পতন

বিকাশ গণ চৌধুরী



বিরহিলিও পিনিয়েরার জন্ম ১৯১২ সালের ৪ঠা আগস্ট, মৃত্যু ১৮ই অক্টোবর। কুবা বা আমাদের চালু কথায় ‘কিউবা’-র এই লেখক একাধারে নাটককার, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, কবি ও প্রাবন্ধিক। তাঁর দেশে পিনিয়েরা নাটকের জন্য বিখ্যাত হলেও তাঁর অনুরাগীরা তাঁর ছোটগল্প কবিতাগুলোকেই নাটকের ওপরে স্থান দেন। পিনিয়েরা তাঁর ১৯৫০ সালে আর্খেন্তিনা (বা আর্জেন্টিনা)-য় চলে যান, সেখানে তাঁর পরিচয় হয় বোর্খেস (বা বোর্হেস)-এর সঙ্গে, তারপপর বোর্খেসের ‘সুর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর লেখা। ১৯৫৭ সালে বিপ্লবের পর দেশে ফেরেন, কিন্তু ১৯৬১ সালেই সমকামী হবার কারণে ‘রাজনৈতিক এবং অনৈতিক’ ছাপ্পা লাগিয়ে রাষ্ট্র তাঁকে জেলে পোরে। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর একজন প্রান্তিক মানুষ হিসেবেই বাকি জীবনটা কাটান। যদিও ১৯৬৯ সালে তাঁর ‘দু’টি প্রাচীন আতঙ্ক’ নাটকের জন্য কুবার সব থেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরষ্কার ‘কাসা দু লাস আমেরিকাস’ পান। পিনিয়েরার লেখায় এক কল্প জগতের পাশাপাশি আমরা পাই এক সন্ত্রাসের, এক আতঙ্কের, এক মানসিক বৈকল্যের জগৎ; আর এসবের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা নানান রাজনৈতিক ভাষ্যের। তাঁর গল্পসংগ্রহ ‘ঠান্ডা কাহিনি’-র অন্তর্ভূক্ত এরকমই একটি গল্প আপনাদের সামনে রাখা গেল।


আমরা তিন হাজার ফুট উঁচু পাহাড় চড়লাম। চূড়ায় কোনো ছোট মঞ্জুষা রাখতে নয়, কিংবা সাহসী অ্যালপাইন পর্বতারোহীর মতো পতাকা ওড়াতেও নয়। কয়েক মিনিট পর আমরা নামতে শুরু করলাম। বাধ্যত, আমার সঙ্গী আমাকে অনুসরণ করতে লাগলো কারণ এই পরিস্থিতিতে যা হয়, একই দড়ি আমাদের কোমরে ঘুরিয়ে বাঁধা। আমি গুনেছিলাম ঠিক আটানব্বই পা চলার পরই আমাদের একজন সঙ্গীর কাঁটাওয়ালা জুতো একটা পাথরে পিছলে যাওয়ায় ভারসাম্য হারিয়ে ও ডিগবাজি খেতে খেতে আমার সামনে দিয়ে গড়িয়ে গেল। যেহেতু দড়িটা আমার পায়ের ফাঁক দিয়ে ঘোরানো ছিল আমি জোর ঝাঁকুনি খেলাম আর সেটা থেকে বাঁচতে পাহাড়ের ধারটা পা দিয়ে চেপে ধরলাম, আমার পিছনের দিকে ঘুরে যাওয়াটাই উচিৎ ছিল। তার বদলে আমি ঠিক যে জায়গাটায় দাঁড়িয়েছিলাম সেখান দিয়েই ও পড়ল। ওর এই সিদ্ধান্ত না ছিল হাস্যকর না অসম্ভব; উল্টে ও পাহাড় চড়ার নিয়মকানুনের বইতে তখনও পর্যন্ত লেখা হয়নি এরকম সব পরিস্থিতিকে বুঝতে বুঝতে সায় দিতে দিতে গড়াতে লাগলো। ওর এই গড়ানোটাকে একটু সামাল দিতে দিতেই দেখলাম আমার পায়ের ফাঁক দিয়ে ও ধূমকেতুর মতো গলে গেল, আর তখন, যেমনটা বলছিলাম, সেই বাঁধা দড়ির ঝাঁকুনিতে ওর পেছন পেছন আমার যে রাস্তা ধরে নামার কথা ছিল সেপথেই নামতে শুরু করলাম। নিঃসন্দেহে আমার ওপর কাজ করা বিজ্ঞানের নিয়ম একইভাবে ওর ওপরও কাজ করছিল, আর দড়িটা যদ্দুর ওকে যেতে দিতে পারে অতটুকু যেতেই একটা ঝাঁকুনি ওকে স্বাভাবিক কারণেই পিছনের দিকে ঠেলে আমাদের একেবারে মুখোমুখি এনে ফেলল। আমরা একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলাম না, কিন্তু দু’জনেই বুঝতে পারলাম যে মাথা নীচু করে আমরা এবার পড়বই। আর তাই হ’ল, অনির্দিষ্ট সময়ের পর আমরা পড়তে শুরু করলাম। আমার একমাত্র চিন্তা ছিল যাতে আমার চোখদুটো নষ্ট না হয়, তাই আমি ওদুটোকে যেভাবে পারি পড়ার ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। আর আমার সঙ্গীর চিন্তা ছিল ওর সুন্দর দাঁড়ি –– গথিক কাচের মতো ধূসর রঙে রাঙানো বাহবাদার
পরিপাটি এক দাঁড়ি –– যাতে একটুকুও ধূলো নেই। তাই আপ্রাণ চেষ্টায় আমি আমার হাতদুটো দিয়ে ওর মুখের দাঁড়ির অংশটা ঢেকে রাখলাম ; আর ও প্রতিদানে ওর হাত দিয়ে আমার চোখদুটো ঢেকে রাখল। প্রত্যেক মুহূর্তে আমাদের গতি বেড়ে যাচ্ছিল, এসব ক্ষেত্রে যেমন হয় আমাদের শরীরদুটো আকাশ দিয়ে পড়ছিল। হঠাৎ আমি ওর আঙুলগুলোর মাঝখানের সামান্য ফাঁক দিয়ে দেখলাম যে ওর মাথার ওপর ধারালো একটা পাথর। আর হঠাৎই আমি মাথা ঘুরিয়ে এটা দেখে নিশ্চিত হলাম যে আমার পাদুটো একটা পাথরে লেগে আমার শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছে, চুনাপাথর গোত্রের পাথরটা সামুদ্রিক জাহাজ তৈরির কারখানার করাতগুলোর মতোন ওর ধারগুলোদিয়ে যা সামনে পাবে তাকেই নিপুণভাবে টুকরো করে ফেলবে। এটা স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে, যতটা পারি ততটুকু চেষ্টায় আমি আমার বন্ধুর সুন্দর দাঁড়ি আর ও আমার চোখ বাঁচিয়ে যাবার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। এতা সত্যি যে -- যেমনটা আমি হিসেব কষেছিলাম, প্রত্যেক পঞ্চাশ ফুট কি তার কাছাকাছি –– আমাদের শরীরের এক একটা অংশ আমাদের শরীর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। যেমন, পাঁচটা মধ্যবর্তী সময়কালে আমার বন্ধু হারিয়েছিল তাঁর বাঁ কান, তাঁর ডান কনুই, একটা পা (মনে করতে পারছি না কোন পা), তাঁর দুটো অন্ডকোষ আর নাক; আর আমি আমার বুকের উপরিভাগ, আমার শিড়দঁড়া, আমার বাঁ ভুঁরু, বাঁ কান আর আমার ঘাড়ের রগ। কিন্তু পরে যা ঘটবে এ তার কাছে কিছুই না। মাটি থেকে এক হাজার ফুট ওপরে, আমাদের যা ছিল সেটা এরকম : আমার সঙ্গীর দুটো হাত (শুধু কব্জির হাড়গুলো) আর ওর সুন্দর দাঁড়িটা; আমার, দুটো হাত (আমারও শুধু কব্জির দুটো হাড়) আর চোখদুটো। একটা হালকা ভয় আমাদের গ্রাস করছিল। আর একটা পাথরে ধাক্কা খেয়ে আমাদের হাতগুলো ছিঁড়ে পড়ে গেলে কী হবে ? আমরা পড়ছি তো পড়ছিই। মাটির থেকে আনুমানিক দশ ফুট ওপরে একটা মজুরের খেয়ালখুশি মতো ছেড়ে যাওয়া একটা আঁকশিতে আমার সঙ্গীর হাতদুটো আটকে গেল। আমাকে শাশ্বত অবিস্মরণীয় এক লজ্জায় স্বীকার করতেই হবে যে আমার অনাথ চোখদুটোকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত দেখে আমি সেটাকে রক্ষা করার জন্য আমার সঙ্গীর ঐ ধূসর সুন্দর দাঁড়ি থেকে হাত সরিয়ে নিলাম। কিন্তু চোখ- দুটো ঢাকতে পারলাম না, কারণ সঙ্গে সঙ্গেই ওই আঁকশির অন্য
দিকে বেরিয়ে থাকা আরেকটা ডান্ডায় আমার হাতদুটো আটকে গেল; একসঙ্গে পড়তে পড়তে এখানে পৌঁছে এই প্রথম আমরা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে গেলাম। কিন্তু আমার কোনো অভিযোগ নেই; আমার চোখদুটো সবুজ ঘাসের জমির ওপর নিরাপদে অক্ষত অবস্থায় নেমেছে আর একটু দূরে নিজস্ব মহিমায় জ্বলজ্বল করা আমার সঙ্গীর দারুণ গোঁফটাকে দেখতেও পাচ্ছে।