কোন রহস্যধারা

বিধান সাহা




০১.
আমি লিখতে পারছি না। এর চেয়ে বড় সত্য নাই। এর চেয়ে বড় অস্বস্তিও নাই। তোমরা লেখা চেয়েছো, আমিও দিতে চেয়েছি। কিন্তু সমস্যা হলো এখন লিখতে পারছি না। যা-ও লিখছি তা আসলে হচ্ছে না। ফলে তোমাদের লেখা দিতে চেয়েও ক্রমাগত ব্যর্থ হওয়ায় এখন সেটাই উল্টো প্রেসার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি যে চেষ্টা করছি না, তা নয়। কিন্তু হয়ে উঠছে না। এমন আমার এর আগেও হয়েছে। দেখা গেলো, প্রায় বছর বা বছর দেড়েক পরে হু হু করে আবার লেখা আসছে। কিন্তু বর্তমানের সাথে পার্থক্য হলো, এখন আমি লিখতে চাইছি। লেখাটা জরুরীও আমার জন্য। কিন্তু হচ্ছে না। আগে যেটা হতো, লেখা হচ্ছে কি হচ্ছে না সেটা নিয়ে মাথাই ঘামাতাম না। ফলে বর্তমানের মতো কোনো প্রেসার ফিল করতাম না। বর্তমানে আমার স্বপ্ন হলো, এই প্রেসারটা কাটিয়ে উঠে নতুন আনন্দে জেগে ওঠা।


০২.
স্বপ্ন তো আছেই। এই যেমন গতকাল, দুপুরে ফিরে ভাতঘুমের আশায় শুয়েছিলাম। তো শুয়ে শুয়েই স্বপ্ন নিয়ে ভাবছিলাম। একটা চমৎকার কল্পনা এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। রাজশাহীর তাপসী-রাবেয়ার সামনে দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছি ওই পুকুরের দিকে। কী দারুণ সবুজ ওখানে! গিয়ে চুপচাপ বসে তাকিয়ে দেখি ওপারের বৃক্ষ-বাগানটা তুষারে ঢেকে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো, পুকুরের ওপারে অন্য একটা দেশ। শৈশবে দেখা কোনো ভিউকার্ডের মতো বিষ্ময়কর! আর বাগানটার ওপাশ দিয়ে চলে গেছে একটা বিরহী রেললাইন। মনে হলো, এই গরমে ওপারে তুষারপাতের ফলে একটা শীতল বাতাস এসে মিশে যাচ্ছে। পুকুরের জল কী দারুণ স্থির! ভাবতেই ভেতরে একটা প্রশান্তির স্রোত বয়ে যাচ্ছিলো। আমি সেই শান্তিটুকু নষ্ট না করার লোভে আর লিখতে বসি নাই!

আমার আজকাল এমন হয়। খুব হয়। জীবন যখন নিজের কাছেই অচেনা হয়ে ওঠে তখন সকলের কি হয় আমার জানা নেই, কিন্তু আমি অস্থির হয়ে উঠি। মনে হয়, এই মুহূর্তেই আমাকে এই প্রতিকূল পরিস্থিতি জয় করে উঠতে হবে। তখন নিরুপায় হয়ে আমি শান্তি খুঁজি সব জায়গায়। বুঝতে পারি যে জীবন অনাকাঙ্ক্ষার বেড়াজালে আটকে পড়েছে। এই জাল ছিন্ন করতে হবে। করতেই হবে।

আমি জানি, একদিন সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমি জানি, একদিন হয়তো পৃথিবীর উদাহরণও হয়ে ওঠা যাবে। কিন্তু তার আগে এই অসমাপ্ত লেখাটা শেষ করে উঠতে হবে। আপাতত এটাই আমার আরাধ্য। আমার স্বপ্ন।

কোন ডালে পাতা তুই, কোন ডাল তুই ও-পাতার!


০৩.
সেদিন বসে বসে নোট করছিলাম। নোট বলতে, কল্পনার ভেতরের বিষগুলো বের করে দিচ্ছিলাম। শেষ করে দেখলাম, সেখানে যে মানুষটা ফুটে উঠেছে তা আমার অচেনা। অথবা এটাই আমি। কিন্তু কোনো দিন সামনে নিয়ে আসি নাই। নিজেরই লেখাগুলো পুনরায় পড়তে গিয়ে ভীষণ বিব্রত বোধ করছিলাম। কিন্তু আমি ঠিক করেছি নিজেকে খোঁজার অনেক পথের একটি হবে নিজের কাছে নিজেকে সত্য বলা। তা যত কঠিন আর বিকৃতই হোক না কেন। কার মুখে যেন শুনেছিলাম যে, রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা তাঁর ভেতরের বিকৃতির প্রকাশ। সত্য কিনা্ জানি না। তবে এই বাক্যকে সত্য ধরে নিয়ে বিস্ময়ে হা হয়ে গিয়েছিলাম। বলে কী, বিকৃতিই এমন! আমার বিকৃতিগুলোর দিকে এখনও ঠিকঠাক তাকানো হয়নি। এবার তাকাবো। কোথায় যেন পড়েছিলাম, মানুষের ভেতরের ‘ডেডলি থিংকস’ যা কিছু, তা অনেকটা ভূতের মতো। আলোতে তাদের অস্তিত্ব নাশ হয়। আমি জানি না, আমার ভেতরে কোনো ‘ডেডলি থিংকস’ আছে কিনা। বা থাকলেও তা আমার সামনের দিকে অগ্রসরের জন্য কোনো বাধা কিনা। কিন্তু যেহেতু বলছি যে আমার কাছে আমি এখন অচেনা, সুতরাং নিজেকে চেনার জন্য সুকৃতি-বিকৃতি যা কিছুই হোক, প্রকাশ করে শুন্য হয়ে উঠতে চাই।

—আমি জানি, প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না।
—তো?
—রহস্য তো সেখানেই!


০৪.
এবার একটি গল্প। একজন মানুষ রোজ ভেতরে ভেতরে ভাবে যে সকলেই তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। সকলেই তাকে মন্দ বলছে। এমন কী, অন্যেরা তার সম্পর্কে কি কি বলছে তাও সে হুবহু কল্পনা করে নেয়। এভাবে চলতে চলতে একদিন লোকটি খেয়াল করে দেখলো পুরো পৃথিবী তার কাছে ক্রমে অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সকল কিছুতে অবিশ্বাস দানা বেঁধে উঠেছে। মানুষের প্রতি অবিশ্বাস, প্রকৃতির প্রতি অবিশ্বাস তাকে ক্রমাগত নিঃসঙ্গ আর বন্ধুহীন করে ফেললো। যখন লোকটি টের পেলো, ততদিনে তার স্বাভাবিকতা বলে আর কিছু নেই। সে ফিরতে চাইলো। দেখলো, প্রকৃতি, মানুষ, তার চারপাশের উপর বিশ্বাস স্থাপন আর সহজ হয়ে উঠছে না। প্রকৃতিও এতোদিন অনেকটা পাল্টে গেছে। অথবা, বহু বহু দিন অন্ধ হয়ে থাকতে থাকতে চক্ষুষ্মান হয়েও সে আর কিছু দেখতে পারছে না। তবু সে ফিরতে চাইছে, আপ্রাণ ফিরতে চাইছে, ফিরতে চাইছে...

গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে নিজেকে কল্পনা করে শিউরে উঠলাম। প্রত্যেক গল্পকার চেতনে বা অবচেতনে কী নিজেকেই প্রকাশ করে চলে? হয়তো, হয়তো না। তবু আমি ভীষণভাবে চাইছি গল্পের লোকটি তার আপতকাল কাটিয়ে আবার স্বমহিমায় ফিরে আসুক। কোনো এক বকুল গাছের নিচে নিজেকে মেলে দিয়ে একটা প্রশান্তির ঘুম দিক। পৃথিবীতে বৃষ্টি নামুক!