ক্ষিতেনের মা ও টেনশন ঠাকুর

এণাক্ষী রায়



একটা বিড়ি ধরানোর জন্য নতুন কেনা দেশলাই বাক্সটা খুলেই তাজ্জব ক্ষিতেনের মা। দেশলাইএর মাথাগুলা তো খয়েরে চুবানো কাঠির মতো খয়েরি খয়েরি হয়। এই দেশলাইটার মাথাগুলা সব সবুজ। খুললেই মনে হচ্ছে লাটাগুড়ির সদ্য কাটা গাছগুলা শুয়ে আছে পরপর। কাঠিগুলোর আগায় আগায় সবুজ পাতা। বাক্সের ওপরে ঘাসের ছবি, তাতে একটা দাঁড়িগোঁফওয়লা সিংহ। সিংহটা রাগী রাগী মুখে তাকিয়ে আছে অন্য দিকে। লেজটা ওপরে তোলা। ক্ষিতেনের পোষা হুলো বেড়ালটার মতো খাড়া করে আছে লেজটা। দেশলাইয়ের বাক্সের ওপরের ছবির সঙ্গে, ভেতরের কাঠিগুলোর লাটাগুড়ির জঙ্গল হয়ে যাওয়াটা খাপে খাপে মিলে যাওয়াতে ক্ষিতেনের মায়ের মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে যায়। বিড়িটায় বেশ আমেজ আসে। সার দিয়ে পড়ে থাকা গাছের দঙ্গল দেখে, দেশলাই বাক্সটা বারবার খুলে, বন্ধ করে। শীত শেষের দিকে। এখন রোদটাকে পিঠে করে ঘুরতে খুব ভালো লাগে। সামনাসামনি আবার রোদটা অসহ্য। মজা লাগে ক্ষিতেনের মা’র। এ যেন পাড়ার শুঁটকির মা’র গালাগালির মতো। ক্ষিতেনের মা’র সঙ্গে লাগলে কী দুর্মুখ কী দুর্মুখ। আবার অন্য কাউকে যখন গাল পাড়ে, ক্ষিতেনের মা-র পেছন থেকে শুনতে বেশ মিষ্টিই লাগে গালগুলো। মনে মনে নিজেও তখন সায় দেয়। বেশ হইছে, ঠিকঅই হইছে।

এই পাতাঝরার মরশুম পার হলে একটু একটু করে রোদের তেজ বাড়ে। বন জঙ্গলের মধ্যে যতগুলো ফাঁক ফোঁকর পায় রোদ, তার মধ্যে দিয়েই নিজেকে গুঁজে দিতে থাকে। ঝরা পাতার স্তূপ তখন মচমচে ভাজা পাঁপড় হয়ে যায়। বড় বড় গাছের নিচে গজিয়ে ওঠা ঝোপঝাড়গুলোর গোড়া উপড়ে দেয় বনবস্তির লোকেরা। ফরেস্ট গার্ডের চোখ এড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়া সে আগুন মসৃণ করে ফেলে বড় বড় গাছের তলাগুলো। ছাই ওড়ে। ওদের বসতির দিকের হালকা হয়ে যাওয়া জঙ্গল জুড়ে ছাই আর ছাই। এর পর বৃষ্টি নামবে। ছাইয়ের ওপর বৃষ্টির জল গাছ বেয়ে বেয়ে নেমে আসবে ঝরনার মতো। ছাইয়ের ওপর লকলক করে গজিয়ে উঠবে ঘাস। আশেপাশের জঙ্গল থেকে সব খরগোশ দল বেঁধে খেতে আসবে। এই সময় খরগোশের জন্য পেতে রাখতে হবে ফাঁদ।
চারদিকে জলের মাঝখানে এক এক টুকরো চর। রাত হলে তারারা নেমে এসে ঢুকে পড়ে ঘরে, জোনাকি হয়ে জ্বলে। পূর্ণিমার চাঁদ নেমে আসে উঠোনে, কুয়োর মধ্যে। কুয়োর ভেতরে ওরা চাঁদকে আটকে রাখার মন্তর জানে। এক এক টুকরো জমিতে ফলায় নিজেদের খাবার ধানটুকু।
দূরে, ঘন ফরেস্ট চিরে চলে গেছে রাস্তা। গ্রামের পর গ্রাম একটু একটু করে অরণ্যে ঢুকে যেতে যেতে গভীরে চলে যায় লাটাগুড়িতে এসে। এইখান থেকে চালসা পর্যন্ত সোজা রাস্তাটা, চুল পড়ে যাওয়া বৃদ্ধার মাথা হয়ে উঠছে দিনদিন। চওড়া হচ্ছে রাস্তা। সরকারি লোকলস্কর এসে হেইও হেইও ক’রে খণ্ড খণ্ড করে দিচ্ছে আকাশসমান গাছগুলো। "ক্যানে? আস্তা হবে সিধা। চিন নাকি যুদ্ধ করিবার তানে নেমে আসতেছে। তাই মিলিটারিরা চিন পর্যন্ত আগায় নিবার ধরিসে আস্তাখান"। বড় বড় যুদ্ধের গাড়ি যাবে এই রাস্তা দিয়ে।
ক্ষিতেনের মাথায় একবার ঘা হইছিল। গিজগিজা ঘা। লাটাগুড়ির হাটে নিয়ে যায়ে চুলগুলা বেবাক কামায় দিয়া নিয়ে আসছিল ক্ষিতেনের বাবা। ফরেস্টটার দশা সেইরকম হইছে মনে হয়। ফরেস্ট কেটে কেটে এখানে ওখানে তৈরি হয়েছে রিসোর্ট। তার ওপর নতুন উপদ্রব, ন্যাওরা মোড় থেকে এক কিলোমিটারের ওভারব্রিজের কাজ শুরু হয়েছে। ফরেস্টের বুক চিরে এখানে চলে গেছে রেললাইন, সেই চ্যাংড়াবান্ধা অব্দি। ওভারব্রিজের কাজে হইহই পড়ে গেছে। লোক লস্কর ক্রেন আসছে আর আসছে সমানে। বেশ কয়েকটা দোকান গজিয়ে উঠেছিল এইখানে। ভাঙা পড়েছে সেগুলোও। সুবলের চায়ের দোকানটা ভাঙা পড়াতে, আরেকটু পিছিয়ে কেটে নেওয়া একটা গাছের গোড়ায় আবার নতুন করে উনুন পেতেছে সুবল। সেইখানে গ্রামের মানুষের জটলা। বিড়ির শেষ টানটা লম্বা করে টেনে নিয়ে সেই দলে ভিড়ে যায় ক্ষিতেনের মা।
— এলায় সরকার তামাম ফরেস্ট কাটিবার ধরিসে, হামরালার হইল যত দোষ। একখান ডাল কাটিলে ফাইন দিবার নাগে।
— চিন না কায় জানি যুদ্ধ করিবার তানে আগাইসে। হেই জইন্য আস্তা হইবে।
— হাতিগিলা আর ময়ুরগিলাকে এই আস্তা ধরি চিন পাঠায় দাও কেনে। বাঁচি যাই। হামরালার ভাত মারিতে আসিছে সরকার। যুদ্ধ টুদ্ধ বাজে কাথা। দেখি নিয়েন।
— হ, অইসব না হয়। দেখি নিবেন, বেবাক মিছা। এইগুলা ওই হোটেল করিবার মতলব করিসে।
— শ্যালার হাতি মরলে কাগজে নাম উঠে। এলা বন্ধ করি দাও। হ্যান করো, ত্যান করো। হামরালার কাথা কায় জানে আর কায় ভাবে! মাইনষে মরলে কুন দাম নাই।
— একবার যদি মরিই যাস দাম দিয়া কী করিবি তয় বাউ!

ক্ষিতেনের মার রগড় হয় খুব। চিন নামে যে উত্তরে একখান দেশ আছে, জানে সে। চিনা মোবাইল, চিনা বাত্তি, সেখান থেকে আসে শিলিগুড়িতে। তার যুদ্ধ করিবার তানে এই আস্তা দিয়াই যাইতে হবে? কার নগদ যুদ্ধ! ক্ষিতেনের মা ভাবে। ভাবতে ভাবতে ক্ষিতেনের মা’র মাইয়ের সঙ্গে ঘষা খায় একবাক্স লাটাগুড়ি ফরেস্ট। ব্লাউজে ভিতরে বাক্সখান। তার ভিতরে নড়েচড়ে কাটা গাছগুলো। মাথাগুলো এখনো সবুজ। আর একটু আগালে রেল লাইন। সারাদিনে একটা মাত্র রেলগাড়ি যায়। আবার সেইটাই ঘুরত আসে। ওই লাইনের আগে পিছে হাজার হাজার মরা গাছের গুঁড়ি। ক্ষিতেনের মা’র বাপেরও বাপের জন্মের আগেকার গাছ এইগুলা। অইখানে বিরিজ হবে। এল লাইনের উপর দিয়া গাড়ি যাবে। গোটাদিনে দুইবার মোটে এলগাড়ি যাওয়া-আসা করে। সেই তানেও এত্তবড় বিরিজ! এত্ত লোহা লক্কর, বালি সিমেন্ট! সুবল বলে
– আমাদের নাখান দশখান বনবস্তির সবগুলা বাড়ি পাকা হয়া যাইত এত্ত মাল-পত্তর।
সুবলের দোকানে নতুন নতুন মানুষ আসে আজকাল। আশপাশের বনবস্তির লোকও আসে। খবরাখবর পাওয়া যায়। এত বড় কর্মযজ্ঞের লেবাররা সব আসে। সুবল বলে — ভেল্লা চিন্তাক আছি রে ক্ষিতেনের মা।
— ক্যান! তুয়ার দোকান তো রমরমায় চলতেছে।
— এই কাম-কাজ শ্যাষ হলে কী করিম! যদ্দিন বিরিজের কাম, তদ্দিন। এইঠে দোকান করিবার তানে পারমিশন নাই।
— ক্যান! হাতি শ্যালাদের জামাই আদর করিবে সরকার! হামরালার কপালে ঝ্যাঁটা! এই ফরেস্টো হামরালার না হয়! জলের মইধ্যে যেইলা মাছ, সেইলা এই ফরেস্টো হামরালার।
— এলায় হামরালার না হয়। এটেকার তামান ফরেস্টো হইছে গিয়া রিসোর্ট পারটির। আরোহ হইছে টুরিস্টের। বুঝলা!


বোঝে ক্ষিতেনের মা, সবটাই বোঝে। গাভুর চ্যাংড়াগুলার কাজ কারবার দেখে বোঝে। ক্ষিতেনের বাপ ফরেস্টের পড়ে থাকা কাঠ-কুটো বেচত। খরগোশ ধরতে পারলে, দুই একখান বনমুরগি ধরতে পারলে, বেচে আসত। ছোট্ট ক্ষিতেনকে নিয়ে ক্ষিতেনের মা নিজে যেত ন্যাওরা নদীতে মীন ধরতে। কুচো মাছও কিছু ধরত, নিজেরা খাওয়ার জন্য। ন্যাওরার কাচের মতো স্বচ্ছ জলে নিচের পাথর পর্যন্ত দেখা যেত। পাড়ের দিকে জল গরম থাকে, ওখানেই মীন পাওয়া যায়। ক্ষিতেনকে হাতে ধরে শিখিয়েছিল নিজে। ক্ষিতেনের এসব কাজ ভালো লাগল না। নতুন গজানো হোটেলে ব্ল্যাকে মদ বেচে বেচে, বাবুদের ফাই ফরমাস খেটে, দুদিনেই কী করে বেশি টাকা কামানো যায়, শিখেছিল ক্ষিতেন। লোকে বলে মেয়েমানুষও নাকি বেচত। ক্ষিতেন তো আর একা না। দালালে-দালালে রেষারেষি ছিল। একেকদিন মাঝরাতে জঙ্গলের নির্জনতা চুরমার করে দিত ভটভটির আওয়াজ। ভটভটিগুলো এলেই বাসা থেকে বের হয়ে যেত ক্ষিতেন। আসত চকচকে জামাকাপড়, গগলস পরে। এই বেশি টাকা কামানোর ধান্দাই কাল হলো। প্রায়ই বাড়ি ফিরত না। একদিন সকালে ক্ষিতেনের কাটা মুণ্ডুটা রেল লাইনের ধারে গড়াগড়ি খেতে দেখল বসতির লোকেরা। দিন দুই পর ধড়টা গভীর জঙ্গলে খুঁজে পাওয়া গেল আধ খাওয়া। বনবস্তির মেয়েগুলাও পালটায় যাচ্ছে, চোখের সামনে দেখছে তো ক্ষিতেনের মা।
ট্যানশন আর হয় না ক্ষিতেনের মার। সরকার থেকে বনবস্তি তুলে দেবে বলেছে। কোথায় যাবে ওরা! এই বন ছেড়ে অন্য কোথাও দু-দিনও থাকতে পারবে৷ না। এসব কথা বলাবলি হয় সুবলের দোকানে। সুবলের উনুনের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার আঁচে ক্ষিতেনের মা বাদে ,সুশীলা, হরেন, দীনেশ, সবারই মাথার মধ্যে ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে যায়। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভিন গ্রামের লেবারগুলো ওদের কথাবার্তা শোনে। দীনেশের সঙ্গে ভাব জমায়। একজন বয়স্ক আর অন্য জন চ্যাংড়া। বয়স্ক জনের লুঙ্গিটা কাছা দিয়ে পরা। উপরে আস্ত কমলা রঙের গেঞ্জিটা পেটের ওপর তোলা। দুই হাত দিয়ে, বার করা পেটটা সমানে চুলকাচ্ছে লোকটা। অন্যজন অল্প বয়স হাঁটু অব্দি প্যান্ট,মিলিটারিদের মতো ছাপা। গেঞ্জিটা এরও একই রকম, কমলা। বয়স্ক জনই কথা বলে — এইঠে থাকেন তুমরালা? ফরেস্টোর বগলৎ?
— হ বগলা-বগলি। তুমরালার কুইন্ঠে? ময়নাগুড়ি?
— মোর বাসাখান জল্পেশ। ভেল্লা বড় ম্যালা হয় যেইঠ্যে। ময়নাগুড়ি হয়া অন্য রুট ধরিবার লাগে।
চ্যাংড়াটাকে দেখিয়ে বলে — উমার ম্যাখলিগঞ্জ। নিজতরফ গ্রামত। নাম শুনছেন, নিজতরফ?
নামটা শোনে নাই ওরা। মেখলিগঞ্জের নাম আগে শুনেছে সুবল-দীনেশ। ক্ষীতেনে মাও শুনেছে। নিজতরফ শোনে নাই। দুই দিকে মাথা নাড়ে সবাই।
— চিনেন না? তিস্তার ওই পারত। মোর নাম কালুয়া, উমার চন্নন।
— বিরিজের কামের তানে আইচ্চেন!
— হ, আগত অইন্য জাগায় দিসিল। এইঠে সগায় সাহস করি আগাইচ্চে না। কন্টাকটার বাবু কহিল, এলায় তুয়ার ভয়-ডর কম আসি, তু যা। হেড করি দিলাম তোক। মুই কই, মরিবু তো একোদিন সগায়! ডর খায়া কায় বাঁচিমু! আসি পড়লাম তুমরালার দেশত।


এরা বাইরের লোক, বাইরের লোকের সঙ্গে বেশি কথা আজকাল আর ওরা বলে না। বনে বাস করতে করতে বন্য জন্তুর ভয় ওদের আর নেই। আছে শুধু মানুষের ভয়। বাইরের মানুষের। নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি হয় সুবল আর দীনেশের। অনিচ্ছা সত্বেও কথার জবাব দেয় দীনেশ।
— হাথত কাম থাকিলে ডর কায়! কাম না থাকিলেই বেবাক ডর।

দীনেশ উদাস হয়ে যায়। স্বাধীন উপার্জনের জায়গাগুলো ছোট হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে সমানে। এখন একশ দিনের কাজে নাম লিখিয়ে বসে থাকে। তার থেকে কাটমানি দিতে হয় নেতাদের।
— তুমরালার মহাকালের লগে বাস। ডর নাই। হামরালা ডর খাই। ভুড়ি চুলকাতে চুলকাতে বলে যায় লুঙ্গিপরা লোকটা।

লোকটাকে আড় চোখে দেখে সুশীলা ক্ষিতেনের মার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলে — মনে লয় বিচুটি পাতা লাগসে উমার পেটত। হি হি

— ট্যানশন তো সবজায়গায়তই। এইলা বিরিজ হইচ্চে, তুমরালা কাম পাচ্চেন, এইলা তুমরালা খুশি। সেলা এই বিরিজের জইন্যেই হামরালার ট্যানশন। এইলাই দুইন্যার খেল।
— হামরালার কাম আজ এইখান, কালই ধরেন গিয়া অন্যত্র। বসি থাকার কুন উপায় নাই। কাম ঠিকঅই আসে।

আরো কী বলে চলে লোকটা। ক্ষিতেনের মা-র আর শুনতে ইচ্ছা করে না। মাইয়ের সঙ্গে ঘষা খেতে থাকা দেশলাই বাক্সটা বের করে আরেকটা বিড়ি ধরাতে যায়। বাক্সটা খুললেই সেই সারি সারি সবুজ মাথাওয়ালা কাঠি। সেই কেটে রাখা লাটাগুড়ির জঙ্গল। ধরালেই পুড়ে খাক হয়ে যাবে সবুজ রঙ। একটা কাঠি নষ্ট করবে ক্যান খামখা! দেশলাইটা আবার ব্লাউজের ভিতর ঢুকিয়ে নিয়ে বিড়ির আগাটা সাবধানে গুঁজে দেয় সুবলের উনুনের আগুনে। সেই জল্পেশে বাসা যার, সেই লোকটা খুব বকবক করে চলেছে। বিরক্ত লাগে ক্ষিতেনের মার। জল্পেশ ঠাকুরের বদলে লোকটা এখন নিজতরফ গ্রামের নতুন কোন ঠাকুরের বৃত্তান্ত বলছে। সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া ক্ষিতেনের মা-কে ধাক্কা দিয়ে লোকটার গল্পের দিকে ফেরায় সুশীলা। সুশীলার কুনুয়ের খোঁচায় বুকের কাছটায় নড়ে চড়ে ওঠে লাটাগুড়ির কাটা গাছগুলো।
— উমার গ্রামত ট্যানশন ঠাকুরের থান আসে বলতেছে। ট্যানশন ঠাকুরের পূজার পাছোৎ উমাদের আরোহ কুন ট্যানশন নাই বলতেছে।
সুশীলা বলে
— সেইটা কী?
প্রশ্নটা একটু জোরেই করে ফেলে ক্ষীতেনের মা। লোকটা শুনতে পায়।
— যায়া দেখিবেন, জ্যোষ্ট মাসের দোমাসির দিনত।
এতক্ষণে কথা বলে মিলিটারি প্যান্ট পরা ছেলেটা
— জ্যোষ্টি মাসের দোমাসির দিনত! ভেল্লা বৃষ্টি ধরিবে! তয় তিস্তার পারত বাসা উমরার। তা বাদে হামারালার মহাকাল বাবা ছাড়ি ট্যানশন ঠাকুরের থানে গেইলে মহাকাল বাবা আগ করিবে। মুই না যাম।
— যায়েন না যায়েন সেইলা তুমরালার ব্যাপার। মোর কওয়ার কইলাম। এইঠে তুমরালার মহাকালের থানের নাকান পাত্থর পূজা না হয়। মূর্তি আসে। পূজাত দিনত সগায়ের জইন্য খিচুড়ির ভোগ। এইবার তিন বছরোত ঠ্যাং ফেলাইসে পূজা। নতুন হইসে, তয় পচার করিতেসি।


সুবল বলে — হামরালার মহাকাল বাবার নাকান পাত্থর না হয়, তয় ক্যামন? বিশ্বকর্মার নাকান?কেউ যায় না যায়, মুই যাম। বহৎ ট্যানশন আসে মোর। মুই পূজা দিম। আটুস করতেছি আইচ্চে পূজাতই দিম। পূজা কায় করে!
— ক্যান! হামরালার অধিকারী নাই? অধিকারী পূজা দেয়। ট্যানশনের মন্তর পড়ে। এই দেখেন, মোর মোবাইলে পিকচার আসে।

রোদের রেখাগুলো পাতার ঝাঁঝরি বেয়ে নেমে এসেছে রাস্তায়। হুশ হাশ করে ছুটে যাচ্ছে গাড়িগুলো। কয়েকটা ভটভটি। এরা কেউ এখানে থামবে না। মা কালী মিষ্টান্ন ভান্ডারের কাছে থামবে কেউ কেউ। চমচম কিনবে, চা খাবে, জিরোবে খানিক। সব ওখানেই দাঁড়ায়। সুবলের দোকানে আগে দাঁড়াত কেউ কেউ। যখন আস্ত দোকান একটা ছিল, দুটো বেঞ্চি ছিল বসার। সেইখানে বসে জঙ্গলের ঝিঁঝির একটানা ঝিন ধরা ডাকের সঙ্গে গরুর গলার ঘন্টার টুং টাং শব্দের মিশে যাওয়া শুনত কান পেতে। থেমে, চা খেয়ে, মহাকালবাবার থানটার হদিশ জেনে নিত। মহাকালবাবাই এই বনবস্তিগুলোর রক্ষাকর্তা। আবার ফসল পাকলে এই মহাকালের চেলারাই সবচেয়ে বড় শত্রু। তখন বোম ফাটায়, ক্যানাস্তারা ফাটায় তাদের তাড়াও, রাত ভর মাচায় উঠে পাহারা দাও! মহাকালে বাবার উদ্দেশ্যে দুহাত জোড় করে ক্ষিতেনের মা। মাথায় থাক টেনশন ঠাকুর! মহাকাল বাবা ছাড়া আর কাউকে দরকার নেই ক্ষিতেনের মার।


সুবলরা চ্যাংড়াটার মোবাইলে উঁকিঝুঁকি মারছে আর হাসছে খুব। সুশীলা তো গড়িয়ে পড়ছে হেসে।
— ক্ষিতেনের মাও দেইখে যা এলায়। উমরার ঠাকুরটা হামরালার ফরেস্টোর অফিচারের মুণ্ডুটা নাগতেসে।
— পুরা না হয়, কনেক কনেক। ফরেস্টো অপিচারের মুণ্ডটা কনেক কালা। ইটা ক্ষিতেনের মার নাকান ধবধবাইছে। গোঁফখান আরোহ দাঁড়িখান অপিচারের নাকান।
মুণ্ডু কথাটা কানে আসতেই, বুক ধড়ফড় করে ক্ষিতেনের মা-র। শরীর খারাপ লাগে।

— অপিচার শ্যালার চামড়াখান গুটায় নিলে এইলা দেকাইবে। চোকখান দেখি মনে লয় গাঞ্জা টানছে। হি হি,কী কয় বাউগুলান! এমন হাসতেসে সব, ট্যানশন ঠাকুর সগ ট্যানশন টানি নিসে নাকি এলায়!

কলুয়া গোটানো লুঙ্গি সোজা করতে করতে বাঁ হাত দিয়ে ভুড়ি চুলকায় আর বলে — দেকিলেন? সগার সগ ট্যানশন টানি নিল দেবতায়। এইলা হাসতেছেন। সগ ঠাকুরের কিরপায়।
এইটাই হল গিয়া আসল কাথা। সগায় হাসিবার ধরিসেন। ধরেন ছাওয়া-পাওয়ার অসুখ করিসে, ডাক্তার নাই। কী করিবেন! ট্যানশন! সব ট্যানশন টানি নিবে বাবায়। তিন বৎসরত যাবৎ এইলা করিই ঠিকঠাক আসে চন্ননরা। মুইও পূজা দিবার ধরিসি দুই বৎসরত হইল।


সাঁ করে একটা পাক দিয়ে ঘ্যাঁচ করে এসে একটা ভটভটি থামে সুবলের দোকানের সামনে। সিগারেট নেয়।
— এখানে অন্য দোকানগুলো ভাঙ্গা পড়ল কাকা? তা তুমি দোকান দিয়ে আছ এখনো?
ছেলেগুলোর মাথায় হেলমেট পরা নেই। বাতাসে এলোমেলো হয়ে আছে চুল। চুলে চিরুনি বুলিয়ে নেয় একজন। যেন সিগারেটটা নেওয়ার পরও যাবার ইচ্ছে নেই।
— দোকান না। দোকান দি নাই।! ওই বাসা থেকে উনানখান ধরায় নিয়ে আসি, যতক্ষণ চলে। আর একটা টেবিল, দুই চারখান পান।
— আগুন দেন।
সুবল একটা দেশলাই বের করে সামনে দেয়। সিগারেটটা ধরায় ছেলেটা। দেশলাইয়ের বাক্সটা বেশ কায়দা করে বুক পকেটে ঠেলে দেয় — দেইখেন, দোকান দিয়ে বসবেন না আবার। সরকারি জমিতে দোকান দেওয়ার নিয়ম নাই। কথাগুলো বলতে বলতে ভটভটিতে স্টার্ট দেয় ছেলেটা। অন্য ছেলেটা এতক্ষণ যেন আকাশ,জঙ্গল ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। ভটভটি স্টার্ট দিতে পেছনে বসে পড়ে লম্বা পা ছড়িয়ে।
ওরা ভুস করে বেরিয়ে যাবার পর প্রথম কথা বলে কালুয়া — সিগারেট, শলাই কুনটারই দাম দিল না শ্যালায়?
ওরা কেউ উত্তর দেয় না কথাটার। দূর থেকে হালকা শব্দ আসছে হেঁইও হেঁইও করে। সবাই একযোগে মন দেয় সেদিকে। গল্প, হাসাহাসি সব চুপসে যায় এক মুহূর্তে।
এইখান থেকেই গভীর হতে শুরু করে ফরেস্ট। এখান থেকেই সরকার শুরু করেছে গাছকাটার পালা। এদিকটা গাছ কাটা শেষ। ন্যাওরা মোড় থেকে ওই পারের চালসার দিকের জঙ্গল আরও গভীর। ওদিকের ঢাল ধরে ব্রিজটা নেমে যাবে আরও হাফ কিলোমিটার। নির্জন এই জঙ্গল, এই চায়ের দোকান, লোহাকাটার শব্দে ভারী হয়ে আছে। গাছকাটা চলছে এখনো। ন্যাওরা মোরের ওইপারে মড়মড় করে ভেঙ্গে পড়ছে জন্মাবধি দেখে আসা গাছগুলো। তছনছ হয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের একটানা শব্দ। আগে এই রাস্তার দুই পারে বড় বড় সাত আটটা কাঠ চেরাইয়ের দোকান ছিল। জঙ্গলে ঝরে পড়ে যাওয়া গাছ-টাছের সন্ধান পেলে, ভালো দাম পেত বনবস্তির লোকেরা। সরকারের কাছ থেকেও কাঠ কিনত মালিকরা। এতগুলো কাঠচেরাইয়ের দোকান থাকলেও তখন জঙ্গল এত পাতলা হয় নি। পরে এই শ'মিলের মালিকরাই প্রথম কাঠের ব্যাবসা গুটিয়ে, রিসোর্ট তৈরি শুরু করে।
বনবস্তি তুলে দেবার আইন আনছে সরকার। এই বন জঙ্গল তাহলে কার? হাতির সঙ্গে, সাপের সঙ্গে, বাঘের সঙ্গে, বাস করাটা অভ্যেস হয়ে গেছে জন্ম থেকে। এক বনবস্তিতে মানুষ হয়ে অন্য বনবস্তিতে বিয়ে হয়ে আসা ক্ষিতেনের মা দেখে, বেশ কিছুদিন আগে কাটা-পড়া এদিকের গাছের মোটা মোটা গুঁড়ি এখনও রাস্তার ধারে শুয়ে আছে কয়েকটা। একটার ওপরে বসে পড়ে থপ করে। গলাটা শুকিয়ে আসছে। ব্লাউজের ভিতর থেকে বিড়ির প্যাকেটটা বের করে ক্ষিতেনের মা। সিংহের ছবিওয়ালা দেশলাই বাক্সটা বের করে। দেশলাইয়ের সবুজ মাথাওয়ালা বারুদ ঘষে দেশলাইয়ের গায়ে। ভুস করে আগুন জ্বলেই নিভে যায় কাঠিটা। সবুজ অংশটা পুরোপুরি কালো। আরেকটা কাঠি ধরায়। কালো হয়ে যাওয়া কাঠিটা ফেলে দেয় গভীর জঙ্গলের দিকে। নিজে যে মরা গুঁড়িটার ওপর বসে আছে,সেটাও আর সবুজ নেই। মাথাটাও নেই শুধু ধড় পড়ে আছে।


সুবল বলে — হামরালার ট্যানশন সগ রিসোর্টের তানে। রিসোর্টগুলা বাড়ি যাছে, আরোহ ফরেস্টো ভ্যানিস হছে। তয় হামরালাও ট্যানশন ঠাকুরের নাকান রিসোর্ট ঠাকুর পূজা করিবার ধরি এলায়। কী কন!
— রিসোর্ট ঠাকুর পূজা করি কী কহিবি? ঠাকুর তুমরার রিসোর্টগুলা বেবাক টানি নাও! টাউনত নিয়া যাও!
— হ ইস্কুল ছাড়ি ছাড়ি সগ ছাওয়া পাওয়াগুলান রিসোর্টে কাম করিবার ধরিসে। উমরায় উল্টা পূজা করিবার ধরিবে – হে রিসোর্ট ঠাকুর হামরাল তানে রিসোর্ট বাড়ায় দেও।
— চা দোকান ছাড়ি তুমরায় অধিকারী হয়ে যান। সুবল অধিকারী।
— মূর্তিখান কার নাকান হবে! মিনিস্টারের নাকান!
— না হয়, পুলিশের নাকান।
— এলায় পুলিশ শ্যালায় এমনিই পূজা পাং। উমরার তেল বারি বারি শুয়োরের নাকান হয়া গ্যাসে। রিসোর্টে মেয়ে বনুষ নিয়া পারটি করে, ফিরি। উমরাই ঠিক।
— হামরালার ট্যানশন ঠাকুর নিয়া তুমরায় হাসতেসেন! পাপ নাগি গেইলে সেইলা বুঝিবেন। হাসিবেন না হয়।
চন্দন নামের ছেলেটা রেগে যায়।

— হাসতেসি না বাপোই, ভাবতেসি। এই ফরেস্টো দেখতেসো, এইলা আর বেশিদিন নাই। তারপর কই যাব তার কুন দিশা নাই হামরালার।
বলতে বলতে সুশীলার চোখ ছলছলায়।

জঙ্গলের রাজা এই শাল গাছ, এই গাছ পেটে ভাত যোগায় কতরকম ভাবে। গাছের পাতা কুড়িয়ে, আঠা জমিয়ে বনবস্তির একেকটা সংসার বেঁচে থাকে। ধুনা হয় এই আঠায়। এই ফরেস্টের ডাক্তার বদ্যি সব এই শাল। বাচ্চার পেটে গুঁড়া কৃমি, শাল পাতা চিবিয়ে খাওয়াও। পেট খারাপে শালের পাতার রস, কচি ডাল। ঘা পাঁচড়ায় শাল আঠা লাগিয়ে নিলেই সেরে যায়। একেকটা গাছ মড় মড় করে উপড়ে নিচ্ছে চোখের সামনে। মুণ্ডুটা ছিটকে পড়ছে কচি পাতা সমেত। পর পর কুড়ালের কোপে খণ্ড খণ্ড হয়ে যাচ্ছে ধড়। গড়িয়ে পড়ছে রক্তের মতো আঠা। জমে যাচ্ছে, জমে জমে লেপ্টে থাকছে কাণ্ডর গায়ে।
জমাট আঠাটাকে ক্ষীতেনের জমাট বাঁধা রক্তের মতো লাগে ক্ষীতেনের মার। শাল গাছের কাটা গুঁড়িটার ওপর বসে বসে ক্ষীতেনের মা দেখে যায় মুখে ডিম নিয়ে পিঁপড়েরা সার বেঁধে চলেছে। পিঁপড়েদের সংসার বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে হাঁটছে তো হাঁটছেই। ক্ষীতেনের মার পা ঘেঁষে চলে যাচ্ছে পিঁপড়ের লাইনটা। শেষ দেখা যাচ্ছে না। কামড়াচ্ছেও না মোটে। কামড়াতেও ভুলে গেছে পিঁপড়েগুলো!কোথায় যাচ্ছে ওরা! টাউনের দিকে!