ওলিপাব

শাফিনূর শাফিন



এমন কোন একটা সময় ছিল, যখন প্রতিবার দেখা হবার আগেই ভাবতাম, ভাবতে ভাবতে বের হতাম- দুহাত ছড়িয়ে এগিয়ে যাবো যেমনটা নাটক সিনেমায় দেখায় আর কি! কিন্তু প্রতিবারই মনে থাকতো না আমার ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজীমার্কা হাত দুটো নিয়ে কাউকে জড়িয়ে ধরার কথা, তুমিও ভুলে যেতে হাত বাড়িয়ে দেবার কথা! কিন্তু প্রতিবার সেই একই ক্যাঁচাল কীভাবে হতো বলতে পারো? তুমি এয়ারপোর্টে ঘুরতে একা একা আর আমি উল্টো তোমায় খুঁজে মরছি! তারপর দেখা হতেই, “ও আচ্ছা তুমি এসে গেছো? পথে কোন অসুবিধে হয়নি তো? অবশ্য জিজ্ঞেস করছি কেন, অসুবিধে হলে তো তুমি এখানে থাকতে না!” এই বলে বিঁড়ির প্যাকেট খুলে বসে পড়া একদিকে। আর আমিও কি ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে বোকা বোকা হাসি দিয়ে বসে পড়ি অন্যদের চোখ এড়িয়ে।
- আরেকটু কাছে এসে বসলে ফিজিক্যালি এসল্ট হবে না।
- আমি দূরত্বে বিশ্বাসী। বাই দ্য ওয়ে, আমি এসল্ট হবো এই ভয় পাই না।
- কেন? তুমি উল্টো এসল্ট করে দাও নাকি? তোমার অন্য সব বন্ধুরা জানে তো এই খবর?
তোমার প্রায় সময় নিজেকে একটা মৃত মাছের চোখ মনে হয়। আর আমার- তোমার দিকে তাকালে নিজেকে ইউনুস নবী মনে হতে থাকে। এই বুঝি আমার উপর দোয়া নাজেল হবে- “লা ইলাহা ইল্লা আন্তা…”। …
এখানে যখন ঝুম বৃষ্টি হয় এসব মনে পড়ে যায়, আমি চোখ বন্ধ করে দেখি অন্য কোথাও তুমি হলুদ পর্দা টেনে শুয়ে পড়ছো। দুইদিন ধরে মানুষের গল্প লিখতে চাইছি। পারছি না। প্রিয় এক দিদি বলেছেন শহরের গল্প লিখতে। মানুষের গল্প লিখতে গেলেই শহর এসে যাচ্ছে। অথচ শহর বলতে আমি যে দুজন মানুষকে বুঝি, তাদের একজন আমাকে দেখিয়েছিল কোন্ পাহাড় থেকে বায়েজিদ বোস্তামীর কচ্ছপগুলো নেমে এসে আস্তানা গাড়ে মাজারের সামনে। আরেকজন তুমি, যে তুমি অন্য একটা শহরে আচানক আমায় নিয়ে মুসলমান পাড়ায় ঢুকে পড়েছিলে, তখন আমার মনে হচ্ছিল কদমতলীর পেটের ভিতর যে বিহারী পাড়া আমি যেন বহুবছর পরে তার ভিতর ঢুকে পড়েছি।
মেইল বক্স খুললেই জানি তুমি আছো। বৃষ্টিভেজা শহরে ছুটন্ত গাড়ির ছবি বাসের জানলা দিয়ে ধরে রেখেছ। গাড়িগুলো সব কেবল দাঁড়িয়ে পড়ে, না? বেলুড় মঠে তুমি যাওনি। অথচ কি সুন্দর স্বপ্নে যা যা দেখলে লিখে পাঠালে। ফিরে আসার ইচ্ছেটাও জানালে। যে একবার ফিরিয়ে দেয় তাঁর কাছে কী আর আসা যায়? ফেরানোটা কিংবা ফেরাতে থাকা তখন স্বভাবে দাঁড়িয়ে যায়। তুমি সোজা হয়ে দাঁড়াও। তোমার নতজানু মুখ দেখতে ভালো লাগে না। শহর গুড়িয়ে আসছে বৃষ্টির ফোঁটায়। আমি ভেঙে পড়বো না ঠিক করেছি। ঝগড়া, চিৎকার, দাঁত কিড়মিড় বাদেও যেসব দুর্লভ মুহুর্ত আমরা জমিয়েছি, এক জীবন কেটে যাবে। আমার আর নিরাময় হয়ে উঠা হলো না। তুমি অসুখ সারিয়ে নিও।
কোন কোন স্বপ্নের কাছাকাছি গিয়েও আমরা ফেরত চলে আসি। এই যেমন তুমি স্বপ্নে দেখছ, কলেজ স্ট্রীট। হাওয়া গলি। তামাক ঘষা হাতের তালু। তুমি দেখছ কারা যেন হরিবোল ধ্বনি দিতে দিতে হেঁটে যাচ্ছে। তাঁদের কাঁধে আমারই লাশ। বিবেকানন্দের আশ্রমের লাল মেঝেতে তুমি চুপচাপ। কোত্থেকে উদয় হয় পুরুলিয়া। তুমি নদীতে নামছো না। তোমার পানিকে বড় ভয়। আমি খাঁদের ধারে। খাঁদ সরে আসছে আরো কাছে। তুমি চিৎকার করছো সমানে, "সুধা পড়ে যাবে।" আমি হাত মেলে দিয়েছি। পাখিটার নাম যেন কি ছিল কিছুতেই মনে পড়ছে না। তুমি দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ছো ওলিপাবে। আমাদের স্বাস্থ্য পান করে চলেছে প্রাইড মিছিল। নানা জাতের মদের গন্ধে নির্বিকার নিঃসঙ্গ সব মানুষ।
তোমার মুখ থমথম। রবিবারে ঋতুর হাসি বিছানার পাশের টেবিলে দুই নম্বর তাকে।
তুমি জানো অসুখ ফিরে আসছে।
ফিরছে ভয়।
মায়াপিশাচ।
হাতে হাত রেখে ঘুম।
উলুধ্বনি।
কালো মানুষের শব নিয়ে আদিবাসীদের মিছিল।
হরিবোল।

অথচ স্বপ্নেও আমরা কেউই কারো কাছে ফিরতে পারছি না। স্বপ্নেও কি ভীষণ জেদ আমাদের!