মেয়েলি গল্প

প্রতিভা সরকার



একটু বড় হবার পর আমার হিংসের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ালো বোনের গায়ের রঙ আর ফিগার। হ্যাঁ, শুটকো মুলোর মতো ভাঁজ ফেলা চামড়া, রোগা চেহারা আর কালো রঙ নিয়ে আমি তখন পাড়ার সেরা কুচ্ছিত মেয়ের শিরোপা পাবার জন্য প্রস্তুত। আমি আমার মায়ের মতো, গাত্রবর্ণের জন্য যার শ্বশুর বাড়িতে হেনস্থার শেষ ছিল না।

আর বোনের সবকিছুতে বাবা বসে আছে! টকটকে গৌরী সে, নাক চোখ মুখ, ভরা কন্ঠা, এমনকি লালচে পাতলা ঠোঁটের জন্যও সবাই তার প্রশংসা করে। আমি জ্বলে মরি।


চিনুকাকি সেদিন মাকে আক্ষেপের সুরে বলছিল, হায়রে, বড় মাইয়াটা যদি তোমার নাকমুখও পাইতো! গায়ের রঙ যাইই হোক, তোমার চোখমুখ তো সুন্দর।

মা নিঃশ্বাস ফেলে বললো, ওর ভাগ্য নিয়া ও জন্মাইছে, আমার কী করার আছে কও। আমার মতো পরের কথা শুনতে শুনতে দিন পার করবে।


আমাদের মফস্বলে আমরা এইরকম মিশ্র ভাষায় কথা বলতাম তখন। আমার দাদু যদিও দেশভাগের অনেক আগে চলে এসেছিল এবং প্রচুর জমিজমা কিনে এলাকায় জোতদার হিসেবে নাম করে ফেলেছিল, কিন্তু ভূমিপুত্র রাজবংশীরা ছাড়া ওখানে সব বসতিই ছিল দেশভাগের সময় এপারে চলে আসা পূর্ববঙ্গীয়দের। তাই তাদের কথাতেও দেশের ভাষার টান লেগে ছিল তখনও, ঢুকে পড়ছিল নানা স্থানীয় শব্দ, আবার কলকাতা ফেরতদের মান্যভাষার প্রভাবে ক্রিয়াপদগুলি ক্রমে সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছিলো।


যে ভাষাতেই হোক, নিন্দেমন্দ, তাচ্ছিল্য বুঝতে খুব একটা বুদ্ধির দরকার হয় কি! গলার স্বরে, তাকানোর কায়দাতেই বোঝা যায়। মা কাকিমার এইরকম কথা বহুবার কানে এসেছে, আড়ি পেতে শুনতে হয়নি। আমাদের গার্ডিয়ানরা তখন খোলাখুলি নিন্দা প্রশংসা দুইই করতো, বডি শেমিং কথাটার মানে জানতো না। আর খোলাখুলি বলারই বা কী আছে, আমি কি কিছু বুঝি না, লোকের চোখের ভাষা পড়তে পারিনা !


বোনকে সঙ্গে নিয়ে চৌপথি পার হয়ে মদনমোহন বাড়ি যাবার সময়, কতো সাইকেল ঘষটে থেমে যেতো, আশেপাশে বড়রা নেই দেখলে তীক্ষ্ণ সিটি উড়ে আসতো। আমি জানতাম কোনটারই উদ্দিষ্ট আমি নই। উদ্দিষ্ট আমার বোন, হাতে পুজোর থালা নিয়ে সবুজ ফ্রকে মরালীর মতো যে ভেসে চলেছে। তবু তো তখন সে মাত্র ক্লাস এইট। আমার নিচু হয়ে ঢিল কুড়িয়ে নিয়ে সিটিওয়ালাদের দিকে ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছে করত। শালা শুয়োরের বাচ্চারা। এইটুকু মেয়েকে দেখে ছোঁকছোঁক! ঘরে মা বোন নেই! নিশঃব্দে মুখ খারাপ করতে করতে ভুলে যেতাম, আমিও কিন্তু তখন সবে ক্লাস নাইন। বোনকে অকারণে বকতাম,

-তাড়াতাড়ি চলতে পারিস না, নাকি! আরো দেরি কর, পুরুত চইলা যাবে।


বড় হবার পর স্বাভাবিকভাবেই এই দমচাপা হিংসে ভিসুভিয়াস হয়ে গেল। অনবরত ছোটখাটো অগ্নুৎপাত লেগেই আছে, কবে যে সশব্দে গোটাটাই ফেটে পড়বে কেউ জানে না। ততোদিনে বোনও সব বুঝে ফেলে ঝগড়া করতে শুরু করেছে। কখনো হাতাহাতিও লেগে যেত। নখের আঁচড়, মুঠোয় ওপড়ানো কয়েকটি চুল, আনতাবড়ি লাথি, তারপর সব শান্ত হতো। মা সবসময় আশংকায় থাকতো এই বুঝি আবার শুম্ভ নিশুম্ভে লড়াই লেগে গেল। আর লাগতোও কী সব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে!


আমাদের বাড়ির একটা বাড়ি পরে কাঠের বাড়ি ছিল ঘনশ্যাম সাহাকাকুর। কাঠের বাড়ি মানে, যার বাড়ি সে তখন ও তল্লাটে বড়লোক। মজবুত শালবল্লার খুঁটির ওপর সার সার তক্তা পাশাপাশি পেতে ঘরের মেঝে। মাটি থেকে অন্তত এক মানুষ ওপরে। মেঝেতে লাফালে ধুপধাপ আওয়াজ হতো। লম্বা ঘরের মাঝে মাঝে কাঠের পার্টিশন দেওয়া, ফলে এক সারিতে তিনটে ঘর। মাথায় ঢালু টিনের ছাউনি। উল্টো দিকে উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘর, ডানদিকে গোয়ালঘর, মুনিষদের ঘর। কুয়ো বাথরুম। আরো দূরে পায়খানা। বাড়িটায় খুব লক্ষ্মীশ্রী ছিল। গোবর ছড়া দিয়ে রোজ উঠোন লেপা হতো। উঠোনের বাঁ কোণে একটা স্থল পদ্মের গাছ কোজাগরির দিন গোলাপি হয়ে থাকত।


তখন সবাই বলতো সাহারা খুব বড়লোক হয়। রাধেশ্যামকাকুর গম ভাঙাবার মেশিন, তেলের কল, এছাড়া বন্ধকি কারবারে সে নাকি দূরদূরান্তেও এক নম্বর। কাকুর একটাই ছেলে, আমার বয়সী। এক ক্লাসে পড়ি কিন্তু পড়াশোনায় তার মন নেই, দিনরাত সিনেমা দেখা, আড্ডা মারা, এইসব। কাকুর ঈশ্বরভক্তি, দিবারাত্রি ইষ্টের নাম মুখে আনবার প্রবণতা তার কপালের ফোঁটা তিলকের মতো সন্তানের নামকরণেও চুইয়ে পড়েছিল, ফলে আমার বন্ধুটির নাম ছিল গোবিন্দ।


এই গোবিন্দ বোনের প্রেমে পড়লো। পড়লো মানে তার আর উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা রইল না। দিনরাত সে আমাদের বাড়ির সামনের মাঠে সকালে ফুটবল, বিকেলে ক্রিকেট প্র‍্যাক্টিস করে। নাওয়া খাওয়ার সময় কী ক'রে ম্যানেজ করে কে জানে! কিন্তু পাশের বাড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে আমাদের বাড়িটা যেখান থেকে দেখা যেত, বাদবাকি সময়েও সে সেখানে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়াতো, ব্যায়াম করতো। অনেক সময় চুপ করে উদাস চোখে এমনি তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখেছি।


আমার যেন দায়িত্ব কর্তব্য অনেক বেড়ে গেল। একে তো অপমানের জ্বালা, আমার সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে, তবু আমায় প্রোপোজ করল না, আবার আমারই ছোট বোনের দিকে হাত ! আমি বোনের ওপর কড়া নজর রাখতে শুরু করলাম। কলপাড়ে গিয়ে একটু দেরি হলেই, এই তুই কোথায় গেলি রে, ব'লে হাঁকডাক তো ছিলোই, তারপর শুরু হলো লুকিয়ে নজর রাখা। বোন কখনো ওদিকে তাকায় কিনা, তাকিয়ে হাসে কিনা, এইসব।


আমাদের সেই মফস্বলে সিনেমা হল ছিল একটাই, আর বারো আনার টিকেট কাটলেই তার লেডিজে ঢুকে পড়া যেতো। রোজ বিকেলে তারস্বরে মাইকে গান বাজিয়ে লোক ডাকা শুরু হতো। দুটো গানই ঘুরেফিরে বেশি বাজানো হতো, দুটোই লতা মঙ্গেশকারের, নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা… আর আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন…। গান দুটো বাজতে থাকলে ঘড়ির দিকে না তাকালেও বোঝা যেতো বিকেল নেমেছে, একটু পরেই মানসাই নদীর ঢেউয়ের নীচে সূর্য অস্ত যাবে। মেয়েমহলে কালো গোড়া কষার ফিতে দিয়ে চুল এঁটে বাঁধার ধুম পড়ে যেত, মা কাকিমা ব্যস্ত থাকলেও জ্ঞাতি পিসিরা আর আমরা দুই বোন বাড়ির লম্বা বারান্দায় বসে খুব হা হা হি হি করতাম। রাস্তা থেকে সে বারান্দার দূরত্ব মেরেকেটে পনের হাত হবে।


সেদিন হঠাৎ দেখি গোবিন্দ রাস্তায় সাইকেল নিয়ে আসছে যাচ্ছে, পেছনের ক্যারিয়ারে বসে থাকা ছোটকুর সঙ্গে গম্ভীরমুখে কী যে আলোচনা করছে, কিন্তু মাঝে মাঝেই তিরছি নজরিয়া ছুঁড়ে দিচ্ছে আমাদের দিকে। সবই জানি, সবই বুঝি, তবু আড় চোখে কড়া নজর রেখেছিলাম বোনের ওপর। তার কোনো হেলদোল দেখিনি। শুধু একটা অকারণ রাগ, অপমান, হতাশা আমায় দখল করে নিচ্ছিল, আর ঠেলে দিচ্ছিল একটা চরম সিদ্ধান্তের দিকে। আমি বাবাকে গোবিন্দের ব্যাপারটা জানিয়ে দেব।


ব্যাপার কিছু থাকুক না থাকুক, আমাদের সময় নালিশ করলেই বড়দের মধ্যে তার প্রতিকারের জন্য অস্থিরতা দেখা যেত। যাইই ঘটুক, ধরে নেওয়া হতো মেয়েটিই দোষী, তার চলনে বলনে কোথাও কোনো উস্কানি ছিল। আর বাবার ছিল অমানুষিক রাগ, কর্তৃত্বের উন্মাদ বাসনা। দিদি কি তোর নামে তবে মিথ্যে কথা বলছে, শেষ অব্দি সাহাবাড়ির ছেলে, এইসব প্রশ্ন আউড়ে আউড়ে মেরেই চলল, যতোক্ষণ না বোন উঠোনে আছড়ে ফেলা একটা নিষ্প্রাণ পেঁয়াজ ভর্তি বস্তার মতো মেঝের ওপর ধপ করে পড়ে যায়।


বাবা ঘাবড়ে গিয়ে মার থামায়। তবে আসল ব্যাপারটা মা ছাড়া কেউ বোঝেনি। বোনের চোখেমুখে জল দেবার জন্য রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে হিসিয়ে উঠে বলে গেল, তোর পেটে এতো হিংসা !


হিংসা ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? বাঁচলেও সে বাঁচা কি মানুষের মতো বাঁচা হয়? হিংসের কারণেই তো যতো উন্নতি। ওর আছে, আমার কেন নেই, এই প্রশ্ন আর আক্ষেপই তো মানুষকে চিরকাল ছুটিয়ে মেরেছে। তাই আরো ভালো, ওর চেয়ে ভালো করব, এই জপতে জপতে দারুণ ভালো রেজাল্ট করে বসলাম। ক্লাস টেন। বাবা বললো, ফাইনালে ডিস্ট্রিক্টে যদি ফার্স্ট হোস তবে স্কলারশিপ পাবি।


আমাদের সময় বাবা মায়েরা ঐরকমই ছিল। বোর্ডে স্ট্যান্ড করা নয়, সব বিষয়ে লেটার পাওয়া নয়, ডিস্ট্রিক্ট স্কলারশিপ পেলেই হবে! ঐ আশাতেই জোর লেখাপড়া চালাচ্ছিলাম, দুম করে একটা ঘটনায় প্রায় বোবা হয়ে গেলাম।


সেই মার খাওয়াবার পর থেকে বোনের সঙ্গে সম্পর্ক আর ভালো হয়নি। কথা চলে মা-কে মাঝখানে রেখে, এমনকি পরস্পরের চোখেও চোখ রাখিনা আমরা। ছোটবেলা থেকেই দুজনে মণিমেলায় খেলতে যেতাম, ব্রতচারী শিখতাম, কিন্তু এখন যাওয়া আসা সব আলাদা আলাদা, আমি দশহাত আগে, ও দশহাত পিছে। এটা অবশ্য বাবার হুকুম মাথায় রেখে ছক কষে করা, বাবা দেখে ফেললে যেন বলা যায়, একসঙ্গেই যাচ্ছিলাম, এখনই একটু এগিয়ে বা পিছিয়ে গেছি।


সেই সময়টায় রাত জেগে পড়ার ফলে আমি আরো শুটকো মেরে যাচ্ছিলাম, চোখের কোলে অন্ধকার,গায়ে যেন আরো কালি ঢালা। মণিমেলার মুখ্য সঞ্চালক কিশোরদা অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে সেদিন বলল,


-কী চেহারা বানাচ্ছিস রে! তোর কী কোন মানসিক দুঃখ কষ্ট আছে ? নিজের বোনের সঙ্গে তুলনা করলে তো… যাকগে, এবার তো তোর শেষ বছর, লাইব্রেরি থেকে গত বছর খান দশেক বই নিয়েছিলি, দুটো ছাড়া সব ফেরত দিয়েছিস। ঐ বইদুটো কাল আমার চাই।


আমার কান গরম হয়ে ঝাঁ ঝাঁ করছিল। বোনের সঙ্গে তুলনা করে না এরকম কাউকে আমি দেখলাম না। আমার সমস্ত দুর্ভাগ্যের মূলে ও, আমার নিজের পিঠোপিঠি বোন। তবু আমতা আমতা করে বললাম,


কাল ? কাল তো আমি আসব না মণিমেলায়। আমার টিউশন আছে বিকেলে।


না না, মণিমেলায় বই আনা আমি এলাউ করি না, তুই তো জানিস। এখানে সবাই কাড়াকাড়ি করে, এন্ট্রি ছাড়াই বই নিয়ে যেতে চায়।

কিন্তু কাল কানুদা স্টক মেলাবে। তুই একটা কাজ কর,টিউশন যাবার আগে বইদুটো আমার বাড়িতে দিয়ে যা।


-দুপুর তিনটের সময়?


আমার ইতস্তত করা দেখে কিশোরদা আবার বলে,


কাউকে তো ডিস্টার্ব করা হবে না তাতে। মা তো নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে ঘুমোয়। তুই কড়া নাড়লে আমি বইটা নিয়ে নেব। একটা সই মেরে দিয়ে তুই চলে যাবি। একটু দেরি করে গেলে অনিল স্যার কিছু বলেন না, আমি জানি। তুই তো একা নোস, এই মণিমেলারই কতো ছেলেমেয়ে পড়ে ওঁর কাছে।



পরদিন বই দুটো আলাদা করেই নিলাম। টিউশনির বই খাতা ব্যাগে, এদুটো হাতে। যাব আর সই করে ছুট দেব।


বেল বাজাতে কিশোরদা এসে দরজা খুললো,


ও তুই এসে গেছিস৷ একটু বসে যা, আমি আসছি।


কিশোরদা বাইরের দরজা বন্ধ করে ভেতরের দরজা দিয়ে কোথায় যেন উধাও হল। আমি বসে উশখুশ করছি, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, বোন তো এতোক্ষণ টিউশন ক্লাসে পৌঁছে গেছে, স্যারও প্রথমে সংস্কৃত পড়াবেন বলে বই খুলেছেন, তারপর অঙ্ক। সব যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম আর ছটফটানি বেড়ে যাচ্ছিল।


এমন সময় বই ফেরতের জাবদা খাতা নিয়ে কিশোরদা এল। এবার ভেতরের দরজাটাও এঁটে দিল। আমি তাকিয়ে আছি দেখে একটু হেসে বলল,


মা ঘুমোচ্ছে রে। নে এইখানে সই কর।


ওর দেখানো জায়গাটা সই করব বলে পেনটা হাতে নিয়েছি, আমার কাঁধে দুটো হাত এঁটে বসল, মুখটা ঝুঁকে এলো ডানদিকের গালের ওপর। দাড়িওয়ালা চিবুক ঘসতে ঘসতে জিজ্ঞাসা করল,


চেহারা এতো খারাপ হয়ে যাচ্ছে কেন রে!


কিশোরদার গলায় অনেক দরদ। আমার সঙ্গে এতো দরদ ঢালা কথা কেউ কখনো বলেছে কি! আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল, কান্না পাচ্ছিল, এঁকেবেঁকে যাচ্ছিলাম, আরেকজনের লম্বা দাঁড়িয়ে থাকা শরীর পিঠের ওপর চেপে এলে যা হয় আর কি! সেই দরদী গলা আমার কানের ওপর গরম ঠোঁট চেপে অনেক কিছু বলছিল, আর আমাকে আস্তে আস্তে টানছিল বিছানার দিকে। আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছিলাম না, শুধু মনে মনে ভেবে যাচ্ছিলাম, তবে কি কিশোরদা আমাকে ভালবাসে? শুনেছি ভালবাসলে তবেই এইরকম করা যায়। আমায় ছেড়ে দিয়ে ও কেবল ভালবাসার কথাই বলুক না কেন! ভালবাসার কাঙাল আমি কান ভরে শুনি।


মোদ্দা কথা, আমি যেন মায়াবী অজগরের গ্রাসে ছিলাম। নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টাও যেন খুব বেশি হতো আমার পক্ষে। তাই নিশ্চেষ্ট থেকেও আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছিলাম সেদিকে, যেদিকে অজগরটা টানছিলো।


হঠাৎ বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার জোর আওয়াজ। কিশোরদা স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠলো। কে কে বলে চিৎকার করল, স্পষ্ট বুঝলাম ওর গলা কেঁপে যাচ্ছে।

উত্তরে আরো জোরে কড়া বেজে উঠল। আমি তখনও ভোম্বল হয়ে দাঁড়িয়ে। টের পাচ্ছি আমার সারা গায়ে অচেনা গন্ধ। বিড়ির গন্ধ, নাকি নিষিদ্ধ কামনার বুঝিনি। কিন্তু থরথর করে কাঁপছিল হাত পা। অনুশোচনা, ভয়ে আমার বমি পাচ্ছিল।


দরজাটা একটু ফাঁক করলো কিশোরদা,


-কে ?


ওপাশ থেকে বোনের সরু গলা পেলাম,


দিদিকে বার করে দিন কিশোরদা। আমি কিন্তু বাবাকে খবর পাঠিয়েই এখানে এসেছি।


সব ধানাইপানাইয়ের মুখ বন্ধ করে দিল শেষ বাক্যটি। হাট করে খোলা দরজা দিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম। চোখ নাক দিয়ে জল গড়াচ্ছে, মাথা নীচু। বোন আমার হাত টেনে হিড়হিড় করে দৌড়াতে লাগলো স্যারের বাড়ির দিকে। শুধু একবার মাথা ঘুরিয়ে বলল,


বাবা কিন্তু কিছু জানে না। তুইও কিছু বলিস না। ওটা না বললে ও তোকে ছাড়তো না। বলে দিত, তোর দিদি এখানে আসেনি তো। ঐ লোকটা যে ঐরকম তুই জানতিস না ?

টিউশনির ক্লাসে তোর দেরি দেখেই বুঝেছি…



আমি এখনও অবাক হয়ে ভাবি বোন জানতো আমি বই ফেরত দিতে গেছি, কিন্তু এরকম যে হতে পারে সেটা জানলো কিভাবে ! তবে কী… তবে কী...ওর সঙ্গেও কখনো, কোনোদিন… ।