অনন্ত সবুজ অপেক্ষা

রিমঝিম আহমেদ



ভাবছি-আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। কেউ যেন দুটি চোখ থেকে উপড়ে নিয়েছে স্বপ্ন। কেন নিয়েছে, কে-ই বা নিয়েছে ,কবেই বা নিয়েছে তা জানি না। স্বপ্ন হারানোতে আমার কোন শোক নেই। শোক কাকে বলে তাও ধারনা নেই। স্বপ্ন হারিয়ে হয়তো কাঁদে মানুষ। আমার কোন কান্না নেই, বিলাপ নেই, বিপন্নতা নেই। একটা শূন্য মগজের মাথা বহন করে প্রতিদিন এখানে-ওখানে ছড়িয়ে যাচ্ছে আমার শরীর। ফের নিজেকে কুড়িয়ে নিয়ে ফিরে আসা ঘরের ভেতর, শহুরে হাওয়ার ভেতর। নিত্যকার খাওয়া-দাওয়া, স্নান ,ঘুম ফের জেগেওঠার ভেতর আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। আমার প্রেম পায় না, বিরহ পায় না, না কান্না, না হাসি; আমি এক অচল টিলা, নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছি এক মহাকাল ধরে। আমার স্বপ্ন নেই, রঙ নেই, কে যেন কুড়িয়ে নিয়ে গেছে সব ক’টা ভোর! সেই দিন, যেদিন ভোর রাতের স্বপ্ন ভেঙে খুব জল তেষ্টা পেয়েছিল। আর স্বপ্ন ভাঙার পর কোন এক ভুতুড়ে নগরী হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল চোখের ভেতর। ভোর রাতের স্বপ্ন সত্যি হয়! হ্যাঁ , সত্যিই হয়েছিল সেদিন। বাবাকে যেমনটা দেখেছি স্বপ্নে, মুখ থুবড়ে পড়ে আছে লাল ইটের উঠোনে, মুখে, ঠোঁটে থকথকে রক্ত... সমস্ত নিথরতা নিয়ে বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে, শান্তির ঘুম। ভোরের স্বপ্নকে জয়ী করে দিয়ে বাবা আর জেগে ওঠেনি। সেইসব কিশোরী দিনে বাবার মতো যত্নবান কোন তুমি চেয়েছি বাম বুকে চেপে বসুক। আততায়ীর মতো হরণ করে নিক আত্মার সমস্ত জমিন, চর দখলের মতো দামামা বাজিয়ে লুঠে নিক যত অপরাধ।

দুপুরে কাঞ্চন পিয়ন আসে, কালো ব্যাগ থেকে আঙুল টেনে আনতো হলুদ খাম, খামের ভেতর সবুজ স্বপ্ন। আমি সে স্বপ্নকে মুঠোয় নেবার আগেই হাওয়া! অধরা মাধুরী সে স্বপ্নের পিছু ছুটতে ছুটতে মুছে গেছে বিকেল, সন্ধ্যা আর ইচ্ছের যত সাতকাহন। তবুও কোন কোন ‘তুমি’ আসে। সেই ‘তুমি’কে বেঁধে রাখতে চাই সুখের অনন্ত গামছায়।

প্রিয় তুমি

আলস্যের বুকে এক হলুদ প্রজাপতি, মৃত নগরীর মতো জমাট অভিমানে ঘুমিয়ে থাকে। এই শহর আমাকেও আকাশ দিয়েছে, যতটা তোমাকে দিয়েছে, দিয়েছে ধুলো-ধোঁয়াট হাওয়া। ডিসিহিল থেকে থেমে থেমে এগিয়ে আসছে মাইজভাণ্ডারী সুর, আলুপটলের দাম বাড়ছে, গ্যাসবিল, বিদ্যুৎ বিল; বিছানার নিচে বিচ্ছেদ রেখে মানুষ বেঁচে আছে! তবু, মানুষ মরছে, হৃদরোগ, দুর্ঘটনায় অমোঘ মৃত্যুযোগ তর্জনী ছুঁয়ে চলে যায়।
সিনেমা দেখি, রাত গুনি প্রতিদিন। আর দেখি কমবয়সী স্বপ্নের ভেতর ঘুণের সন্তরণ । টুকটুকে মন কত অবেলায় ঝরে যায়! বিষাদের পারদ উঠছে-নামছে। বিষণ্ণ জ্বরের ভেতর এক কালো হরিণ পালাতে পালাতে কোথায় যে যায়! আর সে-ই চাঁদ সমুদ্রবেষ্টিত চুমুর কাছে এসে থামে, আমার হাত, তোমার গ্রীবা--- বৃষ্টির ইচ্ছে বুকে নিয়ে মেঘ ঘোরাফেরা করে আকাশময়। পোস্টকার্ডের ভেতর লুকিয়ে রাখা মায়াকে আটকে রাখে স্বেদাক্ত আঠা।
এই যে এলে, তবু এলে না, রাস্তা ছেড়ে পথ করে দেয়া পাখি জেনেছিল তোমার গন্তব্য। মায়া এক অনিরাময়যোগ্য অসুখ, হোটেলের ঘরে কেঁদে ওঠে মাঝ রাত্তিরে। বেড়ালের ঘুম নিয়ে আমরা জানালা দেখি, সমুদ্রের গর্জন, ওপারে ঝুলন্ত আকাশ; আঙুলের ফাঁকে পুড়তে থাকা মাইল্ড সিগারেট। হাত থেকে হাত খসে পড়ে, জেগে থাকে হৃদয়ের চর, ডুবো হাঙ্গরের মতো আমারও খিদে পায়, মাংসের খিদে। চোখের পাশে শুয়ে থাকা ঘাসবনে তবুও হলুদ প্রজাপতি, সবুজ ফড়িঙ ওড়ে। সব কান্না এসে থামে বুকের কাছে।

আমাদের জোড়া করতলে তবুও একটা বিকেল নেমেছিল, দুটো সন্ধ্যা--ছায়ায় ভিজতে ভিজতে ফিরেছি বাড়ি বুকে নিয়ে অসংখ্য মহামারি। একরত্তি শিশুর মতো চোখে নেচেছিল আহ্লাদ। কেমন আছে শরীর, পাঁজরের উপরের কালো ঘাসবন যার সরুগলি বেয়ে হেঁটে গেছে আমার আঙুলেরা! কেমন আছে ওই দ্যুতিময় চোখের তারা?
অনন্তের দিকে বিছিয়ে রেখেছি অপেক্ষার সবুজ চাদর, আকাশের দিকে মুখ করে রাতভোর জেগে থাকে রূপবান হরবোলা পাখি। আজো, প্রতিদিন ব্যক্তিগত ক্ষতের কাছে নতজানু হয়ে বসি, বলি--মুক্তি দাও! এন্টি ডিপ্রেশনের ভাঙা ট্যাবলেটের মতো উচ্ছ্বাসে ছিটকে পড়ে আমার চোখ, পৃথিবীর তাবৎ আত্মহত্যারা শিখে গেছে আমার ডাক নাম।
মর্গ তোমার কাছে সত্যি, মৃত্যুও। মানুষের হাড়ের ভেতর তুমি মজ্জা খোঁজো, আমি খুঁজি ঘুণ, লাল পিঁপড়ে ঘুমিয়ে থাকে বুনো রাস্তায়... জোছনাহীন মাঠের পাড়ে তোমার ঘর, পরলোক থেকে কারা যেন পাঠিয়ে দেয় মায়াবী ঘুম একগুচ্ছ স্বপ্নসমেত।

সময়ের হারামিপনা থেকে আমিও দেখেছি হুইসেল বাজিয়ে উড়ে আসা অন্ধকার, তাদের ছানাপোনা । এই যে যাবতীয় 'আসা' তার কিছু হেমন্তের রাতজাগা শিশির, রোদ উঠলেই মিলিয়ে যাবে অনিবার্য হাওয়ায়।
...