কাঠের সেলাই

শুভংকর গুহ



সংগ্রহশালার এক একটি সিঁড়ি টপকে টপকে নেমে আসছিলাম। আমার পিছনে মিউজিয়ামের স্থাপত্যের নিসর্গ, নীল আকাশে ভাসছে। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটি খোলা মাঠ। তারপরে পিছনে তাকিয়ে স্মৃতি ফেরালাম, চেতনা আটকে গেল সংগ্রহশালার সংগৃহীত ইতিহাসে। যেন আদিম সমুদ্র সময় নিথর হয়ে আছে।
স্বাধীনতা আন্দোলনের নানান ঘটনার সমন্বয়ে বুঝতে পারলাম দুইটি রাষ্ট্র যেন আজও সংঘর্ষ করে যাচ্ছে। একটি রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে, অন্যটি মানুষের স্বাধীন ধর্ম চেতনার বিরুদ্ধে।
বহুদূরের নদীর ওপার থেকে ভেসে আসছে জীবন্ত জাহাজগুলির গোঙ্গানি। নদীর ধারে বিকেলের মানুষ ধূমপান করছে। আর মহিলারা আইসক্রিম খাচ্ছে। একটি জাহাজ নদীর উত্তর দিকেই বহুবছর ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। জাহাজটির দিকে তাকালে মনে হতে পারে বিগত শতাব্দীর কোনো এক সন্ধ্যায় আফ্রিকার মহাদেশের কোনো এক বন্দর থেকে এসেছিল। আর ফিরে যায়নি। কারণ সেই দেশে গণযুদ্ধ চলছিল। খালাসি ও নাবিক সবাই জাহাজ থেকে নেমে গিয়ে এই শহরেই কাজ কারবার ফেঁদে বসেছিল। জাহাজটিকে দেখলে মনে হয়, একটি ক্লান্ত অবসন্ন সময় যেন এলিয়ে পড়ে আছে।
বড় বেশি শব্দহীন আজকে। কোথাও যেন কেউ নেই, আশেপাশে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। মাঠের অনেকদুরে একটি মানুষ বসে আছে রংচটা একটি কাঠের চেয়ারে। মাথায় বাদামি রঙয়ের পানামা টুপি। কিছুক্ষণ পরে, মানুষটি আস্তে আস্তে একটি উলের বলের মতো গড়িয়ে গেল। পরিযায়ী ঋতুর টান এসেছে। তাই ঘাসগুলি কেমন মনমরা। সারাদিনের রোদের প্রখর নেমে এসেছে। অনেক নম্র নিয়ে হাজির যেন দিনের শেষবেলা।


অনেকদিন পরে, আমি খুব মন্থর পায়ে আস্তে আস্তে হেঁটে শহরের প্রাচীন বৃক্ষের নিচে দাঁড়ালাম। গাছটি আমার খুবই পরিচিত। নিঃশব্দে কিছু কথা বলল যেন সে। তারপরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি বললাম,- বিশ্বাস করো হে বৃক্ষপিতা আমার কিছুই করার ছিল না। বিশ্বাস করো। অনেক ভাবে চেষ্টা করেছিলাম। প্রায় দেড়শো বছরের তোমার অস্তিত্বের ইতিহাস আমি লিপিবদ্ধ করে নথি হিসেবে জমা দিই। আমাদের পৌরসভার আঞ্চলিক ইতিহাস জানেন এমন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ আমার নথিটি পরীক্ষা করেন। আমার নথির বিরুদ্ধে ওনারা জোরালো যুক্তির জাল তৈরি করে। পরিষ্কার করে বলে, আমি না কি তোমার জন্মলগ্ন থেকে বর্তমান অস্তিত্ব পর্যন্ত সবটাই বিকৃত করেছি। আমি তোমার বৃদ্ধ বা প্রাচীন অস্তিত্বের সঙ্গে বেঁচে আছি। আমরা সবাই তাই। অথছ ওরা সেই কথা কেউ স্বীকার করছে না।
যখন আস্তে আস্তে বেড়ে উঠে তুমি পিতা হয়ে উঠছ, গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে তখন ঔপনিবেশিক শাসন চলছে। পরাধীন ভারতবর্ষে তোমাকে কেউ একজন মাননীয় চারা গাছ হিসেবে নিজের দরদ ও ভালোবাসা দিয়ে রোপণ করেছিল। সেই ইতিহাস আমরা খুবই অস্পষ্ট জানি। তবুও বলি কেউ না কেউ তোমায় রোপণ করেছিল। এমনকি তোমার যৌবন কালেও আমাদের কারও জন্ম হয় নি। শুধু ইতিহাস ঘেঁটে জেনেছি, তোমার জন্মলগ্নে এখানে কোনো জনপদ ছিল না, ছিল না কোনো গ্রাম। শুধু একদিকে ছিল ফসলের মাঠ, অনাবাদি জমি, আর বাকিটা জঙ্গল। শুনেছি তখন এখানে হিংস্র জানোয়ার বিচরণ করত। তুমি দেখেছ, একটি স্বাধীনতাকামী দেশের আন্দোলনের আগুন।
হে বৃক্ষপিতা তুমি সময়ের সাথে চলমান। তোমার ইতিহাস তুমি নিজেই বহন করে চলেছ। নগরের সবথেকে প্রাচীন গাছ হিসেবে পৌরসভা তোমাকে চিহ্নিত করেছিল, সেই পৌরসভাই আজ নির্মম সিদ্ধান্ত নিল। আমাকে শুধু নির্দেশ পালন করতে হল আমার প্রবল ইচ্ছের বিরুদ্ধে।
আমি জানি না তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ কি না। আমার মৌন উচ্চারণ। দেখতে পারছি তোমার মূল কাণ্ড যেটির মুল্য কয়েক লক্ষ টাকা সেই মূল কাণ্ডটিকে মনে হচ্ছে যেন ভিজে গেছে। মনে হচ্ছে এক পশলা বৃষ্টির জল তোমায় ভিজিয়ে দিয়েছে।
হে বৃদ্ধপিতা, আমার তোমাকে বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এই অঞ্চলের এক বিদেশি বণিক সাতাস লক্ষ টাকার বিনিময়ে তোমাকে ক্রয় করে নিয়েছে। আর সেই টাকাই সেই বেদেশি বণিক একটি প্রকল্পের মাধ্যমে পৌরসভাকে অনুদান দিয়েছে। তোমার মাটি ও শিকড় তোমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, তুমি অবশেষে উপভোগ্য কাঠ তক্তা হয়ে যাবে।
বিলাসবহুল অডিটোরিয়াম নির্মাণের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সেই জন্য নিলাম ডাকা হল। অবশেষে তুমি বিক্রি হয়ে গেলে অমানবিক সিদ্ধান্তের বিনিময়ে।
তোমাকে বিক্রির মধ্য দিয়ে আবার দুইটি দেশের পুনরায় সংঘর্ষের সূচনা হল।
তুমি কিছু বলবে? না বলার মতো সব কথাই তুমি ভুলে গেছ। হয়তো তুমি মনে মনে বলছ, আমি তোমার ভাষা বুঝতে পারছি না। মানুষের বৃদ্ধদশা আর বৃক্ষের বৃদ্ধদশা এক নয়। মানুষ তার সমাজে বৃদ্ধদশায় অনেক বেশি সহানুভূতি পায়। বৃক্ষের বৃদ্ধদশা মানুষের সমাজে উপেক্ষিত হয়। আজ যেমন তোমার অবস্থা হল।
চারদিকের আলো, ক্রমাগত উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। বিকেলের দিকে সাধারণত এমন দেখা যায় না। ডুবে যাওয়া সূর্যের সামনে মেঘ এসেছিল। মেঘ সরে গেছে। মাঠের চারধার আলোর মধ্যে বিষণ্ণতার মাদুর পেতেছে যেন ।


ভাবছিলাম, আর কিছুদিনের মধ্যেই প্রাচীন বৃক্ষটির প্রায় দেড়শো বছরের উপস্থিতি নগরের জনপদ থেকে বিলীন হয়ে যাবে। পৌরসভার কমিউনিটি হলে বৃক্ষটির শরীরের নানান অংশ বার্নিশের পালিশে চকচক করবে।
আমি প্রতিদিন পৌরসভার কাজে ছুটি হওয়ার পরে, বেঞ্চিতে তার পাশে গিয়ে বসি। মাঝে মাঝে তার সিগারেটের সুন্দর তামাকের গন্ধ আমাকে মাতিয়ে তুললেও আমি সেই গন্ধের কাছে আত্মসমর্পণ করিনি।
প্রায়ই কাঠের বেঞ্চির ওপরে সেই মানুষটি আমার জন্য সিগারেটের প্যাকেট রেখে দেয়। হ্যাঁ,... এই সেই মানুষটি, একদিন মরা ঘাসের ওপরে উলের মতো গড়িয়ে গেছিল।
সিগারেটের প্যাকেটের ওপরে একটি সুন্দর লাইটার। এমন ভাবে রেখে গেছে যেন সেই ভদ্রলোক আমাকে বলতে চায়,– নিন না। প্রতিদিন তো আপনার জন্যই রাখা থাকে। নিতে পারেন । জন প্লেয়ার । আমার খুব পছন্দের সিগারেট।
আমি প্রতিদিনই সিগারেটের প্যাকেট থেকে দূরে সরে গিয়ে মনে মনে বলি,- আপনার সিগারেটের প্রতি আমার বেশ কিছুটা ঘৃণা আছে।
চিৎকার করে বলি, আমি এশিয়ান আমি আফ্রিকান......