পোস্টার

অদ্বয় চৌধুরী



ভোঁওওওও!
এক ঝটকায় ঘুমটা ভেঙে যায় রাজুর। চোখ খুলতেই অবাক হয়ে দেখে তার চারপাশে অসংখ্য পোস্টার ভেসে বেড়াচ্ছে। তাতে বড় বড় করে লেখা রয়েছে— ‘আপনি কী পোস্টার হতে চান?’ ভাসতে ভাসতে পোস্টারগুলো ওর চারদিকে ঘুরতে থাকে। প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর বেশ জোরে। একটা বিশ্রী পচা গন্ধ নাকে এসে লাগে। রাজুর মাথা ঘুরতে থাকে; বমি পায়। রাজু আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে।
বারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট। এগারোটা পঁয়ত্রিশের পাঁশকুরা লোকাল গড়াতে শুরু করেছে। এত রাতে গোটা ট্রেনটায় হাতেগোনা কয়েকজন যাত্রী। রাজু এই ট্রেনটাই ধরতে চায় প্রতিদিন। এই কামরাতেই বসতে চায়, এই সিটে, একদম একা। বড়বাজারে যে দোকানটায় ও হিসেব রাখার কাজ করে সেখানে হিসেব-টিসেব মিলিয়ে এগারোটার মধ্যে বেরিয়ে পড়ে ট্রেনটা ধরবে বলে। তারপর হাওড়া ব্রিজ ধরে হাঁটতে হাঁটতে স্বপ্ন দেখে নরম হাওয়ায় সে বসে আছে একটা খোলা ব্রিজের রেলিং-এর উপর। নীচ দিয়ে বড় বড় জাহাজ চলে যাচ্ছে ওদের ছোট্টো দু-কামরার বাড়িটার দিকে। যেখানে সেই কোন ছোটোবেলায় ওর বাবা থাকত, কিছুদিন আগে পর্যন্ত মা-ও থাকত। এখন আর কেউ থাকে না— কেউ না, এমনকি রাজুও না। রাজু আর ব্রিজের রেলিং-এর উপরেও থাকে না। এই দুনিয়ার কোত্থাও নেই রাজু। রাজু আছে পোস্টারে। ‘আপনি কী পোস্টার হতে চান? আপনি কী পোস্টারে নিজের মুখ দেখতে চান? তাহলে চলে আসুন আমাদের প্রতিষ্ঠানে, চলে আসুন পাঁশকুরায়’।
“এগারোটা পঁয়ত্রিশের পাঁশকুরা লোকাল তেরো নম্বর প্লাটফর্ম থেকে ছাড়বে”— ঘরঘর করে ঘোষণা শুরু হয় মাইকে। এক ঝটকায় ঘুমটা ভেঙে যায় রাজুর। চোখ মেলতেই দেখে কামরার উলটো দিক থেকে একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে; ওর দিকেই আসছে। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রাজু। এত রাতে একা একটা মেয়ে কোথা থেকে হাজির হল? আগে কোনোদিন এই ট্রেনে দেখতে পায়নি তো মেয়েটাকে! এ কী স্বপ্ন? নাকি বাস্তব? মেয়েটাও রাজুকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। মনে হয় রাজুর চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করে। তারপর ব্যাগ থেকে রুমাল বার করে নাকে চাপা দেয়। মেয়েটা কী বমির গন্ধ পাচ্ছে?— রাজুর অস্বস্তি হয়। মেয়েটা খানিক ইতস্তত করে রাজু যেখানে বসে আছে সেই খোপটার আগের খোপে বসার তোড়জোড় শুরু করে। রাজুর মুখোমুখি, তবে কোণাকুণি সিটে। বসার আগে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে নেয় সিটটা।
মেয়েটার উলটো দিকের সিটটায় আঠা ছড়িয়ে রয়েছে। ট্রেন ছাড়ার জোরালো হুইসলে যে লোকটা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বমি করে ফেলেছিল, সে আসলে পোস্টারওয়ালা। লোকটা প্রায়ই ওঠে বেশি রাতের ট্রেনগুলোতে। পোস্টার মারতে। অর্শ, সিফিলিস, বশীকরণ, কোচিং সেন্টার, জ্যোতিষী, মাসাজ পার্লার, নিরুদ্দেশ। এক-একটা পোস্টারের জন্যে এক-একটা দিন ধার্য। আজ স্বপ্নদোষ। সিটের উপরে পেতে সে আঠা লাগিয়েছে পোস্টারে। ওই আঠায় বিশ্রী পচা গন্ধ। ওই আঠা বড় মারাত্মক। একবার কাঁচা অবস্থায় লেগে গেলে শুকিয়ে যাওয়ার পরে ছাড়ানো যায়না কিছুতেই। ওই আঠাতেই পোস্টারওয়ালার চোখের দৃষ্টি আটকে গেছে পোস্টারে। চারিদিকে ভাসতে থাকা অসংখ্য পোস্টারে সেই চোখ চেয়ে থাকে সারাক্ষণ। ওই চোখে ঘুম আসেনা, ওই চোখে স্বপ্ন আসেনা। ওই চোখ দেখতে থাকে মেয়েটার সালোয়ারের ডিজাইন, চুলের ক্লিপ, কপালের টিপ, নেলপালিশের রং, ব্যাগের চেনে ঝুলতে থাকা ঝিনুক। ওই চোখ দেখে আসছে মেয়েটাকে। একমাস ধরে, কিম্বা তারও আগে থেকে, হয়তো সেই ছোট্টোবেলা থেকে, যখন থেকে পোস্টারওয়ালা নিজের বন্ধু-বান্ধব বা আর পাঁচটা সাধারণ ছেলের থেকে আলাদা হয়ে গেছে। ওই চোখ দেখতে থাকবে মেয়েটাকে, যতদিন না মেয়েটা হারিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে।
মেয়েটা কিন্তু একবারও তাকায় না ওই চোখের দিকে। সে তার নিজের মতো কাজ করতে থাকে। ট্রেনে উঠেই কাউকে একটা ফোন করে। খানিক বাদে উলটো দিক থেকেও ফোন আসে। প্রথম স্টেশনে ট্রেন থামতেই মেয়েটা বারবার দেখতে থাকে প্লাটফর্মের দিকে। দেখে রাজু ট্রেনে উঠছে কিনা। ওই চোখে উদ্বেগ ছিল, ভয় মেশানো ছিল। রাজু না-থাকার ভয়। ওই চোখ রাজুকে খুঁজছিল হন্যে হয়ে। সেই খোলা ব্রিজের রেলিং-এ বসে বসে মেয়েটার চোখের ভাষা পড়তে থাকে রাজু।
খোলা ব্রিজের নীচ দিয়ে এইমাত্র যে বিশাল জাহাজটা গেল সেটা তিন নম্বর স্টেশনে থামতেই মেয়েটা নেমে যায়। প্লাটফর্ম লাগোয়া যে নিবু নিয়ন বাতিতে ঢেকে যাওয়া টিকিট কাউন্টারটা রয়েছে, তার সামনে একজন মাঝবয়সী লোক দাঁড়িয়ে। রাজুর সেই ছোটোবেলাকার বাবা বলে মনে হয় রাজুর। ঠিক চিনতে পারেনা। মেয়েটা তার দিকে এগিয়ে যায়। মেয়েটার চোখে এখন আর কোনো উদ্বেগ নেই, ভয় নেই। আছে অনেকটা নিশ্চিন্ততা। রাজু দেখতে থাকে ওদের। যতক্ষণ না রাজুর পাশের জানলাটা ওদের ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে ঘুমঘুম অন্ধকারে ঝাঁপ দেয় ফের।
রাজুর যখন ঘুম ভাঙে সে তখন পোস্টারে আঠা লাগাচ্ছে। সে যে সিটে বসেছিল সেই সিটটার উপরেই পাতা রয়ছে পোস্টার। মেয়েটা কেন পোস্টার হতে চায়না? তাহলে ভেসে বেড়াত চারিদিকে, স্বপ্নে, জাগরণে, অনন্তকাল। তাহলে এভাবেই ছুঁয়ে থাকা যেত তাকে। মেয়েটা আজ নেই। আসবেও না। কাল হয়তো কোনো অনুষ্ঠান বা কিছু ছিল, তাই অত রাতে ফিরছিল একা একা। আজ শুধু রাজু আর পোস্টার হতে চেয়েছে যে লোকটা। আর কেউ নেই। এমনকি ঘুমও নেই। ঘুমলে অপেক্ষা করবে কী করে রাজু?
হুইসলের আওয়াজটা পাওয়ার খানিক বাদেই ট্রেন থেকে নেমে মেয়েটাকে আসতে দেখে রাজু। ওরই দিকে এগিয়ে আসে। আজকেও! মেয়েটা কি কোনো চাকরি করে? নাহলে আজকেও কেন আসবে? কোনো নাইটস্কুলে পড়ায়? সবে ঢুকেছে চাকরিতে? নাহলে এত রাতে একা একা ফেরার ঝুঁকি নেবে কেন? কিন্তু আজ আর মেয়েটার কোনো ভয় নেই; নেই কোনো ইতস্ততবোধ। বরং রাজুকে দেখে অনেকটা নিশ্চিন্ততা ফুটে ওঠে চোখে। প্লাটফর্ম লাগোয়া যে টিকিট কাউন্টারটায় রাজু অপেক্ষা করছিল, তার নিবু নিয়ন বাতিতেও সে পড়তে পারে মেয়েটার চোখের ভাষা। মেয়েটা যেন আজ ওকেই খুঁজছিল। কেন খুঁজছিল? ওর মধ্যে তো কিছুই নেই সেরকম। জীবনে কিছুই করতে পারেনি রাজু। অন্তত পোস্টারে নিজেকে দেখার মতো কিছুই না। এরকম একটা ছেলের মধ্যে ঐ মেয়েটা কী দেখল যে এত নিশ্চিন্ত বোধ করে? এতটা নির্ভরতা দেওয়ার মতো কিছু কি রাজুর মধ্যে আছে? মনের মধ্যে চাপা একটা অস্বস্তি শুরু হয় রাজুর। রেলিং-এর নীচে দিয়ে চলে যাওয়া জাহাজে ঝাঁপ দিতে ইচ্ছা করে। তারপর পোস্টার হয়ে যেতে। ভেসে বেড়াতে চারিদিকে। চোখের সামনে পোস্টারগুলো ভাসতে থাকে আবার। ভাসতে ভাসতে সেগুলো ওর চারদিকে ঘুরতে থাকে। ‘আপনি কী পোস্টার হতে চান? আপনি কী পোস্টারে নিজের মুখ দেখতে চান?’
পোস্টারে চোখের দৃষ্টি আটকে যাওয়ার পর থেকে রাজু আর কিচ্ছু দেখতে পায়না। শুধু কানে শুনতে পায়। প্রখর তার শোনার ক্ষমতা। রাজু শব্দ শুনে শুনে বুঝতে শিখে গেছে মেয়েটা কি করছে। ব্যাগের চেনের ঝিনুকে শব্দ হলেই রাজু বোঝে এবার ব্যাগ থেকে চিড়ুনি বার করে ও চুল আঁচড়াবে। ব্যাগের সাইডলক খোলার আওয়াজ পেলেই রাজু জানে এইবার মেয়েটা ইয়ারফোন বার করে গান শুনবে। এভাবেই সেদিন রাজু জানতে পারে পরশু মেয়েটাকে দেখতে আসবে পাত্রপক্ষ, পাকাকথা হবে। এভাবেই রাজু আরও জানতে পারে বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েটা এতদূরের এই নাইটস্কুলের কাজটা আর করবে না। সেদিন আর রাজু খোলা ব্রিজের রেলিং-এ বসে না। সেদিন আর কোনো জাহাজ তার ছোট্টো বাড়িটার দিকে যায় না। সেদিন আর তিন নম্বর স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের নিবু নিয়ন আলোটা জ্বলে না। সেদিন শুধু চারিদিকে বিশ্রী পচা গন্ধ ভাসতে থাকে। বমির গন্ধ। সেদিন রাজু একের পর এক ছিঁড়ে উড়িয়ে দিতে থাকে সমস্ত পোস্টার, আর এতদিন ধরে পোস্টারে আটকে থাকা চোখগুলো মুক্ত হয়ে কাঁদতে থাকে অঝোরে। তারা ভেসে ভেসে পৌঁছে যায় পরের দিনে।
পরের দিন দোকানের হিসেবের খাতায় শুধুই জলে ভেজা চোখের অঙ্ক কষতে থাকে রাজু। হিসেব আর মেলে না। সব হিসেবের শেষে দাঁড়িয়ে থাকে এগারোটা পঁয়ত্রিশের পাঁশকুরা লোকাল। তেরো নম্বর প্লাটফর্মে। রাজুকে পৌঁছতেই হবে ওই শেষ হিসেবে। যেভাব হোক। আজকেই তার শেষ অঙ্ক। রাজু ছুটতে থাকে— ছুটতে থাকে খোলা ব্রিজ ধরে। জাহাজেরা দাঁড়িয়ে দেখে আজ রাজু ছুটছে— শেষ অঙ্কের দিকে।
খোলা ব্রিজ যখন তেরো নম্বর প্লাটফর্মে এনে নামায় রাজুকে তখন বারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট। এগারোটা পঁয়ত্রিশের পাঁশকুরা লোকাল তখন গড়াতে শুরু করেছে। রাজু পাল্লা দিয়ে ছুটতে থাকে। পোস্টারওয়ালা হাত বাড়ায় ট্রেনের সেই কামরা থেকে। হাতে তার পোস্টারের কাঁচা আঠা লেগে রয়েছে। সেই আঠা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাজুর হাত। রাজু উঠে পড়ে। উঠে পড়ে ঘুম থেকে। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। হাঁপাচ্ছে প্রচণ্ড। আজও মেয়েটার চোখ ওকেই খুঁজছিল অস্থিরভাবে। অদ্ভুত উদ্বেগ সেই চোখে; ভয়ও। রাজু না-থাকার ভয়। রাজু ওর চোখের ভাষা ঠিক বুঝতে পারে। কিন্তু আজ তো মেয়েটা একা নেই! সঙ্গে পোস্টারওয়ালা রয়েছে। সে বসে আছে রাজুর সিটটায়। ঘুমোচ্ছে। গোটা কামরায় বিশ্রী গন্ধ ছেয়ে রয়েছে। পোস্টারের আঠার গন্ধ। চারিদিকে নতুন পোস্টার ভেসে বেড়াচ্ছে। তাতে বড় বড় করে লেখা— ‘আপনি কী পোস্টার হতে চান?’ আজ কী তবে পোস্টার হওয়ার দিন? রাজু আর কিছু পড়তে পারেনা। রাজু ধপ করে বসে পড়ে তার সামনে যে সিটটা ছিল তাতেই। তারপর অসাড় শরীর এলিয়ে দেয় সিটের উপরে। মন কিন্তু সমানে অঙ্ক কষে চলে; হিসেব মেলায়।
মেয়েটা তো আজ একা নয়। তার আজ ভয় পাওয়ার দিন নয়। তাহলেও সে রাজুকেই খুঁজছিল কেন? রাজুর অসাড় শরীরে উত্তেজনা জেগে ওঠে। আজ সে যাবে মেয়েটার কাছে। আজ সে বাড়িয়ে দেবে হাত। যে হাত পোস্টারওয়ালার আঠা লাগা হাত ধরেছিল, যে হাতে পোস্টারের আঠা লেগে রয়েছে এখনো। আজ নাহলে আর কোনোদিন হবে না। দ্বিতীয় স্টেশন ঢুকে পড়েছে। এবার রাজু যাবে। এবার রাজু উঠে দাঁড়াবে। হয়তো জীবনে প্রথম বার। হয়তো বা শেষ বার।
রাজু সিট ছেড়ে উঠতে যায়, কিন্তু পারেনা। কিছুতেই পারে না। রাজু অবাক হয়ে যায়। অদ্ভুত লাগে ওর। জাহাজ তখন এগিয়ে চলেছে তৃতীয় স্টেশনের দিকে। মেয়েটার ইয়ারফোন ব্যাগে ঢুকে যাচ্ছে। এবার রাজু অধীর হয়ে ওঠে। রাজু ওর সিটের দিকে তাকায়। সিটে পোস্টারের আঠা ছড়িয়ে রয়েছে। কাঁচা আঠা শুকিয়ে গিয়ে ভীষণ আঁকড়ে ধরেছে। এই আঠা ছাড়ানো যায় না। এই আঠা আজীবন আঁকড়ে থাকে। তবু রাজু গায়ের জোরে চেষ্টা করে। পারেনা। তৃতীয় স্টেশনের সেই টিকিট কাউন্টারটা ক্রমশ দেখা যায়। সেই মাঝবয়সী লোকটা দাঁড়িয়ে রয়েছে নিবু আলোয়। আজ রাজু তাকে চিনতে পারে। রাজুর ছোটোবেলায় দেখা বাবা। আজ সেও রাজুকে দেখে মুচকি হাসে। মেয়েটা দরজার কাছে এগোচ্ছে। রাজু শেষবারের মতো আপ্রাণ শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে নিজেকে ছাড়ানোর। কিছুতেই পারে না। তারপর ফ্যালফ্যালে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে মেয়েটার ট্রেন থেকে নেমে যাওয়া। মেয়েটা একবারও তাকায়না রাজুর দিকে। তাকালে হয়তো পোস্টারে আটকে থাকা রাজুর চোখদুটোর ভাষা বুঝতে পারত। পারত কী? রাজু আর কিছু ভাবতে পারে না। সে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
পরের দিন মেয়েটা আর আসেনা। রাজু কিন্তু ওর জন্যে অপেক্ষা করে। চোখ বন্ধ করে। আগেরদিনের জায়গাতেই।
***