বোকামানুষি

মাহরীন ফেরদৌস




বাসায় ঢুকেই বুঝতে পারলাম গরুর মাংস রান্না হচ্ছে। কসানো মাংসের ঘ্রাণে বাড়িঘর ডুবে আছে। মনে হয় প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পর আজকে বাসায় ভালো-মন্দ কিছু রান্না হচ্ছে। করিডোর দিয়ে যেতে যেতে এক ঝলক রান্নাঘরের দিকে তাকালাম। কে রান্না করছে? আম্মা নাকি মামী? দেখলাম মামী কাঠের বড় চামচ দিয়ে কড়াইয়ে প্রবল বেগে মাংস নাড়ছেন। কড়াই থেকে ধোঁয়া উঠছে। আমার পেটের ভেতরে খিদে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করে দিল। লম্বা পা ফেলে আম্মার ঘরের দিকে চলে গেলাম। আম্মা খাটে বসে কিবলামুখি হয়ে তসবিহ গুনছেন। আমি বাথরুমের দরজা যথাসম্ভব আস্তে খোলার চেষ্টা করলাম। আম্মা তাও টের পেয়ে গেলেন।

- মনু নাকি ? কখন আইছিস?
- এই তো।

এই তো বলে আমি বাথরুমে ঢুকে গেলাম। আম্মার সাথে কথা বাড়াতে চাই না। কী লাভ কথা বলে? কী বলব আমি? এরচেয়ে অল্প কিছু বলে সামনে থেকে সটকে পড়াই ভালো। বাথরুমে ঢুকে ঘামে ভেজা শার্ট খুলে ফেললাম। ভেতরের সাদা গেঞ্জিও ঘামে চুপচুপে হয়ে আছে। গেঞ্জি খুলে গলার কাছে তর্জনি দিয়ে ডলা দিলাম। ঘামের পানির সাথে কিছু ময়লা জমা হতে থাকল। সব জামা কাপড় খুলে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে গেলাম। রাজপথে যেমন হঠাৎ করে মুষল ধারে বৃষ্টি নামে তেমন করে হুড়মুড়িয়ে পানি পড়তে থাকল আমার গায়ে। মাথা নিচু করে আমি ভিজতে থাকলাম। ঠাণ্ডা পানিতে আরাম লাগছে। খুব আরাম। পানিতে ভিজে মনে পড়লো গোসল করে পরার জন্য কোন আলাদা কাপড় আনি নাই। তার মানে গোসল শেষ করে আবার ঘামে ভেজা, দুর্গন্ধওয়ালা কাপড় পরতে হবে আমাকে। আচ্ছা, পরব। সাবানের গন্ধের সাথে ঘামের গন্ধ মিলেমিশে এক হবে। মন্দ হবে না। ঘড়িতে কয়টা বাজে কে জানে! মামা কি বাড়িতে আসছেন নাকি আসেন নাই? মামা না আসলে ভালো হয়। গোসল করে রান্নাঘর থেকে চট করে প্লেটে কিছু খাবার নিয়ে নিজের ঘরে সরে যেতে পারব। কারও সাথে দেখা হবে না, কারও সাথে কথা বলতে হবে না। ভালো হবে। যদিও সত্যি বলতে আমার নিজের কোন ঘর নাই। বসার ঘরের পাশে আরেকটা করিডোর আছে, সেখানে একটা মোটা জাজিমকে বিছানা বানিয়ে থাকি আমি। বিছানার পেছনে একটা ভাঙা স্যুটকেসে আমার কাপড় থাকে। টুকটাক জিনিস থাকে। আমি শুধু রাতে বাসায় আসি। বসার ঘরের বারান্দায় রাত পর্যন্ত জেগে মোবাইল টিপি আর সিগারেট খাই। তারপর কিছু না কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে মামা নাস্তার টেবিলে বসার আগেই বাসা থেকে বের হয়ে যাই। কিন্তু আজকে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে খাওয়া সম্ভব না। অনেক খিদা পেটের মধ্যে। সারাদিনে কয়েক কাপ চা আর সিগারেট বাদে কিছুই খাওয়া হয় নাই। গত কয়েকদিনও চা, সিগারেট আর সিঙ্গাড়া বাদে কিছুই পেটে যায় নাই। আজকে এসে আর সহ্য হচ্ছে না। পেট ভরে খেতে হবে। এক প্লেট গরম ভাত, ঝাল করে রান্না করা গরুর মাংস ভুনা, দুইটা কাঁচা মরিচ আর একটু লবণ। আহ! আর কী লাগে? ভাবতে ভাবতে আমি আমার অভুক্ত পেটে হাত বুলাই। তারপর সাবানের কেস থেকে পাতলা হতে হতে দুইভাগে ভেঙ্গে যাওয়া সাবানের একটা টুকরা নিয়ে গায়ে ঘষতে থাকি।

আম্মা যদি তসবিহ গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে যেতেন ভালো হত। নইলে বাথরুম থেকে বের হলেই আবার আমার সাথে কথা বলতে থাকবেন। নানান প্রশ্ন করতে থাকবেন। আর প্রশ্ন না করলে আমাকে সামনে বসতে বলে আমার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকবেন। এক সময় দেখব উনি নাক টানছেন আর চোখ থেকে কলের পানির মত কান্না ঝরছে। ওইটা আরও ভয়ংকর। সেই কান্না দেখলে নিজেকে কুত্তা বিলাই মনে হয়। আজকে অন্তত নিজেকে কুত্তা বিলাই হতে দেখতে চাই না। খুব ক্লান্ত লাগছে আজকে। পেট ভরে খেয়ে একটা সিগারেট টেনে ঘুমাতে ইচ্ছে করছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে ঘুমাই না। ঘুমালেই শরীর ঝটকা মারে। চোখ আপনা আপনি খুলে যায়। তারপর আর ঘুম হয় না। আগে রাতে ঘুম না আসলে যখন বারান্দায় বসে থাকতাম শান্তা লেবু চা বানিয়ে দিত। অল্প একটু চা পাতা আর বেশি করে চিনি দেওয়া লেবু চা। রাতের বেলা সেই চা খেতে খেতে আরেকটা সিগারেট ধরাতাম। গুনগুন করে গান গাইতাম, “বিবাগী এ মন নিয়ে জন্ম আমার”। খুব ভালো লাগত তখন। আমাকে চা দিয়ে শান্তা কখনও অপেক্ষা করত না । পাশে দাঁড়াত না। চলে যেত আম্মার সাথে ঘুমাতে। এই বাসায় দুইটা মাত্র বেড রুম। একটায় থাকে মামা-মামী আর অন্যটায় আম্মা আর শান্তা। আগে আম্মাদের ঘরটা গেস্ট রুম হিসেবে ছিল। ছয় বছর আগে আব্বা যখন মারা গেলেন তখন আম্মা, শান্তা আর আমি এই বাসায় এসে উঠলাম। আমার জন্য তখন বসার ঘরে একটা সিঙ্গেল খাট পাতা হয়েছিল। সেন্টার টেবিলে লেখাপড়া করতাম। সিঙ্গেল বেডে ঘুমাতাম। শান্তার বয়স তখন মাত্র এগার। সে আম্মাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না। দিনরাত আম্মার সাথে আঠার মত আটকে থাকত। ছায়ার মত থাকত বললাম না কারণ, রাতের বেলা তো ছায়া থাকে না, শুধু দিনের আলোতে থাকে। শান্তা দিন নাই রাত নাই সারাক্ষণ আম্মার সাথে থাকত। আব্বার একটা নীল রঙের গেঞ্জি ছিল। হাফ হাতা গেঞ্জি। ফার্মগেট থেকে কেনা। কাঁধের কাছে একটু পোকায় কেটে ফেলেছিল। মারা যাওয়ার দিন সকালে আব্বা ওই গেঞ্জিটাই পরেছিলেন। আব্বাকে কবর দিয়ে আসার পর থেকে শান্তা বাসায় থাকলেই সেই নীল গেঞ্জি পরে থাকত। লিকলিকে শরীরের মেয়েটাকে বব কাট চুল আর নীল গেঞ্জিতে ছেলে ছেলে লাগত। আমার নিজেরই তখন মনে হত শান্তা আমার বোন না হয়ে ভাই হলে ভালো হত। রাস্তায় রাস্তায় ওকে নিয়ে ঘোরা যেত। মাঝরাতে সিগারেট কিনতে কিংবা চা আনতে মোড়ের দোকানে পাঠানো যেত। মেয়েমানুষ নিয়ে অনেক যন্ত্রণা। চাইলেই সবকিছু করা যায় না। সব জায়গায় পাঠানো যায় না। আমরা এ বাসায় আসার বছর খানেকের মধ্যে মামার বাসার অনেক কিছু বদলে গেল। ততদিনে আম্মার জমানো টাকা মামার ব্যাংকে গচ্ছিত হয়ে গিয়েছে। বেশ কিছু টাকা-পয়সা কেমন কেমন করে জানি খরচও হয়েছে। বসার ঘরে মেহমান এসে খাট দেখলে মামা-মামীর সম্মান কমে যায় বলে আমার খাট ভেঙ্গে আম্মার খাটের নিচে পাঠিয়ে দেওয়া হল।। শুধু জাজিমখানা করিডোরে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ঘুমানোর জন্য। ততদিনে মামার আচরণ বদলেছে। কথাবার্তায় কেমন যেন বাংলা সিনেমার চৌধুরী সাহেব ভাব। মামী দিন দিন আরও বেশি চুপচাপ হয়ে গেছেন। যেন বিয়ের দশ বছরেও সন্তান জন্ম দিতে না পারার অক্ষমতায় উনি মানুষ থেকে ভীরু হরিণীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। প্রথম প্রথম আমার খারাপ লাগত। আমি মামার সাথে অল্প স্বল্প করে কথা বলতে চেষ্টা করতাম। উনি ধমকাতেন। বদের হাড্ডি আর আর আপদ বলে ডাকতেন। কালের বিবর্তনের মত বদের হাড্ডি হয়ে গেল হারামজাদা, আপদ হয়ে গেল হারামির পুত। আমি কথা বন্ধ করে দিলাম। হু হা ছাড়া কথা বলি না। সিগারেটের নেশার সাথে যুক্ত হল একটু গাঁজা পাতা। আমার ধৈর্য্য বাড়ল। চুপ থাকা শিখে গেলাম। এড়িয়ে চলা শিখে গেলাম।

- মনু আর কতক্ষণ বাথরুমে থাকবি? বাইর হ।

আম্মার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। কল বন্ধ করে দ্রুত ভেজা গায়ে প্যান্ট আর শার্ট পরে বের হয়ে গেলাম। বের হয়ে দেখতে পেলাম আম্মা দাঁড়িয়ে আছেন। নীল সাদা সুতি শাড়ি পরা। লম্বা ঘোমটা মাথায়। আমি মাথা নিচু করে করিডোরের সামনে চলে আসলাম। একটা লুঙ্গি আর গেঞ্জি নিয়ে আবার বাথরুমে এসে ঢুকলাম। আম্মা এখনও দাঁড়িয়ে আছেন। মূর্তির মত। কাপড় বদলে বের হবার সময় বললেন।

- আধোয়া কাপড়গুলা বালতিতে রাখ। আমি কালকে ধুইয়া দিমু। গন্ধ আসতেছে।

আমি অবহেলায় বালতিতে কাপড় ছুঁড়ে দিলাম। ঘর থেকে বের হতে যাওয়ার সময় আম্মা ডাকলেন।

- একটু বইসা যা আমার সামনে।

- কিছু বলবেন?

- না, এমনি বস। কিছু খাইয়া আসছিস বাইরে থেকে? চোখ লাল ক্যান?

- আরে! কী আর খামু? ঘুম হয় নাই রাতে তাই চোখ লাল।

- এই কয়েকদিন ছিলি কই?

- রফিকের বাসায়। ও আসতে দিতে চায় নাই। আটকায়ে রাখছিল।

- তুই আমারে এমন কইরা একলা রাইখা গেলি...

এইটুকু বলে আম্মা আরও কিছু বলতে চান, কিন্তু কথা শেষ করতে পারেন না। ঘোমটার আড়ালে বাকি কথাটুকু, বেদনাটুকু ঢাকা পড়ে যায়।

আমি বুঝতে পারি উনি এখন কাঁদতে শুরু করবেন। মাথার ভেজা চুলে চিরুনির মত আঙুল চালাই। তারপর যান্ত্রিক স্বরে বলি,

- কাইন্দেন না। এত কান্না দেখলে আমার পালায়ে যাইতে ইচ্ছা করে।


আম্মা চুপ করে যান। এটাই মোক্ষম সময়। এখনই আমার উঠে চলে যাওয়া উচিৎ, কিন্তু উঠি উঠি করে আমি উঠতে পারি না। রাস্তার নিঃস্ব ফকিরের মত বসে থাকি। মাথার উপর ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে ফ্যান ঘুরছে। কেন যেন ফ্যানের এই শব্দকে বড় বিকট মনে হয়। মনে হয় যেন ফ্যানটা বলছে, এ্যাই, কথা কস না ক্যান তোরা? কথা ক? কথা ক?

রান্নাঘর থেকে চামুচের টুং টাং শব্দ হয়। আমার পেটের ভেতরে আবার খিদা জানান দেয়। আমি নিঃশব্দে আম্মার সামনে থেকে চলে আসি। রান্নাঘরে এখনও মামী ঘুরাঘুরি করছেন। ভেতরের ঘর থেকে টেলিভিশনের আওয়াজ আসছে। তারমানে মামা বাসায় চলে এসেছেন। আমি বারান্দায় চলে যাই। বেতের চেয়ারে বসে সিগারেট ধরাই। শান্তা থাকলে ওকে বলতাম এক গ্লাস ঠাণ্ডা সরবত দিয়ে যেতে। শান্তা নাই। আমার নিজেরও উঠে গিয়ে সরবত বানানোর ইচ্ছা নাই। বাতাসে গোটা তিনেক ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বাইরে তাকালাম। গলির মোড়ের চায়ের দোকানে তিন চারটা ছেলে আড্ডা মারছে। এদের মাঝে ঝাঁকড়া চুলের চিকনা ছেলেটা শান্তাকে কলেজে যাওয়ার সময় উত্যক্ত করত। বাজারের ফ্লেক্সিলোডের দোকান থেকে পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে ওর ফোন নাম্বার যোগাড় করে রাত বিরাতে ওকে কল করে ফোন সেক্সের কথা বলত। কয়েকটা নাম্বার ব্লক করেও নিস্তার পায় নি শান্তা। আমি বাসায় থাকলে যদি আজেবাজে নাম্বার থেকে ফোন আসত, তখন শান্তা আমাকে মোবাইলখানা দিয়ে বলত,


- দাদা, একটু হ্যালো বলে দিবা? পুরুষমানুষের গলা শুনলে কয়েকদিন ডিসটার্ব করবে না।
আমি তখন ওকে বলতাম,

- রাত আটটার পর মোবাইল বন্ধ করে দিবি। সকালে উঠে আবার অন করবি। এত মোবাইল ব্যবহার করার দরকার কি?

শান্তা যখন আমাকে ওই ঝাঁকড়া চুলের চিকনা ছেলের ব্যাপারে বিচার দিয়েছিল আমার তখন খুব মেজাজ খারাপ হয়েছিল। অনেকদিন আমি বলেছি কলেজে যাওয়ার সময় শান্তা যেন মাথায় স্কার্ফ পরে যায়। ও কথা শুনে নাই। কলেজ কি স্টাইলের জায়গা? কথা না শুনলে এসব তো হবেই। ওকে অবশ্য আমি ধমক দেই নাই। শুধু বলেছি,

- ঢাকা শহরে এখন এসব কমন ব্যাপার। ডানে-বামে না তাকিয়ে কলেজে যাবি। উলটা পালটা কিছু শুনলেও না শোনার ভান করে হজম করে নিবি। মাথায় স্কার্ফ দিবি।

আমার কথা শুনে শান্তা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর আম্মার কাছে চলে গিয়েছিল। শান্তা পাড়ার ছেলেদের নজরে পড়বে এটা স্বাভাবিক। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার আগের বছর থেকে ও দেখতে একটু বেশিই সুন্দর হয়ে গিয়েছিল। ফর্সা গায়ের রঙ, লম্বা চুল, মাঝারি স্বাস্থ্য, বড় বড় চোখ। আগের মত ছেলে ছেলে ভাব ছিল না। এইসব বৈশিষ্ট্য থাকলে সব ছেলেদের চোখে পড়ারই কথা। লাভের লাভ একটাই হয়েছিল ও স্কার্ফ পড়ে কলেজে যেত। তাতে অবশ্য ওকে পাড়ার ছেলেরা উত্যক্ত করা থামিয়েছিল কিনা আমার জানা নাই। আমি আর নিজে যেচে জিজ্ঞেস করতে যাই নাই। কিসের এত ঠ্যাকা?

খাবার টেবিলে প্লেট, বাটি রাখার শব্দ হল। বুঝতে পারলাম মামা রাতের খাবার খেতে বসেছেন। এরপর আবছাভাবে আম্মার কণ্ঠ শুনতে পেলাম। মামী খুব সম্ভবত আম্মার ঘরে ভাত তরকারি দিয়ে আসতে গিয়েছেন। আমি আরেকটা সিগারেট ধরালাম। একটু পর শুনতে পেলাম, মামা খেতে খেতে হালকা স্বরে মামীকে বলছেন,

- মনোয়ার হারামিটা বাসায় আইছে নাকি?

মামী হ্যাঁ সূচক কিছু বললেন হয়ত।

- আমার বাথরুমের কলের প্যাঁচ ঠিক নাই। কল পুরাটা বন্ধ হয় না। টিপটিপ করে পানি পড়তেই আছে। মনোয়াররে বলবা কালকে সকালে মিস্ত্রি আইনা কাজ করাইতে।

মামী কী বললেন শুনতে পেলাম না। কিছুক্ষণ পর মামা আবার বললেন, ‘গরুর মাংসটা জব্বর হইছে’। তারপর টেলিভিশনে সংবাদ পাঠের শব্দ ভেসে আসতে থাকল। আমি সিগারেটের শেষ অংশ বেতের চেয়ারের হাতলে চেপে ধরলাম। আগুন নিভে গেল। আশা করছি হাতলে পোড়া কালো দাগ পড়বে। আব্বা আগে এমন করতেন। সিগারেট খাওয়া শেষ করে আশেপাশের কিছু না কিছুতে সিগারেটের শেষ অংশ চেপে ধরতেন। কতদিন এই বদভ্যাসের জন্য আম্মা ঝগড়া করেছেন। কোন লাভ হয় নাই। আব্বার একটা সবুজ পাঞ্জাবি ছিল। সেই পাঞ্জাবি পরলে উনাকে খুব নায়ক নায়ক লাগত। যে কোন বড় দাওয়াতে গেলে উনি সেই পাঞ্জাবিটা পরতেন। একদিন পরতে গিয়ে দেখলেন সেই পাঞ্জাবিতেও সিগারেটের ফুটা। রাগে-দুঃখে আম্মা সেদিন দাওয়াতেই যান নাই। আম্মার রাগ ভাঙ্গাতে আব্বা আমাদের নান্নার বিরিয়ানি এনে খাইয়েছিলেন। সেই রাতের কথা মনে পরলে এখন খুব ভালো লাগে। অথচ আগে মনে হত এটা দুঃখের ঘটনা। দুনিয়ার সব মানুষের সাথেই কি আসলে এমন হয়? এক সময়ের দুঃখের ঘটনা পরের সময়ে সুখের স্মৃতি মনে হয়? নাকি শুধু আমিই এমন বেকুব?

পরপর দুইটা সিগারেট খেয়ে খিদা একটু কমে গিয়েছে। মনে মনে ভাবলাম মামা-মামী ঘুমালে একবারে ভাত খাব। বিড়ালের মত হালকা পা ফেলে আমি করিডোরে আমার বিছানায় চলে গেলাম। বাতি না জ্বালিয়ে মোবাইলটা চার্জে দিলাম। তারপর বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। এত যে ক্লান্তি শরীরে আগে বুঝি নাই। শোয়ার সাথে সাথে মনে হল শরীর ছেড়ে দিয়েছে। পিঠের হাড্ডি ব্যাথা করছে। গত কয়েকটা দিন খালি রাস্তায় রাস্তায় হেঁটেছি। রফিকের বাড়ির ছাদে সারা রাত জেগে বসে থেকেছি। ভাবনার বাসা খালি ছিল। ওর বাবা-মা দু’দিনের জন্য ঢাকার বাইরে ছিল। ও বেশ কয়েকবার ফোন করে আমাকে খালি বাসায় ডাকছিল। তাও যাই নাই। ভালো লাগছিল না। সাদা কাগজ মোমের আগুনে পুড়ালে যেমন জ্বালাপোড়া করে, তেমন করছিল বুকের ভেতর। ভাবছিলাম অনেক দিন বাসায় আসব না, কিন্তু আজকে সন্ধ্যায় হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বাসার সামনে চলে আসলাম, তা বুঝি নাই। আগে এই বাসার দরজায় শব্দ হলে সব সময় শান্তা দরজা খুলত। আজকেও মনে হচ্ছিল বেল বাজালেই দেখব শান্তা এসে দরজা খুলছে। অথচ এমন কিছুই হয় নাই। সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে দেখি ঘরের দরজা হালকা করে ভেজানো। বেল দিতে হয় নাই। বাসায় ঢুকে পড়তে পেরেছি। আম্মার ঘর থেকে খুব মৃদু শব্দ আসছে। এই মহিলা কি কান্দে নাকি কোরআন পড়ে কিছুই বুঝি না। একই রকম লাগে। ধুর!

আম্মার কান্না নাকি সূরা পড়ার শব্দ এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যেন চোখ ভারি হয়ে আসল নিজেও টের পেলাম না। ঘুম ভাঙল শান্তার ডাকে।

- দাদা, দাদা। খাইতে আস। টেবিলে খাবার দেওয়া আছে।

বুঝতে পারলাম শান্তা বাসায় ফিরেছে। আড়মোড়া ভাঙলাম আমি। হাত মুখ ধোয়ার জন্য আম্মার বাথরুমে গেলাম। আম্মা আমাকে দেখামাত্র খাট থেকে নেমে বললেন,

- মনু, উইঠা গেছিস? হাতমুখ ধুইয়া খাইতে বস। আমার ঘরে খাবার দিয়া গেছিল। আমি খাই না। এখন তোগোরে নিয়া একলগে খামু।

আমি বাথরুমে গিয়ে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটায় মুখ ধুলাম। ঘুমানোর কারণে খিদা বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে হাতি-ঘোড়া খেয়ে নিতে পারব। খাবারের ঘরে গিয়ে দেখলাম ভাতের গামলা থেকে ধোঁয়া উঠছে, বাটিতে গরুর মাংস ভুনা, ঘন ডাল, পিরিচে কয়েক টুকরা কাটা পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ। খুব শান্তি লাগল দেখে। আম্মা চেয়ারে গিয়ে বসলেন। আমিও উনার পাশের চেয়ারে বসলাম। আম্মা শান্তা কে ডাকলেন।

- শান্তা মা, কই গেলি? খাইতে আয়।

আমি প্লেটে ভাত নিতে যাচ্ছিলাম। আম্মা মৃদু ধমক দিলেন।

- বলছি না, একলগে খামু? শান্তা রে ডাক।

শান্তা কে ডাকতে ঘরে গেলাম আমি। শান্তা নাই। বসার ঘরেও নাই, আম্মার ঘরেও নাই, বারান্দাতেও নাই। ওকে খুঁজতে কই যাব বুঝে ওঠার আগেই শুনলাম ‘দাদা, দাদা’ বলে শান্তা ডাকছে। মামার ঘর থেকে আওয়াজ আসছে। আমি আর আম্মা দুজনেই সেইদিকে ছুটে গেলাম। ঘরে গিয়ে দেখি নীল কামিজ পরা শান্তা হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নিচে ঢুকার চেষ্টা করছে আর ডাকছে,

- দাদা, দাদা।

আমার মাথা কাজ করল না। খাটের নিচে কী? ওখানে যাচ্ছে কেন? আম্মা এদিকে চিৎকার শুরু করলেন,

- শান্তা, ও শান্তা তুই কই যাস? আমারে সাথে নিবি না?

নিচু খাটের ভেতরে ততক্ষণে শান্তা প্রায় তার অর্ধেক শরীর ঢুকিয়ে ফেলেছে। আমি এক ছুটে ওর এক পা ধরে ওকে টেনে বাইরে আনার চেষ্টা করতে থাকলাম। একচুলও নাড়াতে পারলাম না। তাজ্জব হয়ে গেলাম। এই মেয়ের গায়ে এত শক্তি আসল কই থেকে? শান্তা কুকুরের মত দুই হাত আর দুই পায়ে ভর করে নিজের অর্ধেকের বেশি শরীর অন্ধকার খাটের নিচে টেনে হেঁচড়ে নিয়েই যাচ্ছে। আমি এবার ওর দুই পা ধরে ওকে আটকানোর চেষ্টা করলাম। এবারও কিছু করতে পারলাম না। দেখতে পেলাম ওর পুরা শরীর একটু একটু করে খাটের নিচে হারিয়ে গেল। তারপর টের পেলাম খাটের নীচ থেকে কুলকুল করে পানির মত কী যেন বের হচ্ছে। গন্ধ শুঁকে মনে হল কেরোসিন তেল। আম্মা ততক্ষণে মরাকান্না শুরু করে দিয়েছেন।

-আমারে একলা ফালাইয়া কই গেলি মা? কই তুই? কই?

আমার বুক ধ্বকধ্বক শুরু করে দিল। আমি কোনরকমে মেঝের কেরোসিনের উপরে শুয়ে এবার খাটের নিচে তাকিয়ে শান্তাকে ডাকলাম,

- শান্তা, এই শান্তা। বাইর হ। বইন আমার। শান্তা...

খাটের নিচের অন্ধকারে মনে হল বিড়ালের মত ওর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। হঠাৎ আমার মনে হল, ‘আচ্ছা মামা-মামী কই?’ এমন সময় শুনতে পেলাম বাথরুমের ভেতর থেকে মামার আর্তনাদের আওয়াজ আসছে। সাথে সাথে বিদ্যুৎ চমকের মত সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। শান্তা তো মামার অত্যাচারেই আমাদের ছেড়ে গিয়েছিল। মামার জন্যই ওর প্রাণটা নষ্ট হয়েছিল। ওই লম্পটের চোখে গত ছয় বছরে শান্তা ছেলে ছেলে মার্কা মেয়ে থেকে ভরা শরীরের যুবতী হয়ে গিয়েছিল। নষ্ট নজর থেকে শান্তা নিজেকে বাঁচাইতে পারে নাই। এই জন্যই শান্তা এখন উনাদের শাস্তি দিতে চলে এসেছে। খুব সম্ভবত উনাদেরকে বাথরুমে আটকে ফেলেছে। কেরোসিন দিয়ে এই বাসা জ্বালায়ে দিবে এখন ও। তার মানে তো আমার হাতে সময় খুব কম। শান্তার তো আর বাঁচামরার কিছু নাই। আমাকে জলদি আম্মাকে নিয়ে এই বাসা ছাড়তে হবে। মামা মরে গেলে আমাদের ব্যাংকের টাকা আর উনার যা সহায় সম্পত্তি আছে সবই তাহলে আমার হয়ে যাবে। যেহেতু ব্যাটার কোন বাচ্চাকাচ্চা নাই, তাই দাবী করারও কেউ নাই। সবই হবে আমার। খুব দ্রুত আমার মাথায় হিসাব-নিকাশ চলতে থাকে। এখনই আমার আম্মাকে নিয়ে পালাতে হবে। এরপর আমাদের জীবন বদলে যাবে। স্বচ্ছলতা আসবে। আরাম আসবে। হয়ত নিজেদের একটা গাড়িও থাকবে। আমি প্রায় লাফ মেরে দাঁড়িয়ে যাই। আম্মার এক হাত ধরে উনাকে টানতে টানতে বাইরে বের হবার জন্য দরজার দিকে যেতে থাকি। বাথরুমের দরজা ভাঙার জন্য ভেতর থেকে লাথির শব্দ আসতে থাকে। আমি ভ্রুক্ষেপ করি না। আমাদের এখন পালাতে হবে। পালাতে হবে। মূল দরজার ছিটকিনি খুলে দরজা খুলতে গিয়ে দেখি, খুলছে না। দরজা বন্ধ। দরজার নব, ছিটকিনি সব ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখি। সব খোলা তাও দরজা খুলছে না। ভেতরে ভেতরে আতংক বাড়তে থাকে আমার। পেছনে তাকিয়ে দেখি মামার বেডরুমে লাল আগুন নাচছে। পা দিয়ে ধমাধম লাথি মারি দরজায়। দরজা খুলে না। অসহায়ের মত আম্মার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করি,

- আম্মা, দরজা খুলতেছে না ক্যান?

আম্মা লম্বা ঘোমটা টেনে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিছু বলেন না। আমি আবার দরজায় ঘুষি, লাথি মারতে থাকি, কিন্তু যত জোরে লাথি মারব ভাবি লাথিটা কেন যেন তত জোরে হয় না। আস্তে হয়ে যায়। কাঠের দরজা যেন লোহার দরজা হয়ে গিয়েছে। একটু কেঁপেও ওঠে না। হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখার তাপ অনুভব করতে পারি। বাঁচার তীব্র স্পৃহা থেকে আমি দশ আঙুলে দরজার কাঠ খামচে ধরি। চিৎকার করতে থাকি,

- কেউ দরজা খুলো। কেউ তো আসো... বাঁচাও... আমাদের বাঁচাইলে আমি টাকা দেব। সম্পত্তি দিব। কেউ বাঁচাও।

কেউ আসে না। কেউ না।

আগুনের তাপ আর ধোঁয়ায় আমার চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসে, এবং তখন আমার মনে পড়ে শান্তা আসলে আমাকেও ছাড়বে না। মামার অত্যাচারের কথা ও বহু আগেই আমাকে কয়েকবার আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়েছিল। আমি না বোঝার ভান করে থেকেছি। যার আশ্রয়ে আছি তার সাথে ঝামেলা করার মত সাহস বা ইচ্ছে কোনটাই আমার ছিল না। তাই শান্তাকে শুধু বলেছিলাম, ‘সাবধানে থাকবি। বাসায় থাকলে সব সময় যেন বুকের ওড়না ঠিক থাকে। প্রয়োজনে বাসায়ও মাথায় ঘোমটা দিয়ে থাকবি’। সপ্তাহ তিনেক আগে এক মাঝরাতে শান্তা আমাকে চা দিতে এসে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বলেছিল, ও অন্তঃসত্ত্বা। আমি হিংস্র হয়ে ওকেই ‘নষ্টা মাগি’ বলেছিলাম। ও আমার সামনে হাঁটু ভেঙ্গে বসে বলেছিল,


- দাদা, দাদা একটু সাহায্য করো। আমারে বাঁচাও...

আমি শব্দ করে একদলা থুথু ফেলে বলেছিলাম,

- বাজাইরা মাগিদের সাথেই এমন হয়। বুদ্ধি কইরা চলতে পারস না?

এর ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় শান্তা ছ’তলার ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। আমি আত্মদহনে কয়েকদিনের জন্য পলাতক হই। আমি জানি শান্তা আমাকেও ক্ষমা করবে না। ছেড়ে দিবে না। আম্মাকে হয়ত ছেড়ে দিত, কিন্তু সেই বোকা মহিলা শান্তার লাশকে বুকে জড়িয়ে ধরে বারবারই বলেছেন, ‘আমাকেও সাথে নিয়া যা। নিয়া যা’।

অর্থাৎ, এই বোকা মহিলা খুশি মনেই শান্তার কাছে চলে যাবেন। শুধু আমিই ধরা খেয়ে গেলাম। ঝাপসা চোখে চারপাশ দেখার চেষ্টা করতে করতে বুঝতে পারলাম আমি ঝলসে যাচ্ছি। শেষ মুহূর্তে শুধু একটা কথা মনে হল, আজকে আমার আর মাংস ভুনা দিয়ে ভাত খাওয়া হল না...