বুদবুদ

অলোকপর্ণা



ঘুমের মধ্যে আমি জলকে ভয় পাইনি। সুইমিং পুলের মেঝেতে পা ভাঁজ করে বসে চোখ খুলেছিলাম। একটু দূর অবধি সব দেখা গিয়েছিল, যেমন জীবন... তেমনই জলের মধ্যে একটু দূর পর্যন্ত গিয়ে আমার দৃষ্টি আটকে গেছিল, জলেই। খুব ধীরে মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিল বুদবুদ। হাল্কা, নরম, জীবনের মত ছোঁয়াচে বুদবুদ। জল সাঁতরে উপরে উঠে যাচ্ছিল, আমার বেঁচে থাকাটুকুর প্রমাণ হিসেবে। জলের মধ্যে আমি পা ভাঁজ করে বসেছিলাম।
প্রথম দিন জলে নামার আগে ট্রেনার বলেছিলেন, “সব কিছু ছেড়ে দিতে হবে, চেষ্টা করা চলবে না। বাকীটা জলই সামলে নেবে”। কিছুক্ষণ হাতড়ে বেরানোর পর হাল ছেড়ে দিতে টের পেলাম জল আমাকে নিচ্ছে না। ফিরিয়ে দিচ্ছে, উপরে উঠিয়ে দিচ্ছে। গভীরে যেতে দিচ্ছে না। জলের উপরে ভাসতে ভাসতে আমার বেবী পিসির কথা মনে পড়ল। একদিন বিকেলে বেবী পিসি পুকুরে নেমে আর উঠে আসেনি। জল বেবী পিসিকে নিয়ে নিয়েছিল। জল তো আরো কত কিছু নেয়, পুরীর সমুদ্রে জ্যোতির হাওয়াই চপ্পল ভেসে গিয়েছিল। জল ফেরত দেয়নি। মায়ের ফুলকরা কানের দুল ডুবে গেল আরব সাগরে, আর ফিরল না। শ্রীচৈতন্যদেব চলে গেলেন মহাপ্রস্থানে। জল খালি আমায় নিল না। ফেনার মত ফিরিয়ে দিয়ে গেল।

জ্যোতির সব স্বপ্ন মনে থাকে। ঘুম থেকে উঠে একটা সময় পর্যন্ত তার প্রথম কাজ ছিল আমাকে স্বপ্ন বলা। ওর স্বপ্নে বেশি কিছু থাকত না কোনোদিন। সাদামাটা পার্ক, রাস্তা, রান্নাঘর। কোনো গল্প ছিল না ওর স্বপ্নের। শুধু দেখার জন্যেই যেন দেখে যাওয়া। অথচ তার সবটা ওর মনে থাকত। অন্তত ঘুম ভাঙার ঘন্টা তিনেক অবধি। তার মধ্যেই ওর না গল্প, না কবিতা, শুধু শব্দ, শুধু দৃশ্য স্বপ্ন ও আমাকে শুনিয়ে ছাড়ত। তবে একেক দিন ও পুরো স্বপ্ন শেষ করার আগেই জেগে যেত। আমায় ফিসফিস করে ডেকে বলত, “আজকে স্বপ্নে বাঘটা এসেছিল”, জ্যোতির স্বপ্নে মাঝে মাঝে বাঘ আসত একটা। জ্যোতি তার কোনো নাম দেয়নি, এমনই সাধারণ ছিল সে। তবু স্বপ্নে তার বাঘ আসত। দুচোখ খুলে তাকিয়ে থাকত তার দিকে, ঝাঁপিয়ে পড়ত না। গর্জন করত না। শান্ত ভাবে তাকিয়ে দেখত। ওরকম শান্ত বাঘ জ্যোতির স্বপ্ন ছাড়া আর কোথাও নেই। তবু বাঘটাকে দেখার পর জ্যোতি ইচ্ছে করে জেগে যেত। আমাকে বাঘটার কথা বলার জন্য। অথচ বাঘটারও কোনো গল্প ছিল না। জ্যোতির স্বপ্নে বাঘটা শুধু শুধু আসত। জ্যোতির স্বপ্নে আসলে কোনো কিছুরই কোনো গল্প ছিল না। তবু জ্যোতি বলত, ওর দেখা স্বপ্ন সত্যি হয়েছে অনেক বার। আমাকে নিয়ে জ্যোতি স্বপ্ন দেখেনি কোনো। তাই আমার সত্যি- মিথ্যে কোনো কিছু হয়ে ওঠার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।
জলের মধ্যে বসে চোখ খুলে দেখলাম আমার নাক থেকে বুদবুদ বেরিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। আমার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে বুদবুদের আওয়াজ। আমি না চাইতেও শব্দ করে তারা উপরে উঠে গিয়ে বাইরের হাওয়ার সাথে মিশে যাচ্ছে। আমার মধ্যে থেকে শব্দ বের করে নিয়ে বুদবুদগুলো লুকিয়ে এসে পড়া রোদের মত উঠে যাচ্ছে। ওদের ধরে রাখা যাচ্ছে না।
ওর স্বপ্ন বলা হয়ে গেলে জ্যোতি জানতে চাইত আমি কি দেখেছি, মিথ্যে বানিয়ে বানিয়ে বলতাম ওকে। রাজার স্বপ্ন দেখেছি, ভুতের স্বপ্ন, খাওয়ার স্বপ্ন, গাছ, হাওয়া, বিড়ালের স্বপ্নের কথা ওকে বলতাম। জলের কথা বলিনি ওকে কখনো। চোখ বুজলে যে জলের মধ্যে গিয়ে বসি আমি রোজ, সেই জলের কথা জ্যোতিকে জানানো হয়নি। জ্যোতি জল ভয় পেত। জলে নামতেই শক্ত হয়ে যেত ওর হাত পা। ও শক্ত করে ধরে থাকত আমার হাত। ছাড়ত না। তবে তা জলের মধ্যেই। বাইরে এলে জ্যোতি আবার ঠিক হয়ে যেত। ফিসফিস করে বলে উঠত, “বাঘটা আজকে আবার এসেছিল।”
আমি জ্যোতিকে বলতাম বাঘ এলে ওরকম চট করে জেগে না যেতে, দেখতে বাঘটা কি করে, জেগে না গেলে বাঘটার একটা গল্প অন্তত জানা যাবে, এই আশায় আমি রোজ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে জ্যোতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম। দেখতাম ওর অক্ষিগোলক দুটো ঘুরপাক খাচ্ছে চোখের পাতার নিচে।
কিন্তু সেদিন জলের মধ্যে বসে চোখ খুলতেই দেখতে পেলাম শান্ত চোখটাকে। বুঝলাম একটু দুরেই জ্যোতির বাঘ আমার দিকে স্থির তাকিয়ে আছে। ঝাঁপিয়ে পড়ছে না, গর্জন করছে না, চুপ করে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার জলের মধ্যে জ্যোতির বাঘ কি করছে জানতে ইচ্ছে হল খুব। ধীরে ধীরে জলের মধ্যে উঠে দাঁড়ালাম। নাক থেকে বুদবুদ উঠে আসছে তখনও। লক্ষ্য করলাম, জ্যোতির বাঘটা নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। বাঘটা কি মরে গেছে তাহলে? মরে গিয়ে তারপর আমার জলের মধ্যে এসে গেছে? যে জল বেবী পিসিকে নিয়েছে, মায়ের কানের দুল, জ্যোতির চপ্পল, শ্রীচৈতন্য দেবকে নিয়ে নিয়েছে সেই জল জ্যোতির বাঘটাকেও গিলে খেল তাহলে। একটু একটু করে বাঘটার কাছে এসে দাঁড়ালাম, বাঘটা তখনও আমাকে দেখছে, কিন্তু আমি জানি বাঘটা আমাকে ছুঁতে পারবে না। যেমন জল পারেনি, জ্যোতি পারেনি। টের পেলাম আমার দম ফুরিয়ে আসছে, বুকে একটা চাপা ব্যথা... বাঘটা জিভ দিয়ে নিজের নাক চেটে নিল। আমি উপরের দিকে তাকালাম, আমার শেষ বুদবুদগুলো আমায় ফেলে উঠে যাচ্ছে, বাঘটাকে জলের ভেতর রেখে আমি উঠতে থাকলাম বুদবুদের পিছু পিছু। জলের উপরে উঠে এসে আমি নিচে তাকালাম, দেখলাম জ্যোতির বাঘটা তখনও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।

অথচ উপর থেকে জলে আমার নিজের ছায়া দেখার কথা,
উপর থেকে জলের মধ্যে আমার নিজেকে দেখার কথা।