নাম…অনিশ্চিত

পিয়াল রায়




এবার লিখতে হবে। স্বপ্নের কথাগুলো লিখে ফেলতে হবে এইবেলা। নইলে যদি হারিয়ে যায়? হারিয়ে যাওয়াটা আজকাল এতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, ভয় হয়, কোনোদিন হয়তো দেখবো আমিও ভ্যানিশ। তাতে অবশ্য কারো কিছু এসে যাবে না, কিন্তু আমার তো যাবে। আমার স্বপ্নগুলো কে লিখবে তখন? ভোর হয়ে আসছে। ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। আশ্চর্য এক জলঢোঁড়া সাপ একেবেকে গেল জঙলা নদীর গা ঘেঁষে। সাপের স্বপ্ন দেখা নাকি খুবই পূণ্যের। যে গৃহের মহিলারা সাপের স্বপ্ন দেখেন তারা খুবই পুণ্যবতী। সতীর পুণ্যে ঘর ভরে ওঠে ঐশ্বর্যে। অথচ কি যে অসহ্য দিনকাল পড়েছে, পাপপুণ্যগগুলো বদলে যাচ্ছে বেয়ারা রকম। স্বপ্নে সাপ এলে বুকে ঘাম জমে। ঘামের ভিতর নুনঝাল। কাউকে যে দেবো তারও উপায় নেই। তখন কন্ঠনালীতে কামড় বসায় ক্ষুধার্ত নেকড়ে। আমার তো সাধারন ভাতকাপরের স্বপ্ন নয়। সে বড় জটিল। ওখানে আমাদের ঝুপড়ির মায়া জড়িয়ে থাকে অষ্টপ্রহর। আকাশের তারা থেকে মাটিতে ফুটে থাকা হলদে ফুলগুলো,নিতান্ত নগন্য, অথচ মায়াময় জড়িয়ে রাখতে চায়। এত মায়ায় আমি বাঁচি কিভাবে? আমি সন্ন্যাসী। অতৃপ্ত আত্মার মতো ব্রক্ষ্মান্ডের আনাচকানাচ খুঁজে বেড়াই আমার আমিটাকে। কোথায় গেল? দেবতার সুচারু প্রাসাদে সে নেই। সঙ্গীতে নেই। তরমুজের ফালিতে নেই। এক বালতি গরম জলে নেই। তবে? আমার ইচ্ছে ছিল লালমুখো দৈত্য হওয়ার। স্বপ্ন দেখা হলনা বলে দৈত্য লুকিয়ে রইলো রূপকথার তোরঙ্গতেই।
কি হবে বলোতো পোশাক দিয়ে? পোশাকি জীবন দিয়ে? অভিজ্ঞতা চাই। কিসের? খাদের দিকে বয়ে যাওয়া নদীটার। টুকরো টুকরো কাচের মধ্যে প্রতিফলিত জীবনটার। দৃশ্য থেকে ক্রমাগত দৃশ্যান্তর। অভিশাপে ভয় নেই তাই পুনর্জন্ম চাই। স্বপ্ন আজকাল আমাকে সেই অভিশাপ এনে দেয়। মহাপাপের কোটর থেকে জাগরণের হাওয়া উত্তর সমুদ্র থেকে দক্ষিণের দ্রাক্ষাবনের দুয়ার দেয় খুলে। ভিতরে কারা যেন অকুন্ঠ মদ্যপানে মায়া নির্মাণ করে। যেদিন মৃত শিশুটিকে ঘিরে ভোজ জমানোর চেষ্টা করেছিলো কুটিল সাপের দল সেদিন থেকে সাপের স্বপ্ন মরে গেছে। এমনকি দুপুরের ভাতঘুম জুড়ে কারো রক্তমাংস খেলার মাঠ হয়ে এলেও ঘৃনা তৈরি হয়। ব্যর্থ সেতু। আঁতুর ঘরে অন্ধকার।গোঙানি স্বরে দীর্ঘজীবিনী রাংতা। আদিম বাগানে সাদা পাখিদের আর দেখা যাবেনা। সব মুঘ ঝাপসা। বিগত সময়ের নামে কোনো উইল নেই। কেউ নেই তাকে ধারন করে।গোটা জীবন ব্যয়ের পর বুঝতে পারি আসলে সবটাই ছিল ফাঁকি। ফাঁকের দিকে গড়িয়ে যাওয়া দু একটা পল বাদ দিলে বাকিটা শুধুই স্বপ্ন। যে স্বপ্নের কোনো আবিষ্কার নেই। কোনো একদিন নিশুতি রাতে তাই পাখিদের ফিসফিসানি জল হয়ে ঝরে যায় আলুথালু মেঘেদের দরজায়। আমার জন্মের একুশদিন পর যে স্বপ্নেরও জন্ম তা আর আমার সাথে থাকেনা। নিজে নিজে বাঁচবে বলে আমাকে ছেড়ে চলে যায় কোনো কোলাহলে। নিজের নিঝুম আস্তানায় আমি কবি হয়ে উঠতে থাকি। যে নিরন্তর জয়ের আকাঙ্খায় প্রথম সচকিত করেছিলাম চারপাশের ধোঁয়াদের আজ এতদিন পরে বুঝতে পারি ভয় থেকে, মনান্তর থেকে শেষমেশ পৌঁছে গেছি জীর্ণ তোরণের কাছে। মানে একরকম অভিজ্ঞতা থেকে অন্যরকম অভিজ্ঞতার দিকে যাত্রা।