কথা-বলা সাবান

উমাপদ কর



সাবান

সাবানটা হাত থেকে পড়ে যেতেই কথা বলে ফেললঃ ঘষলে, ক্ষয় করলে, ফেনা তুললে, গন্ধ মেখে নিলে, আবার ফেলেও দিলে?
এষা অবাক, এ আবার কী? সাবানও কথা বলে? কুড়িয়ে নিতে যেই না নিচু, আবার হোঁচট। এক দমে সরে গেল সাবানটা। মার্বেলে সাবানে তৈরি স্লিপারে। আবার ধরতে গেলে, আবারও সুড়ুৎ, সাবান। আবারও...। কিছুটা সময় এভাবেই। মাঝখানে একবার...
এষা— কী দস্যি সাবান রে বাবা! বাথরুমময় ছোটাছুটি, এ আবার কী ঝামেলা?
সাবান— কেন? সাবান বলে কি মানুষ নই? সেদিন যে ময়দানে যিশুকে ধরতে গিয়ে বারবার ফসকাচ্ছিলে, তার বেলা? তারপর তারপর একবার ধরে একদম চটকে চুমু। আরো কী সব...। হি-হি, হি-হি-হি,.. এছাড়া আরও এগিয়েছ নাকি? খি-খি খিক-খিক খি…
-- ওমা! কী অসভ্যরে বাবা! এ বলে কী! আমার কী হবে? জানল কীকরে? বাড়ির কেউ জানে না, বন্ধু-বান্ধবও না। তাহলে এ কোত্থেকে? অবসন্নের মতো বাথরুমের ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে পড়তে গিয়েই থমকে দাঁড়ালো এষা। সর্ব্বনাশ। গায়ে যে কুটোটি নেই। ছিটকিনি ফের বন্ধ, শাওয়ার অন, ফেনা গন। টাওয়েল ছোপছোপ। গাউন ঢাকনা। ব্যস্‌ । থাক পড়ে তুই ওখানেই। যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! বাথরুম থেকে বাঁ-পা বাড়াতেই শেষ চমকটা আর বাকি রইল না।
সাবান— যাও যাও। যাবে তো বটেই। আমিও দেখব। সঙ্গে ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ কান্না।
এষা— আচ্ছা গেরো তো! এ যে কাঁদতেও জানে...।
সাবান— (কেঁদে কেঁদে) শুধু কান্না কেন? নালিশ করতেও জানি। আসুক তোমার মা, সব বলে দেব। এমন রং চড়িয়ে দেব না!
এষা— কী সর্বনাশ! এ মার সঙ্গেও কথা বলবে? ভাবলুম হয়তো আমার সঙ্গেই কিছু কথা মনে-মনে হয়েছে। হয়তো আমিই পড়ে যাওয়া সাবান আবার আমিই এষা। অসম্ভব। এ হতে পারে না।
সশব্দে বাথরুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে এষা তাড়াতাড়ি তার ঘরে চুল ঝাড়ছে। মার চিৎকারে ডাইনিং এ বেরিয়ে দেখল দু-হাত তুলে দুলে দুলে মা প্রায় নাচছে। হাসি যেন থামছেই না। কোনো হুঁশই নেই মনে হচ্ছে। হাতে একটা সাবানের প্যাকেট।
এষা— কী হল মা! হল কী? এত নাচছ কেন? হাসছ কেন? বলবে তো কী হল?
মা— ওরে সাত রাজার ধন মানিক খুঁজে পেয়েছি। এই প্যাকেটে লাকি কুপন। ফ্রি... সারা জীবন ফ্রি তে সাবান পাব। আর সাবান কিনতে হবে না। কুপন দেখাব, আর ফ্রি তে সাবান নিয়ে আসব। যত খুশি। হা-হা-হা। লাকি নয় বল? এক মিনিটে বাথরুম প্রসঙ্গ ভুলে এষা মাকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও থমকালো, জিজ্ঞাসা করল— মা সাবানটা কোথায়? এ-তো শুধু প্যাকেটটা।
মা— তা জানিনে। তুইই খুলেছিস বোধহয়। আরে আমি ফেলে দিতে গিয়েও ভেতরটা দেখতে গেলাম, ব্যস, মিলে গেল। কী মজা কী মজা।
এষা— আমি যে সাবানটা খুলে বাথরুমে ঢুকলাম, সেটাই এটা? সে তো মহা নচ্ছাড় সাবান মা। মা— কেন? কেন?
এষা— কিছুতেই হাতে থাকে না, চলকে পড়ে যায়। আবার তুলতে গেলে কত কথা, কত গোসা! ভীষণ ভীষণ পাজি।
মা— ও মা! তাই নাকি? কিন্তু ঐ নচ্ছাড়ই তো আমার লক্ষ্মী সোনা। ওই তো বয়ে আনল প্যাকেটটা। ওকে তো একবার হামি খেতেই হবে। চল দেখি বাথরুমে।
সহসা বজ্রপাত এষার মাথায়। আবার ঐ সাবান! তাতে চেতাওনি দিয়ে রেখেছে, মা বাথরুমে ঢুকলেই নালিশ করবে যিশুর ব্যাপারটা সব খোলসা করে দেবে। এমন কী বাড়িয়ে… এখন কী হবে?
এষা— মাম মাম, বলছি কি সাবান নয়, তোমার লাকি কুপন বয়ে এনেছে এই প্যাকেট। একে চুমু হামি যা কিছু খাও। কিন্তু সাবানকে চুমু খেতে যেও না মাম। তোমার মুখ নষ্ট হবে। মা— তা হোক। সাবানই তো কারণ। প্যাকেট নিমিত্ত মাত্র। সাবান না কিনলে প্যাকেট জুটত? কুপন মিলত? সাবানটাই মূল। ওকেই তোয়াজ করতে হবে।
বাথরুমের দিকে মার হাঁটা। এষার যতটা সম্ভব বাধা, যুক্তি, অন্তত নিজে বাড়ি থেকে না বেরোনো পর্যন্ত মাকে আটকে রাখার চেষ্টা সব বিফলে দিয়ে অগত্যা মা বাথরুমে...। সাবান খোঁজায়...। দরজা হাট... বাইরে দাঁড়িয়ে এষার প্রমাদ গোণা... চোখ বন্ধ, কানে দু-হাত চাপা।
বাথরুম থেকে মা— কই রে এষা সাবানটা কোথায়? উত্তর নেই। কান হাতে চাপা যে।
-- কিরে একটা গোটা সাবান শেষ করে ফেললি একবারের স্নানে? উত্তর নেই। কান হাতে চাপা যে।
-- এষা, এই এষা! কী হলো তোর? শরীর ঝাঁকানো, সম্বিত ফিরল, প্রায় কেঁদে— মাম, ও সত্যিই কথা বলছে?
মা অবাক। -- কথা... বলছে ... মানে? ‘ও’-টা কে?
এষা— সাবান।
মা— সাবান? সে কিরে সাবান আবার কথা বলে নাকি?
এষা— হ্যাঁ বলে।
মা— পাগল হলি? একটা সাবান শেষ করে ফেললি? কেসে তো সাবান নেই।
এষা— নেই? ও হো, দাঁড়াও দাঁড়াও। আমার হাত থেকে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। তুলতে যেতেই সরে গেল। আর বকবকানি। যতবার ধরতে যাই ততবারই পিছলে যায়। আর নানা কথা। ঠেস দিয়ে ঠেস দিয়ে। মিথ্যে কথা, আজগুবি যত্তসব।
মা— সাবান কথা বলল! তুই শুনলি? কী বলল? এ-তো আমাকে ফ্রি গিফট ছেড়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে ছুটতে হবে রে। তা কী বলল?
এষা— সে অনেক কথা।
মা— কী অনেক কথা? সেটাই তো শুনতে চাইছি।
এষা— ওই, আমাকে ফেলে দিলে! ধরতে গিয়ে ধরতে পারছ না আর রেগে যাচ্ছ! কই যিশুর বেলায় তো রেগে যাও না। তখনতো গড়ের মাঠ জুড়ে দুজনে খুব... যিশুকে ধরে…। মা আসুক বলে দেব।
মা— যিশু! সে আবার কে? সে আবার কোত্থেকে জুড়ল?
লম্বা জিভ এষার। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মা-ও হতচকিত। মেয়ের কী হল? লাকি কুপন আনলাকি হতে চলল যে। শেষে দুজনেই একসঙ্গে বাথরুমে ঢুকে সাবানের খোঁজ। সে ছিল জল বেরিয়ে যাবার নেটের গায়ে। ভেজা, নরম, সামান্য ক্যাতরানো। এষার চোখে অবশ্য তার উজ্জ্বলতা হারায়নি। যেন বলে উঠল— কী! মাকে নালিশ জানালাম তো? সব খোলসা করে দিলাম! তব্বে...?

প্যাকেট

এবারে প্যাকেট কথা বলতে শুরু করল সুতপার সঙ্গে। রান্নাঘরে মাইক্রো-অভেনের ওপর দশ টাকার একটা কয়েনে চাপা দিয়ে রেখে গ্যাস-অভেনে খুন্তি নাড়ছিল সুতপা। মেয়ে বেরোবে ফার্স্ট-ইয়ার কলেজে। পৌনে দশ। তাড়া ভীষণ। একপ্রস্থ সেরেছে ন’টা বাজতে দশে, কর্তার অফিসে লাল দাগ বাঁচাতে। প্রথমে বুঝতে পারেনি, একটু হাস্কি গলা। – কেমন আছো সুতপা? উত্তর দেবার প্রয়োজন মনে করেনি। কষানো হলে জল ঢালায় ঝমাস শব্দে ঢাকা পড়ে গিয়ে থাকবে। কিন্তু এখন স্পষ্ট, -- কেমন আছো সুতপা? কে বলছে কথা? কেউ নেই তো! চোখ পড়ল সাবানের প্যাকেটের ওপর। যেন নড়ছে, যেন গলার রগ একটু একটু ফুলে উঠছে। আবার— কেমন আছো সুতপা? ওমা, এ-যে প্যাকেটটাই জিজ্ঞাসা করছে। সে-কী! এষা তাহলে গাপ্পি মারেনি! সাবানের পরে আবার তার প্যাকেটও? কালে-কালে কত আর দেখব, শুনব! আজব বাৎ। সংক্ষেপে, ‘ভালো আছি’। কালক্ষেপ না করে, এবার আরেকটু জোরে— কেমন ভালো গো? -- বাব্বা, এ যে সোহাগী কথাবার্তা। একদম ‘গো’! তা তোমার কী দরকার বাপু, আমি কেমন আছি? বললাম তো ভালো আছি। তাতে পোষালো না বুঝি? কেমন ভালো? তা দিয়ে তোর কী দরকার শুনি? তুমি থেকে তুই-এ নেমে গায়ের জ্বালা যেন কিছুটা কমল। প্যাকেট কিন্তু থামে না। — ভালোর রকমফের নেই বুঝি! মনটা একটু খোলসা করেই না-হয় বলো, কেমন ভালো!
-- বেশ ভালো। যেমন সংসারে আর পাঁচটা আমার বয়সীরা থাকে, ঠিক তেমনি।
-- তাই কী? বেশি কম নয়? একটু না-হয় ভেবে বলো।
-- না বলব না। গলার পর্দা চড়ালো সুতপা। আশ্চর্য প্যাকেটেরও স্বর চড়লো। সে আর ভেজা বেড়াল নয়। মুখে মিচকি, এখন বেশ জোরেই—
-- আজ মর্নিং-ওয়াকে রোজ দেখা হওয়া জীতেন বাবুকে একদিন দুপুরের দিকে এ-বাড়ি আসতে বলোনি তুমি? তাতেই বুঝি ফুরফুরে?
আকাশ থেকে পড়ল সুতপা। এই হারামজাদা বলে কী? জানলই বা কীভাবে? এই-তো কয়েক মাস হল হাঁটতে বেরোনো, ভোর-সকালে, গাঁটের ব্যথাগুলো মরে। সঙ্গী পায়নি, একা-একাই। মাসখানেক আগেই বিপরীতমুখী জীতেনবাবুকে দেখা, উনিও ঐ সকালেই, একা-একা। প্রথমে একটা-দুটো কথা, কোনোদিন শুধুই একটু হাসি। মাঝে একদিন একটা শালিক দেখে চুপ মেরে আরেকটার অপেক্ষা করছিল সুতপা। হঠাৎই জীতেন বাবু— কী, আরেকটা শালিক খুঁজছেন? সুতপা – না মানে, ঐ আর কী! তিনিও একটাই দেখেছেন আজ। খানিক গল্প আর হাসাহাসি। মানুষটা ভা্লো, উঁচু চাকরি করতেন, সবে রিটায়ার, কিন্তু ঘ্যাম নেই। এসব মনে করতে গেল কেন সুতপা? একটা সাবানের প্যাকেটকে মনে মনে জবাবদিহি? কক্ষনো না।
-- তাতে তোর কী রে?
-- আমার কিছুই নয়। বলেছ তো! হয়তো আসবেনও তিনি।
-- আসুক না-আসুক, তোর কী? ঝগড়া মোডে কোমরের শাড়িটা পেঁচিয়ে নেয় সুতপা।
-- আহা! রাগছ কেন, রাগছ কেন? আসা ভালো। কিন্তু যদি এষা জানতে পারে? জানতে পারে…
-- এই শোন, ম্যালা ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ করিস না তো! দেব ছিঁড়ে কুচিকুচি করে উড়িয়ে…
-- কী হয়েছে গো মা? কার সঙ্গে এত রেগে কথা বলছ? সাজ শেষে ডাইনিং-এ বেরিয়ে এসেছে এষা। খেতে বসবে। হতচকিত সুতপা। খেয়ালই ছিল না, এষা ওর ঘরে। খেতে বসবে। কলেজ যাবে। ঐ শয়তানটার ঠোকা মারা কথার জেরে ক্ষেপে উঠেছিল। তাড়াতাড়ি সামলে—
-- না, না। কিছু হয়নি তো রে। ঐ একটু বকবক করছিলাম। রান্নাঘরের দরজার দিকে এগিয়ে আসে এষা। ভেতরে উঁকি দিয়ে মাকে ঘামে ভেজা মনে হয়।
-- কার সঙ্গে বকবক করছ? ঘামে একদম ভিজে গেছ যে মা! খুব রেগে আছো মনে হচ্ছে?
-- কার সঙ্গে আর করব! করি কপালের সঙ্গে। ভিজি তো রোজই। কার ওপর আবার রাগব! আড়চোখে একবার প্যাকেটটার দিকে তাকাল সুতপা। খিক-খিক হাসছে শয়তানটা। পিত্তি জ্বলে যায় তার। এষারও নজর মায়ের নজরের সঙ্গে যায় মাইক্রো-অভেনটার ওপর। ছুটে আসে।
-- মা, সাবানের প্যাকেটটাও রেখে দিয়েছ? এটাও লাগবে নাকি ফ্রি সাবান পেতে? শুধু কুপনটায় হবে না? কুপনটা কোথায় রেখেছো মা?
-- রেখেছি, রেখেছি। আয়, তুই খেতে আয়। টেবিলে গিয়ে বসগে। আমি ভাত নিয়ে আসছি। কী হলো! যা, দশটা বেজে গেল তো প্রায়।
এষা দাঁড়িয়েই রইল। মার দিকে তাকাল ভালো করে। কেমন ভয় পাওয়া মানুষের মতো লাগছে মাকে। এমন তো দেখে না রোজ়! ঘরপোড়া গরু সে, কিছুক্ষণ আগেই যা ঘটল তার সঙ্গে! এই সাবানের প্যাকেটটার কিছু ভূমিকা নেই তো! কৌতূহল দমিয়ে না-রেখে জিজ্ঞাসাই করে ফেলল—
-- মা, এই সাবানের প্যাকেটটার সঙ্গে বকবক করছিলে? ওটাও কি নচ্ছাড়?
-- কার সঙ্গে আবার। দ্যাখ না কেমন খিক-খিক হাসছে। শয়তানের শয়তান। মুখের আগল নেই। বলে কিনা— ‘কেমন আছো সুতপা?’ যেন আমার জন্য তার রাতের ঘুম নেই।
-- অসুবিধা কী মা? জানতে চাইছে, বলে দাও। মিটে যাবে।
-- মিটে গেলে আর এত বকছি কেন? বলে ‘কেমন ভালো?’। আরে আবাগি, কেমন ভালো, তোর কী দরকার? স্বামী-মেয়ে নিয়ে ঘর করছি, ভালোই আছি, তার আবার কেমন ভালো?
-- সেটা বলে দাও। চুপ করে যাবে।
-- তা কি আর বলিনি? ঢের বলেছি। তারপরেও শয়তানটার কথার চাষ।
-- কী কথা মা?
-- কী আবার! ঐ ঐ… । থেমে যায় সুতপা। কী বলবে বুঝতে পারে না। এই সময়ই আবার তার চোখ যায় প্যাকেটার ওপর। দেখে, ক্যালাচ্ছে ওটা। বলছে— কী হলো! বলতে ভয় পাচ্ছো বুঝি। কথাগুলো আদৌ এষা শুনতে পাচ্ছে কিনা বিচার না-করেই হঠাৎই সুতপা চোখ লাল করে চিল্লিয়ে ওঠে—
-- বদমাস! ইয়ার্কি হচ্ছে আমার সঙ্গে। বেশ করেছি, ভালো করেছি, জীতেন বাবুকে একদিন এ-বাড়ি আসতে বলেছি। তাতে কার কী হয়েছে? হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভালো করেছি, খুব ভালো করেছি, দুপুরের দিকে আসতে বলে। কেন কী হবে তাতে? কার পাকা ধানে মই পড়বে, শুনি? হাড়-বজ্জাত কোথাকার। টন্টিং হচ্ছে! টানা বলে গিয়ে মুখ লাল হয়ে ওঠে সুতপার, যেন দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। এখনই টলে পড়ে যাবে। খুব দ্রুত এষা মার পাশে এসে দাঁড়ায়, হাত ধরে ফেলে। বলে— এত উত্তেজিত হয়ো না মা! তোমার প্রেসার বেড়ে গেছে। চলো ডাইনিং-এ বসবে, আজ সকালে প্রেসারের ট্যাবলেট খেয়েছ তো? মাকে নিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলে বসায়। জল দেয়, পাখার স্পিড বাড়িয়ে দেয়। মাথার চুলে বিলি কেটে দেয়। কিছুটা শান্ত আর ধাতস্ত হয়ে অপেক্ষা করে থাকে এষার মুখ থেকে ছোট্ট একটা প্রশ্নের জন্য— ‘জীতেন বাবু, কে মা?’ অপেক্ষা জারি, উত্তর তৈরি করছে মনে মনে। কিন্তু মেয়ে এষা সে-সবের ধারেকাছেই গেল না। অল্প হেসে, নিজেই নিজের খাবার বেড়ে নিয়ে এসে মার পাশটিতে বসে খেতে শুরু করল। তবুও অপেক্ষা রইলই সুতপার মনে আর কানে। উত্তর একটা তৈরিও করে নিয়েছে এরমধ্যে। এষা খাওয়া শেষ করে রান্নাঘরের সিংকে বাসন নামিয়ে হাত ধুয়ে মাইক্রো-অভেনের ওপর থেকে সাবানের প্যাকেটটা সাবধানে লুকিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। দু-এক মিনিটের মধ্যেই সে বেরিয়ে পড়ল প্যাকেটটা বইয়ের ব্যাগে পুরে। যাওয়ার সময় বলে গেল— আর যেন রাগারাগি কোরো না মা! বকবকও একদম নয়। একা বাড়ি থাকবে, মনে থাকে যেন। বাই। মিনিট পাঁচেক ডাইনিং-এই বসে থাকল সুতপা। শেষে উঠে রান্নাঘরে ঢুকে দেখল সাবানের প্যাকেটটা নেই।

লাকি কুপন

সোয়া-ছ’টা সাড়ে-ছ’টা নাগাদ যে কলিং বেল টা বেজে ওঠে, সেটা আজও বাজল যখন, সচরাচর যত তাড়াতাড়ি তা খুলে যায়, আজ তা খুলল না। ভেতরে যেন একটা টানা-পোড়েন, কে গিয়ে খুলবে? একঘরে সুতপা একটা সিরিয়ালে মন দিয়েও দিতে পারছে না, অন্যঘরে কলেজফেরত এষা আজ যেন একটু অন্যমনস্ক অবসন্ন। মা ভাবছে মেয়ে যাবে, মেয়ে ভাবছে মা নিশ্চয়ই যাবে। বাইরে অফিসফেরত সরলবাবু ক্লান্ত হয়েও অধৈর্য হননি। রোজ তো আর হয় না। একদিন হতেই পারে। বুঝতে পারছিলেন না দ্বিতীয়বার বেলটা ঠিক কখন বাজাবেন! তবে একসময় বাজাতেই হল, কিছুটা অবাক হয়েই। ভেতরে, সুতপা— কী রে বাবা এসেছে, খুলে দিসনি এখনও? বলেই দ্রুত গিয়ে দরজা খুলল ফ্ল্যাটের। সরলবাবু হেসে ঢুকলেন— কী ব্যাপার সিরিয়াল দেখছিলে? এষা-মা ফিরেছে তো? ততক্ষণে এষাও বেরিয়ে এসেছে— হ্যাঁ বাপি ঢুকে গেছি। সুতপা একটু হেসেই প্রায় গম্ভীর— টিফিন করেছ তো? কী খাবে এখন? আগে চা?
– বসাও জল। ওয়াশরুমে ঢুকি। মা ও মেয়ে পরস্পরের দিকে একবার তাকিয়ে যে যার দিকে চলে গেল।
রান্নাঘরের গুমোট অনেকটাই কম, ঘামছে না আর। কিছুক্ষণ আগে বাথরুমেও এষার একই অভিজ্ঞতা। যেন কিছুই হয়নি, এমন একটা নীরবতা। কিন্তু মা-মেয়েতে আজ অন্যদিনের চেয়ে কথা কম। এষার ভুরু একটু কুঁচকে, কী যেন বাপী আবার সাবানের খপ্পরে পড়ে কিনা! সুতপা চায়ের জল বসিয়ে খুঁজে দেখছে, সাবানের প্যাকেটটা আবার উড়ে গিয়ে ঘরেই কোথাও সেঁটে আছে কিনা? বাথরুমে ঝরঝর জল আর গুনগুন গান টের পেল এষা। চিন্তাটা কমে স্বাভাবিকের দিকে সে। না, কোথাও কোনো খাঁজেই নেই সাবানের প্যাকেট। স্বস্তিতে সুতপা চা-পাতা দিল ফুটতে থাকা জলে। সরলবাবু ডাইনিং-এর আয়নায় চুলটা ঠিক করে নিজেদের ঘরে। ভীষণ ফ্রেশ লাগছে, একটু পাউডার ঘাড়ে বুকে। নিজেদের ঘরে ঢুকে হাফহাতা পাঞ্জাবিটা গলাচ্ছেন, কে যেন ‘সরলবাবু’ বলে ডেকে উঠল। গোটাটা না-ঢুকিয়েই এদিক-ওদিক তাকালেন তিনি। কেউ কোত্থাও নেই। অবাক হলেন। আবার, ‘সরলবাবু’, বেশ মিহি গলা, একটু আবেগঢালা। ওই অবস্থাতেই চোখ বোলালেন ঘরে। এবারে পাঞ্জাবিটা গলে গেছে। চোখ গেল কোনার দিকে ছোট্ট টেবিলে রাখা ডেস্কটপটার মাথায়। কিছু একটা ছোট্ট-কার্ড যেন কাঁপছে। এগিয়ে গেলেন সেদিকে। হাতে ক’রে তুললেন, ছোট্ট এক-রত্তি কার্ডটা, লাকি-কুপন, সাবানের। কে এটা এখানে রাখল? সুতপাই হবে। হাতে নেওয়ায় খুব কাছে থেকে স্পষ্ট শুনলেন— সরলবাবু! সংসার করছেন আর সংসারের কোনো খবরই রাখেন না? ওমা! সেকি! এ-যে লাকি-কুপন কথা বলছে। তাও আবার হয় নাকি? দ্রুত কাঁপা হাতে যেখানকার জিনিস সেখানে রেখে পিছিয়ে এলেন। ভৌতিক ব্যাপার। কাগজের টুকরো কথা বলে, শোনেননি এই ৪৮ বছরের জীবনে। একটু ভয় পেলেন। সুতপা ও এষাকে ডাকবেন নাকি ভাবলেন। না-ডেকে পরখ করার চেষ্টায় বললেন— রাখি তো খবর, যতটুকু রাখার। এরপর যা কথোপকথন—
কুপন – যতটুকু বললেন, তাতে কতটা আর বোঝায়? সংসারে কিছু কুচোকাচা থাকে, নাড়ী-নক্ষত্র থাকে, জানেন তো? মানেন তো?
সরল— তার আগে বলুন তো আপনি কে? কেনই বা আমাকে এসব প্রশ্ন? আপনার বলার হকটাই বা কী?
কুপন— দেখলেন তো হাতে তুলে, চোখে পড়ে, একটা লাকি-কুপন, সাবানের। আজই এ-বাড়ি এসেছি। আর সকাল থেকে রঙ্গ-তামাশা দেখে চলেছি।
সরল— তাই! বেশ-তো এসেছেন, বসে থাকুন, আপনাকে দিয়ে ফ্রি-তে সাবান নিয়ে আসব। সাবানটা বাজার থেকে তো আমিই এনেছি। আবার আপনাকে দেখিয়ে নিয়ে আসব। দেখাবো আর নেব। আমার সংসারে সাশ্রয় হবে। মাঝখানে আবার কথা কিসের?
কুপন— সরলবাবু, এই মাঝখানটাতেই যত গণ্ডগোল, যত ইন্টুমিন্টু, যত নাড়ী-নক্ষত্র।
সরল— (একটু রেগে) আপনি কী ভাষায় কথা বলছেন আমি বুঝতে পারছি না। এটা একটা ভাষা? আমার সংসারে কোনো হ্যাপা নেই। বন্ধ করুন এবার।
কুপন— হ্যাপা নেই? তাহলে সকাল থেকে যা ঘটল সবটা মিথ্যা, সবটা সংসারে জড়িয়ে নেই?
সরল— সকাল থেকে কী ঘটেছে, আমি তা জানি না, অফিস ছিলাম। কী ঘটেছে? এমন কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে? কী জানেন আপনি?
কুপন— আমার মুখ থেকেই শুনবেন না স্ত্রী আর মেয়ের মুখ থেকে? আপনি যে সাবানটা এনেছেন, সেই সাবানের সঙ্গে মেয়ের কী হল, আর সেই সাবানের প্যাকেটের সঙ্গে স্ত্রীর কী হল, আপনার জানতে ইচ্ছে করে না?
সরল— তেমন জরুরি কিছু হলে ঘরে ঢোকার সঙ্গেসঙ্গেই ওরা বলত, যা সাধারণত বলে।
কুপন— সাধারণ না-হয়ে অসাধারণও তো হতে পারে! হয়তো দু-জনেই চেপে গেল। আপনি সরলবাবুই থেকে গেলেন।
সরল— কক্ষনো না। ওরা নিশ্চয়ই বলবে, তেমনকিছু ঘটে থাকলে! চাপবেই বা কেন? কী এমন কাণ্ড যে আমাকে চাপতে যাবে? সুতপা, এষা আমার কাছের আর খুবই প্রিয়। আপনি চুকলামো করার ধান্দায় আছেন। আমি বেশ বুঝতে পারছি। আর কোনো কথা নয়, চুপ করুন।
শেষ দিকটায় সরলবাবুর কিছুটা রাগ গলা দিয়ে বেরোচ্ছিল। চা-বিস্কুট নিয়ে ঢুকল সুতপা।
-- কার সঙ্গে কথা বলছ? কে ফোন করেছিল?
-- ফোন নয়।
-- তবে, কার সঙ্গে কথা বলছিলে, একটু রেগেও গিয়েছিলে মনে হচ্ছে?
-- ঐ দ্যাখো কম্পিউটারটার মাথায় সাবানের লাকি-কুপন। ওই হতচ্ছাড়াই…
চমকে ওঠে সুতপা। এখনো কীর্তন শেষ হয়নি তবে? চা-টা রেখে ছুটে যায় কম্পিউটারের কাছে। হাতে তুলে—
-- লাকি-কুপন কথা বলছে? কই এখন বলছে না তো? তোমার কি মাথা টাথা খারাপ হয়ে গেল? ওগো আমার কী হবে!
-- হাসছে, দেখতে পাচ্ছো না?
-- না।
-- খিক-খিক করছে, শুনতে পারছো না?
-- না।
-- তবে ভৌতিক। আমার জন্যই গেরো। আমি শুনতে পাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি। আচ্ছা বোসো তো, শুনি তো ব্যাপারখানা। এষাকেও একটু ডেকে নাও তো।
-- বসব, কেন? জলখাবার করতে হবে যে।
-- পরে হবে। এষাকেও ডাকো দেখি।
-- আবার এষাকেও? বেচারা পড়তে বসেছে।
-- পরে পড়বে।
বাপি-মামের কথা শুনে এষা নিজেই এসে গিয়েছিল।
-- কী হয়েছে বাপি?
-- বস-তো একটু।
-- কেন?
-- সকালে সাবান নিয়ে কী হয়েছে রে মা?
-- কই কিচ্ছু হয়নি তো? কে বলল তোমাকে কিছু হয়েছে? কই কিছু না-তো। (নিমেষে। যেন প্রস্তুত ছিল)
-- হয়নি? তবে এই লাকি-কুপনটা যে বলছে হয়েছে। সাবান নিয়ে হয়েছে তোর সঙ্গে। আর সাবানের প্যাকেট নিয়ে হয়েছে তোর মার সঙ্গে।
-- সাবানের প্যাকেট নিয়ে? আমার সঙ্গে? কী আজগুবি বকছ? মাথা-টাথা খারাপ করে দিয়েছে তোমার ঐ লাকি কুপন।
এইসময়ই লাকি-কুপন একটু হেসে বলল— বললাম না আপনাকে, ওরা চেপে যেতেও পারে। এখন মিলল তো কথাটা।
সরলবাবু স্পষ্ট শুনলেন। শুনল না, সুতপা আর এষা।
-- লাকি-কুপন আবার কথা বলে নাকি, বাপি? বললেও তার কথার কোনো মূল্য আছে, না দিতে হয়? অফিস থেকে ফিরেছ, এখন ঠাণ্ডা হয়ে টিভি দেখ। রিল্যাক্স করো। রিল্যাক্স বাপি রিল্যাক্স। বেরিয়ে চলে যায় এষা।
-- ঠিকই বলেছে এষা। আজগুবির পেছনে ছুটো না। কে কী বলল আর অমনি আমাদের কাছে জানতে চাইছ কী হয়েছে, কেমন বোকা বোকা। কিছু হলে তো আমরাই বলতাম। কিসের লাকি একটা কুপন! লাকি না আনলাকি কে বলবে? যাই খাবার করি গে। রেস্ট নাও। সুতপাও চলে যায়। ওদের দু-জনের চোখ-মুখ কিছুটা অপরিচিতের মতো লাগে সরলবাবুর।
কুপন— আমি জানতাম, ওরা কিচ্ছুটি বলবে না তোমাকে। সরলবাবু! নাড়ী-নক্ষত্র এমনই।
সরল— তাহলে আপনিই বলুন কী ঘটেছে। কী হয়েছে সাবান নিয়ে এষার সঙ্গে, আর কী-ই বা হয়েছে প্যাকেট বনাম সুতপা?
কুপন— সরি সরলবাবু আমার লাইফ পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে। দুটো কাহিনি বলার মতো শক্তি আমার আর নেই। আর মাত্র দুটো ধ্বনি বড়োজোর।
সরলবাবু দেখলেন ছোট্ট কার্ডটা কেমন মিইয়ে গেল। সহসা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। যেভাবে যে পোশাকে ছিলেন, কার্ডটা হাতে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরোলেন।
সুতপা— কোথায় বেরোচ্ছো?
সরল— বাইরে।
সুতপা— খাবারটা খেয়ে যাও।
সরল— পরে হবে।
সুতপা— চা-টাও দেখছি পড়ে রয়েছে।
সরল— থাক।
এষা- কোথায় যাচ্ছো বাপি?
সরল— বাইরে।
এষা— কোনোদিন তো যাও না।
সরল— আজ যেতে হবে।
এষা— কখন ফিরবে?
সরল— ফিরব, সময় হলেই।
সুতপা— মাথা থেকে কুপন-ভূতটা নেমেছে তো?
সরল— নামাতেই যাচ্ছি।
বেরিয়ে যায়। মা ও মেয়ে পরস্পরের দিকে একবার তাকিয়ে যে-যার ঘরে।

বড়ো ভারবোধ হচ্ছে সরলের। পাড়ার মোড়ে এক কাপ চা খেল। একটা সিগারেট টানল। উদ্দেশ্যহীন হেঁটে চলল। কী এমন কথা, তাকে বলতে পারে না সুতপা, এষা! কী ঘটেছে সাবান নিয়ে আর ঐ প্যাকেটটা নিয়ে! ঘটনাটা আর বড়ো কথা নয় তার কাছে। কেন বলল না তাকে, সেটাই বিস্ময়ের, বিশ্বাসের আর সম্পর্কের টানাপোড়েনের। সরলবাবু অনেকটা আঁকাবাঁকা হেঁটে নদীর কাছে চলে এলেন। বাঁধ-কাম-রাস্তায় দাঁড়ালেন। একটু বিমর্ষ হলেন। বুকপকেট থেকে লাকি-কুপনটা বের করে একবার চোখ স্থির রেখে দেখলেন। একটা হাহাকার খেলে গেল যেন। যেন কিছুটা ঠাণ্ডা বাতাস তার চুল এলোমেলো করে দিল। সটান নেমে গেলেন একটা ঘাট বেয়ে নদীর কাছে। হাতের কুপনটা আস্তে করে নামিয়ে দিলেন জলের ওপর। হালকা স্রোতে দক্ষিণমুখী হল লাকি-কুপন, বলল— ‘টা টা’। যতক্ষণ দেখা যায়, দেখলেন সরলবাবু। ঘাটের একটা ধাপিতে বসে পড়লেন।
অথ কথা-বলা সাবান-কথা ইতি।