সামান্য ক্ষতিপূরণ

রুখসানা কাজল



অনেক রাতে পুলিশকাকুরা এসে দাদাকে তুলে নিয়ে গেছে ।
অনেকদিন ধরেই হন্যে হয়ে ওরা খুঁজছিল। এবার পেয়ে গেলো। নেওয়ার সময় অশ্রাব্য গালিগালাজ করে গেছে । আমাদের বাড়ির আশেপাশের প্রতিবেশিরাও ছি ছি করেছে সবাই। যদিও পুলিশের তল্লাশির সময় ভয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল অনেকেই। পাড়ার মুরুব্বি গোছের কেউ কেউ আবার বাড়ি বয়ে উপদেশ দিয়ে গেছে। ব্যঙ্গ করে বলে গেছে, নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন ভদ্রলোকের ছেলেরা কখনো নকশাল করে নাকি ! তাও এই স্বাধীন দেশে ? বানচোতের জাত যতসব ! ঝাড় বংশ ধ্বংস করে দিয়ে যাবে এবার। কেউ কি জানে পুলিশে ছুঁলে কত ঘা ? ডাক্তারের পরিবারটা এবার ধ্বংস হয়ে যাবে। ও আমজু ফজলু এখনও সময় আছে। তোরা তোদের সম্পত্তির ভাগ নিয়ে আলাদা হয়ে যা।
ধরে নেওয়ার সময় ন্যুনতম সন্মান দেখিয়েছে ওরা। বাপির সামনে দাদাকে মারপিট করেনি। কিন্তু শোনা যাচ্ছে, থানায় ঝুলিয়ে এমন মার মেরেছে যে জন্মদাতা মা বাবারও কালঘাম ছুটে যাবে তাদের প্রথম সন্তানের মুখখানা চিনতে।
রুমকির দুই চাচা ফুঁসছে। রাগে দুঃখে ভয়ে কালশিটে পড়ে গেছে ওদের মুখে। সংসারের হাল ধরবে বলে, গুচ্ছের টাকা খর্চা করে বিদেশে পড়িয়ে শেষ পর্যন্ত নকশাল হয়েছে বড়দার ছেলে ! দুঃখ আর কাকে বলে !
সেজোকা মিউজিক ডিরেক্টরের মত দুহাত ঝুলিয়ে চরম হতাশায় থেকে থেকেই বলে উঠছে, মেরে ফেলুক! মেরে ফেলুক ! রোজ রোজ এ ঝামেলা আর ভালো লাগেনা। বংশের কুলাঙ্গার। অমন ছেলে আমাদের দরকার নেই। তুমি কানবা না সেজোবউ। যাও ছেলেদের জামাকাপড় গোছাও। জলদি যাও
সেজোকাকি লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছে। দাদা খুব প্রিয় ছিল তার। স্বভাবে দুর্বল। কিছুটা ভালো মানূষ সেজোকাকি কাঁদছে আবার সদ্য বড় হয়ে ওঠা নিজের দুই ছেলেদের নিয়ে ভয় পাচ্ছে। কিশোর ছেলেরা ঘাড় গুঁজে প্রতিবাদ করছে, বড়দা কী চোর ! বড়দা কোনো অন্যায় করেনি।
সিদ্ধান্ত হয়েছে দাদাকে ছাড়াতে কেউ যাবে না। মেরে ফেললে ফেলুক গে। মরে পড়ে থাকুক গে থানায়। আর কত ! বাড়ির অন্য ছেলেরাও মাথায় বেড়ে ওঠছে । পুলিশ কাকে কখন কোথায় মিথ্যে মামলা দিয়ে ধরে ফেলে কেউ কি জানে ! সেজকা তার দুই ছেলেকে ওদের মামাবাড়ি চলে যেতে বলেছে । ছেলেরা যাবে না। তাই শুনে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে গাল পড়ছে সেজো, শুয়োরেরবাচ্চারা বড়দা কলাচ্ছো তাই না ! আমি কি সাধ করে যেতে বলছি ! পুলিশ কার জন্যে কাকে টান দেয় কে বলতে পারে ! তখন কি করতে পারবানি আমি। তোর বড়চাচাকে দ্যাখ। কিচ্ছু করতে পারছে !

ছোটকাও বলছে, মরুক গে । কাঁহাতক আর পারা যায় !
স্থলপদ্ম গাছের কাছে দাঁড়িয়ে প্রতিবেশিদের শুনিয়ে চেঁচাচ্ছে ছোটকা, মরতে এসেছিল বাংলাদেশে। চারু মজুমদার না কে, তার কাছে চলে যাক না ভারতে। হারামজাদা রাজিনীতিই যদি করবি তো ক্ষমতার রাজনীতি কর। তা না গরিব ফকিরদের হয়ে জান লড়ে যাচ্ছে। এবার কি হবে কে জানে !
কেবল ছোটকাকিমা ধপধপ করে কাজ করছে। গলা তুলে শ্লেষ ছড়িয়ে ব্যঙ্গ করছে ছোটকাকে, পৃথিবীর মানুষ যদি সত্যটি বুঝত। শুনছ পোলাউ খাবে না কোর্মা রানব ! আজ তো আবার উৎসবের দিন। ঘরের ছেলে পুলিশের মার খাচ্ছে আর সবাই বাড়িতে বসে মোচ্ছব করছে !
ছোটকা রক্তগরম চোখে তাকালে রুমকির মা তাড়াতাড়ি সরিয়ে আনে সেজকাকি আর ছোটকাকিমাকে।
সেই থেকে কাকিমারা কেঁদে যাচ্ছে । দাদা বড় প্রিয় ছিল সবার। দাদাকে পাকড়াও করে ছোটকাকিমা একদিন জানতে চেয়েছিলো, আচ্ছা টুটুল তোরা কি চাস বলত ?
দাদা মা কাকিমাদের বুঝিয়ে বলেছিলো, যাদের অনেক আছে তাদের থেকে কিছু নিয়ে গরীবদের দিতে চাই।
সরলভাবে কাকিমা বলেছিলো, তো এতে অন্যায় কি হলো ?
লতিফ মাস্টারের মত একটু বাঁকা হেসে দাদা বলেছিল, তোমরা যে দিতে চাও না!
ছোটকাকিমা গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেছিল। সত্যি তো মোতির মার শাড়ি ছিঁড়ে গেলে পুরান শাড়ি দেওয়া হয়। আর দুই ঈদে দুটো কমদামী মোটা সূতির শাড়ি। মোতির মা তাই পেয়ে খুশী হয়। কিন্তু কথা তো সত্যি, কেউ পাবে, খাবে কেউ পাবে না, খাবে না তাও তো ঠিক না।
সেদিন থেকে ছোটকাকিমা নরম ব্যবহার করে মোতির মার সাথে। নিজে গিয়ে মোতিকে ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়ে এসেছে। নিয়ম করে রোজ পড়তে বসায়।
মোতির মাও জানত দাদারা কি চায়।
ধপধপ করে ইঁদারায় বালতি ফেলে কানতে কানতে অজস্র গালাগালের সাথে পুলিশদের শাপশাপান্ত করে যাচ্ছে। এই রকম অশান্তিময় পরিবেশে রুমকির হাত ফস্কে দুটো ডিম পড়ে একেবারে ল্যাটিয়ে গেছে মাটিতে। রুমকির মা এই মারে তো সেই মারে। চুলের ঝুঁটি টেনে ধরেছে, এমন সময় রান্নাঘরের পেছনের জানালায় সরকারী হাসপাতালের ঠিকে আয়া মিতালি গোমেজ ডাক দেয়, ও বড়ভাবি থানায় যাচ্ছি গো।
মা রুমকিকে ফেলে ছুটে যায় জানালায়। হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে, তুমি একা !

জানালা থেকে সরে দাঁড়ায় মিতালি গোমেজ। ঘন বাগানের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে ছুটে যাচ্ছে আরও অনেকে। থানায় যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা এদিকেই। মা কিছু বলার আগেই ছোটকাকিমা একগাদা টাকা গুঁজে দেয় মিতালি গোমেজের হাতে। সেজোকাকি আরো টাকা এনে দেয়, দিদি গো তোমাদের জন্যে ছেলেটা লড়েছে। যে করে হোক ছাড়িয়ে আনো গো দিদি।
মোতির মা ঝন্নাৎ করে বালতি ফেলে ছুটে যায়। সেজকা চেঁচিয়ে উঠতেই ঘাড় বেঁকিয়ে জ্বলে ওঠে, আমরা বেঈমান না।
রুমকিও ছোটে। থানা ঘেরাওয়ে পুলিশ লাঠি চার্জ করে, টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে, গুলি চালায়। কত মানুষ মার খায়। রক্ত ঝরে। মানুষ তবু থামে না । মার খেয়ে আরও ক্ষেপে ওঠে । চীৎকার করে শ্লোগান দেয়। ও জানে, দাদাকে খুলনা কিম্বা যশোর চালান করার নামে একবারে হাওয়া করে দিতে পারে পুলিশ। যেমন হাওয়া হয়ে গেছে লতিফ মাস্টার। কোনো সকালে হয়ত দাদার লাশ পাওয়া যাবে মধুমতির চরে। পুলিশ বলবে, এনকাউন্টার। পুলিশ মেরে থানা লুটতে এসেছিলো। যেমন বলেছিল খাটরার খালে মন্টুদার মৃতদেহ পাওয়া পর ।

অনেক বছর পর। সমরেশ মজুমদারের মৌষলকাল পড়ছিল এডভোকেট রুমকি হাসান। পড়তে পড়তে হেসে ফেলে । রাজনীতি, কি স্বদেশ কিবা বিদেশ, সেই একই আছে। কেবল বদলে গেছে শ্লোগান, পোস্টার, দেওয়াল লিখন। এই মূহূর্তে ভোগে আছে পৃথিবী। যাপিত জীবনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অসহিষ্ণু লোভ। ধর্মের মুখোশে ক্ষমতার লকলকে লালচ।
দাদাটা বেঁচে থাকলে আজ কোন পথে যেত কে জানে !
গেল মাসে একজন ব্যবসায়ী ক্লায়েণ্টের পরিচয় জেনে চমকে উঠেছিল রুমকি। প্রথম সারির একজন নকশাল নেতার ছেলে। সম্পূর্ণ বেআইনি জেনেও তার কাজটা করে দিয়েছিল। ও না করলে অন্য কোন এডভোকেট ঠিক করে দিতো। ওকেও তো বাঁচতে হবে!
অনেকদিন ধরেই সততার খচখচানি কমে গেছে রুমকির। তবু সেদিন খুব বেজেছিল। ব্যথায় কেঁপে ওঠেছিল বুক। মধুমতির চর উজিয়ে দুধ দিতে আসা জামালকাকু ফিসফিস করে ছোটকাকে বলে গেছিল, লাশ ভেসে উঠেছে চরে। কাটা কলাগাছের মত গড়িয়ে পড়েছিল ছোটকা।
তারপ বাড়ি ভাগ হয়ে তিনটে বাড়ি হল। তিনটে বাড়িতেই ব্যথার কাজলদানি হয়ে ঝুলে থাকলো দাদা। ভুলোমন রঙে হারিয়ে গেল পিতলের রঙদানি। মোতির মার নাতনি সুমি থাকে রুমকির সাথে। দু কাপ চা এনে পাশে এসে বসে, আন্টি ভাবছি ল’ পাশ করে বিসিএস দেব !
গরম চায়ে চুমুক দিয়ে রুমকি বলে, দে, যা যা লাগবে জানাস।
সামান্য কম্পেনসেশন। পৃথিবীটা এখন এভাবেই চলছে যে!