অলিন্দে কেতকী ছায়া

অনিন্দ্য বর্মন





৮ফুট বাই ৮ফুট। এই জুড়েই রাও আর শিউলির ঘর। সংসার। শিউলি রাওএর দ্বিতীয় বউ। প্রথম বউ রামাইয়ার খবর রাও ছাড়া কেউ জানে না। নিবাস দক্ষিণ ভারতের কোনও গ্রামে। রামাইয়ার কোনও সন্তান ছিল না। সন্তানের স্বপ্নেই রাওএর শিউলি সন্ধান।
শিউলি মা হতে পারেনি।
তার সারাক্ষণের ভয়, যদি রাও ছেড়ে দেয়!
তবু যেন কিসের টানেই, রাও ছেড়ে যায়নি। ২৫ বছর। ঠিকানা সেই ৮ফুট বাই ৮ফুট।

পাশেই মুরগিদিদার উঠোন। প্রায় ১কাঠা জায়গা জুড়ে তিনটে ঘর, চিলতে দালান এবং মাঝারি মাপের উঠোন। বিয়ের পর দু’ঘরে সংসার পেতেছে দুই ছেলে, বউমা এবং নাতি-নাতনিরা। তৃতীয় ঘরে জামাই তালা ঝুলিয়েছে, যাতে শালারা দখল করতে না পারে। মুরগিদিদার ঠাঁই উঠোনে। বৃষ্টিতে তেরপলের ছাদ। বাকি সময়টা খালিই থাকে। বাড়ির সবার আপত্তি। বাড়িটাকেও বস্তির মতো দেখায়।
এই উঠোনেই একসময় মুরগি পালা হত। পারিবারিক ব্যবসা। এইভাবেই বড় হয়েছে তিন ছেলে-মেয়ে। দিদার বয়স বাড়ার সাথেই মুরগিগুলো মরল। এখন জীবন মাধুকর।
আর এইসবই মামারবাড়ির বারান্দায় দাঁরিয়ে দেখত ছোট্ট অলিন্দ।

বড় হতে হতে, জীবন অভিশপ্ত হতে শেখায়। অলিন্দ আপাতত সেই বিদ্যালয়ে পাঠনরত। ব্যেক্তিগত শিক্ষিত জীবন আর অশিক্ষিত কর্মজীবনের মাঝে—এক স্বপ্নসন্ধানী।
অলিন্দর বাড়ির সামনের কেতকী গাছে হঠাৎই বসন্তের রঙ আসে। আসে নাম-না-জানা হলুদরঙা পাখি। সেই পাখি দেখতে দেখতেই একে একে এসে পরে সরস্বতী পুজো, দোল, নববর্ষ। রঙিন বোকা বাক্সে ক্ষণিকের জনপ্রিয়তা পায় ‘এসো হে বৈশাখ।’

জীবন একটা যুদ্ধ। মাঝে মাঝে শিউলি আর মুরগিদিদা যেন সেটা মনে করিয়ে দেয়।
মোম এবং বজ্রর এক অদ্ভুত বৈপরীত্য! একজন আলোকিত করে নিজের জীবন দিয়ে আর অন্যজন ক্ষণিকে বয়ে আনে অবিরাম শান্তির পূর্বাভাস।
আসলে দু’জনেই জ্বলে ওঠে নিভে যাবে বলেই।
অলিন্দ বুঝে নেয় এই বৈপরীত্যের নামই জীবন।
তাই বছরভর চেয়ে থাকে কেতকীর দিকে।
তার চাতকদৃষ্টির দায় বহন করে না কোনও ধূসর পাণ্ডুলিপি।
কবিতাও শান্তিতে ঘুমায় কোনও মরা ক্যানভাসে।

স্বপ্নের অন্তিম লগ্ন অনতিক্রম্য।
কেতকীর পাতায় পাতায় জ্যৈষ্ঠের উত্তাপ। অলিন্দের জীবনেও বয়ে চলেছে প্রখর দাবদাহ।
তবু ছায়া আছে, প্রাণ আছে।
স্বপ্ন পূরণ হলে আরও একটা স্বপ্ন এসে পড়ে।