স্বপ্নের আঠারো মাস

সেলিম মণ্ডল



মাস ছয়, বাবা আমার পাশের ঘরে ঘুমায়। দুই ঘরের মাঝে কেবল একটা গ্রিল। বাবা আমার কথা, আমি বাবার কথা স্পষ্ট শুনতে পাই। অথচ, কেউ কিছু না শোনার ভান করি। তবে রাত বাড়লে বাবা মাঝেমাঝে হাঁক দেয়, “এখনও ঘুমাসনি? ক’টা বাজল খেয়াল আছে?”। আধঘুমে বলে। কাঁচাঘুমে বলে। বলতে বলতে ঘুমিয়ে যায়। আমি রাত জেগে কাব্যি করি। ব্যথাদের পাহারা দিই। ব্যথারা আমাকে আশকারা দেয়। রাতের পর রাত জাগিয়ে রাখে। ঘুম কম হয় বলে স্বপ্ন আসে না। জেগে দেখা স্বপ্নগুলোকে নিয়ে দাবা খেলি। আমি রাজা সাজি। মন্ত্রী সাজি। হাতি হই। ঘোড়া হই।

খেলতে খেলতে ঢুকে যাই আমাজন। পেরিয়ে যাই হুবার্ড। আচমকা পাশের ঘর থেকে আওয়াজ আসে। তীব্র কান্নার আওয়াজ। শিশুর কান্নার আর্তনাদ। এই রাতে কে কাঁদছে! এই স্বর আমার চেনা। এই স্বর কোনো প্রতিবেশী শিশুর নয়। এই স্বর বাবার। বাবা কাঁদছে। ছেলে কাঁদে দেখা যায়। বাবা কাঁদে দেখেছে কেউ? আমি বলি, "কী হল? কাঁদছ কেন? শরীর ঠিক আছে?"। বাবা নিরুত্তর থাকে। মা উত্তর দেয়, "তোর আব্বা আজও স্বপ্ন দেখেছে।" সকালে জিজ্ঞাসা করি, "তুমি রাতে কী স্বপ্ন দেখ?"। চুপচাপ থাকে। আমার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর বলে, "কে বলল, স্বপ্ন দেখি? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়?"।

এই যে আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বসন্তের পিঠে নিজের মৃত শরীর বয়ে বেড়াই, সময়কে ঘড়ির পরিবর্তে টুপি পরাই- আমার কি কোনো স্বপ্ন নেই?

কিছুদিন আগে একটা স্বপ্ন বারবার রিপিট হত- আমি ছারপোকা হয়ে গেছি। কেড়ে নিচ্ছি সকলের রাতের ঘুম। সকলের জীবন বিভীষিকাময় হয়ে উঠছে। এখন দরকার এই অত্যাচার নির্মূল। কেউ কেরোসিন খুঁজছে, কেউ গরম জল... কেউ কেউ বেগন স্প্রে। কিন্তু কিছুতেই কোনো সমাধান নেই। বিরাট হিলের জুতো পরে সভ্যতা যেভাবে এগোচ্ছে, তারপরও এই হেরে যাওয়া সকলকে যেন মেন নিতে হচ্ছে। সবাই পালাচ্ছে। ক্রমশ জনশূন্য চতুর্দিক। শুধু আমি আমার কীটজীবন নিয়ে চাবুক ঘোরাচ্ছি। হাসছি। আর হাসির ভিতর পৃথিবীকে করে তুলছি তরল। জল নয়, কিন্তু গড়িয়ে যাবার গার্হস্থ্যতা ধনী করে করে তুলছে।

উপভোগ করছি এই স্বপ্ন। কিন্তু একা। এই 'একা' কার ভালো লাগে? জেগে থাকার উপায় খুঁজছি। এখন স্বপ্ন নেই। খুব জাগছি। বাবার স্বপ্নের ভিতর ঢুকে পড়ছি। হালুম, হালুম করছি। ছারপোকার মৃত্যু চেয়ে যারা একদিন ঈশ্বরকে নালিশ জানাত, ভিড় করছি তাদের দলে।

ঘুম আসবে? হয়ত, আসবে অ্যাম্বুলেন্স চেপে। যখন স্বপ্নরা কবিতার বিষ পান করে বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়বে। আমিও বাবার মতো শিশু হয়ে আঠারো মাসে বছর গুনব লক্ষ্মীছেলে হয়ে।