এক আনোখা খোয়াব

চিত্রালী ভট্টাচার্য



ফির ওহি রাত হ্যায়/ ফির ওহি রাত হ্যায় খোয়াব কি-------।
রোশনি, যতদূর দৃষ্টি যায় এক আনোখা রোশনিতে ভেসে যাচ্ছিল চারিদিক ।আর সেই বিরান জঙ্গলের মধ্যে একা একা দাঁড়িয়েছিল রাঠোর। হাঁ, রাঠোর, ইয়ানি - সংগ্রাম সিংহ রাঠোর – ব্রিগেডিয়ের, ৩৫নং ব্যাটেলিয়ান। এ প্রান্তর তার খুব চেনা। এটা একটা গিরিপথ। চড়াই- উৎরাই ,বরফ- এসব তো আছেই, এছাড়াও আছে উঁচা উঁচা পেড়। এরা পরস্পরের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে অন্ধকার করার চেষ্টা করছে কিন্তু আকাশ থেকে নেমে আসা এক অদ্ভুত আলো ওদের সব ষড়যন্ত্র বানচাল করে দিচ্ছে। আসলে এ আলো তো কোনো সাধারণ আলো নয় , রাঠোর বলে – এহ্ এক বেমিশাল খোয়াব, জিসকা কোই কিনারা নহি।
এ অঞ্চল হরদম ঘনা কুয়াশায় ঢাকা থাকে।তবে মাঝে মাঝে যখন চাঁদ হাভি হয় তখন রাত এমন বেমিশাল হয়। আজকাল এরকম রাতের সাথে রাঠোরের প্রায়ই মোলাকাত হয়।রুক্ষ্ম পথ, কাঁকরিলা জমিন, বরফ, পেড়- পৌধে সব, সবকিছু তখন পিঘলে যায়। এমন কি রাঠোরও কমজোর পড়ে যায়। পাথরের চাঁইএর আড়ালে শেল্টার নিয়ে ও যতবারই ওর ভারি মেশিনগানটা কাঁধের ওপর তুলতে চায় ততবারই পেশী শিথিল হয়ে পড়ে।
--ধত্‌ তেরিকি, এ কা হো রাহা !- ও বিরক্তি দেখায়। বার বার চেষ্টা করে নিজেকে সক্ষম করে তুলতে কিন্তু পারেনা। একবার ওই রোশনির দিকে তাকায় আর একবার মেশিনগানটার দিকে। শেষ- মেশ সব ছোড় ছাড়কে শুয়ে পড়ে পথরিলা জমিন পর। চোখ চলে যায় আসমানে। মনে মনে বলে- ক্যায়া রাত হ্যায় ভাই, কুছ সমঝ নহি আ রাহা ! এমন রাতে চাঁদ নেমে আসে জমিন পর। যেন- মা। রাঠোরকে ওর রুক্ষ্ম জীবন থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় মায়ার পৃথিবীতে। ওর শরীর বিঁধে থাকা কাঁটা তুলে ফেলে দিতে চায় অতীতের জলে। রাঠোর তেজ দেখায়। বলে- ছোড়ো , ই সব ব্ল্যাক ম্যাজিক হমপে নহি চলেগা, কিন্তু ধীরে ধীরে কমে আসে তেজ। বাধ্য শিশুর মত নেতিয়ে পড়ে প্রকৃতির কোলে।
খুব আরাম হয় বোধ করে। সব ব্যথা কমে গেলে খুব ঘুম পায় ওর । কঠিন পেশীর খেলা আর চলেনা তখন। সারাদিনের যুদ্ধ শেষ করে শরীর অবশ হয়ে পড়ে।
আজও তেমনই একটা রাতের শেষে যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন ধুন্দলা সা নজর এলো সবকিছু। প্রথমটায় রাঠোর কিছু বুঝতে পারছিল না, শেষে খুলা ফাটকের সামনে সান্ত্রীকে দেখে সবকিছু সাফ হয়ে গেল।
মুচকি হেসে জানতে চাইল—কা হুয়া? লাগতা হ্যায় বহুত হি টেনশন মে হো ?
সান্ত্রী মুখ কাচুমাচু করে বলল—জী। বাত হি কুছ অ্যাসি হ্যায় । চলিয়ে, মু- হাত ধো লিজিয়ে, যানা নহি হ্যায় কয়্যা?
-কাঁহা?
-ফিরসে আপকা স্বগতকে লিয়ে সবনে বুলায়া হ্যায়।
সান্ত্রীর হাব-ভাব দেখে রাঠোর হো হো করে হেসে ওঠে।
-আপ হাস্‌ রহে হ্যায়!-
-তো ক্যায়া করু? রোউ? শোভা দেগা মুঝে?
সান্ত্রী চুপ করে যায়। জানে রাঠোর নিরুপায়। ওদের ডাকে যেতে তো হবেই। কোনো জোর চলবে না। কোনো মায়ার খেলা নেই এখানে। কঠিন বাস্তব। এখানে ওর একমাত্র পরিচয় -ও জাসুস, ইয়ানি গুপ্তচর। এরকমই প্রচার চালাচ্ছে ওরা।গত দু বছর ধরে ওকে তাই বন্দী করে রাখা হয়েছে এই সেলে। হাজারো ছান-বিন, লাখো অনুসন্ধানের পর দোষি করার দিয়েছে ওরা। দন্ড- মৌত।
তমাম দুনিয়ার মানুষ নাকি এক্কাট্‌ঠা হয়েছে এর বিরুদ্ধে। সবাই ওকে ওর মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে দেবার জন্য আবেদন করছে, এরাও নাকি তাতে বিচার বিমর্শ করছে – সান্ত্রীর মুখে এসব কথা শুনেছে ও । গোপনে সব সন্দেশ এনে দিয়েছে ও রাঠোরের কাছে। কিন্তু রাঠোর জানে এসবে কোনো কাজ হবে না। মরতে তাকে হবেই। সরাসরি মৃত্যুদণ্ড না দিতে পারলে, গুপ্ত হত্যা হবে ।
নাহ্‌, মরতে ভয় পায়না রাঠোর, কিন্তু এভাবে মরতে ওর পৌরুষে বাধে। বীরের মত যুদ্ধ করতে করতে মরাই তো তয় ছিল ওর জন্য ।—আমনে সামনে, আঁখ পর আঁখ ডালকে। লেকিন এয়সা নহি হো পায়া। এক রাতে কয়েকজন টেররিষ্ট যখন ঘুমের মধ্যে ওকে আগবা করে নিয়ে এল তখন ও ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। এখনো সেজন্য ও আফসোস করে।
আর তারপর থেকে হরদম টরচার। কথা ওগরানোর সেই ভয়ঙ্কর খেল। বরফের ওপর ওর কম্বল জড়ানো শরীরটা ফেলে মোটা রুলার দিয়ে সারারাত------। জ্ঞান হারিয়ে গেলে ফেলে আসা হয় সেলে।
আর জ্ঞান ফিরলে ও প্রতিদিন দেখতে পায় সেই সান্ত্রীর খোয়া হুয়া মুখ।
-দর্দ হো রাহা হ্যায়?-চোখ খুলতেই ও জিগ্যেস করে।
-নহি, ইতনা ভী কমজোর নহি হু ম্যায়।
- জী জানাব, হম জানতে হ্যায়।
-ক্যায়া জানতে হো?
-আপ আপনে বতন কা বহত হি আলা আর্মি অফসর থে। হিম্মত মত্‌ হারিয়ে, সব ঠিক হো জায়েগা। উনকে কে ঘর মে দের হ্যায় ,অন্ধের নহি।
রাঠোর হাসে।
সান্ত্রী হাত বাড়িয়ে জ্বলন্ত বিড়ি গুঁজে দেয় ওর মুখে। ও ফুক্‌ ফুক্‌ করে টানে। মাঝে মাঝে দু/ এক পাইটও লুকিয়ে চুরিয়ে---। বলে- পি লিজিয়ে, দর্দ মহসুস নহি পড়েগা।
রাঠোর চুপ চাপ খেয়ে নেয়। হাসে। ভাবে এতটুকুতে কিই বা হতে পারে ওর । ও জেনে গেছে অত্যাচার যত বেশি হবে তত তাড়াতাড়ি রাত এসে নিয়ে যাবে ওকে । সেই খোয়াবের মধ্যে ফেলে সেবা করে যাবে সারারাত। ধীরে ধীরে ব্যথা সেরে গিয়ে শিথিল হয়ে পড়বে ওর শরীর।
এ খোয়াব কা কোই অন্ত নহি। বহত হি চওড়া হ্যায় ইসকা বিস্তার। রাঠোর ভাবে। শুধু তার নয় , আর্মি ট্রেনিং এর সময় সমস্ত জওয়ানদের বুকে গুঁজে গুঁজে দেওয়া হয় এহি খোয়াব। তিরঙ্গার সঙ্গে বাঁধা বাঁশ শরীরের ভেতর গেঁথে দিতে দিতে অফিসাররা চিৎকার করে বলে—জয় হিন্দ। সেই চিৎকার প্রতিটা শিরায় শিরায়, স্নায়ুতে স্নায়ুতে ছড়িয়ে যায়। ঘোর লেগে যায় দেশের মায়ায়।
উস দিনসে – হর রাত এক খোয়াব কি রাত। এ সিলসিলা কভি বন্ধ নহি হোতা –রাঠোর নিজের মনে বলে।

আজও সান্ত্রীর পেছন পেছন যেতে যেতে এসব কথাই ভাবছিল রাঠোর।
যেতে যেতে সান্ত্রী বার বার বলছিল- ক্যায়া জানে আজ ক্যায়া হোগা।
- যো হগা দেখা যায়েগা, সচনা ক্যায়া হয়। বতন কয়ে লিয়ে সবকুছ সহনে কে লিয়ে হম তৈয়ার হ্যায়।
-
সেদিন সারারাত ধরে চলেছিল টরচার। রাঠোরকে মারতে মারতে ওরাই হাঁপিয়ে উঠেছিল। শেষে আরো বেদর্দ হয়ে ওরা মুচরে ভেঙ্গে দিয়েছিল ওর ডানহাতটা।
রাঠোর উফ্‌ তক করেনি।
মারের চোটে যখনওর ডান হাতটা কাঁধ থেকে নেমে খল্‌ বল্‌, খল্‌-বল্‌ করছিল ঠিক তখনি, হ্যাঁ ঠিক তখনি ফিরসে অহি রোশনিবালি খোয়াব । খোয়াব মে দ্রাস সেক্টারের বন- বাঁদাড়, বরফ, পথরিলা সড়ক সব, সব ডুকরে উঠেছিল। চাঁদনি এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেঁদেছিল ওর বুকের ওপর, সারা দেশ যেন ওকে জড়িয়ে ধরে ওর ব্যাথার ওপর হাত বুলতে বুলতে লোরি গাইছিল—তারা রারুম, ও তারি রুম। সুরমই আঁখিয়ো মে, নান্‌হা মুন্‌হা এক সপ্‌না দে যা রে । রাঠোরের খুব ভালো লাগছিল। ও সেই দেশের বুকে মুখ গুঁজে কোনোমতে বলেছিল -- জয় হিন্দ , তারপর থেমে থেমে গেয়েছিল-
অ্যায় মেরে প্যারে বতন/ অ্যায় মেরে বিছরে চমন/ তুঝ পে দিল কুরবান-তুঝ পে ----দি—ল কু---র---বা---ন-----।