হিস্যা

ঝর্না রহমান



সংসারের জ্বালা যন্ত্রণা এড়াতে কদিনের জন্য ডুব মেরেছিলাম।
ভাবছেন,উমহ! কত ঢঙ! ব্যাটাদের আবার সংসারের জ্বালা বলে কিছু আছে নাকি? তারা তো ডুব মারে ডুবে ডুবে জল খাওয়ার জন্য! শুনুন বাহে! ব্যাটা নই, আমি বিটি! মেয়েমানুষ! হয়তো নাক শিটকাচ্ছেন, ওও! মেয়েমানুষ! তার আবার অত কীসের কথা?
কথা আছে! এত কথা যে লিখতে গেলে বস্তা বস্তা বই হয়ে যাবে! তবে হ্যাঁ মেয়েমানুষদের কথা নিয়ে গাদাগুচ্ছের বই হলেও মেয়েমানুষকে বই পড়তে দেখলে নরলোকে বড় ঝায়ঝামেলা ঘটে। যেমনটি আমার সোয়ামি করতেন। বই পড়তে দেখলে বলতেন, কী অত পড়? বই পড়ে কী হবে, মেয়েলোকের ব্যাকরণ বদলাবে কোনোদিন? সোয়ামী বলতেন ভাবার্থে! মেয়েদের খোঁটা দিয়ে। আমি বলি, সত্যি, ভাষার ব্যাকরণ তো পুরুষেরই ব্যাকরণ! পড়ে দেখেছো? সেখানে নারীপুরুষ, গরুছাগল, আসমানজমিন সব পুরুষ। প্রথম পুরুষ, দ্বিতীয় পুরুষ, নামপুরুষ! যত ভালো ভালো শক্তপোক্ত শব্দ, সব পুরুষ! মেয়েদের জন্য কী আছে? আছে লবডংকা! মেয়েমানুষের জন্য ব্যাকরণে অবলা বণিতা রমণী ললনা অঙ্গনা ছাড়াও বারাঙ্গনা বেবুশ্যে, ছিনাল বৈতাল আরও কত মন্দ শব্দ বরাদ্দ আছে, কিন্তু ভালো শব্দ নেই! পৌরুষ, পুরুষকার-এসবের মত দড় শব্দ আছে? কী হত মেয়েদের জন্যও যদি আলাদা সর্বনাম, আলাদা বিভক্তিবাচক স্ট্রং স্ট্রং শব্দ থাকতো! যাকগে সেসব। আসল কথায় আসি!
মেয়েমানুষ হলেও আমার চালচলন পুতুপুতু নয়। আমার হাতপা যেমন হেন্তালের লাঠির মত শক্ত শক্ত তেমনি আমার স্বভাবটাও গোঁ ধরা। ভাঙবে তবু মচকাবে না টাইপ। দেখা গেল ভাত চড়িয়ে কবিতা লিখতে বসেছি। ভাতের কথা আর মনে থাকলো না। পোড়া গন্ধে বাড়িঘর ভরে গেল। সোয়ামি ঘরে ঢুকে নাকের বাঁশি ফুলিয়ে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বাতাসে দুটো টান মেরে বলেন, কী পুড়েছে? আমি বলি, কপাল!
বুঝতে পারেন না। বলেন, কী বললে? আমি বলি, কিছু না, ওই, মানে ভাতটা.....
কী যন্ত্রণা, বুয়া যদি ঠিকমত ভাতটাও না রাঁধতে পারে, ওকে বিদায় করে দাও না কেন?
তা হলে আমাকেই বিদায় করতে হবে নাথ!
সোয়ামী কতক্ষণ ক্যাটক্যাট করে চেয়ে থাকেন। তারপর মুখ ঘোরান।
তার মনে পড়ে যায়, কদিন আগে অতিথিদের জন্য রান্না করা অন্নব্যঞ্জনে নুনঝাল তেলমসলার পানচুন হেরফের হওয়ার অপরাধে আমাদের হেঁসেলের দীর্ঘদিনের ট্রেনিংপ্রাপ্ত রাঁধুনী মহিলাকে তিনি পত্রপাঠ বিদায় করেছেন!
তিনি এলাকার সরকারি দলের নেতা। সারাক্ষণ তাঁকে ঘিরে থাকে চ্যালাচামুণ্ডা। সারাক্ষণ তাঁর সভা সমাবেশ। জনগণের সেবার জন্য ছুটোছুটি করতে গিয়ে তাঁর দিন কাবার। একদিন তাঁকে বললাম, ঘরসংসার আর ভালো লাগছে না। বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যেতে চাই। কয়েকদিন ঘর সংসার তুমি সামলাবে।
তিনি চোখ কপালে তুলে বললেন, আমার তো সামনে নির্বাচন! মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল অবস্থা! তোমার বন্ধুবান্ধবদের কি ঘরসংসার নেই?
আমাদের খিটিমিটি বেড়েই চললো। তাঁর আয়রোজগারও বেড়ে চললো। কোত্থেকে কীভাবে এত টাকা আসে বুঝতে পারি না। দুদিন পর পর সাগরেদরা বস্তা ভরে টাকা নিয়ে আসে। দুটো পুত্র আমার। গাদা গুচ্ছের টাকা আর মাথাপিছু একখানা করে গাড়ি পেয়ে পুরোই বখে গেল। মেয়েটেয়ে নিয়ে লং ড্রাইভ ট্রাইভ করে...... বিচ্ছিরি কাণ্ড! লাম্পট্যের জন্য দুচারবার জেল হাজতও খাটলো। ক্ষমতাবান বাপের ব্যাটাদের কাছে এইসব ছিচকে জেলহাজত হল পানতা ভাত। তাই লকারের চৌকাঠ ডিঙোবার আগেই দায়িত্ববান বাপ বাছাদের গলায় ফুলের মালা দিয়ে ঘরে ফিরিয়ে আনে।
আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। রাত দুটো তিনটেতেও সোয়ামির দিন শেষ হয় না। কোনো কোনেদিন বাড়িতেও ফেরেন না। জানতে চাইলে বলেন, কাজের চাপে নাক পর্যন্ত ডুবে আছি। তবে ডুবে থাকার জন্য তাঁর দুনিয়ায় নানা রঙ্গের সরিৎসাগর আছে তাও আমার জানা। সেখানে মদ্য বাদ্য নারী শাড়ি সবই ভেসে যায়, ডুবে যায়। সুতরাং তার দিন গড়গড়িয়ে চলতে থাকে। আর আমার দিনগুলো হতে থাকে মন্থর। প্রিয় প্রিয় বইও আর পড়তে ভালো লাগে না। একদিন একখানা চিরকূট লিখে বের হয়ে পড়লাম। তবে ভাববেন না, আমি রবিবাবুর মেজো বউয়ের মত অগ্যস্ত যাত্রা করলাম! ভাবলাম, কদিন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই। নিজের মত করে সময় কাটাই। তারপর দেহগাড়িতে ফুয়েল ভরে আবার চলে আসবো।
চিরকূট পেয়ে সোয়ামি যখন ফোন করেন তখন আমি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে একটা লাক্সারি বাসে চেপে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি। নৈশ কোচ। দু তিন দফা ঘুমের টানেই পৌঁছে যাবো।
সোয়ামি গাঢ় আবেগের টোন গলায় বললেন, কী ছেলেমানুষ তুমি! গাড়িও নিলে না! আমাকে বললেই তো হত, প্লেনের টিকিট করে দিতাম! হোটেল টোটেল বুক করে দিই? কোনটাতে থাকতে চাও!
আমি বলি, লাগবে না। নিজেই পারবো। আমাকে আমার মত থাকতে দাও। আমি নিজেকে নিজের মত গুছিয়ে নিয়েছি! হালকা গলায় সোয়ামির আবেগে ফুঁ মারি!
সোয়ামি প্রেমমাখা স্বরে হাসতে হাসতে বললেন, তুমি আর বড় হলে না, সুইট বেবি! টেক কেয়ার! আর আমার হিস্যাটুকুরও যত্ন নিও। মিস করবো!
অসহ্য লাগে আমার! রাগে সর্বাঙ্গ জ্বলে ওঠে।
আমি বলি, ডোন্ট কেয়ার!
ফোনে একটা নতুন সিম লাগাই। কারো কোনো প্রেমপিরীতি চাই না!
সকালে হোটেলে পৌঁছে রুমে ঢুকেই একটা দীর্ঘ হট শাওয়ার নিলাম। বাথরোবটা গা থেকে সরাতেই বড় আয়নায় আমার নগ্ন দেহ ধুরুম করে আছড়ে পড়ে। আমার দেহের কন্টুর মানচিত্রে বাথরুমের উজ্জ্বল আলো নানারকম রেখা এঁকে রেখেছে। রেখাগুলো সুতানলী সাপের মত নড়াচড়া করে। এখানে সোয়ামির হিস্যা আছে নাকি? কোথায়? কোনখানে? এই চেনা মানচিত্রের এই স্থল এই জল এই চর এই মোহনা এসব আমার নয়? হিস্যার হিসাব নিয়ে আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়।
রেস্টুরেন্টে বসে নাশতা করতে গিয়ে শুনলাম কক্সবাজারের রুটে আমাদের পরের বাসটাই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছে। দুমড়ে মুচড়ে গেছে বাস। রাস্তায় শোয়ানো আছে সারি সারি লাশ। আপনজনেরা লাশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। মনটা দমে গেল। তবুও কেন যেন ভাবতে ভালো লাগলো ওই লাশের সারিতে আমিও শুয়ে আছি। আমাকেও শনাক্ত করেছে আমার স্বামী পুত্তুর কেউ। ওদের মুখ মলিন। চোখ উপচে পড়ছে অশ্রুর ফোঁটা। ওরা নিশ্চয়ই আমার জন্য চিন্তিত। আমি বলিনি কোন বাসে যাচ্ছি। এদিকে আবার সিম বদলে ফেলেছি। ওরা কোনোভাবেই আমার ট্রেস পাবে না। এখন খবর দেয়া দরকার। কিন্তু একটা বৈরাগ্য আঁকড়ে ধরে। থাকিই না ‘আউট অব সাইট’ হয়ে! কতকাল ধরে সাইটের ভেতরে টাইট হয়ে বসে আছি!
তারপরে কী একটা ঘটলো আমার মধ্যে! মনে হল আমি আসলে পরের বাসেরই যাত্রী। হয়তো নয়, লাশের সারিতে সত্যিই আছি আমি! রাতে বিছানায় শুয়ে মনে হতে থাকে আমি আসলে বেঁচে নেই। আমার তালগোল পাকানো দেহটা রাস্তার একধারে পড়ে আছে। ধুলোবালি মাখা। দেহের সব হিস্যা একাকার। হিসাব মিটিয়ে ফেলা বিগত বছরের পুরোনো খাতার মত ছেঁড়াখোঁড়া পড়ে আছি আমি। আমার ‘রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি’। মাছির সাথে আমার মৃত চোখের তারাও উড়ে যায়। আকাশ মাটি ফসলের খেত তৃণলতা ইটের ভাটা নদীর ঢেউ চলন্ত মহাসড়ক কত কিছু মিলে পৃথিবীতে চলছে জীবনের মিছিল! এই মিছিলে আমি নেই! আমি বিচ্যুত হয়ে গেছি। বাসের সাথে ছিটকে দূরে পড়ে গেছি। আমি মৃত। শুধু চোখজোড়া উড়ে যায়!
রুমে ঢুকে বিছানায় শুয়ে শুয়ে টেলিভিশন দেখি। অকুস্থলে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া বাস। নারী পুরুষ শিশুর মৃতদেহ! স্বজনদের আহাজারি! আমিও ভিড়ের মধ্যে স্বজনদের খুঁজি। আমার স্বামীকে, ছেলেদেরকে। পরদিন খবরের কাগজে দুর্ঘটনার খবরই লিড নিউজ। হোটেল লাউঞ্জে কয়েকটা পত্রিকা। কেন যেন বুভুক্ষুর মত আমি সব পত্রিকা ঘাঁটি। মৃতদের নাম পরিচয় মনোযোগ দিয়ে পড়ি। নিজেকে খুঁজি আমি। পেয়েও যাই! তালগোল পাকানো একটা মানবপিণ্ডের নিচে আমারই নাম লেখা! পরিচয় কেবল গৃহবধূ! আমি তো গৃহবধূই ছিলাম! আমার উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট, কাব্যচর্চা, আমার গান, আমার সাহিত্য, ওসব কি কোনোদিন গৃহের বাইরে বেরিয়েছিল? কিংবা আমার কোনো ফুরসৎ ছিলো ওসব নিয়ে বাইরে বের হওয়ার?
রাতে টেলিভিশনের খবরে আমার স্বামী আর ছেলেদের দেখে চমকে উঠি। কর্তৃপক্ষ ওদের কাছে আমার মৃতদেহ হস্তান্তর করছে! মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে আমার বখে যাওয়া ছেলে দুটো মা মা বলে হাউ মাউ করে কাঁদছে। ওদেরকে কী সুন্দর মনে হয়! সেই শৈশবে আমার আঙুল ধরে হাঁটা বাচ্চা দুটো যেন ওরা! হোটেলের বালিশে বুক চেপে আমিও কাঁদি। কাঁদিস না বাপ! মা কি কারো চিরদিন থাকে?
তিনদিন বাদে আমার ঘোর কাটে। মাথাটা ফকফকা হয়ে যেতেই আমি বাড়িতে স্বামীর মোবাইল ফোনে কল করি। কে একজন ধরলো। জানতে চাইলো আমি কে। বুঝলাম নতুন সিম বলে স্বামীর ফোনে এইটি আননোন নম্বর হিসেবে এসেছে। অন্য কেউ ধরেছে বলে আমার গলাও চিনতে পারছে না। স্বামীর নাম বলাতে বললো, উনি অসুস্থ। অসুস্থ? কী হয়েছে তাঁর? অভ্যাসবশত আমার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা জাগে। ফোনে অপর প্রান্ত থেকে লোকটি বলে, রোড অ্যাকসিডেন্টে তার ওয়াইফ মারা গেছে। আজ তার কুলখানি। সবাই ব্যস্ত। তিনি এখানে নেই। আপনি কে?
লাফ দিয়ে উঠলাম। বলে কী! শেষে আমার অবস্থা রবি ঠাকুরের কাদম্বিনীর মত হবে না তো? কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল......!
আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলাম, তখন দিনের আলো মরে এসেছে। বাইরের খোলা মাঠে শামিয়ানা টাঙিয়ে কুলখানির খাওয়াদাওয়া চলছে। অতিথিমেহমান পাণ্ডা সাঙাৎ বাবুর্চি খানসামা ডেগডেগচি শাহী বিরিয়ানির ভুরভুরে গন্ধ, এঁটো পাতে কাকচিল কুকুর বেড়ালের হুল্লোড় সব মিলিয়ে এক এলাহি কাণ্ড। স্বামীর ইমেজ রক্ষার্থে আমাকে এমনিতেই বোরখা পরতে হতো। কাজেই কেউ আমাকে চিনলো না।
স্বামীই সবার তদারক করছিলেন। তিনি আজ আজমির শরীফের পাঞ্জাবী পরেছেন। কাঁধে কাশ্মীরী শাল। কানের ভেতর আতরমাখা তুলো। তার দশ আঙুলে দশরকম পাথরের আংটি। কেউ কেউ তাকে সান্ত¡না জানাচ্ছেন। চারপাশে বহু লোক। সবাইকে আমি চিনিও না। স্বামী আমাকে দেখে একজনকে ডেকে বললেন, এই এখানে একজন গেস্ট আছে। প্লেট নিয়ে আসো। তারপর আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এই টেবিলে বসে যান। ভালো করে খান। তাঁর পকেট থেকে রুমাল বের হল। ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে গদগদ কণ্ঠে বললেন, ও চলে যাওয়াতে যেন আমার একটা হাত ভেঙে গেছে। কোনো কিছুতেই আর হাত উঠছে না!
আমার স্বামী তার আংটিশোভিত হাতখানা চোখের সামনে এসে কী দেখতে লাগলো। একবার ভাবলাম, খপ করে আমার হেন্তাল লাঠির মত শক্ত হাতে ঐ হাতটা চেপে ধরি। তারপর মুচড়ে দিই।
কিন্তু তখন আমারও নখদর্পণে মুখ দেখার দরকার হয়। অনামিকায় একটা আংটিও বাঁকা হাসি হাসে। চোখ ঘুরিয়ে বলে, আমার হিস্যাটুকুর যত্ন নিও! বটে!
আমি সোয়ামির ঘরে ঢুকে টেবিলে আংটিখানা খুলে রেখে রাস্তায় নেমে আসি। মাঠের প্রান্তে তখনও এক টুকরো রোদ! ওই রোদের হিস্যা পুরোটাই তখন আমার।