বিস্মৃত যত কিছু

আফসানা বেগম



খালিদ আহমেদ আগেভাগে সন্ধ্যার চা শেষ করে কম্পিউটারের সামনে বসেন। ল্যাপটপটা অন ছিল, জুম মিটিং-এ সময়ের মিনিট পাঁচেক আগে যুক্ত হতে হবে। স্টুডিওতে ঢুকতেই শোনেন, উপস্থাপক, সোহেল আলমের সঙ্গে অন্য অতিথির আলাপ চলছে। আয়তকার খোপে তাকে দেখে সোহেল বলেন, ‘এই যে, খালিদ ভাই চলে এসেছেন। তা আছেন কেমন, ভাই?’ তারপর খালিদ উত্তর দেবার আগেই বলেন, ‘ইনি হলেন, সুতপা বণিক। নিউ ইয়র্কে থাকেন। মূলত ইতিহাসের গবেষক তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তার বিশেষ আগ্রহের জায়গা। আর সুতপা দি’, ‘ইনি হলেন মুক্তিযোদ্ধা, খালিদ আহমেদ। আরো অনেক পরিচয় আছে বটে। অবশ্য তা আপনারও আছে, মানে, আপনারা গুণী মানুষ। তবে বিজয়ের মাসে, আজকের অনুষ্ঠানে ওই পরিচয়গুলোই আমাদের কাছে মুখ্য। আপাতত ওতেই চলুক।’
অতিথিরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হাসেন। অনুষ্ঠানের শুরুর সঙ্গীত বাজার আগমুহূর্তে সুতপার কণ্ঠ শোনা যায়, ‘আচ্ছা, আপনি কি যুদ্ধের শেষের দিকে শিলচরে. . .’ বলতে না বলতেই সঙ্গীত কানে এলে প্রত্যেকে সতর্ক হন। উপস্থাপকের প্রারম্ভিক কথাবার্তা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আবেগ-আকুতির সময়টাতে সুতপা আড়চোখে খালিদের দিকে তাকিয়ে দেখেন। খালিদের দৃষ্টি ক্যামেরার দিকে, ভাবলেশহীন। সুতপার আধাআধি কথার অর্থ ধরতে পারেননি হয়ত। সুতপার অস্থির লাগে, এই লাইভ কখন শেষ হবে আর কখন প্রশ্নটা করা যাবে যে, তিনিই কি আহত মুক্তিযোদ্ধা খালিদ? প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের এলোমোলো হাজার মুহূর্ত দিয়ে মালা গাঁথতে গাঁথতে সুতপা অন্যমনস্ক হন। উপস্থাপকের মুখে নিজের নাম শুনে চমকে ওঠেন। উপস্থাপক বলেন, ‘আচ্ছা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিচিত্র ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আপনি হঠাৎ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে অধিক মনোযোগী হয়ে উঠলেন কী করে?
সুতপা মুখে গড়গড় করে উত্তর বলে যান, যেন কোনো যন্ত্র। তাকিয়ে থাকেন খালিদ আহমেদের মুখের দিকে। মধ্যবয়সী লোকটার ফেঞ্চকাট দাঁড়ির নীচে কি সেই তরুণের ব্যথায় কাতর অথচ মায়াবী মুখটাই উঁকি দেয় না? ওদিকে কী সমস্যা, চশমাটাই সঙ্গে নিয়ে বসা হয়নি। এখন চশমা খোঁজাখুজির কথা বলে উঠে যাওয়াও যায় না। একেকবার মনে হয়, সেই মানুষই তো! মুক্তিযুদ্ধের প্রভাবক হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক আলাপের মাঝখানে সুতপার মুখ দিয়ে যেন বেরিয়েই যায়, ‘আপনি কি ওই খালিদ? ওই যে একাত্তরে, আমাদের শিলচরে? মানে, ওই যে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে পায়ে মর্টার শেল লাগল আপনার? . . .’ অনেক কষ্টে, মনের উপরে জোর করে সুতপা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের ব্যাপারে ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পিছনের কারণ বিশ্লেষণে অটল থাকেন।
প্রতি বাক্যের শেষে সুতপা নিশ্বাস নিতে ভুলে গেলেও স্মৃতি আওড়াতে ভোলেন না। একাত্তর. . . সে বছর এত বৃষ্টি পড়ে, যেন আকাশের কান্না থামেই না। মুক্তিযোদ্ধারা হাসপাতালে হাত-পা হারিয়ে কাতরায়। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণের জন্য নয়, বরং প্রার্থনা করে স্বাধীনতার জন্য। ওদিকে, সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবর এসে যায় কিন্তু বৃষ্টি থামার নাম নেই। দীর্ঘ বর্ষাকালের এক দিনে চৌদ্দ বছর বয়সি সুতপার আর তার বাবা-মায়ের মুক্তিযুদ্ধে আহত ছেলেদের দেখে আসার সাধ হয়। এর-ওর মুখে শোনা যায়, হাসপাতালে তরুণ ছেলেগুলো রক্তাক্ত হয়ে আসে। মৃতপ্রায় কেউ কেউ পড়ে থাকে সরু বিছানায় বা মেঝেতে। সুতপার বাবা তখন বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরলে ওই এক গল্প- শরণার্থী শিবিরের হালচাল, মুক্তিযোদ্ধাদের দিনকাল, যুদ্ধের পরিস্থিতি। শুনতে শুনতে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা দেখার জেদ ওঠে সুতপার। সুতপার বাবা ডাকসাইটে উকিল আর স্থানীয় কংগ্রেসের নেতা। তাই ব্যবস্থা করতে অসুবিধা হয় না।
জুম মিটিং-এ বসে খালিদ আহমেদ বলে যান গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। ওদিকে, সুতপা ভাবেন তার দেখা তরুণ মুক্তিযোদ্ধা খালিদের কথা. . . সৌভাগ্যক্রমে আকাশে মেঘ না থাকলে টিলার উপরের বাড়িটার প্রান্তের ঘরটাতে সকাল সকাল যখন সূর্য ঢুকে পড়ত, তখন বিছানায় কাত হয়ে পড়ে থাকা এক পা কাটা তরুণের মুখটায় আলোকরশ্মি খেলত। সুতপা নাস্তা পৌঁছে দিতে এসে, দরজায় দাঁড়িয়ে সেই মুখটা ড্যাবড্যাব করে দেখত। আর তারপর কোথায় হারিয়ে যায় সেই যোদ্ধা! ঊনপঞ্চাশ বছরে স্মৃতির উপরে পরতে পরতে ধুলো জমতে জমতে যোদ্ধার বয়সি চেহারা কল্পনা করা যায়নি। সুতপার মনে হয়, সে না চিনুক অন্তত খলিদের তো তাকে চেনা উচিত! আত্মীয়েরা বলে তার মুখটা এখনো কিশোরীসুলভই থেকে গেছে। কিন্তু কই, খালিদ তো যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা বলেই চলেছেন, সুতপার মুখের দিকে তার দৃষ্টি নেই।
‘সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমি শেষবারের মতো মিশনে গেলাম। ‘শেষবার’ বলছি এজন্য যে সেদিন সম্মুখযুদ্ধে পা হারাই আমি।’
‘তারপর?’ উপস্থাপকের আফসোস মেশানো প্রশ্ন।
‘আমার আর মিশনে যাওয়া হয়নি,’ খাদে নামা খালিদের কণ্ঠস্বর অপরাধীর মতো শোনায়। থেমে নিয়ে বলেন, ‘জুরি ভ্যালির দিলখুশ চা বাগানে মিশন ছিল মধ্যরাতে। দুটো ব্রিজ উড়িয়ে রাস্তা বন্ধ করে আর্মি ক্যাম্পে আক্রমন করার কথা ছিল আমাদের। একটা ব্রিজ ওড়াতে দুবার বিষ্ফোরণ ঘটাতে হয়েছিল। শব্দ শুনে এদিকে আমরা ভেবেছিলাম দুটোই উড়ে গেছে। নিশ্চিন্ত মনে আক্রমণ করেছি, জানতেও পারিনি ওদিকে আমাদের এক দল রাজাকারদের কবলে পড়ে একটা ব্রিজ ওড়াতেই পারেনি। শেষে যা হবার তাই হলো, আক্রমণের খানিক পরে আর্মিদের আরেক দল পৌঁছে গেল, পাল্টা আক্রমণের শিকার হলাম আমরাই। সেই আক্রমনেই পা হারালাম। যা হোক, ভোরের দিকে কাতরাচ্ছি দেখে চা বাগানের এক কুলি কোত্থেকে লম্বা মই আনে। তারপর পাঁচজনে মিলে মইয়ে শুইয়ে টানতে টানতে আমাকে প্রায় এগারো কিলোমিটার দূরে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরে ওদের কাছে শুনেছি, আমি নাকি মইয়ের উপরে শুয়ে ও আমার দেশের মাটি তোমার প’রে ঠেকাই মাথা গুনগুন করে গাইছিলাম। প্রচুর রক্তক্ষরণ হলেও আমি বেঁচে যাই। এখনো ভাবি, অতি সাধারণ ওই কুলিদের ঋণ শোধ করার সামর্থ কি কোনোদিন আমার হবে? তারপর মনে পড়ে, প্রায় দুটো মাস এক বাড়িতে পড়ে থাকলাম, তাদের দয়া আর পরিচর্যায় সেরে উঠলাম। তাদের ঋণও আমি কোনোদিন. . . মানে, সুশীল বণিক ও তার পরিবারের ঋণ শোধ করতে চাওয়াই ধৃষ্টতা হবে আমার!’
‘আপনি খালিদ, মানে, ওই খালিদ যে আমাদের বাড়িতে. . .’ সুতপার আকস্মিক প্রতিক্রিয়ায় খালিদ কথা থামাতে বাধ্য হন। উপস্থাপক কিছু বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকেন। আর খালিদ ওই প্রথম পূর্ণ দৃষ্টিতে সুতপার দিকে তাকান। ঢাকায় তখন জানালার বাইরে অন্ধকার হলেও সুতপা সরু নীল পাড়ের ঘিয়ে শাড়িতে বসে আছে খোলামেলা আলোকিত এক ঘরে। পাশের জানালায় ঝকঝকে সকাল, জানালার দেয়ালটায় ছোটো টবে চন্দ্রমল্লিকা ফুটে আছে। খালিদ অপলক দৃষ্টিতে মৃদু নড়তে থাকা স্বচ্ছ সাদা পরদার সামনে বসা সুতপার দিকে তাকিয়ে থাকেন। সাদা-পাকা চুলের ঘেরাটোপে তীরের মতো থুঁতনিওলা সেই লম্বাটে মুখটাই তো! খালিদের বিস্ময়ের ঘোরে সুতপা বলে ওঠেন, ‘আমি সুতপা। আমার বাবা, সুশীল বণিক। আপনি মনে রেখেছেন আমাদের কথা!’ সুতপার মুখটা তখন স্ক্রিন জুড়ে ভাসে। চশমাটা নাকের উপরে ভালোমতো বসিয়ে নিয়ে খালিদ স্ক্রিনের দিকে আরেকটু এগোন, নীচু স্বরে বলেন, ‘সুতপা!’
অনুষ্ঠান শেষ হয় কোনোরকমে। এই প্রথম তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর গভীর জ্ঞানসম্পন্ন গবেষক, সুতপা বণিকের বিস্তারিত আলোচনায় যেতে ইচ্ছা করে না। কোনোরকমে এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেই ষাটোর্ধ মেয়েটি কৈশোরের উত্তেজনায় ফিরে যান। জুম মিটিং-এর ব্যক্তিগত আসরে দুজনের কৌতূহল মিটতে থাকে। সুতপা অস্থির হন, ‘সেই কবেকার কথা, ভাবুন তো! মুক্তিযুদ্ধের পরে আপনি জার্মানি চলে গিয়েছিলেন, সেটুকু তো চিঠি থেকে জেনেছি। আপনার পায়ের অপারেশনের কথাও। কিন্তু তারপর কোথায় হারিয়ে গেলেন? আমার চিঠিগুলো কি আপনার কাছে পৌঁছেনি? আর বাবা-মায়েরগুলো? আমি কিন্তু আপনাকে আলাদা করে লিখতাম, ওই জার্মানির ঠিকানাতেই. . . আপনি এখন কি বাংলাদেশে থাকেন?’
প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে সুতপা নিজের কিশোরীসুলভ আচরণে বিব্রত হন। সামান্য থমকে থাকেন। খালিদ জানতে চান, ‘আচ্ছা, মাসি আর মেসোমশাই?’
‘তাঁরা দুজনেই স্বর্গবাসী হয়েছেন।’
‘ও হ্যাঁ, তাই তো, তাই তো। সময় যে থেমে নেই! আমাদের বয়সই তো. . .’
খালিদ আহমেদ বিষণ্ণ বোধ করেন। কী ভয়ানক এক সময়ে দেবদূতের মতো তাঁরা হাসপাতালের বিছানাটার পাশে হাজির হয়েছিলেন! স্মৃতির হুড়োহুড়িতে হয়ত খালিদকে খানিকটা মৌন থাকতে হয়। নীরব থাকেন সুতপাও। নিস্তব্ধতার মধ্যে খালিদের কেবল ঘুমানোর পরে উঁচু থেকে পড়ে যাবার মতো অনুভূতি হয়। দিলখুশ চা বাগানের কুলিরা তাকে যখন বালু বিছানো রাস্তা আর ঝোপঝাড়ের ঢাল বেয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তখন সেরকম অনুভূতিই হয়েছিল। হুট করে নীচের দিকে পড়ে যাবার অনুভূতিটা পরে স্মৃতি ফুঁড়ে যখন তখন জানান দিত। বছরের পর বছর চোখ বুজলেই চা বাগানের শেড ট্রিগুলোর নীচ দিয়ে ক্রমশ নীচের দিকে পড়তে থাকত সে। হাঁটুর নীচ থেকে ফিমারের হাড়টা টুকরো টুকরো হয়ে ছেঁড়া চামড়ায় সামান্য সম্পর্কযুক্ত হয়ে ঝুলছে আর তার উপরের মাংসের স্তর উধাও। উপরে অন্ধকার আকাশে সিল্যুয়েটের মতো শেড ট্রি, শরীরে রক্তে আর ঘামে জবজবে অনুভূতি অবচেতন মনকে কখনো পিছু ছাড়েনি।
আহত মুক্তিযোদ্ধা, খালিদ আহমেদ ক্যাম্পে পৌঁছালে দ্রুত জিপে ওঠানো হয়। চেতন আর অবচেতনের মধ্যে করিমগঞ্জ, বদরপুর পেরিয়ে নেয়া হয় মাসিমপুর হাসপাতালে। সেখানে সপ্তাহ দুয়েক ওষুধের প্রভাবে বলতে গেলে ঘুমের ঘোরেই কাটে। কখনো চেতনায় ফিরলে কোমর অব্দি ব্যান্ডেজটার উপরে খালিদের হাত চলে যেত। ভিতরে ভয়ানক চুলকাত। চুলকানোর নিষেধ সত্ত্বেও একদিন ঝাড়–দারের কাছে কয়েকটা ঝাড়–র কাঠি চেয়ে নিয়ে বালিশের নীচে লুকিয়ে রেখেছিলেন খালিদ। একলা ঘরে সুযোগ বুঝে ব্যান্ডেজের ফাঁকে কাঠিগুলো ঢুকিয়ে খুব করে চুলকে নিতেন। কিন্তু তবু যেন মনে হতো আরো বেশি চুলকানো দরকার। ঠিকমতো চুলকাতে না পেরে শরীরে নভেম্বরের শীতেও ঘাম ছেড়ে দিত, মুখ থেকে চিৎকার বেরোতে চাইত। কিন্তু চোখে-মুখে তখন মুক্তিযুদ্ধের সংকল্পের গাম্ভীর্য ছাড়া কিছু থাকত না।
এরকম একটা সময়ে সুতপার বাবা-মা আর চুলে দুই ঝুটি বাঁধা সুতপা গিয়ে হাজির হয় বিছানার পাশে। মায়াবী কণ্ঠে সুতপার মা বলেন, ‘আহা রে, কতইবা বয়স ছেলেটার! ঊনিশ পেরিয়েছে কি? এই বয়সেই পা গেল! সুতপার বাবা বলেন, ‘স্বাধীনতার জন্য ওরা শুধু পা কেন, শরীরের প্রত্যেকটা প্রত্যঙ্গ বিলিয়ে দিতে পারে।’ তারপর খালিদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন, ‘আমি সুশীল বণিক আর এই আমার পরিবার। তোমাকে দেখতে এলাম বলে বিরক্ত বোধ করছ না তো, বাপু?’
‘না না, তা কেন! কতদিন হলো হাসপাতালে পড়ে আছি। এই প্রথম কেউ দেখতে এল,’ খালিদ বলেন।
খালিদের কথায় সুতপার মা চোখ মোছেন। ‘আহা, কী মায়া করে বললে গো তুমি! আমাদের জীবন ধন্য হলো তোমাকে দেখে। কিন্তু কী করে এসব হলো, বাছা?’
‘সম্মুখযুদ্ধে। প্রতিদিনই গুলি লাগব লাগব করছিল, আমি ঠেকাচ্ছিলাম। তারপর সেদিন, ধারাবাহিকভাবে কি আর মনে পড়ে, সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল. . . আমার থেকে চার ফিট দূরে, সেলিমের বুকে এসে লাগল প্রথমে। লড়াইয়ের ক্ষেত্রের পশ্চিম দিকটা শুধু আমরা দুজনে কাভার দিচ্ছিলাম। তাকে লুটিয়ে পড়তে দেখেও আমি কিন্তু গুলি করা থামাইনি। তবে ফাঁকে ফাঁকে চোখ গেলে মনে হচ্ছিল, সেলিমের গালে একটু হাত রাখি, কে জানে যুদ্ধ শেষ হতে হতে শীতল না হয়ে যায়! এই ভাবতে ভাবতে কখন যে আমার ঠিক পাশে মর্টার শেলটা এসে পড়ল. . . বিকট শব্দের পরে দেখলাম বাম পায়ের হাঁটুর নীচ থেকে নেই।’
খালিদ বলতে বলতে হাসে। সুতপার মা চোখ মোছেন, ‘আহা, তোমার মায়ের কী দুর্ভাগ্য গো। এই বয়সের একটা সন্তানের. . .’
‘মা আমাকে হাসিমুখেই যুদ্ধে পাঠিয়েছেন। ঢাকায় আছেন। আমার বন্ধুরা এখনো লড়ছে। পা হারালেও স্বাধীনতা নিয়ে মায়ের কাছে ফিরব।’
‘তা তো বটে। তা তো বটে,’ সুতপার বাবা তড়িঘড়ি করে বলেন। তারপর কী যেন চিন্তা করেন, ‘আচ্ছা বাপু, তোমাকে দেখে তো বড়োই আনন্দ হলো। তা বলতে পার কী করতে পারি তোমার জন্য? কিছু করতে পারলে আমাদের বড্ড ভালো লাগত, হে ছোকরা।’
খালিদ সুযোগ পেয়ে বলে বসল, ‘আমার পায়ের ব্যান্ডেজের ভিতরে না খুব চুলকায়, ভিতরে নিশ্চয় কোনো সমস্যা. . .কিন্তু দেখুন, এখানকার সবাই বলছেন যে, সেরকম কিছুই নাকি আসলে, মানে, . . .’
খালিদের কথা শেষ হবার আগেই সুপরিচিত কংগ্রেস নেতা, লম্বা-চওড়া মানুষটা সেখান থেকে হনহন করে হেঁটে চলে যান। কয়েক মিনিটেই উপস্থিত হন কেচিসহ নানান যন্ত্রপাতির ট্রে হাতে নার্সদের নিয়ে। তারপর নার্সেরা ক্যাচক্যাচ করে খালিদের পায়ের ব্যান্ডেজটা লম্বালম্বি কেটে ফেলেন। অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়ানো মানুষগুলো বিষ্ফোরিত চোখে তখন ব্যান্ডেজের হা হয়ে থাকা সুরঙ্গে শুকিয়ে চ্যালা কাঠের মতো হয়ে আসা ঊরু আর সাদা প্লাস্টারে ছোপ ছোপ ছারপোকার গুচ্ছ পরিবারের সন্ধান পান। সুশীলবাবুর চিৎকার থামে পোকাসহ পুরোনো প্লাস্টার হটিয়ে নতুন আরেকটা ব্যান্ডেজ লাগানোর পরে। আনকোরা ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত মুখে বলেন, ‘তোমার তো বাপু আর এখানে থাকা চলে না!’ তার কণ্ঠে সুর মিলিয়ে সুতপার মা বলেন, ‘সেই ভালো। ওকে নিয়ে চলো আমাদের বাড়িতে। এতটুকুন ছেলে এই অবস্থায় এখানে পড়ে থাকবে, তা কী করে সহ্য করি বলো দিকিনি?’
সুতপাদের বাড়িতে সকালগুলো দেরিতে হতো। ঘরে সূর্য আসত আর আসত সুতপার হাতে স্যুপের বাটি। মা-মেয়ে পাশে বসিয়ে খাওয়াত প্রতি বেলায়। ওদিকে গান বাজত রেকর্ড প্লেয়ারে। একটাই রেকর্ড ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাজাতে বলত খালিদ। তাতে আপত্তি ছিল না বাড়ির কারোরই। ভূপেন হাজারিকার রেকর্ড, মোটে কয়েকটা গান, তাও আবার অহমিয়া ভাষায়। অথচ কী যেন বলতে চাইত সেই সুর. . . বিস্তীর্ণ পাররে অহংক্ষ জনরে হাহাকার হুনিউ নিঃহব্দে নীরবে বুড়্হা লুই তুমি বুড়্হা লুই বুঁয়া কিঁওর. . . দুর্বোধ্য কথাগুলোর মধ্যে মুক্তির আকাক্সক্ষা খুঁজে পেত খালিদ যার সঙ্গে নিজেকে এক সুরে মিলিয়ে নেয়া ছিল জলের মতো সহজ। দিনভর শ্রবণ অধীর হয়ে থাকত, সত্যিকারের মুক্তির খবর আসবে! তাকে আসতেই হবে।
মুক্তি আসার আগে রাখীবন্ধনের দিন চলে এসেছিল। সুতপার স্কুলের কয়েকজন সেদিন তাকে দেখতে আসে। প্রত্যেকের হাতে রাখি। লাল সুতোর বৃত্তে কবজি থেকে কনুই অবধি সদ্য তরুণ দীর্ঘ লোমগুলো ঢাকা পড়ে। কিন্তু রাখি বন্ধনের সময়ে এদিক-ওদিকে উঁকি দিয়েও কেন যেন সুতপাকে কোনোদিকে দেখা যায় না। খালিদ ভাবে, তাকে ডেকে ধন্যবাদ দেবে আর জানতেও চাইবে তার হাতে রাখি না বেঁধে সে কোন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল!
‘বলুন না, জার্মানিতে কতদিন ছিলেন? আমার চিঠিগুলো সত্যি কি পাননি? মানে, কী করে যে যোগাযোগটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল! কিন্তু খালিদ, আপনি যতদিনই থাকুন সেখানে, পারলে আমাদের একটা খোঁজখবর তো নিতে. . . মানে, আমরা তো আর জায়গা বদলাইনি!’
খালিদের স্মৃতিচারণের অন্যমনষ্কতায় সুতপার প্রশ্ন যেন ঢিল, শান্ত পুকুরে আঘাত করে। মনে পড়ে, সুতপা তাকে একাত্তরেও ‘দাদা’ ডাকত না, ভাব বাচ্যে কথা বলত। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে খালিদের জ্বর এসেছিল- পাহাড়ি মশার কামড়ের ফল। সুতপা তখন বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে দিনরাত খালিদের সেবায়। কপালের জলপট্টি বদলে তার দিন কাটে। কখনো সরলেও ফিরে এসে বলে, ‘স্যুপটা শেষ হয়েছে? পুষ্টিহীনতা হলে কিন্তু সুস্থ হবার আশা নেই। দেশ তো স্বাধীন হলো, অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে চলবে? ফেরার ইচ্ছে নেই নাকি?’
ফেরা হয়েছিল বটে। আর ফিরতেই খোদ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রথম ব্যাচ আহত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে গিয়েছিলেন পায়ের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে জার্মানিতে। সেসব অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। স্বাধীন দেশে প্রথম পাসপোর্টের অধিকারী হওয়া, রাজকীয় নায়কের মর্যাদায় জার্মানিতে গিয়ে চিকিৎসা নেয়া, কৃত্রিম পা লাগিয়ে আবারো নিজের পায়ে দাঁড়ানো. . .এইসমস্ত হাজার ঘটনার ভিড়ে স্মৃতির পরত হালকা হয়, দিনে দিনে আবছা হতে হতে হারিয়েই যায় সুতপা আর তার মায়াময় বাবা-মায়ের মুখ। কে জানত সামনে এলে তাদের কী বলবে খালিদ, কয়দিনইবা ভেবেছিল তাদের কথা! মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দেশে বাস্তবিকভাবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আকাক্সক্ষা তখন অনেক প্রকট। অথচ আজ দ্বিমাত্রিক আয়ত খোপে সুতপার দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করে। তবে মুখে কথা জোটে না। সুতপার চোখ স্থির আর খানিকটা টলটলে নয় কি? খালিদ বিভ্রান্ত হয়। উপস্থাপক সেই কখন সরে গেছে। যাবার সময়ে কিছু বলেও থাকবে হয়ত। মনে পড়ে না। বরং মাথার উপরে জোর দিলে মনে পড়ে, জার্মানির বাড়িতে সুতপার একের পর এক চিঠি. . . সাদা খামের চারদিকে লাল-নীলে বর্ডার, উপরে লেখা, এয়ার মেইল। বড়ো একঘেয়ে হয়ে গেছিল চিঠিগুলো, ‘কেমন আছেন? বাবা-মা আপনার কথা অনেক বলেন। আপনার পায়ের অপারেশন সফল হয়েছে জেনে আমাদের খুব আনন্দ হলো। আচ্ছা, আপনি কি এখন ঠিকঠাকমতো হাঁটতে পারেন? একবার হেঁটে আসতে পারেন এখানে? মানে, আমরা তো আর আপনাকে হাঁটতে দেখিনি- সেই যে হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন. ..’ প্রায় একইরকমের কথা প্রত্যেক চিঠিতে নানান আঙ্গিকে, নানান শব্দে। কোনো চিঠিতে হয়ত বাড়তি একটা লাইন, ‘বাবা-মায়ের মতো আমারো আপনার কথা খুব মনে পড়ে।’
খালিদ জানে, ক্র্যাচ ছুঁড়ে ফেলে হাঁটা আর দৌড়ানো তাকে অন্য এক মানুষ করে তুলেছিল। আয়নায় নিজেকে লম্বালম্বি দাঁড়াতে দেখে আগের সমস্তকিছু মুহূর্তে ধুয়েমুছে গেছিল। স্বাধীন দেশের নামখচিত প্রথম পাসপোর্ট হাতে জার্মানিতে পড়ালেখার সিদ্ধান্ত নেয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জার্মান মেয়ের সঙ্গে তুমুল প্রেম আগের জীবনটাই ভুলিয়ে দিয়েছিল। স্মৃতির উপরে জোর দিলে কেবল মনে পড়ে, দিনভর কাজ, আড্ডা আর ড্রিংক শেষ করে বেশ রাতে ঘরের মেঝেতে দরজার নীচ দিয়ে পিছলে ঢুকিয়ে রাখা এয়ার মেইলের খাম। ক্লান্ত শরীরে ঝুঁকে খামটা হাতে তুলতে ইচ্ছে করত না। কে জানত কোথাকার কোন সুতপা এত বছর তাকে মনে রাখবে! তারপর কবে বন্ধ হয়েছিল চিঠি আসা? স্মৃতির ভাণ্ডার এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চাপ নিতে পারে না।
‘আমি ছয় বছর ধরে আপনাকে চিঠি লিখেছিলাম। বিয়ের পর আমেরিকায় এলে আর লিখিনি। তবে মনে মনে লিখেছি। জানেন তো, টেলিপ্যাথি নামে একটা ব্যাপার আছে? আপনি চাইলে আপনার সঙ্গেও ঘটবে। না চাইলে আমি যতই চেষ্টা করি না কেন, যোগাযোগের আশা নেই।’
‘আসলে আমি যে ঠিক চাইনি, তা নয়। তোমরা আমার জীবন বাঁচিয়েছ। কিন্তু ব্যাপারটা হয়েছে কী, মুক্তিযুদ্ধে পা হারানো একটা মানুষের হতাশার গভীরতা তুমি কি জানো? আর তারপর হুট করে পা ফিরে পাওয়ার উত্তেজনাটা? জানো? পা হারানোর আগের আর অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে পাওয়ার পরের দুজন মানুষ যে আলাদা, এটা বোঝো? পরের দশ-পনেরোটা বছর জীবন যে আমাকে কোথা থেকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, সুতপা. . . তবে যাই বলো, আমার অপরাধ স্বীকার করেই বলছি, তোমাকে দেখে বড়ো ভালো লাগছে। তুমি বিদুষী আর বিখ্যাত একজন হয়ে উঠেছ। তোমাকে নিয়ে তোমার বাবা-মায়ের গর্ব দেখতে পারলে অবশ্য. . .’
‘তারাও বহুদিন আপনার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। আমার মতোই,’ সুতপার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ শোনায়। নেটওয়ার্কের সমস্যা কি? কোনোরকমে কথাটা বুঝতে পারেন খালিদ।
‘ছয় বছর অপেক্ষা করেছি মনে আছে। কিন্তু আপনি ঠিক কবে হারিয়ে গেলেন, মনে নেই। যুদ্ধ শেষ হয়েছিল, জয়ী হয়েছিলেন, পা-ও পরে ফেরত পেয়েছিলেন- এইসব ঘটনা আমার জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান। দেশ আপনার, স্বাধীনতা আপনার, অথচ আমি তার সবটুকু ভোগের উত্তেজনা অনুভব করি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, আপনি সেই মাটিতে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন, আমার জীবনে এর চেয়ে আনন্দের সংবাদ নেই। শুধু আপনাকে যে কোথায় হারিয়ে. . .’
সুতপার কণ্ঠস্বর হঠাৎ ভেঙে আসে। আয়ত খোপে সুতপার চোখের পানি গড়িয়ে পড়া অস্পষ্ট বোঝাও যায়। খালিদ কথা খুঁজে না পেয়ে বলেন, ‘আমি অপরাধী, সুতপা। আমার বড়ো ভুল হয়েছে। ক্ষমা কোরো।’
‘না না ঠিক আছে। আপনার অবস্থা তখন না বুঝলেও, এখন বুঝতে পারি। কিন্তু আপনার মনে আছে যে আমি সেদিন আপনাকে রাখি পরাইনি? আমার বান্ধবীরাই পরিয়েছিল শুধু, মনে পড়ে?’
প্রশ্নটা করে নিয়েই সুতপা নিজেকে গুছিয়ে নেন। হয়ত মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন চুপ থাকার। যথেষ্ট বলা হয়েছে। শাড়ির আঁচল ঠিকঠাক করতে থাকা মানুষটার অভিব্যক্তি তখন মধ্যবয়সী ইতিহাস গবেষক, সুতপা বণিকের পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। আস্বস্ত হয়ে খালিদ বলেন, ‘সুতপা, তোমরা আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছিলে। স্বাধীনতা আর নতুন জীবন পেয়ে আমি পৃথিবীর কোথা থেকে কোথায় চলে গেছি. . . তোমাদের কাছে ফিরে আসিনি একবারও। ক্ষমা কোরো। কিন্তু স্বাধীন হবার নেশায় যখন বুঁদ ছিলাম, তোমার মুখের দিকে তখন ঠিকমতো তাকানোও হয়নি। মুক্ত হবার প্রতিজ্ঞায় পরাধীন মানুষের যে যাত্রা, তার সামনে অন্য সমস্ত আকর্ষণ তুচ্ছ হয়ে যায়, জীবনের নানা ধাপে এতদিনে তুমি নিশ্চয় তা জেনেছ।’
আকস্মিকতা সামলে ওঠা সুতপা নির্বাক তাকিয়ে থাকেন খালিদের দিকে। কোনোরকমে বলেন, ‘বিজয় এসেছে, আপনি আবারো হাঁটতে পেরেছেন। বাকি সব তুচ্ছ- আমি জেনেছি।’