতান শোনা গেলে বিবর্ণ ফোনের স্ক্রিন উপচে দুর্গামঙ্গলের ছিটে লাগে সবিতার চোখে-মুখে। বুবুনও ভিজে যায়।


*****

সেদিনও সন্ধ্যায় ফোন আসে৷ বুবুন উৎকর্ণ হয়। অথচ সবিতা বিগলিত নয়। উৎকণ্ঠা তার নির্বাক চোখে৷ মেয়েটির জ্বর। গলাতেও ব্যথা সেই সাথে। সবিতা নিশ্চুপে রান্না করে। নদীর কথা, গ্রামের কথা কয় না৷ মোল্লাখালিতে একটি মাত্র প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র৷ সেখানে দুদিন ডাক্তার মেলেনি। বুবুনের ইচ্ছে করে সবিতাকে জড়িয়ে ধরতে। পৃথক কাপ, থালা আর সাবানের বাধা ডিঙিয়ে তা হয়ে ওঠে না।

পরদিনও সুসংবাদ আসে না। খুদের গলা ফুলেছে বিস্তর৷ সে নাকি বলেছে, 'মরে যাব মা'। বুবুনের অপরাধী লাগে। অধীরকে জানাবে একবার? অধীর কি মাথা ঘামাবে?

দরজায় টোকা পড়লে অধীর বিরক্ত হয়। এক মিনিট সময় পাওয়া যায়? অধীর ক্যামেরা অফ করে। বুবুন জিজ্ঞাসা করে, কোনোভাবে যদি কেউ মেয়েটিকে নিয়ে আসে শহরে, অধীর কি থাকতে দেবে তাকে? চিকিৎসা করাতে দেবে এখানে থেকে ক'দিন? অধীর সংক্ষেপে বলে, 'যা ইচ্ছে করো।'

ভিন্ন সময়ে নঞর্থক মানেটাই নতমস্তকে গ্রহণ করত বুবুন। কিন্তু এখন সে ধরেই নেয়, সত্যি 'যা ইচ্ছে' সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার আছে। সবিতার চোখে কৃতজ্ঞ পশুর বশ্যতা ভেসে ওঠে। সে স্বামীকে ফোন করে। মেয়েকে কলকাতায় ছেড়ে যেতে বলে। এখান থেকে করোনা পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যাবে।

কী আশ্চর্য! স্বামী মহাশয় রাজি হয় না। এখন ধান রোয়ার সময়। কাজ ফেলে মেয়ে নিয়ে শহরে দৌড়বে কে? মেয়েমানুষের জান অত সহজে যায় না। তার চেয়ে সাতজেলিয়ার সরকারি হাসপাতালে চেষ্টা করা ভাল। সবিতা, তুমিও বুঝি উদাসীনতার স্বাভাবিকতায় অভ্যস্ত হয়েছ?

কাজের শর্ত ছিল, অন্তত দু মাস যেতে পারবে না বাড়ি। যাতায়াতকালীন সংক্রমণ এড়াতেই না এত কিছু! সবিতা তাই নিশ্চুপে রান্নাঘরে ফেরে। রাতে পাখি-ঘর থেকে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শোনে বুবুন। মনে পড়ে আল্ট্রাসাউন্ডের ঘর। যে মুহূর্তে জানা গেল, সন্তরণরত জীবটির হৃদয়ের ধুকপুক থেমে গেছে বিনা নোটিসে, সেই মুহূর্তের ফোঁপানি। পরদিন আরেকটা আল্ট্রাসাউন্ড মৃত্যু বিষয়ে নিশ্চিত হল। রাতের ওষুধগুলো খাওয়ার পর রক্তক্ষরণ শুরু হল। পিছনের সিটে তাকে বসিয়ে নির্বিকার হাতে স্টিয়ারিং ধরেছিল অধীর। জরায়ুমুখ শিথিল হলে তাকে ছিন্ন করে নেওয়া গেল অচেতন বুবুনের শরীর থেকে। মৃত সন্তানের জন্য শোক মান্য। কিন্তু মৃত ভ্রুণের জন্য? যে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠেনি, তার মৃত্যুতে তেমন হেলদোল দেখাল না অধীর।রক্তে ভেজা একটা গাড়ির সিটের উপর উঠে বসল বুবুন অস্বস্তিতে। শুকনো যোনিমুখে হাত দিয়ে আশ্বস্ত হল, স্বপ্ন ছিল। পাখিঘরে তখনও ফোঁপানি৷

ভোররাতে চাবি খুলে দিল সে সবিতাকে৷ 'ফার্স্ট ট্রেন ধরো, মেয়েকে নিয়ে এসো।' সবিতা ছোট ব্যাগখানি খুলে দেখাতে ভোলে না। আয়া সেন্টার বলে দিয়েছে, বাইরে বেরোনোর আগে ব্যাগপত্র দেখিয়ে মালিককে আশ্বস্ত করতে হবে যে, চুরি যাচ্ছে না কিছু। বুবুন দেখে, ব্যাগের মধ্যে পার্স আর লঝঝরে মোবাইল। পার্সটিও খুলতে যেতে বুবুন আর্ত চিৎকারে তাকে থামায়।



*******


পরদিন ফেরার কথা মেয়ে নিয়ে৷ অথচ সবিতা ফেরে না দুদিন পর। ফোন বন্ধ। ফেলে যাওয়া চার্জার বুবুন আবিষ্কার করে পাখিঘরে। বুবুন অস্থির হয়। অদেখা বালিকার জন্য দুশ্চিন্তা হয়। একাকীত্বের দিন-রাত ফেরে। সবিতাকে কি ফিরবে আর? নাড়ির টান বন্ধুতার টানের চেয়ে বেশি, কে না জানে! সবিতা তাকে বন্ধু ভাববেই বা কেন?

তিন দিনের মাথায়, বুবুন নিশ্চিত হয়, এ চিরতরেই যাওয়া৷ হয়ত আসতে দেওয়া হয়নি সংসার ছেড়ে। হয়ত মেয়েটির শরীর এতই খারাপ যে কলকাতায় নিয়ে আসা সম্ভব নয়। এমন অবসাদ গ্রাস করে যে সেন্টারে ফোন করে জানানো হয় না, নতুন লোক চাওয়া হয় না। নতুনতর সম্পর্কে বুবুনের চিরকালই অনীহা। অধীরের সঙ্গে বন্ধন ছিন্ন করাও মুলতুবি সে কারণে। খানিক অনিষ্টচিন্তা আর খানিক অবসাদ নিয়ে বুবুন ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে নদী দেখে। হানা থেকে বিদ্যেধরী, বিদ্যেধরী থেকে দুর্গামঙ্গলকে আলাদা করে চিনতে চেষ্টা করে। এক এক নদীর এক এক খেয়াল। নদীর চরে কাদামাটির ঘর। যে ঘর পড়ে যাবে, গড়া হবে, যাতে পরের বছর আবারও পড়ে যায়।

খুব সকালে বেলের তীক্ষ্ম শব্দে ধড়মড় করে উঠে বসে বুবুন। অধীরের ঘুমন্ত মুখে বিরক্তির ভাঁজ। দরজা খুলতেই সবিতা। এক গাল হাসি আর বিশাল বোঝা।

-কত ভোরে রওনা দিলে সবিতা? এতদিন কোথায় ছিলে?

মেয়ে গত দুদিনে সেরে উঠেছে। মায়ের উপস্থিতির কারণে হয়ত বা। অতিমারী রেয়াত করেছে তাকে। প্রত্যাবর্তন এত আনন্দ দেয়? সবিতা, জানো কি তুমি, কেন? হাত ধরবে সবিতা?

সবিতা এনেছে ব্যাগ ভরা আনাজ, বাড়িতে ফলানো। ফুলকপি, ওলকপি, বাঁধাকপি, বিট ও সিম। তাদের গায়ে এখনও এঁটেল মাটির ঘ্রাণ। ভোরের শিশির মেখে মিটিমিটি হাসছে। তারা শুয়ে আছে পাশাপাশি রান্নাঘরের স্ল্যাবে, যে ভাবে নিওন্যাটালে সদ্যোজাতরা পাশাপাশি শুয়ে থাকে৷ সবিতা তাদের যখন তুলে দেয় বুবুনের হাতে, তখন হাত হাত মেশে। যেভাবে বিদ্যেধরী মেশে হানায়, হানা দুর্গামঙ্গলে।