সুখচার্বাক

শিমুল মাহমুদ




খ্রিস্টপূর্বাব্দ প্রেক্ষাপটে ভারতীয় দর্শনাশ্রিত সমকাল উদ্দীপক আখ্যান
[আলেখ্য-ইশারা : মানবপ্রজাতির দায়, চার্বাক কথিত ভোগবাদি পূঁজির উদ্ভব]



১. চার্বাক সকাশে আলেকজান্ডার

স্বয়ং এরিস্টটল মহাশয় বালক আলেকজান্ডারের মাস্টারমশাই ছিলেন। আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপ নিঃসন্দেহে প্রজ্ঞাবান, যুদ্ধপ্রিয় হলেও উত্তরাধিকার সূত্রে সূর্য-উপাসক। এরিস্টটলের জন্মেরও আগে, তখনও খ্রিস্টাব্দ গণনা চালু হয় নাই, যিশুর নতুন বাইবেলের দৃশ্যাবলি তখনও দৃশ্যমান নয়; অথচ তখনও ভারতবর্ষ পরিজ্ঞাত, প্রস্ফুটিত। তখন ইয়োরোয়েশিয়ায় বীরযুগের প্রবাহ দাপুটে; আর তখন ভারতবর্ষে আদি চার্বাকগণ গুহাবাসি, উলঙ্গ এবং সুখি।

আদিচার্বাকদের সঙ্গে আলেকজান্ডারের সাক্ষাৎ হয়নি। এমনকি আরও পাঁচ শতাব্দি পর ঘৃতচার্বাকদের সূচানাকাল, তখনো আলেকজান্ডারের জন্ম হয়নি, বরং আরও পাঁচ শতাব্দি অতিবাহিত পর যাদের পাওয়া যাচ্ছে তারাও চার্বাক বটে; তবে ইনারা উত্তরকালের চার্বাক। এর পর এখন পাওয়া গেল ভাবিকালের চার্বাকদের, যাদের মধ্য দিয়ে আমরা নিজলোক প্রাপ্ত হয়েছি, মৎকৃত অর্থাৎ মদীয়লোক অবলোকন করেছি। এই যে অবলোকনপ্রাপ্তি যার ধারাক্রম আদিকালের চার্বাক মারফৎ মধ্যকালের ঘৃতচার্বাক; অতঃপর ঘৃতচার্বাক থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত উত্তরকালের চার্বাকগণের যাপিতজীবনের ধারাবাহিকতায় আমরা যারা নিজেদেরকে ভাবিকালের চার্বাক বিবেচনা করে শ্লাঘাবোধ করছি অর্থাৎ বর্তমান অবধি পৌঁছেছি।

পুনশ্চ-১
[অর্থাৎ এই যে মনুষ্যলোকের অবলোকন প্রসূত চিন্তনের প্রতিভাসসমূহ, চিন্তাযুক্তির এহেন প্রতিভাসসমূহ আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে চিন্তাপ্রবাহে অধিকার করে আসছি আদিচার্বাকগণের কাছ থেকে ঘৃতচার্বাক কর্তৃক; অতঃপর ঘৃতচার্বাক হতে উত্তরকালের চার্বাকদের যাপিতজীবনের আলোকে আমরা ভাবিকালের চার্বাকমুখি চিন্তকবৃন্দ]

এক্ষণে চার্বাক সকাশে আলেকজান্ডার। ইনারা উত্তরকালের চার্বাক এবং মৎকৃত স্বয়ং লিপিকর কিঞ্চিৎ ভাবতাড়িত বস্তুজগৎ কর্তৃক আক্রান্ত। ভাবিকালের পাঠক, তাহলে পাঠ করা যাক চার্বাককথা।

অতঃপর আলেকজান্ডার ভারতীয় যোগিদের উদ্দেশে প্রশ্নবাণে দৃঢ়; যদিও আলেকজান্ডারের দৃষ্টিতে দশ সংখ্যক ভারতীয় পুরুষ, ‘যোগি’ পরিচয়ে পরিচিত হলেও তদমধ্যে অন্তত একজন নিজেকে যোগি জ্ঞান অপেক্ষা চার্বাক পরিচয়ে অধিক শ্লাঘা বোধ করে।

আলেকজান্ডারের প্রথম প্রশ্ন : ওহে ভণ্ডবৃন্দ তাহলে বলো, মানুষের ঈশ্বর কতখানি জ্ঞানি?
চার্বাকগণের মধ্য থেকে অন্তত একজন যে নিজেকে যোগি পরিচয় অপেক্ষা চার্বাক পরিচয়ে প্রশান্তি বোধ করে সেই কৃষ্ণকায়া, অপরাপর যোগিপুরুষ অপেক্ষা অপেক্ষাকৃত দীর্ঘাকৃতি, চিক্কন দেহাকৃতির রাক্ষস-কর্কশকণ্ঠ উচ্চারণ করল,
--মানুষ যতটুকু জ্ঞানি ঠিক ততটুকু।
এবম্প্রকার কথোপকথন চলতে থাকলে লিপিকর ইথারলোকপ্রদত্ত কথোপকথনসমূহ আমাদিগের বোধগম্য ভাষায় লিপিবদ্ধ করলেন। অতঃপর চিন্তাশীল পাঠক আসুন লিপিবদ্ধ কালানুবাদ পাঠ করা যাক।
কাদেরকে তোমরা সংখ্যায় অধিক মনে কর, জীবিত না মৃত?
--জীবিত। কারণ মৃতেরা এখন নাই, মৃতেরা কোথাও নাই, মৃতদের গণনা অর্থহীন।
কোথায় বৃহত্তম প্রাণি জন্মে, সমুদ্রে নাকি স্থলভূমিতে?
--স্থলে। কারণ সমুদ্র স্থলেরই অংশ যেমন মৃত্যু জীবনেরই অংশ।
পশুদের মধ্যে কে সর্বাপেক্ষা চতুর?
--মানুষ। কেননা মানুষই উত্তম পশু, সৃষ্টির সেরা।
পৃথিবীতে প্রথম কী ছিল, দিন নাকি রাত্রি?
--দিন একদিন আগেই হয়েছিল। কেননা আলেকজান্ডারের মতো চার্বাকেরাও আশাবাদি, জীবনবাদি, জীবনরস ভোগানুসারি।
মানুষ কীভাবে অপরের নিকট জনপ্রিয় হতে পারে?
--প্রচুর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে সচরাচর ভয় উৎপাদন করে না।
মানুষ কীভাবে দেবতা হতে পারে?
--অসাধ্য সাধনই দেবত্ব প্রাপ্তির উপায়, যেমনটি ইতোমধ্যেই সিদ্ধার্থ গৌতমের দেবত্বলাভ করায়ত্ব এবং এক্ষণে আপনি আলেকজান্ডার হয়ে উঠতে শুরু করেছেন রক্তপাতের দেবতা, আগ্রাসনের দেবতা।
কোনটি অধিক শক্তিশালী, জীবন না মৃত্যু?
--জীবন। যেহেতু জীবনই যাবতীয় কষ্ট সহ্য করতে পারে, মৃত্যুর সেই ক্ষমতা নাই।
মানুষ কতদিন মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে?
--যতদিন জীবনের চেয়ে মৃত্যু মূল্যবান বলে মনে না হয়।
মানুষ জ্ঞানের পথে কতটুকু হাঁটতে পারে?
--ঈশ্বর যতটুকু হাঁটতে পারে ততটুকু।
ঈশ্বর কতখানি হাঁটতে পারে?
--অনন্ত। ঈশ্বর হল স্বপ্ন। মানুষ সমীম হওয়া সত্ত্বেও মানুষের স্বপ্ন অসীম। স্বপ্নের পথ বিরামহীন। জ্ঞানের পথ বিরামহীন। মৃত্যুর পরও মানুষ হাঁটতে পারে, স্বাপ্নিক ঈশ্বরের মতো।
মানুষের মৃত্যু হয় কেন?
--বেঁচে থাকার সময়টুকু স্বপ্ন দিয়ে মুড়িয়ে রাখার জন্য মানুষকে মরতে হয়। স্বপ্ন তো মানুষের মতো এলোমেলো আর মানুষের মতোই আকাঙ্ক্ষাপাগল, গতিশীল। স্বপ্নের ভিতর রয়েছে চরম মাদকতা, অথচ সেই মাদকতার উল্টোদিকেই প্রচণ্ডরকম ভয়, ভূত, রাক্ষস, বমি চেটে তোলার মতো বিতৃষ্ণা, ন্যাংটো হবার লজ্জা, লোকসমাজে বেইজ্জতি হবার ভয়, যদিও মানুষ মাত্রই নেংটা, তারপরও জলাতঙ্ক ব্যাধিতুল্য বেইজ্জতি হবার স্নায়ু-বিকলতা, জাহাজভর্তি পোশাকপড়া মানুষের মধ্যে নিজেকে পোশাকবিহীন উলঙ্গ হিসেবে দেখার আতঙ্ক, দৌড়াতে গিয়ে দৌড়াতে না পারার স্থবিরতাজনিত আতঙ্ক, অথচ পরমুহূর্তেই শূন্যে ভেসে গিয়ে জাহাজের মাস্তুলে ঝুলে থাকার আতঙ্ক; অনন্তকাল এই ঝুলে থাকার আতঙ্ক থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই মানুষকে মরতে হয়।

[সূচনাংশের ট্রায়াল এডিশন : অসমাপ্ত]