সমান্তরাল

হিন্দোল ভট্টাচার্য



শনিবার সকালে সুবল আবিষ্কার করল সে কিছুতেই বৃহস্পতিবারকে মনে করতে পারছে না।
ভুলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। হয়তো সেই দিনটায় এমন কিছুই ঘটেনি, যার জন্য তাকে মনে রাখতে হবে। সেভাবে ভাবতে গেলে, জীবনের কটা দিনই বা মনে থাকে? আমাদের জীবনটাই হয়তো এক দীর্ঘ আত্মবিস্মরণ।

তবু, মনে করতে গেলে, অনেক কিছুই মনে পড়ে যায়। কিন্তু তারিখ, বার- এইসব মনে পড়ে কি? মনের মধ্যে খচখচ করলেও, সুবল আশ্বস্ত হল, যে ভুলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। কারণ তার জীবনে এমনিতেই তেমন কিছুই ঘটে না।
কিন্তু বৃহস্পতিবারকে মনে রাখার একটা কারণ আছে। প্রতি বৃহস্পতিবার সে নিয়ম করে স্কুল থেকে বেরিয়ে গঙ্গার ঘাটে যায়। ওইদিন লাস্ট পিরিয়ড পর্যন্ত থাকতে হয় না। তিনটের মধ্যেই সে বেরিয়ে পড়তে পারে।
অন্তরা যেদিন চলে গেল, তার পর থেকে, সুবল গ্রতি বৃহস্পতিবার নিয়ম করে প্রিন্সেপ ঘাটে গিয়ে বসে থাকে সন্ধে ৭টা পর্যন্ত। গঙ্গার দিকে তাকিযে থাকতে তার ভাল লাগে। মাঝেমাঝে এও মনে হয় একদিন অন্তরা ফিরে আসবে। অন্তরা যে ঠিক কোথায় চলে গেছে, তা সুবল কেন কেউই জানে না। এমনটা নয়, তাদের মধ্যে ভালবাসা ছিল না। এমনকী, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক, তা হল, দুজনের মধ্যে খুব একটা মনোমালিন্যও হত না। শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা শহরে আসা অব্ধি সুবলের একটাই আশ্রয় ছিল, অন্তরা।

কিন্তু সুবল ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি, একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে, দরজা খুলে স্রেফ অন্তরা স্রেফ মিলিয়ে যাবে। নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা, পুলিশে জানানো, তদন্ত, কোনওকিছুতেই কিছু হয়নি। প্রায় তিনবছর হল।

কেন চলে গেল অন্তরা, কোথায় চলে গেল, এ কথা জানতে সুবল অনেক চেষ্টা করেছে। এমনকী যদি স্বপ্নের মধ্যে ক্লু খুঁজে পায়, তার জন্য ঘুমের ওষুধ খেযে ঘুমিয়েও থেকেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু অন্তরা আসেনি।
কোনও এক বৃহস্পতিবার অন্তরা চলে গেছিল।
তাই বৃহস্পতিবারকে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে সুবলের। একটা জ্যান্ত গোটা বৃহস্পতিবার তার জীবন থেকে, স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে, এটা সে ভাবতেই পারছে না। অথচ এটাই সত্য।
অন্তরাও হারিয়ে গেছে, বুসহপতিবারও হারিয়ে গেছে।
সাতদিন না, এই সপ্তাহে সুবলের আয়ু ছ দিন কমবে।
কিন্তু এখন সুবলের তাহলে করণীয় কী? আজ স্কুলে যাবে না ঠিক করল সুবল। যে করে হোক, বৃহস্পতিবারকে খুঁজে বের করতেই হবে।

বারান্দা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। ফ্ল্যাটের পিছনের দিকেই ঘন বস্তি। এখন আর কোথাও উনুনের ধোঁয়া ওঠে না। দমদমের বস্তিগুলোয় বেশ প্রতিটি অ্যাসবেস্টসের মাখায় একটা করে ডিশ অ্যান্টেনা লাগানো। মানুষ বিনোদন আর খবর ভালবাসে। সময় কি মানুষকে বেশি বিপর্যস্ত করে দেয়? কারণ কাজ না থাকলে মানুষ স্থির ভাবে একা নীরবতার মধ্যে থাকতে পারে না বলেই এত বিনোদনের রাস্তা।
সুবল ভাবে।
তার বিনোদন নেই। এদের নিশ্চয় প্রত্যেকের বাড়িতে বৃহস্পতিবার এসেছিল। এদের বাড়ি থেকে কেউ বৃহস্পতিবার সকালবেলা হারিয়ে যায়নি।
কাঠের চেয়ারটা নিয়ে বারান্দায় রেখে সুবল অপেক্ষা করবে বলে ঠিক করে। বৃহস্পতিবার কি ফিরে আসবে না আর?
বৃহস্পতিবার ফিরে এলে কি অন্তরাও ফিরে আসতে পারে?
বৃহস্পতিবার কি অন্তরার সঙ্গে দেখা করতে চলে গেছে? না কি সুবলের ঘুমের সুযোগে, অন্তরা এসে বৃহস্পতিবারকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেছে?
সুবল অনির্বাণকে ফোন করে। অনির্বাণ, তার স্কুলের এক সহশিক্ষক।
- একটা কথা বলতে পার?
- বলুন দাদা, আজ আসছেন না?
- না, শেন না, তুমি এই বৃহস্পতিবারটা মনে করতে পার?
- মনে করতে পারি মানে?
- মানে, আমি কি বৃহস্পতিবার স্কুলে গেছিলাম?
- বৃহস্পতিবার? ও, না, আপনি তে ওইদিন স্কুলে আসেননি। এ সপ্তাহে দুদিন ক্যাজুয়াল গেল আপনার? অনেক ছুটি জমা আছে নাকি?
- না, আমি বৃহস্পতিবার যাইনি?
- ও আচ্ছা। ঠিক আছে। না গো, আমি আজ যেতে পারছি না।
- শরীর টরির?
- না, না, একটা জায়গায় যেতে হবে।

ফোনটা কেটে, ফোনটা হাতে নিয়েই চেক করতে শুরু করল সুবল। না, বৃহস্পতিবারের কোনও মেসেজ নেই, হোয়াটসাপ নেই। ফেসবুকে গেল। বৃহস্পতিবার সে কিছুই পোস্ট করেনি।
বেল বাজল। ঊর্মিলাদি এসেছে। অনেকদিনের কাজের লোক। ঘর মোছা, বাসন মাজা। তার বাইরে রান্নাটাও করে দিয়ে যায়।
ঊর্মিলাদি রান্নাঘরে ঠুক ঠাক করছে। জিজ্ঞেস করা উচিত হবে কিনা, ভাবতে ভাবতে, সুবল এগিয়ে যায়।

ঊর্মিলাদি শব্দ পেয়ে তাকায়। ‘কিছু বলবে? চা খাবে?’

- না, দিদি, একটা কথা,
- তা বলো না
- বলছি, বৃহস্পতিবার কি আপনি এসেছিলেন?
- এই বেস্পতিবার তো তুমি আমাকে আসতে বারণ করলে। বললে তোমার স্কুলের একটা পিকনিক আছে। তাই সকালে বেরিয়ে যাবে।
- আমি বলেছি?
- আমি বলেছি?
- হ্যাঁ, তাই তো আসিনি। তোমার কী হয়েছে? ভুলে টুলে যাচ্ছ নাকি?
- না, দিদি ঠিক আছে। একটু চা হবে?
- হ্যাঁ, তাই বলে না।

চা’টায় চুমুক দিয়ে সুবল আবার ভাবতে বসল। তার মানে সুবল বৃহস্পতিবারে বাড়িতেও ছিল না, স্কুলেও ছিল না। অথচ তার কিছুই মনে নেই। আবার মনে পড়ছে শুক্রবার থেকে। শুক্রবার ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে বাকি সবকিছুই মনে পড়ছে।
কিন্তু বৃহস্পতিবারের অস্তিত্ব তার জীবনে নেই। অন্য কারোর জীবনের বৃহস্পতিবারেও সে নেই।
ফাঁকা বাড়িটার মতো হয়ে গেছে তার মন। মাথায় কিছুই আর নেই বলে মনে হচ্ছে। ঘড়ির টিকটিক শব্দটার মধ্যে কী যেন এক অজানা ভাইরাস আছে। এই ভাইরাস কি আতঙ্কের? একটা ফাঁকা বাড়িতে দেওয়ালঘড়ি রাখাটাই সম্ভবত উচিত কাজ নয়। একটি ঘড়িও মানুষকে খুন করে দিতে পারে।
সুবল ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকে।
একটা অদ্ভুত সমস্যা। একটা সম্পূর্ণ দিন যেমন তার কাছে মুছে গেছে, তেমন, সেও একটা গোটা দিন অন্যদের কাছে মুছে গেছে।
এটিএম থেকে কোনও টাকা তোলা হয়নি, ফোন করা হয়নি, ফোন আসেনি, ফোন বন্ধ ছিল, এসএমএস বা হোয়াটসাপের উত্তর দেওয়া হয়নি, কেউ তাকে দেখেনি এবং তার নিজেরও কিছু মনে পড়ছে না।
‘আশ্চর্য এটা তো আমি কখনও ভাবিনি।‘
এমনটাও তো হতে পারে, সুবলের কাছে যেমন বৃহস্পতিবার, অন্তরার কাছে তেমন সপ্তাহের সাতটি দিনই।
এই কারণেই অন্তরাকেও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না এবং অন্তরাও সম্ভবত হারিয়ে গেছে কোথাও। বা, ভুলে গেছে।
এ কথা মনে হতেই, শোক নয়, একপ্রকার শিহরন অনুভব করল সুবল। একটু শীতও করতে লাগল। কিন্তু এ কথা তো আর অস্বীকার করা যায় না, এই ভয়ের একটা কারণ আছেই। সুবল এই পৃথিবীটাকে ভালবাসে। কিন্তু একটা একটা করে দিন যদি তার কাছে সম্পূর্ণ লুপ্ত হতে থাকে এবং পৃথিবীর মানুষের কাছে সেই সব দিনে সেও যদি এভাবেই লুপ্ত হতে থাকে, লে, অন্তরার মতো সেও হয়তো একেবারেই লুপ্ত হয়ে যাবে।
মৃত্যু কি একেই বলে?

অন্তরা কি তবে মারা গেছে? না, মারা যায়নি, এভাবে হারিয়ে গেছে। আর সকলের স্মৃতি থেকেও অন্তরা হারিয়ে যাচ্ছে। আসল মৃত্যুটা শুরু হয়েছে এখন।

যে কোনও প্রকারে হোক, সুবলকে এই বিস্মৃতি থামাতে হবে। আজ বৃহস্পতিবার, কাল শুক্র, এমন করে যদি সুবলের সব দিন অন্য কেউ নিয়ে নেয়।
কিন্তু কে এই কাণ্ড করছে? এই সব তো নিজে নিজে ঘটতে পারে না। কেউ তো প্ল্যান করছে।
তাকে যদি আটকানো যায়।
- হ্যালো, আমি কি দমদম থানার ওসির সঙ্গে কথা বলতে পারি।
- বলছেন ( গলা বেশ গম্ভীর)
- আমি , আমার নাম সুবল। আমি একটা সমস্যায় পড়েছি।
- বলুন, কী হয়েছে।
- আমার বৃহস্পতিবার হারিয়ে গেছে।
- মানে?
- হ্যাঁ, আমার মনে হচ্ছে এভাবে সবকটা দিনই একে একে হারিয়ে যাবে। আপনারা আটকান। আমি বাঁচতে চাই।
- কোথায় থাকেন?
- জলবাগানে।
- আচ্ছা, বেশ। কনস্টেবল পাঠাচ্ছি। বাড়িতে থাকুন।

দুজন কনস্টেবল এসে একই সমস্যার কথা শুনে, বুঝল, সুবলের মানসিক অবস্থা ভাল নয়। এ অবস্থায় কী করা যায় এ বিষয়ে শলাপরামর্শ করল আধ ঘণ্টা ধরে। কিন্তু কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার কিছু নেই ভেবে, তারা আবার পাড়ি দিল থানায়। একটু শান্ত ভাবেই। পিছনের দিকে ফিরেও তাকাল না। ভেবেছিল খুন বা কিডন্যাপ কিছু হবে। কিছুই না, একটা পাগল।

বিকেল হয়ে গেল, অথচ কিছুই হল না।
কোনও কারণ জানতে পারল না সুবল। সন্ধের আকাশে পাখিওুলি জীবনানন্দের বর্ণনামতোই উড়ে যাচ্ছে।

অন্ধকারকে ভয় পায় না সুবল। বাড়িতে আলো জ্বলেনি সে। একেই কি নিয়তি বলে? একটা সিগারেট ধরিযে সুবল সবেমাত্র মাথাটা এলিয়ে দেবে ভাবছে এমন সময় কলিংবেল।
পুলিশ এল আবার?
সুবল এসে দরজা খুলতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠ হল বলে মনে হল তার।
কারণ, আর কেউই নয়, দরজার ওপারে দাঁড়িয়েছিল স্বয়ং অন্তরা।

- তুমি ফিরে এসেছ
- ফিরে এসেছ মানে?
- মানে, তোমায় কত যে খুঁজেছি।
- কী বলছ তুমি বুঝতে পারছি না। আমি আবার কোথায় গেলাম।
- তুমি কোথাও যাওনি? তিন বছর?
-তিন বছর? আধ ঘণ্টা হল বেরোলাম, এর মধ্যে তিন বছর কেটে গেল?

তুমি বৃহস্পতিবার সকালে বেরিযে তো আর আসেনি।

মানে? আজ কী বার?

-আজ শনিবার।

তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তুমি কি এখনও ঘুমোচ্ছিলে?

অন্তরা, ইউ ওযের মিসিং।

সুবল, সুবল, প্লিজ।

আরে, আমি এই ভরসন্ধেবেলা মিথ্যে কথা বলব কেন?

কী বললে। ভরসন্ধেবেলা? এখন সকাল ৯টা। বাইরে দেখো ভাল করে।

সুবল বাইরের দিকে তাকাল, নরম একটা ঝলমলে রোদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সুবল কিছুই বুঝতে পারছিল না। অন্তরা এগিয়ে এল। বলল, ব্রাশ করে নাও। চা করছি।



সুবল ব্রাশ করে চাযের কাপ নিয়ে বসে আছে সোফায়। উল্টোদিকে মায়ার মতো, ভ্রমের মতো অন্তরা কথা বলেই যাচ্ছে। যেমনটি সে করত। না এখন তো আর করত বলা যাবে না। বলতে হবে, যেমনটি সে করে।

মনের মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে সুবলের। তিন বছরের আগের সে দিনটা তবে ফিরে এসেছে?

তাহলে, তিন বছর পরের সেই দিনটা কোথায় গেল?

চা খেতে খেতে আরেকবার সুবল পূর্ণদৃষ্টিতে অন্তরার দিকে তাকাল।

সবকিছুই তো স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। এটা স্বাভাবিক আর কিছুই ছিল কি?
সোমবার সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে সে আবিষ্কার করল রবিবার দিনটা তার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার ছিল না। এখন রবিবারও নেই।

একটা একটা করে দিন কমে যাচ্ছে তার জীবন থেকে।

না কি বাড়ছে?

সুবল বিছানায় বসেই একটা সিগারেট ধরায়।

আজও তার কিছুই করতে আর ইচ্ছে করছে না। রোদটাও নিষ্প্রভ।