ইয়েলো কার্ড

শৌনক চ্যাটার্জী

দূর থেকে দেখে মনে হত, নিঃসঙ্গতা রাজার জীবনকে কোনোদিনও ছুঁতে পারেনি। না, ছুঁয়েছিল হয়তো, কিন্তু তার লক্ষণগুলো কখনই বেশি সময়সাপেক্ষ হয়নি। আসলে রাজা অত ভাবতনা, আর অতীতটাকেও কাঁটাছেড়া করতনা। কারন সে নতুন সঙ্গী খুজে নিতে জানত, আর বাঁচতে ভালোবাসতো।
রাজার সকাল-বিকেলের ওতপ্রোত সঙ্গী ছিল একটা সাদা রঙের তার, যার দুটো শাখা ওর দু-কান থেকে বেরিয়ে মোহনা হিসেবে বেছে নিত বুকের কাছটাকে, তারপর অবলীলায় মিশে যেত প্যান্ট বা জামার পকেটে গিয়ে। মানে, গোদা বাংলায় ৮-৮০ যাকে হেডফোন কয়।
সঙ্গী মনে হয়েছিল কারন রাজার কোম্পানি যখন লক-আউট হয় ও বড় বড় তাবর ম্যানেজার দের কালঘাম ছুটিয়েছিল, কানে নিয়ে প্রতিনিয়ত “চ্যালেঞ্জ নিবি না শালা”। অপ্রতিরোধ্য রাজা, কোম্পানিও খুলেছিল। কিন্তু চাকরিটা থাকেনি ওর। জীবন তার পকেট থেকে হলুদ কার্ড বার করেছিল। রাজার গতি শিথিল হয়েছিল। হেডফোনটা তখনও তার সঙ্গ ত্যাগ করেনি। সে কিন্তু অবিরাম গতিতে শুনিয়ে যেত-

“আমাকে আমার মত থাকতে দাও
আমি নিজেকে নিজের মত গুছিয়ে নিয়েছি
যেটা ছিলনা ছিলনা সেটা না পাওয়াই থাক
সব পেলে নষ্ট জীবন।”

রাজাও মাঠ ছাড়ে নি। ধাক্কাটা ও সয়ে নিয়েছিল আস্তে আস্তে, গুটিয়ে নিয়ে নিজেকে। জীবনমুখী ওর সবচেয়ে প্রিয় ছিল, কারণ সে বাঁচতে ভালোবাসতো।
কিছু বছর আগের কথা। তখন অন্য ম্যাচ চলছে। রাজা তখন হেডফোনটাকেও অতটা সময় দিতনা। কারণ অবশ্যই সুস্মিতা। আর বেলঘরিয়া স্টেশন সাইডিং টা ছিল অনেকটা ওদের কাছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। যেখানে ওরা মিলিত হাতে গোধূলি দেখত, নির্জনতার সুযোগ নিয়ে আসত আরও কাছাকাছি আর প্রতিজ্ঞা করত আজীবন সমান্তরালভাবে হেঁটে চলার। সাইডিং তার নির্জনতাকে বজায় রেখেছিল অভ্যাসের নিয়মেই। তবে রাজা হারিয়েছিল সুস্মিতাকে মন কষাকষির জেরে, কিছুটা কালের নিয়মে অথবা সাবধানতার-অসাবধানতা, ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রশ্নকে সামনে রেখেই। সেই ম্যাচেও রাজা হলুদ কার্ড দেখেছিল।
জীবনে প্রথমবার পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার ইচ্ছা হয়েছিল রাজার, যেদিন বছরখানেক ঘুরেছিল। দুপুর থেকে বিকেল সে লাইনের ধারে বসেছিল। গোধূলি থেকে সন্ধে সে লাইন ধরে হেঁটেছিল।

“আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা
আর কতকাল আমি রব দিশেহারা।”

হেডফোনে বারংবার রুদ্ধশ্বাসে বেজেছিল। ট্রেনের হুইসিলটাও ধীরে ধীরে গানের তালে স্তব্ধ হয়ে গেছিল।
জীবনের প্রতিটা ময়দানে অবিরত চলতে থাকা ড্রিবলিং-এর খেলায় রাজা পরপর দু বার হলুদ কার্ড দেখে ফেলেছিল। পরপর দু ম্যাচে। এবার তার... সে শুয়েছিল দুটো পাশাপাশি রেল লাইন যেখানে একে-অপরকে ড্রিবল করে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক তার পাশে। লাইনের ধারে। মাঠের বাইরে। জীবন তাকে সাসপেন্ড করেছে।পরপর দু দুটো ইয়েলো কার্ড এবং...