উত্তম ভায়াগ্রা

কাজল শাহনেওয়াজ



শাদাবকের নকশালপন্থা
আমার অনুমান শক্তি সাধারণ। আমার আমিত্ব অতি-অসাধারণ। আমার জীবনের শাদাবকেরা অর্ন্তবাস হারিয়ে আমারই মতো নগরলাজুক; ওদের কামার্ত গ্রীবাসন্ধি নিস্তেজ। আরষ্ট কণ্ঠহাড়ে উড়াল দিগন্ত কোথায়? বায়ূবয় কিন্তু উতরোল করে না। কেন যে এমন হল, সেইসব দিনের পালক আপনাআপনি ভেগে আসে না ওদের পাঁচিল টপকে আমাদের সীমানায়; ঘনকৃষ্ণ গাছের কাণ্ড ধরেধরে, ডালপালা বেয়ে পুষ্ট রুটির চেয়েও বলবান পত্রপুটে; কোনো সালাদফ্রেস নক্ষত্রপন্থি বেতফল লেবুরঙা মূর্তআলোকবিমের সন্নিধির ডাকে। আমরা তখনো দানা বেঁধে উঠিনি, আমাদের বুটু তখন একটা ভিজা ছোলার চাইতে সামান্য বড়। খোলা অবস্থায় কিছু ফোলাফালা মনে হয়, সামান্য মনোযোগের আনন্দে সাপের ফণার মতো ভয়ংকর ফুটে ওঠে, চাঁপা ও তাতে ম্রিয়তর।

আমরা অনুমান করতাম, আমাদের অনুমানই আমাদের শক্তি। বাস্তব হলেও, বাতিল হলেও; ভালোবাসার বা বমির বা নটেশ্বর মন খারাপের বা নকশালপন্থি তীব্রবিবাহের মৃত্যুর বা উড়োজাহাজের নথিবদ্ধ রেশমী স্বর্গে যাবার কল্পনা শুকিয়ে আনে ভালোবাসার নকুলদানা।

বালিকার স্তন বিবর্তনের মতোই আমাদের পাগলামি রঙে লেবুতে, মাউন্টে, অতি স্পর্শকাতরতাময় নন্দনলক্ষীর নন্দনহারে মুখবুজে পড়ে আছে; মুখরোচক মুখ-স্ত করার বিষয় হয়ে উঠে ঝুলছিল।

বেশ কয়েকটা ভাগে ভাগ করা হয় এ দেহযন্ত্র। ফুটে ওঠে বাহারি পুষ্পরাজি প্রতিটা অংশে নিয়মিত নদীমাতৃক দানাপানি জুটলে। ঠিক বলা যাবে শরীর তার নদীরাজ্যগুলির ভিতরে কী টোনে কথা বলে? কিভাবে ধারণ করে প্রাক্তন সময়ের চিহ্নগুলি, যা কিনা জীবিত হয়েছ বারবার! অনেক সুপ্ত অবরুদ্ধতা রয়েছে, যখন তখন বেড়িয়ে পড়ে, গেছো বাবার মতো পুঁপুঁর কাছে বলে : যাচ্ছি রাচি! কিন্তু চলে যায় করাচি। বলে, স্বাধীনতা কিন্তু পেয়ে যাই দেশ-হত্যা। সেই ইংরেজ কাল থেকে শেখা ১৭৫৭ > ১৮৫৭ > ১৯০৫ >...১৯৪৭ > ১৯৭১ > ২০০? >. >. >......

দেহ একটা শহর। সেই শহরে ছড়িয়ে ছিড়িয়ে রয়েছে বোম্বেটেরা। রয়েছে চিত্র বিচিত্র পাগল। চলো চলো পাগলের জমিদারিতে। যদি তুমি যাও অবশ্যই তোমার প্রয়োজন হবে না নিখিলক্ষুধার নিত্যজিহ্বা, তবে তার আগে নিশ্চিত করতে হবে কবে তুমি স্থিরতার বইটা মুড়ে রেখেছো। সন্ত্রস্ত ভেজ আমি একটা বিশাল আমি-যৌথে। যৌথ সমবেত একা।

এককুঠুরির ডাক
ক্রমাগত টাইট আবহাওয়ায় দিনে দিনে ক্লান্ত নগরও। শরীর কোনো কিছুতেই লাফিয়ে ওঠে না তার। ঠাণ্ডা কুলপি, ফাজিযুক্তির দুরনিয়ন্ত্রিত ফ্রেয়ন-শীতল ঘরও দমরোধি। এই মাটিতে তা হলে আমাদিগের জন্ম হয় নাই? না হলে গায়ে ফোস্কা আসে কাহা হোতে।

কবন্ধ দৈবযান
বেনিয়া ব্রিটিশ রাজত্বের যে সব লক্ষ্মীপূজারী বুড়িগঙ্গার নির্মলতাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছিল, তাদের বেশ খানিকটা গর্ব ’৪৭র পরে পিত্ত ও কফের সবজেটে হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। প্রজাসম্মত প্রতিবেশীরা তো দূরের কথা, ছিন্নগ্রস্থ আত্মীয়েরাও ঠাহর করতে পারেনি কী হতে চলেছে... রনোর বাবা কিছুটা টের পেয়েছিল, রনো কিছুই না। সবাই যখন একে একে নিবে গেল ঐ বাংলায় উদিত হবে বলে, আর ঘন ঘন মর্মান্তিক ও রোমাঞ্চকর কাহিনী যখন ছড়াতেছে সংখ্যালঘুর মনে ও বনে, রনো মোটা চুলের বিরুদ্ধে সৌখিন চিরুনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তখনই জোগাড় করেছিল কবিতার শক্ত আঁচড়ানি; একটি জীবন্যাস।

চতুর্দিকে সদরঘাটের সদম্ভ চালাকি। ইতুরি বিতুরি তারের জালের ভয়ংকরতায় জলপথে যাতায়াতকারীদের শেষ মুহুর্তের দায়িত্ব পালনের খেসারতের জন্য সাজানো দ্রব্যসামগ্রীর মনোহারি ফাঁদ বিপণি! ফুটপথ অদৃশ্য হয়ে যায় বাহ্যত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের খণ্ড খণ্ড অনুপ্রবেশে। কিন্তু একটু একটু করে যোগ করলে টিলাগুলি যেভাবে পাহাড়শ্রেণীর চরিত্র লাভ করে, দখলকরা পথের মালিকানাও সে ভাবে পাহাড়পতিদের।

বাংলাবাজার বইপাড়া। একদা এই প্রাদেশিক শহরের গুটিকয়েক পাজামা-ফ্লাইংসার্ট-মো া চশমা পরিহিত কিশোরদের মধ্যে কোলকাতা থেকে রেলডাকে আসা মূলত: পূর্ববাংলা থেকে হিজরত করা কবিদের সম্পাদিত কৃশ পত্রিকাগুলি দারুণ সাড়া তুলে দিয়েছিল। এয়ারপোর্ট দিয়ে আসা মার্কিন ও অন্যান্য নীল/সাদা/সবুজ অক্ষররাশি যতটা গরম করত ততটা উত্তেজিত করত না যা হত লাল মলাটে।

রনো ঐ ধারার ২য় প্রজন্মের; এদের বয়স এখন ৬০+। সমকালীনদের অল্প কয়েকজন খ্যাতি ও ক্ষমতার চূড়া স্পর্শ করেছে, বাদবাকিদের ইতিহাস কোথায় লুকিয়ে ফেলেছে কে জানে; রনো সেই মহাবাক্সের কোথাও তার মনের টিকিটা পোস্ট করে দিয়েছে।

হঠাৎ করেই ডাক আসে। রনো, যে সাধারণত রেললাইন পার হয় না কখনো (এটা ষাট দশকের প্রবচন, ঢাকার প্রান্তসীমা তখন ছিল নারায়নগঞ্জ থেকে আসা তেজগাঁগামী রেল লাইন, অতিআঁতেলরা কুড়েমির জন্য তা অতিক্রম করে পুবের গ্রামাঞ্চলের দিকে যেতে চাইত না), সে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল :
: হ্যালো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আজত সোমবার, বিকেলে আমার ছুটি, আসুন না।
: !?#;...
: আরে তাতে কী, আসুন তো। আপনার জন্য গোয়ালের হাত-মাখন আর নুন জোগাড় হয়েছে, আসার সময় একটু মশলা আনতে পারবেন না আমার জন্য? না, না, গরমটা না। বাবাগো, কী ভয়ংকর। ঠাণ্ডা, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠাণ্ডাই তো।

পারলে দোতালাটা নেমে আসে। তিনটা সিঁড়ি বেয়ে নিচতলার বারান্দায় উঠতেই শিকলে বাঁধা পারিবারিক কুকুরটা খেঁকিয়ে ওঠে, আঁতুরঘরের চৌকো দালান মিআইয়ে যেতে চায় কুকুরের বাচ্চার পোলাপানি ন্যাকামিতে। এই বাড়ির সাথে আঁতুরঘরটা একসময় মানাত এখন আর মানায় না। ১৯৭১ এর পরে আর কারো পূণর্জন্ম হয় নাই এখানে। তারপরের শিশুরা আঁতুর ঘরে হেট মস্তকে নামে নাই, হাসপাতালের পাতালের বেডে বেহেশত থেকে নেমে এসেছে। শ্যামলা মেয়েটি জ্যাঠার আভিজাত্যে সন্তুষ্ট না হলেও গলার মিষ্টি স্বরে শিরিষ কাগজের ঘষা চিহ্ন। গেটে বাগানভেলিয়ার পরে এই বালিকাটির চোখেই এ বাড়ির জীবনের উত্তাপ পাওয়া গেল।

টানেল দিয়ে উপরগড়ানো দিয়ে উপরে উঠতে হয়। দোতলার সর্বত্রই ডাম্পের মালিন্য, চুনা লাগানোর ঘটনা কবে ঘটেছিল তা স্বয়ং চুনেরও মনে নাই। তবু নিচে উপরে বসবাস করছে উত্তর পুরুষেরা, যেখানে পূর্বপুরুষদের সম্মতির কোনো চিহ্ন নাই। রনো এমন এক ব্যক্তি, তাকে নিয়ে যে ব›ধু একদা গল্প রচনা করেছিল তাঁর মৃত্যুর খবর পাবার পরেই কেবল তার উপর থেকে অনধিকার চর্চার অভিযোগ প্রত্যাহার করেছিল সে। তর্জনী তুলে তার জন্য এখনো প্রতিবাদ করেন, যদিও বন্ধুর আসমুদ্রতেতুলিয়া খ্যাতি তাকে তৃপ্ত করেছে যারপরনাই।

মুশকিল হয়েছে আমাদের জীবনে যেসব নুতন নুতন ছন্দাতিছন্দের অনুপ্রবেশ ঘটছে প্রতিনিয়ত, তার কোনো ছন্দপরিচয় স্পষ্ট না। এর মধ্যে অনেক কিছুই থাকবে না। পণ্ডিতেরা এখনো বৈদিক ঋষিতে আসক্ত। সহজে এখনো টিকি নড়ে না যদিও ট্যাক ভরে ওঠে দ্র”তই। শতাব্দী শেষে দেখা যাচ্ছে শতবার্ষিকীর ঘনঘটা, ধুমধাম। তাহলে একশ বছর টিকে গেল এতকিছু? শতবার্ষিকীর এই ফেভার কি আমরা পাব? রনোকে একথা জিজ্ঞেস করব। যেখানে ক্ষণজীবি শক্তিকণা পরমাণু ভেঙে হারিয়ে যাবার আগে তাৎক্ষণিক স্বাক্ষরেই প্রকাশ করে বড় শিংগা ফোঁকার সময় কী হয়েছিল তার গল্প, সেখানে কথার তুবরি ও কলমের প্যাঁচের আতশবাজী ফুটিয়ে আমরা আরো এক শতাব্দীর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি। যেন এভাবেই শতবার্ষিকী পেরিয়ে ফাঁকির ফসলের গর্ভপাত বন্ধ হতে থাকবে।

আমরা কি একটা দরকারি নতুন শতাব্দী দিতে পারলাম ? ভোরের দিকে বাহাদুর শাহ পার্কে গোয়ালের মাঠার উপর অদ্ভুত রংয়ের মাখন ভাসতে দেখে মনটা বিষিয়ে উঠল - পঞ্চাশ দশকের বিখ্যাত বিউটি বোর্ডিংয়ের মাখন টোস্ট এই সেদিনও হাউস করে খাওয়া হতো - মুস্তফার গোল মুখচ্ছবি সহনীয় হয়ে উঠত না এখানকার লনে না বসলে; কিন্তু আমরা তো হাউসের মাঠার কালারটুকু পর্যন্ত ধরে রাখতে পারলাম না। সামনের শতাব্দীতে কোনো ভাবেই থাকবে না বিউটি বোর্ডিং, থাকবে না নারায়ণগঞ্জের বোস কেবিন, ময়মনসিংহের তাজমহল, বগুড়ার পড়ূয়া, চাটগাঁর সবুজ হোটেল, কিশোরগঞ্জের গ্রীন, টাঙ্গাইলের আনন্দময়ী।

আমরা নশ্বর পৃথিবীর যত ফন্দিফিকির জেনে ফেলেছি আর বেশি বেশি করে হয়ে উঠেছি ইহলৌকিক মাংশলোভী,দেহই আমাদের আত্মা,নগদেই সব উদ্যম। যা কিছু সূক্ষ্মতা সব স্মৃতির,আর স্মৃতি তাজা রাখার ব্রাম্মীশাক - এ নগরীতে তা কোথায় ? কোন বাজারে বিকায়? দুনিয়ার বহুজাতিকদের মধ্যে শুকিয়ে যাওয়া এই মনোশুটকিগুলির জন্য কোনো সহৃদয় ফাইজার ইনক. কি নেই যারা বানাবে অতি কার্যক্ষম সিওর সাকসেস রেস্টুরেন্ট ভায়াগ্রা? তাহলে ওদের চিন্তাচেয়ার-কল্পনাটে িল-পরিকল্পনা-পিরিচতস্ তরীরূপী প্রায় মরে যাওয়া শিশ্নের ইরেকটাল টিস্যু চেগে উঠত আগামী যুগের রক্তস্রোতে। তুমুল আড্ডার সেক্সি সিগন্যালে নতুন কবিতার সাইক্লিক জিএমপি ভেঙ্গেচুরে দিত সব শুকিয়ে যাওয়া উপমা, উন্মুক্ত করে দিতো ফৃ ছন্দের শিরা। আধুনিক পর্বের কবিরা কি এখন রক্ষণশীল? রেস্তোরা ভায়াগ্রা এসে জাগিয়ে তুলুক ঐ কবিদের অবদমিত অচরিতার্থ কাব্য-কাম-ইচ্ছা -এমন করে,যাতে ক্লান্ত হতে হতে মারা যায় ঐ অর্ধবিকলপ্রায় হৃদপিণ্ড,নতুন ছন্দের সাথে আলিঙ্গন করে।

টানেল দিয়ে গড়াতে গড়াতে দোতলায় উঠতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল চিরঅবিবাহিত এই চিরযুবকের বুকে কোনো উৎসাহের দোলা লেগেছে কি নবযুগের ভায়াগ্রাসংবাদে? তো কী ভাবছে সে, মামলারত পৈত্রিক বাড়িটিকে শত্রু সম্পত্তি হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষাকরার মতো তাকদ আমেরিকান ঐ ভায়াগ্রা তাকে দিতে পারবে? কিন্তু মিটফোর্ডের দোকানগুলির সান্ধ্য কেনাবেচায় তিরিশ পিলের এক ফাইলের দাম উঠেছে তিরিশ হাজার টাকা! দুটো টাকা বাঁচাতে যে পারতপক্ষে বন্ধুদের সাথে যায় না দেখা করতে, অফিসে যায় সদরঘাট-রামপুরার মুড়ির টিনে চড়ে - এই খবরে কী করবে সে?

আমার যদি টাকা থাকত কালো আর বেসুমার বেহিসেবি, তাহলে অবশ্যই রনো কে কিনে দিতাম এক ফাইল। গন্ধগোকুলের তেল নয়, ভালুকের চর্বি নয়, খাঁটি নীল নীল গোল চাক্কি। রনোর জন্যই তো বিশুদ্ধ ভায়াগ্রা চাই। ঐ ঋণখেলাপি, ঘুষাসক্ত আমলা, দুশ্চরিত্র শিক্ষক, ছদ্মবেশী ইমাম, বিকিয়ে যাওয়া বামপন্থি, দেশপ্রেমহীন সংসদসদস্যদের অপরিসীম অপচয়ের যৌবন ফিরে পাবার জন্য প্রযুক্তির সমস্ত উদ্ভাবন নিবেদিত হতেই থাকবে? যে লাম্পট্যের ফলে ওরা তা হারিয়ে ফেলেছে আবারো লালচের ডাকে ওরা ফিরে পাবে প্রকৃতির দুর্লভতম প্রশংসাগীতিকে? দেহছন্দের বিশুদ্ধ নিবেদনটুকু? পরকালের সমস্ত পুরষ্কার যদি ইহকালেই পেয়ে যায় তাহলে খোদার ভয় তো জগৎ হারিয়ে ফেলবে? শুধু অ-ঢে-ল কাঁচা টাকাই কি পার্থিব/অপার্থিব সমস্ত শক্তির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে? ওদের থাবার নিচে ছটফট করবে রনো, যে শিখেছে অপেক্ষা করতে :

যদি তুমি সমর্থ না হও প্রতিপালনের, তাহলে অপেক্ষা করো, যদি তাতেও না হয়, তাহলে কোরোই না, অবশ্যই তুমি পুরষ্কৃত হবে, স্বর্গে।

খবরের কাগজ সর্বদা শুধু কালো কালিতে সাদা পৃষ্ঠাই ছাপে না, কখনো কখনো আশার রঙিন হৃদস্পন্দও জাগায়। যমুনা নদীর ওপর বড় একটা ঘটনা ঘটবে এ শুধু সম্ভব ছিল নেশার হ্যালু’তেই। কিন্তু তা যে এত জ্যান্তবাস্তব এত জৈবদ্র”ত তাত ভাবা যায়নি। ভায়াগ্রা শুধু কেমিস্টের ল্যাবে না, প্রয়োজনপুরণের যেকোনো স্বত:স্ফুর্ত হয়ে যাওয়ার সাথেই তার জন্ম হয়।

আটাত্তর আয়নায় চল্লিশ
রনো শুধু সকালের কাগজটার দিকে তাকিয়ে থাকল। বিশ্বাস হতে চাইছে না। তবু তাকিয়ে থাকল। এই ঘরটাতে লাবণ্যময় কোন কিছুই নাই, একটা পারা ওঠা হাত আয়না ছাড়া। যা কিছু আছে সব ধূলিময়, ধূলা মাখানো। ’৭১এ বিহারীরা বাড়িটা দখল করে বসবাস করত, এই ঘরে তার আগের কিছুই নাই বলা-ই বাহুল্য, তবে ধূলাগুলি অনেক পরের - বিহারীদের নয়, ’৭২এ কিছুদিন ক্লাবট­াবের নামে যারা থেকে যেতে চেয়ে ছিল আয়নাটা তাদের ফেলে যাওয়া। প্রায় সব পেকে যাওয়া দাড়িগুলি পরিচর্যার সময় আয়নাটা কাজে লাগে।

রনো ৬৫ হলেও তাঁর অর্জিত বয়স ৭৮ (অবিবাহিত হলে প্রতি ৫ বছরের জন্য ১ বছর বাড়িয়ে দিয়ে : ৬৫+১৩ =৭৮ বছর)। কিন্তু বাস্তব ঘটনা অন্য রকম। তার বয়স এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে কোনো ফর্মুলা ছাড়াই ৪০ এ।

রনো কাগজের পাতায় চোখ রেখে ভাবছিল যমুনা নদীও কি কোন নদীভায়াগ্রা খেয়েছে? রাজশাহী যেতে আর তাহলে আরিচার মাইল মাইল সড়ক জ্যামে ক্রোধের কাছে পরাজিত হতে হবে না? হৃদয় যখোন লাফিয়ে উঠবে ‘রাজশাহী যাই’ বলে, আর মনে হবে রাজশাহী হলো সেই আলো যা সায়াহ্নকালে উদ্ভাসিত হয়, তাকে এখনই চাই, এখনি রওনা হলাম - তখন ফেরীগুলি আর পথ আগলাতে পারবে না বিরোধী দলের হঠাৎ হরতালের মতো  সব এখন দ্রুত, দ্রুত, দ্রুত। রনো ভাবে : তিন বার বলেছি দ্রুত। আর আমাকে কেউ থামাতে পারবে না। আমার পক্ষে রয়েছে দীর্ঘতম সেতু, শে এখন আমার খুব কাছে; কাছেই তো ! তার রক্ত ছলকায়।

চরম টানাটুনির ভেতরেও রনো রাজশাহী থাকাকালীন যে ঘরটায় থাকত, ওখান থেকে চলে আসার দীর্ঘদিন পরেও সেই ভাড়া ঘরটা রেখে দিয়েছে। পূজায়, ঈদে বা হঠাৎ কোনো লম্বা ছুটিতে ঢাকা থেকে সে হারিয়ে যায় - আমরা বুঝি রনোকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে। কিন্তু এই অকৃতদারের মনের মাঝে কেউ কি এখন তার মনোভায়াগ্রা হয়ে রয়েছে? কেউ জানি না, জানার চেষ্টাও করি না। জানি, রনো এখন আরো ঘনঘন ঢাকা থেকে হারিয়ে যাবে -

সেতুটা চোখের সামনে নীল রং ধারণ করে ধনুকের মতো বাঁকা হতে হতে গোল হয়ে আস্তে আস্তে আরো গোলাকার আরো বিশুদ্ধ নীলে রূপান্তরিত হচ্ছে ... চলাফেরার জন্য পয়ষট্টি (আসলে চল্লিশ) কোনো ব্যাপারই না; যে যাত্রায় ফেরী নাই, নদী পাড়াপাড়ের পাপ নাই, অপেক্ষার নরক দর্শন নাই - নদী এখন সা করে চলে যাবার ব্যাপার, জানালার ধারে বসে তাকিয়ে থাকার ঘটনা এখনত কত কিছুই ঘটে, ঘটে থাকে।

রনো রতি
তোমার দেহ মনে কর একটা বাদ্যযন্ত্র। শতভাবে একে টিউন করা যায়। শে তার দাঁত ও জিভ দিয়ে তোমাকে যা দিতে পারে - তার তুলনা এই দুনিয়ায় আর কিছু নেই।

কৈশোরে রনো-র সংস্কৃতে হাতেখড়ি হয়েছিল ধর্মপুস্তকের শ্লোক দিয়ে। তার তাৎক্ষণিক স্মৃতি ছিল বিস্ময়কর রকম। হরফচেনাপর্ব পার হতে না হতেই বানান করে করে দীর্ঘ বাক্য পড়ে ফেলত - এই ভাষার সুবিধা আছে। পড়তে পারলেই অধিকাংশ শব্দধ্বনিই পরিচিত মনে হয়। বাক্য গঠন থেকে শুরু করে সকল প্রকার ব্যাপারে বাংলা তো সংস্কৃতেরই কন্যা।

বানান করে করে মেঘদূত যেদিন পড়া শেষ করল, পরিকল্পনার কথা মনে হতেই জিভ ভিজে উঠেছিল। আর্য লাইব্রেরীর - ভিতরদিককার আলমারীতে ও পেয়েছিল কামসূত্র - পড়তে পারে নি, ভবিষ্যতে পড়বে এই ভরসায় লুকিয়ে রেখেছিল যাতে সহসা কারো চোখে না পড়ে।

দুপুর গড়ালেই টুপটুপ করে লালা গড়াত। বানান করে করে মেঘদূত পড়া যায় - কারণ ইতিমধ্যেই ওটার সব টিকাটিপ্পনি মুখস্তপ্রায় - কিন্তু কামসূত্র নিয়ে তো কারো সাথে আলোচনা করা যায় না - আর বিষয়গুলো এত অস্পষ্ট ও অযৌন - যে - ওর সন্দেহ হত এটাই কি সেটা। তারপর আস্তে আস্তে বুঝল এটা এরকমই। না বুঝতে পারুক!

কিন্তু সেই পড়া যৌবনে খুব কাজে লেগেছিল। বিশেষ করে ’৭১ এ। কলকাতায় চলে গিয়েছিল এপ্রিলেই - দুএক মাস পরে ঘোরাফেরা করে চাকরিও জোগাড় হয়ে গেল, অনুবাদকের - হাতে যে টাকা আসত খেয়ে পড়ে তাতে ভালোভাবেই তো চলেই যেত - কিছুদিন পরে টের পেল শহরটা সত্যিই সকল শ্রেণীর নাগরিকের। ব্যবস্থা করে রেখেছে বাড়তি টাকাগুলি খরচ করার - সকল মানুষের বয়স, ধর্ম, রুচি, অভ্যাস, দেহসামর্থ - সব খেয়াল করে যেন সাজানো রয়েছে সবকিছু।

যুদ্ধের ভয়ংকরতা, নিষ্ঠুরতা, উদ্বেগ - সবকিছু সয়ে আসছে, কষ্টও অভ্যাস হয়ে গেছে - এমনি একদিন আবিষ্কার করল - ঢাকা জীবনের সবচেয়ে রসিক বন্ধু বেঁচে আছে বহাল তবিয়তে এবং বাস করছে এ শহরেই। বাকরূদ্ধতা কাটিয়ে বিমূঢ়াবস্থায় প্রথমে প্রস্তাব করলো - চলো চলো, তোমারে লইয়া আইজ স্বর্গে যামু। দেখা হওয়ার পুরষ্কার, চলো।

আনু পরে স্বীকার করে, হ্যাঁ ঠিক, ঘরের বউও এমন সেবা জানে না। যদিও দুজনই তখনো ব্যাচেলর, রনো বলে : খদ্দের হলেও অতিথি তো - অতিথি নারায়ণ, নারায়ণকে খুশি করা চাই তো। তাহলেই তো নগদ নারায়ণ শব্দ করে উঠবে।

রনোর প্রাকটিস তখনি পূর্ণতা পায়। আনু যে ছিটেফোঁটা জ্ঞান পায় - আজো তার বিকল্প হয় না।

যেসব বর্ণনা রয়েছে দেহমিলনের - রনোর মনে হয়, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বটা হচ্ছে কল্পনা - দেহবাস্তবতা পেরিয়ে... হয়ে ওঠে - রহস্যময়, খ্যাতিমান ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বিষ্ণু যেভাবে পৃথিবীকে রক্ষা করছে - সিক্রেট প্রোফাউন্ড লাভলি।

আমাদের বন্ধুর নাগরিক চোখ লাল থেকে শাদা করতে ভিজাইন ব্যবহার করতে হয়। আইড্রপটা উড়ে আসে কোনো বিমানবালিকার পার্সে করে বিদেশ থেকে। বন্ধুদের জন্য ওরাই সবচেয়ে মায়াবতীর প্রতীক হতে পারে।

যা কিছু দেখা যায়, ছোঁয়া যায় - বাস্তবতা সেটা - প্রতারক হতে পারে না - তাই বাস্তবতা সন্দেহজনক চরম রসমোক্ষণ সম্ভব নয় - এটা চূড়ান্ত হতে পারে না - যে ছন্দ দেখা যাচ্ছে শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট করে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। তাই উপমাও অশুদ্ধ - কারণ নাগরিক এই কায়দাই তো বিষাক্ত।

নগর কোনো স্থান বা বস্তু নয়। এটা সর্বত্র, ভার্চুয়াল অস্তিত্ব - ভাটিয়ালির মধ্যেও, কংক্রিটেও। দালানগুলো শহরের গাছ। গ্রামের গাছগুলি এমনই বদলে গেছে যা দেখে বিদ্যুতবাহী পোলগুলি গাছের রং করা। সমস্ত বাস্তবতাই আক্রান্ত। সর্বত্র। গ্রামে কি আমাদের জীবনের সব প্রশান্তি স্থান করেছে। না, তা কোথাও নেই।

কামসূত্র থেকে রনোর নিম্নোদ্ধৃত জ্ঞান লাভ হয় :

যা কিছু সব হতে হবে ধীরে, কোনো দ্রুততা নয়।
বাঁশ চেরাইয়ের রূপকল্পের মধ্যে রয়েছে ভারতবর্ষীয়তা।

হাত হয়ে উঠুক পর্যটক
নখ ব্যস্ত আধা চাঁদের দাগে

পার্বতী যেমন দশহাজার বছর অপেক্ষার পর মিলিত হয়েছিল রনো সেভাবে দৌড়ে যায় হাজার বছরের ক্ষুধা নিয়ে। গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বিভাগ শহর রাজশাহীর অনতিদূরেই প্রেমতলী। গঙ্গার পাড়েই। বৈষ্ণব মহাগুরু প্রভু শ্রী গৌরাঙ্গ এখানেই দেহবাক্স থেকে নিজেকে মুক্ত করে মহাপ্রভুর সাথে মিলিত হয়েছিলেন। জায়গাটাতে একটা তমাল গাছ লাগানো হয়েছে। মন্দির চত্বরে যেতে খানিকটা পথ পায়ে হাঁটতে হয়। পথের দু’ধারে ফণিমনসার ঝোপ। এখান থেকেই বরেন্দ্র অঞ্চল শুরু।

পুনর্জাগরণবাদী হিন্দুদের ভয়ে শ্রী প্রভু আত্মগোপনে ছিলেন। নদীয়া থেকে সরে এসে প্রেমতলীতে অপরিচয়ে অবস্থান কালে মহামারীর কবলে আক্রান্ত হন এবং তাতেই সমাধিপ্রাপ্ত হন। বিপক্ষের নিষ্ঠুরতার কবল থেকে দেহ রক্ষা করার প্রয়োজনে সংবাদটি আর প্রচার করা হয় না। খুব গোপনে শুধু ঘনিষ্ঠ শিষ্যরা ব্যাপারটা জানে এবং নিঃশব্দে প্রেমতলী হয়ে ওঠে তাদের অন্যতম তীর্থ - পরম প্রেমময়ের সাথে একাত্মায় লীন হবার মিথ নিয়ে।

অদ্যাবধি সেই মিথ জাগ্রত, সমাধির সেই স্থানে গাছের গোড়া বাঁধানো - আর স্মৃতিমন্দির হয়ে রয়েছে বৈষ্ণব প্রেমচর্চা কেন্দ্র। জীবিতের আনাগোনা সারা বছরই, তীর্থযাত্রীদের থাকার শেড রয়েছে। মাটির দেয়ালের গায়ে সাঁওতালী আঁকাআঁকি, গেরুয়া রঙের অলংকরণ।

সেজন্যই কি সকল পূর্ববঙ্গীয় পুরুষদের হৃদয় একবার হলেও রাজশাহীর আত্মার কাছে বাধা পড়ে? দেখা যায়, জ্যেষ্ঠ রেডিও কর্মকর্তা হাবুডুবু খায় বালিকা তরুণ কবির কাছে ? সত্তর দশকের কবি দী-র্ঘ কবিতা লেখে স্বরবৃত্তে রাজশাহীতে যাবার জন্য? তা মন কী করে ওঠে ? যেভাবে আশি’র বিস্ময়কর কবি আন্ত নাক্ষত্রিক অনুসরণ প্রকল্পের প্রধান অবজেক্টকে আবিষ্কার করতে চায় একবারের জন্য হলেও রাজশাহী সেনানিবাসে! রনো ষাট স্পর্শ করার আগেই তার রাজশাহীপর্ব সমাপ্ত করেছে।

ঢাকায় সতের জায়গায় হাতে সেলাই করে রক্ষা করা দেড়টাকা দামের জামা পড়ে (কারণ এই মুহূর্তে ওটার পকেটে এই পরিমাণ মুদ্রাই বর্তমান) মুড়ির টিনে করে অফিস করে আর তখন তার পায়ের আঙুলগুলি ক্ষয় হতে হতে লুপ্তপ্রায় জুতার ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকে - যেন ঐ ধ্যাবরা নখপচা আঙুলগুলিকে জনসমাজে ফ্রেমের মধ্যে উপস্থাপন করার দায়িত্বই জুতাগুলার প্রধান কাজ।

রুদ্ধ ঘরে একা বসে বসে ভাবছে সেই কবেকার বাৎসায়নে পড়া শব্দগুলা : কীর্তিবান্ধা, হংশলীলা, বরাহগত, আম্রচুষিত, জানুকুরপারা, অবলম্বিতক, একপদ, কোকিলা...। এ জীবনে চাঁদের স্বপ্ন যেমন সফল হল না, পাওয়া হল না পৈতৃক বাড়ির আপন স্বত্ত, এই শব্দগুলারও তেমন কোন সুরাহা হল না। কত কিছু অচেনা রয়ে গেল!