পুতুলের দিনযাপন

আফসানা বেগম



মেয়েটি রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। সরু কোমরের দুপাশে রেলিঙের চৌকোণ কাঠটা দুহাতে আঁকড়ানো। পাশে অনেক নীচে মাটি, কত নীচে কেউ জানে না- ঘোলা হতে হতে অদৃশ্য প্রায়। রিফাত মেয়েটির ঠিক সামনে এসে দাঁড়ায়। মেয়েটি যেন জানতই, প্রস্তুতই ছিল। তার হাত নড়ে না। রিফাত আরেকটু এগিয়ে যায়। মেয়েটির শরীর আর তার মধ্যে কোনো আকাশ তখন অবশিষ্ট নেই আর। শরীর, এমনকি চোখের মণিও নড়ে না মেয়েটির। তবে ঘটনার আকস্মিকতায় পাতলা জিব বের করে সে ততোধিক পাতলা ঠোঁটদুটো ভিজিয়ে নেয় কেবল। তার পরপরই তাকে দেখতে কেমন অবশ লাগে; যেন সোনার কাঠি কি রূপার কাঠি জাতীয় কিছু একটার ছোঁয়ায় তার জ্ঞান ফেরাতে হবে। মেয়েটির গালের উপরে রিফাত নিজের গাল রাখে। গালে গাল ছুঁয়ে পিছলে যেতে থাকে- একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে। চোয়াল উঁচু হয়ে থাকা তার মসৃণ গালের স্পর্শ রিফাত নিজের গালে পেতে থাকে; বারবার- কতবার, খেয়াল নেই। রিফাত তার ঘাড়ের দুদিকে দুহাত রাখে। ঘিয়ে রঙের সিল্কের জামার পিচ্ছিল কোমলতা তার হাতের তালুতে তখন। দুদিকে পাখির ডানার মতো মেয়েটির দুটো হাত নেমে গেছে, উন্মুক্ত। ঘি-রঙা জামার পাশে ভুট্টার রঙের হাতদুটোর উপরে কাপড় আছে কি নেই, ভাবতে ধাঁধা লাগে। যেন তাই দেখতেই রিফাতের মুখ এগিয়ে আসে আর মেয়েটির মুখের ঠিক সামনে এসে থমকায়। মেয়েটির প্রায় সমতল নাকের ছোঁয়া তখন তার ত্রিভুজ নাকের তীক্ষ্ন কোণটিতে। তারপর মুহূর্তের হিসেব আর নেই। মুহূর্তগুলো চুরচুর হয়ে ভাঙে কিংবা একটির উপর আরেকটি আছড়ে পড়ে। কিছু হতে না হতেই যেন কী হয়ে যায়... একটা কোনো শব্দ বা আলো নাকি অন্ধকার সমস্ত কিছু গিলে ফেলে। রিফাত লাফিয়ে উঠে বিছানায় বসে। সেল ফোনের অ্যালার্মের মিষ্টি শব্দ আকস্মিক ঝাঁঝালো লাগে তার কানে। কেবল কান না, যেন সমস্ত শরীরে ঝনঝনে আওয়াজ প্রবাহিত হতে থাকে। হাত বাড়িয়ে বন্ধ করতে করতে ধাতস্ত হয় রিফাত, হ্যাঁ, নিজেরই বেডরুম, পরিচিত চাদর গায়ে জড়ানো। ডানদিকের দেয়ালে বাচ্চাদের মনের মাধুরি মিশিয়ে আঁকা শিল্প। ক্রেয়নের আবোলতাবোল আঁচড়, বিন্দুমাত্র একাত্মতা ছাড়াই নিয়মমাফিক নদীর তীরে গ্রামের দৃশ্য। সামনের জানালার চেনা পরদা নড়েচড়ে দিচ্ছে সকালের ঝিরিঝিরি বাতাসের সংবাদ। জানালার বাইরে খোলা আকাশের ভগ্নাংশ আবছা আলোয় ভরে উঠেছে। বিছানায় বসে নীচে গুলশান লেকের গন্ধওঠা পচা পানি দেখা না গেলে ওদিকে অদ্ভুত অসীমতার আভাস। খানিক আগে দেখা রেলিঙের পাশে দাঁড়ানো মেয়েটির মুখ যেন ওদিকেই কোনোখানে। হুট করে ঘুম ভেঙে স্মৃতি থেকে সে হারিয়ে যায়নি। আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় ওখানেই কোথাও আছে দাঁড়িয়ে। পাশে অনেক নীচে অস্পষ্ট লোকালয়। রিফাত মাথার উপরে জোর দিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত ধারাবাহিকভাবে মনে করার চেষ্টা করে। মেয়েটি দাঁড়িয়ে ছিল, তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, রিফাত এগিয়ে গেল- তারপর ঠিক কী হলো? মেয়েটিকে কি সে চেনে? আগে কখনো দেখেছে? মঙ্গোলিয়ানদের মতো হলদে ছিল তার গায়ের রঙ। উপরে জমাট ধরা ঘিয়ের মতো অনুজ্জ্বল জামা- যেন গায়ে আছে কি নেই। মেয়েটির শরীর ছিল ঠিক ততটুকু যতটুকু না হলেই নয়। ভাবতে গেলেই একতাল তীব্র আলো চোখ ধাঁধিয়ে দেয় আর সেই আলোর ঘনঘটায় মেয়েটি হয়ে পড়ে অস্পষ্ট। রিফাতের মনে হয় চোখ বন্ধ করে ভাবলে হয়! দুটো চোখ বুজলেই তো তৃতীয় নয়ন। সেই নয়নকে ফাঁকি দেয় কার সাধ্য! সামনে থেকে আলো সরিয়ে অন্ধকারের কোনো গহ্বরেরর শেষ প্রান্তে হয়ত মেয়েটিকে পাওয়া যাবে, রেলিঙে হাত রেখে সে স্থির তাকিয়ে থাকবে রিফাতের দিকে...
‘সে কী! বসে বসে ঘুমাচ্ছ নাকি? রেডি হবে না?’
এই শব্দটা খানিক আগে ফোনে বেজে চলা অ্যালার্মের চেয়েও কর্কশ। রিফাতের বন্ধ চোখ এক ঝটকায় আলোর দিকে উন্মুক্ত। চেপে রাখা চোখের পাতায় অপরিণত স্বপ্নের বাকি অংশ দেখার চেষ্টা নিমেষেই হাওয়া। ঘুম ভেঙে না হারালেও দীপার তাগাদায় সেই হলদেমতো মেয়েটি শেষ পর্যন্ত হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। দীপা কথা বলতে বলতে যেমন দ্রুত ঘরে ঢুকেছিল, আলমারি মন্থন করে কিছু একটা হাতে নিয়ে তেমনই বেগে বেরিয়ে যায়। খাবার ঘর থেকে ভেসে আসা গলা শোনা যায়, ‘কই, ওরা রেডি তো, আসো না...’
স্বপ্নের ঘোরের কারণেই হোক বা ঘুমঘুম ভাব জড়িয়ে ধরার অবসরে, রিফাতের সত্যিই সেদিন বাইরে আসতে মিনিট সাতেক দেরি হয়ে যায়। বাচ্চাদের ঘাড়ে ভারি ব্যাগের বোঝা চড়িয়ে দিতে দিতে দীপার বিরক্ত গলা শোনা যায়, ‘কত রাত পর্যন্ত কাজ করি সেটা তো অজানা নয় তোমার। দেরিই যদি হবে তবে আমি কাকডাকা ভোরে উঠব কেন বলো তো? আর এদেরইবা কেন ওঠাব?’
দীপা যেমন ব্যস্ততার খাতিরে অন্যদিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, রিফাতও তেমনি বাচ্চাদের হাত ধরে এগোতে এগোতে আরেকদিকে মুখ করে ‘স্যরি’ বলে। জীবনের আরেকটা সকাল শুরু। একঘেয়েমির ঠেলায় পা চলতে চায় না। ফকফকে সাদা-নীল স্কুলের পোশাকের উপরে উঁচু করে রাখা বাচ্চাদের কচি মুখগুলোর দিকে তাকালে অবশ্য সকালটা আরেকরকম হয়ে যায়। শুধু বাঁচতে ইচ্ছে করে তখন; মন বলে, জীবন সুন্দর! দুদিক থেকে নরম হাতদুটো হাতে আসতেই রিফাতের ঘুম ঘুম ভাব ছুটে পালায়। গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিতেই গান বেজে ওঠে...
ঘুম ভেঙে তাই শুনি যবে দীপ-নেভা মোর বাতায়নে
স্বপ্নে- পাওয়া বাদল-হাওয়া ছুটে আসে ক্ষণে ক্ষণে-
স্বপ্নে পাওয়া বাদল হাওয়া? বাহ্! রিফাতের মনটা হুট করেই ফুরফুরে হয়ে যায়। সে-ও তো স্বপ্নে পেয়েছে, কী যেন পেয়েছে- আলো, হ্যাঁ, আলোই হবে। তাই তো কেমন যেন আলো আলো লাগছে সব! দীপা কথা বলে বেশিরভাগ কর্কশ স্বরে আর শোনার সময় শোনে রবীন্দ্র সঙ্গীত। নানানরকম বৈপরিত্য নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে এটা ভাবতে রিফাতের মাঝেমধ্যে মজাই লাগে। প্রায় প্রতিদিন সকালে স্টার্ট দিলে গাড়িতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডি বাজতে থাকে। যে কোনো গানের মাঝখান থেকে শুরু হয় বরাবর। রিফাতের অভ্যাস না থাকলেও বাচ্চাদের স্কুলের বাসে উঠিয়ে দিয়ে আসতে আসতে গোটা দশেক গান শোনা হয়ে যায়। মন্দ না। এই গানগুলোতে একরকমের সম্মোহনের মতো ব্যাপার আছে। যখন বাজতে থাকে তখন কান নাকি মন যেন গানের ওঠানামার দখলে চলে যায়। বাকি যা থাকে, চোখ সেটুকুকে কাজে লাগিয়ে রাস্তা ধরে এগোতে থাকে। বাচ্চাদের সঙ্গে টুকটাক কথা চলে, রাস্তার উলটো দিক থেকে এগিয়ে আসা বেপরোয়া গাড়িকেও পাশ কাটানো যায়। তবে মন থাকে পুরো দখলে; গানের দখলে। দীপাকে কথাটা বলাতে একদিন সে বলেছিল, ‘বাণীনির্ভর গানের এই এক ব্যাপার। ভালোমতো শুনতে গেলে তুমি ইনভলভড হয়ে পড়বেই।’ রিফাতের বলতে ইচ্ছে করেছিল যে সে তো আর পিছনের সিটে আরাম করে বসে শোনে না, তাই গাড়ি চলতে চলতে গানে তার অত মনোযোগী হওয়া চলবে না। কিন্তু বলতে পারেনি। এসব গানের ব্যাপারে দীপার সংবেদনশীলতা যে কোনো কিছুকে হার মানায়। তার বক্তব্যের উলটো কিছু বললে বিরাট ফিরিস্তি শুনতে হবে। কলেজ জীবনে ছায়ানটের রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্লাসে প্রথম-দ্বিতীয় হতো সে। রমনার বটমূলে একক গানও গেয়েছিল বার দুয়েক। সেসব এখন আফসোসের স্মৃতি। কথা উঠলেই সংসার আর ডাক্তারি নিয়ে ক্ষোভের ফোয়ারা ছুটবে। দীপার ব্যাপারটা অবশ্য এমনই। দেয়ালে টাঙানো গায়ে-হলুদের ছবিতে নতমুখী ছিপছিপে দীপাকে দেখে কেউ যদি উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘ও মা, আপনি এত্ত সুন্দর ছিলেন!’ দীপা প্রশংসা অগ্রাহ্য করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলবে, ‘বিয়ে, বুঝলেন? বিয়ে হলো গিয়ে একটা অভিশাপ।’ বিয়ে করেই তার শরীর গেছে, গান গেছে। তার আরেক শত্রু হলো ডাক্তারি। এই পেশায় থাকলে অন্য কিছুই করা যায় না। রিফাত একবার মিনমিন করে বলেছিল, ‘যারা গান করেন তারা কি কেউ বিবাহিত নন? তা ছাড়া, ডক্টর অরূপ রতন চৌধুরির গান শোননি তুমি?’ দীপা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘বিয়ে করতে না করতেই কারো দু দুটো বাচ্চা হয়ে যায়নি, বুঝেছ? আর তুমি বলছ ডক্টর অরূপ রতনের কথা, দাঁতের ডাক্তারদের কি পেশেন্টের ওয়াটার ব্রেকিঙের খরব পেয়ে মাঝরাতে ক্লিনিকে ছুটে যেতে হয়? গাইনি হলে দেখা যেত। দলে দলে পেট-ফোলা মহিলারা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসছেন আর পঙ্গোপালের মতো বাচ্চা জন্মে চলেছে। আমার মতো এক সন্ধ্যায় পরপর চার-পাঁচটা সিজারিয়ান অপারেশন সেরে তারপর চুপটি করে বসে গান গেয়ে দেখাত কেউ...!’ এরকম সময়ে বাধ্য বাচ্চার মতো দীপার কথায় ‘তা ঠিক তা ঠিক’ বলে মাথা নাড়াতে থাকে রিফাত। কখনো গভীর ভাবনায় পড়ে যায়, আসলেই তো, এত বাচ্চা জন্মাচ্ছে কেন? সরকার আগে বলত, ‘দুটো সন্তানই যথেষ্ট’। এখন কেন যেন ভয়ে দুটোর কথাও বলে না। চীনের মতো ত্রাসের দরকার ছিল, দ্বিতীয় সন্তান হলেই খুন। তবেই হয়ত দীপার মতো ডাক্তাররা খানিক হালকা হতো। চাই কি মনের সুখে গান গাইলেও গাইতে পারত। সে যা হোক, রিফাত গাড়িতে বাজতে থাকা গানের দিকে মন দেয়। সাগর সেন নাকি চিন্ময়, যিনিই হোন, তার কণ্ঠস্বরও খানিকটা সম্মোহিত করে ফেলে। তবে ড্রাইভারকে রিফাত বারকয়েক বলেছিল যে গাড়ি রাতে বাড়িতে পৌঁছলে এসি অফ করতে হবে, সিডি প্লেয়ারও অফ হওয়া চাই। ড্রাইভারের মনে থাকে না। রাত একটা-দেড়টা পযন্ত দীপাকে ক্লিনিকে আনা-নেয়ার ডিউটি সেরে সে যখন ফেরত আসে, কোনোরকমে গাড়ি রেখেই বাড়ির দিকে রওনা দেয়। পরদিন আসতে আসতে দুপুর একটা, তার আগে দীপার তাকে লাগে না। ওদিকে রিফাত ততক্ষণে অফিসে। তাই ড্রাইভারকে আর মনে করিয়ে দেয়া হয় না রিফাতের। তবে আজ সেজন্য কৃতজ্ঞই লাগে- গাড়ি স্টার্ট দিতেই গানের মাঝপথে, স্বপ্নে-পাওয়া বাদল-হাওয়া... দারুণ ব্যাপার! রিফাতের মাথায় ঘুরতে থাকে বিষয়টা।

স্বপ্ন আবার তার মাথা দখল করে। একটা বিষয় সে বোঝে না, কাউকে কাউকে কখনো বলতে শুনেছে ঘুমানোর আগে কিছু ভাবতে ভাবতে ঘুমোলেই স্বপ্নে তা দেখা যায়। রিফাতের খুব দেখতে ইচ্ছে করে বাবাকে। ষোলো বছর হয়ে গেল বাবা চলে গেছেন। গেছেন এমন কোথাও যেখানে চিঠি যায় না, ফোন নম্বরও নেই। রিফাত গভীরভাবে বাবাকে নিয়ে ভাবে। ঘুমের আগে বেশিরভাগ দিনে বেশ আয়োজন করেই ভাবতে থাকে। কিন্তু কখনো বাবাকে স্বপ্নে দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। অথচ এর মধ্যে আজ কোত্থেকে এসে জুটেছে এক হলদে মেয়ে আর আকাশের মতো উঁচু কোন এক বারান্দা। এমন কোনো জায়গা কি মঙ্গোলিয়ান কোনো মেয়ের মুখ নিয়ে রিফাত ভুলেও কখনো ভাবেনি। তবে সে বিশ্বাস হারাবে না। রাতের পর রাত কায়মনে ভাবতে থাকবে বাবাকে। কতদিন দূরে থাকবেন বাবা? একদিন না একদিন দেখা দিতে আসতেই হবে তাকে। ভাবতে ভাবতে মুচকি হাসে রিফাত- হলদে মেয়েটিকে নিয়ে কোনো কোনো রাতে ভাবলেও মন্দ হয় না!
বাড়ি ফিরে রিফাতের এত ক্লান্ত লাগে যে মনে হয় সোজা বিছানায় যেতে পারলে বেশ হয়। দীপা অবশ্য এরই মধ্যে টানটান করে বিছানা গুছিয়ে ফেলেছে। খাবার ঘরে আর রান্নাঘরে বাচ্চাদের খাওয়ানো আর টিফিন দেয়া নিয়ে যেটুকু এদিক-ওদিক হয়ে গেছিল, সব টিপটপ। দীপা পারেও। এমন চটপটে আর ছটফটে কারো পক্ষে চুপটি করে বসে গান গাওয়া এক ঝক্কিই বটে। দিনেদুপুরে গোছানো বিছানায় গা এলিয়ে দিতে কেমন সংকোচ লাগে রিফাতের। তা ছাড়া সকাল সকাল আলসেমির মানে নেই। বরং অফিসের জন্য একটু আগেভাগেই তৈরি হয়ে যাওয়া যেতে পারে। নইলে প্রায়ই অফিসের গাড়ি আসার পরে তাকে গরম চায়ে দু’চার চুমুক ঠান্ডা পানি ঢেলে ঢকঢক করে খেয়ে যেতে হয়। তৈরি হতে না হতেই দীপা এসে বলে, ‘শোনো, আজ কিন্তু বাবলির গায়ে হলুদ। বাচ্চাদের নিয়ে সাতটার দিকে চলে যেও। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব। আর বাচ্চাদের কাপড় ওদের ঘরে পাবে। দেখবে সামনেই হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে...’
‘বাবলি মানে তোমার ওই মামাতো বোন?’
‘তো আর কে? বিয়ের এত বছর হলো তবু আমার আত্মীয় স্বজনের নামধাম মুখস্ত হলো না তোমার। তোমার দুঃসম্পর্কের কারো বাড়ির ফিরিস্তি জানতে চাও তো আমার কাছে, দেখ কেমন গড়গড় করে বলে দিই।’
‘না, মানে, তুমি নিজে যাচ্ছ না, তবে আমি আর সেখানে গিয়ে কী করব?’
‘আমি যাব তো, বিয়ে আর বউভাতে যাব। আজকাল বিয়েতে ব্যাচেলর পার্টি থেকে শুরু করে হানিমুন পার্টি পর্যন্ত সাত-আটটা অনুষ্ঠান। সবটাতেই দাওয়াত আছে। আমার পক্ষে এতবার যাওয়া সম্ভব, বলো দেখি?’
‘তবে আজ আর কী দরকার যাওয়ার?’
‘দরকার আছে। আমার সিরিয়াস রোগী আছে কিন্তু মেয়ের গায়ে হলুদ ইম্পর্ট্যান্ট, বুঝেছ? বাড়ি থেকে একজন গেলেই চলে। আর হলুদে সব হিন্দি গানের নাচটাচ হবে, বাচ্চাদের আনন্দের কথাটা ভাববে না তুমি?’
‘আচ্ছা, ভাবলাম’, মুখ বেজার করে বলে রিফাত। সন্ধ্যাটা গেল। ভেবেছিল আজ ফিরে এসে একটা হরর সিনেমা দেখবে। অফিস থেকে ফেরার পথে সিডি কিনে এনেছে কাল। বহুদিন হরর সিনেমা দেখা হয় না। রিফাতের প্রিয়। তার ভয় পেতে মজা লাগে। হরর সিনেমা দেখার পরে ঠিকমতো ভয় না লাগলে অবশ্য ভীষণ বিরক্ত লাগে তার। ডিরেকটরকে মারতে ইচ্ছে করে তখন। স্কুলের শেষের দিকে তারা কয়েক বন্ধু মিলে যেমন দেখা শুরু করেছিল অ্যাডাল্ট সিনেমা। বেছে বেছে ভিডিও ক্যাসেট আনা হতো। দোকানে গিয়ে চাইতে মাঝেমধ্যে মুখে বাধত। বিশেষ করে তখন দোকানের কাউন্টারে যদি বয়স্ক কোনো লোক থাকত। সোবহানবাগের ভিডিও কানেকশনে গিয়ে একদিন দাঁতে দাঁত রেখে টেনে আর চিবিয়ে রিফাত বলেছিল, ‘একটা অ--সামাজিক ছবি হবে?’ পিছন থেকে আরেক বন্ধু কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে ফিসফিস করে বলেছিল, ‘ওই তুই কী বললি, সামাজিক নাকি অসামাজিক? ঠিক করে বল।’
‘যাচ্ছ তাহলে। গুড’, দীপা খুশি হয়। বলে, ‘শোনো, গেলে তোমার ভালোই লাগবে। তোমাকে তোমার শালা-শালিরা কিন্তু বেশ পছন্দ করে।’
‘ছোটে না কি হাঁটে না কাউকে যে কাটে না ধরনের স্ত্রৈণ লোকদের সব শালাই পছন্দ করে’, বিতর্কহীনভাবে একমত হবার মতো নির্লিপ্ত মুখ করে বলে রিফাত। দীপার মুখ থেকে তৃপ্তির হাসি হুট করে মিলিয়ে যায়। তার বদলে রিফাতের দিকে চোখ গোল গোল করে তাকায় সে। রিফাত ব্যাগ হাতে দ্রুত বেরোয় অফিসের পথে। ইন্টারকমে অফিসের গাড়ি আসার খবর অবশ্য তখনো আসেনি।
সে যাত্রা উতরে গেলেও বিকেল থেকে দীপা দুবার ফোন করে বাচ্চাদের নিয়ে রিফাতের গায়ে হলুদে যাওয়া নিশ্চিত করে। সেখানে গিয়ে রিফাতের অবশ্য লাভই হয়। প্রথম সে জানতে পারে যে তার মেয়েদের নাকি হিন্দি গানের নাচ শেখার স্বপ্ন ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। আশ্চর্য চোখে দেখে আট বছরের ইরাম আর ছয় বছরের ইনকা অনায়াসে দেবদাস সিনেমার নাচ নেচে চলেছে। বাড়িতে নাকি বহুবার প্র্যাকটিস করে গেছে তারা। পেশাদারীর মতো নাচ দেখে রিফাত অবাকই হয় খানিকটা। সে রাতে বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে কেন যেন ঘুমই আসতে চায় না রিফাতের। কখনো মনে হয় চোখ লেগে আসে আবার মাথা থেকে পায়ের বড়ো আঙুল অব্দি ঝাঁকুনি দিয়ে চোখ খুলে যায়। মনে হয় বিছানাটা একটা সুরঙ্গের মুখ, এই বুঝি শরীরটা পিছলে গেল তলিয়ে। এপাশ ওপাশ করতে করতেই দীপা চলে আসে। প্রতিদিনের মতোই নিশব্দে কাপড় বদলে অন্ধকারে পা টিপে টিপে বিছানায় আসে সে।
‘দীপা...’
‘সে কী! এখনো ঘুমোওনি?’
‘ঘুম নেই কেন যেন আজ।’
‘তুমি ভালো আছ, দীপা?’
‘মানে? আমার আবার কী হলো?’
‘না, এমনি। এত রাতে এলে...’
‘এ আর নতুন কী। আজ একটা ক্রিটিক্যাল কেস ছিল। রোগী মারাত্মক এক্লামশিয়ার দিকে রওনা দিচ্ছিল। আরেকটু হলে বাঁচানো যেত না। বাইরে আবার রোগীর মামা, সরকারী দলের এমপি, পায়চারি করছিলেন। পান থেকে চুন খসলে কাল পেপারে নিউজ হবে। ভাবছিলাম রাতটা ক্লিনিকেই থেকে যাব কি না।’
‘তো, চলে এলে যে?’
‘ডিউটি ডক্টর বললেন জানাবেন। তা ছাড়া ডেলিভারির পরে পেশেন্টকে স্টেবল দেখলাম। বাদ দাও, গেছিলে বাচ্চাদের নিয়ে?’
‘হুম। ওরা তো দারুণ নাচে, দীপা!’
‘হ্যাঁ, সারা বিকাল এই প্র্যাকটিস চলে। তুমি তো তখন অফিসে। কে মাধুরি আর কে ঐশ্বরিয়া এই ঝগড়া আমাকে মেটাতে হয়। নাচের মাস্টার রাখতে বলেছে। রাখব। আমার গান হয়নি, ওদের নাচটা হোক অন্তত। কারো না কারো স্বপ্ন তো সফল হওয়া উচিত, কী বলো?’
দীপার পুষে রাখা কষ্টের দিকে আলাপ যাচ্ছে দেখেই হয়ত রিফাত প্রসঙ্গ বদলায়। কিংবা মাথায় তার যা ঘুরছে তাই বেরিয়ে আসে।
‘আচ্ছা, দীপা, তুমি স্বপ্ন দেখ?’
‘আমার নিজের আর কী স্বপ্ন থাকতে পারে?’
‘আরে, আমি ওই স্বপ্নের কথা বলছি, যা ঘুমিয়ে দেখতে হয়।’
‘আমার ঘুমইবা কতটুকু, এত রাতে ফিরে বিছানায় পড়লেই ঘুম। ওসব স্বপ্নটপ্ন দেখি না আমি।’
রিফাত হতাশ হয়। দীপা প্রায় যন্ত্র হয়ে গেছে। কিন্তু এটা মুখে বলা যাবে না। বললে তার অভিযোগ আর হতাশা আরো চরমে উঠবে। রেলগাড়ির মতো বিবরণ চলবে। পুরো রাতের ঘুম হারাম তারপর। কিন্তু খানিক পরে দীপাই আবার কী মনে করে বলা শুরু করে।
‘তবে হ্যাঁ, দুপুরের খাবার পরে হঠাৎ যদি নিজের অজান্তে সোফায় বা বাচ্চাদের ঘরে ঘুমিয়ে পড়ি, তখন স্বপ্ন দেখি মনে হয়, বুঝলে?’
‘তাই? কী দেখ?’ উদগ্রীব হয়ে ওঠে রিফাত।
‘এই তো সেদিন দেখি পুরো শিফট কাজ করলাম। সাকসেসফুল সব অপারেশন হলো। পুরো টিম খুশি। পেশেন্ট আর তাদের আত্মীয়রা দেবশিশুর মতো বাচ্চা কোলে নিয়ে আমাকে হাসিমুখে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। কাজ সেরে ক্লান্ত হয়ে আমি বাড়ির পথে রওনা দিলাম আর তখনই ঘুম ভেঙে গেল। বোঝো, কেমন বিরক্তিকর।’
‘বিরক্তির কী হলো? পজিটিভ স্বপ্ন।’
‘কীসের পজিটিভ? ঘুম ভেঙে দেখি ক্লিনিকে যাবার সময় হয়েছে। একটা আস্ত শিফট কাজ মোটে শেষ করলাম, শরীর ভেঙে আসছে, আর তখন নতুন আরেক শিফট শুরু হলো, কোনো মানে হয়?’
বালিশে মুখ চেপে সামান্য হাসতে হাসতে হঠাৎ হো হো করে হাসতে শুরু করল রিফাত। দীপা অবাক হয়। উঠে বসে অন্ধকারে রিফাতের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘অ্যাই, তুমি রাত দুপুরে এভাবে হাসছ কেন?’
হাসি বন্ধ করে রিফাত বলে, ‘আচ্ছা, এত কষ্টের কাজ কেন কর, দীপা?’
‘ওই যে, স্বপ্ন, আর কী?’
‘কার স্বপ্ন!’
‘কেন, বাবা-মায়ের? মা বলেছিল অ্যাপ্রন পরলে দেখতে সুন্দর লাগে, ডাক্তার হ। বাবা বলল কিছু শুনতে চাই না, ডাক্তার হতেই হবে। ব্যস, হয়ে গেল।’
‘আহা রে... স্বপ্ন।’
‘হুম, স্বপ্ন দিল সব পেঁচিয়ে। আর এখন তো প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে এমন এক চক্রের মধ্যে পড়ে গেছি, বেরোবার উপায় নেই। মান্নাদের গান শোনোনি, তবুও শ্রোতারা তাকে দিল না ছুটি, শেষ গান গাইল সে পরে শেষ মালা? আমারও ওই দশা হবে বুঝলে? অপারেশন থিয়েটারে মৃত্যু।’
‘স্বপ্ন দেখ দীপা তার চেয়ে, আসো দুজনে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখি।’
‘আশ্চর্য, দুজনে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা যায়?’
‘যায় তো। একই কথা ভাবতে থাকি চল। যেমন ধরো একটা উঁচু বারান্দা, ধোঁয়া ধোঁয়া অস্পষ্ট চারদিক, শেষ প্রান্তে একটা কাঠের রেলিং...’, মুখ ফসকে বলতে বলতে রিফাত নিজেকে সংযত করে। উচ্চারণ এমন অস্পষ্ট করে আনে যে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। আর তারপর নিশ্চুপ। দীপা হয়ত ক্লান্তিতে মুহূর্তের মধ্যে গভীর ঘুমে। রিফাত মনে মনে ভবে, ভাগ্যিস! আহা, সামান্য স্বপ্ন নিয়েও লুকোছাপা...কী বাঁধা পড়া জীবন রে!

পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে রিফাত মনে করায়, কদিনের মধ্যে তাদের ফিক্সড ডিপোজিট ম্যাচিউর হবে। দীপা বলে, ‘তো কী করবে ওটা দিয়ে, ভেবেছ কিছু?’
‘আমি মনে মনে আগেই ভেবে রেখেছি, তোমার ভালো লাগবে’, রিফাত উত্তর দেয়।
‘কী ভেবেছ, শুনি?’
‘অনেকগুলো টাকা তো, ব্যাংকে আর ফেলে রাখার দরকার নেই। ইন্টারেস্ট রেট কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে আর ওদিকে ট্যাক্স দিতে দিতে অবস্থা শেষ। পৃথিবীর কোথায় এই হারে ট্যাক্স বাড়ে, বলো? তাই ভেবেছি বসুন্ধরার শেষ প্রান্তে একটা অ্যাপার্টমেন্টের ডাউন পেমেন্ট দিয়ে দিই। পরে দুজনে মিলে ধীরে ধীরে শোধ করলাম আর কী।’
‘ভালোই ভেবেছ কিন্তু। এটা ভাড়া দিয়ে আমরা ওটাতে চলে যাব। দারুণ হবে।’
‘হুম, বারান্দায় বসে কাশফুলের সাদা সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে আমরা সকালের চা খাব, কেমন?’
‘সমুদ্রের অনেক দূর পর্যন্ত যেন দেখা যায়। উঁচু বারান্দা চাই কিন্তু, অনেক উঁচু’, দীপাকে খুব খুশি দেখায়। হাত সামনে বিস্তৃত করে আধবোজা তৃপ্তির চোখে বলতে থাকে সে।
‘ঠিক আছে। একদম টপ ফ্লোর’, বলতে বলতে রিফাতের কেমন সন্দেহ হয়, দীপা ঘুমানোর আগে কাল উঁচু বারান্দার কথাটা শুনে ফেলেছিল নাকি? পরমুহূর্তে মনে হয়, নাহ্, ততক্ষণে সে ঘুমিয়ে গেছে। আর তা ছাড়া সে-ও তো বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। স্বপ্নের মধ্যে রিফাতের মাথার ভিতরে ঢুকে তার গোপন চিন্তাভাবনা ধরে ফেলার তরিকা দীপা নিশ্চয় রপ্ত করেনি।
সপ্তাহ দুয়েক পরে ফিক্সড ডিপোজিটটা ভাঙিয়ে আনার সময় হলো। ঠিক যেদিন রিফাত অফিসে না গিয়ে আগে ব্যাংকে যাবে বলে ভেবেছে, দীপা যেন নতুন কিছু আবিষ্কারের মতো আনন্দ নিয়ে খাবার টেবিলে এসে বসল। প্লেটে রুটি নিতে নিতে বলল, ‘প্ল্যানটা ফাইনাল করে ফেললাম।’
‘কীসের প্ল্যান?’ রিফাত জানতে চায়।
‘ওই যে বাসা, তুমি বললে না, ডিপোজিট ভাঙিয়ে অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে চাচ্ছ?’
‘আচ্ছা। তো, কী প্ল্যানের কথা বলছ?’
‘টাকাটা তুলে এনে আমাকে দিও। ভাইবোনরা সবাই মিলে উত্তরায় একটা জায়গা কেনার প্ল্যান করেছি। বড়ো জায়গা, পনেরো কাঠার মতো। তো, বুঝতেই পারছ বড়ো বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট হবে। একেক তলায় একেকজন। ছাদে বাগান থাকবে আর সেখানে...’
‘সে কী! আমরা যে বসুন্ধরায় কিনতে চাইলাম?’
‘সেখানে আর কতটুকু অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে পারব বলো? টেনেটুনে বড়ো জোর দু’হাজার স্কয়ার ফিট? এখানে অনেকের সঙ্গে শেয়ারে জায়গাটা কিনলে তো অনেক লাভ হচ্ছে। সাড়ে তিন কি সাড়ে তিন হাজার স্কয়ার ফিট করে হতে পারে একেকটা। আর তা ছাড়া, সবাই আবারো একসঙ্গে থাকা, সেই ছোটোবেলার মতো, মজা না? এটা তো তুমি স্বীকার করবেই। তাই ওদেরকে কথা দিয়ে ফেললাম কাল।’
‘তা, সবাই কি আবার ছোটো হয়ে যাবে? তারপর একসঙ্গে বাড়ির ছাদে কানামছি খেলবে?’ বলতে গিয়ে রিফাতের মুখ খানিকটা কঠিন হয়ে গেল।
‘মানে? আমি ভাবতেই পারছি না এত সুন্দর একটা প্ল্যান শুনে তুমি এমন রিঅ্যাকশন দিচ্ছ! আর ইউ ও কে? বছরে বছরে কত দূরে দূরে ছিটকে পড়েছি একেকজন। কতদিনের স্বপ্ন ছিল আমাদের আবার কোনো সুযোগে একসাথে হব, আবারো একসঙ্গে দিন পার করার স্বপ্ন আমাদের...’
‘হুম, স্বপ্ন। স্বপ্নই বটে!’ বলতে বলতে ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে রিফাত। অফিস যাবার জন্য দরজার দিকে এগোয়। তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে দীপা। খুঁটিয়ে দেখেও রিফাতের মনোভাবটা কেন যেন ধরতে পারে না সে। রিফাত তার দিকে আর তাকায় না। অফিসের কোনো কাজের কথা মনে পড়ে গেল কি? হতে পারে। দীপা আর রিফাতকে নিয়ে মাথা ঘামায় না। সন্ধ্যার দিকে কেবল একবার ফোন করে জিজ্ঞাসা করে, ‘ডিপোজিটটা ভাঙিয়েছ তো?’ রিফাতের উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না, বলে, ‘খুব টায়ার্ড দীপা, অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয়েছে। ঘুমাই একটু’, বলেই ফোন রেখে দেয়। তবে ওই দু’তিনটে কথা বলতেই ক্লান্তির ঘুমটা যায় ছুটে। তার বদলে মনটা বিরক্তিতে ভরে যায়। না জেনে হুট করে তেতো কিছু মুখে দেয়ার মতো। মনে মনে বলে, আমার স্বপ্নের কী হবে, দীপা? উঁচু বারান্দা, কাশফুলের সমুদ্র, শুধু তুমি আর আমি?
বাবাকে জাগতে দেখে দুই মেয়ে দুদিক থেকে এসে জড়িয়ে ধরে। মুখের তেতো স্বাদ আবার হুট করে মিষ্টিও বনে যায়। রিফাত তাদের জড়িয়ে ধরে, ‘বলো, মামনিরা, কী করছিলে?’
‘এখন তো কিছু করছি না, বাবা। তবে তুমি আসার আগে নাচের টিচার এসেছিল। নাচ প্র্যাকটিস করছিলাম’, বলে খিলখিল করে হেসে ওঠে দুজনে। ইনকা বলে, ‘জানো বাবা, মা বলেছে, প্র্যাকটিস করলে আমরা অনেক বড়ো... কী যেন হব?’ বলে তাকায় ইরামের দিকে। ‘নৃত্যশিল্পী’, জবাব দেয় ইরাম। ‘হ্যাঁ বাবা, নৃত্যশিল্পী হব। টিচারও তাই বলেছে। যার মানে হলো গিয়ে ডানসার।’
‘খুব ভালো’, রিফাত তাদের ঝরঝরে চুলে দু’হাত বুলায়।
‘আর মা বলেছে বড়ো নৃত্যশিল্পী হতে গেলে এখন থেকেই আমাদেরকে স্বপ্ন দেখতে হবে। তারপর সেইভাবে প্র্যাকটিস করতে হবে, বুঝেছ? মা বলেছে যদি এমনটাই চাই তবে সেটা হবে আমাদের ফার্স্ট প্রাইওরিটি।’
রিফাত জড়িয়ে ধরে তাদের। দুজনের মাথায় চুমু খেয়ে বলে, ‘মা একদম ঠিক বলেছে। নিশ্চয় পারবে তোমরা। প্রাউড অফ ইউ।’
পরদিন অফিস যাবার পথে কেমন আলসেমি লাগতে থাকে রিফাতের। অফিসের গাড়িতে বসে মনে হয় চোখ জড়িয়ে আসছে। ঘুম ছাড়াই স্বপ্নের মতো ছাড়া ছাড়া কিছু দৃশ্য ছুঁয়ে যায়। ভালো করে চোখ মেলতেই সেসব দৃশ্যের স্মৃতিসহ উধাও। কিন্তু চেষ্টা করেও চোখ খুলে রাখা যাচ্ছে না। জোর করে চোখ মেললে রাস্তার মাঝখানে রাখা ফ্লাইওভারের বড়ো বড়ো টুকরো, বালু-সিমেন্ট-রডের পাশ দিয়ে সরু রাস্তা ধরে পিপড়ের মতো পিলপিল করে এগিয়ে চলা। হর্ন শুনে আর গাড়ির এলোমেলো সারিতে বসে কাটিয়ে দেয়া। আধবোজা চোখ বাস্তব ভাবনাও ভেবে নেয় ফাঁকে ফাঁকেÑ কবে শেষ হবে রাস্তার এই কাজ! গর্ত আর কাদায় কত মানুষ আছাড় খেয়েছে কে জানে। কতজনের পা ভেঙেছে কে বলবে। ফ্লাইওভারের দীর্ঘসূত্রিতা শেষ হতে হতে যাদের পা আস্ত থাকবে তারাই কেবল উন্নয়নের ফল ভোগ করতে পারবে। যেন রাস্তা চলে যায় এঁকেবেঁকে, স্বপ্নের পথে হাঁটা কেবল, নেতার স্বপ্ন প্রবাহিত হয় নেত্রীর স্বপ্নে। সাধারণ মানুষ সেই স্বপ্নের দাবাখেলার দৃশ্যের গুটির মতো। হঠাৎ চোখ যায় রাস্তার ধারে অপেক্ষমান একটা লোকের দিকে। এক হাত ক্র্যাচে রেখে রাস্তা পেরোনোর জন্য দাঁড়িয়ে লোকটা। ধুলো ঠেকানোর জন্য আরেক হাতে নাক চেপে ধরে। রিফাত তার দিকে তাকিয়ে থাকে একভাবে। দাবার গুটিরা কেউ এক ঘর যায় তো কেউ যায় কয়েক ঘর, কেউ যায় কোণে তো কেউ শুধু সামনে, কেউ আবার এক লাফে আড়াই। অথচ সবাই চায় অন্যে তার বেগে চলুক, তার মতো বলুক, তার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখুক। ভাবতে ভাবতে আরো বেশি ক্লান্তি চেপে বসে রিফাতের শরীরে। মগবাজার মোড়ে গাড়ি আটকে থাকার অবসরে গা এলিয়ে দেয় সিটের পিছনে। চোখ বন্ধ হতেই নিজের কথায় নিজেই চমকে ওঠে, ‘উত্তরায় থাকবে। উত্তরা থেকে আমাদের অফিসগুলো কত দূর হবে কোনো ধারণা আছে, দীপা? দিন কেটে যাবে রাস্তায়, তোমার রোগীগুলো মরবে।’ মনে হয় যেন চিৎকার করছে সে। চোখ মেলে লাফিয়ে ওঠে। গাড়ি তখনো মগবাজার মোড়েই। যাক্, বাস্তবে না হোক স্বপ্নে খানিক চিৎকার তো করা গেল! এভাবেই যদি মনের ঝাল মেটে। মনে মনে হাসে রিফাত। পরমুহূর্তে ভাবে, কী আছে উপদেশ দেয়ায়, যার যার স্বপ্ন সফল করতে সে সে আকুল। দীপার আর কোনা স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া উচিত না।
অতিরিক্ত জ্যামের কারণে সেদিন অফিসে পৌঁছতে দেরি হয়ে যায়। রিফাত পৌঁছে দেখে জরুরি মিটিঙের লোকজন আগেই উপস্থিত। বসের সামনে খোলা ফাইল। চশমার উপর দিয়ে চোখ তুলে বস একবার তাকিয়ে নেন রিফাতের দিকে। এক মুহূর্তের দৃষ্টিতে, দেরি কেন, এত দায়িত্বহীন হলে কী করে চলবে, এ জাতীয় বহু কিছু লেখা। এমনিতেই ঘুম ঘুম ভাব তার উপরে সামনে এত লোক, রাস্তার জ্যামের চেনা অজুহাত রিফাতের আর আওড়াতে ইচ্ছে করে না। আলোচনায় সে যথাসম্ভব সংযত থাকে। মিটিং শেষে তার ছয় মাস ধরে দাঁড় করানো প্রজেক্টের যে আদেশ হেড অফিস থেকে এসেছিল তা তারা বাতিল করেছে বলে জানানো হয়। রিফাত একবার বলতে চায়, আমার ছয় মাসের পরিশ্রমের কী হবে তাহলে? বলতে পারে না। এই ছয় মাস অফিস থেকে বেতন তো সে নিয়েছেই। এখন তাদের ইচ্ছের প্রজেক্ট তারা করবে না বলে যদি সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানে রিফাতের কিছু বলার থাকতে পারে না। অন্যের স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গও অন্যের।
ধীর পায়ে নিজের রুমে ফিরে আসে। এবারে ক্লান্তিটা সত্যিই চরমে উঠেছে। গা এলিয়ে দেয়ার জন্য সে কোনোরকমে চেয়ার পর্যন্ত যায়। ক্লান্তিটা মানসিক নাকি শারীরিক, সূক্ষ্মভাবে বোঝার চেষ্টা করে। শরীর ঠিক আছে তো? এমনিতে মনেও পড়ে না কবে শেষ জ্বরটর হয়েছিল। দিনের পর দিন মনোযোগ দিয়ে তার উপরে দায়িত্ব দেয়া প্রজেক্টটা দাঁড় করিয়েছিল। কর্মজীবন থেকে কি তবে ছয় মাস হারিয়ে গেল? মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে রিফাতের। কোনো চিন্তাই কেন যেন ভালোমতো গুছিয়ে করতে পারে না। পিছনের দিকে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজে ফেলে সে। মনে মনে আওড়ায়, তৃতীয় নয়ন, আসোÑ আসো, কিছু স্বপ্ন দেখাও। পরমুহূর্তে মন আকস্মিক দখল হয়ে যায় আফসোসেÑ সেই যে সেই স্বপ্নটার বাকিটুকু আর দেখা গেল না! সেই যে মেয়েটি, উঁচু বারান্দায় ইতস্তত ভাব নিয়ে রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো? রিফাত কায়মনে ভাবতে থাকে তার কথা, নিজের কথাও। নিজের পদক্ষেপ দেখতে পায় সে, এগিয়ে যাচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে.... ভাবতে ভাবতেও ভাবনাটা এগোয় না। ওই স্বপ্নের পরের দৃশ্যের রহস্যটা কি কোনোদিনও সে জানতে পারবে না? ইচ্ছের বাড়াবাড়িতে স্কিটজোফ্রেনিয়ার রোগীর মতো আচরণ করতে মন চায় তার। মনে হয় নিজের মতো ঠিক করে নিলেই হয় পরের দৃশ্যগুলো। আর তারপর তাকেই স্বপ্ন বলে মেনে নিলেই হলো। কী আর, স্বপ্ন তো একরকম কল্পনাই, একরকম ইলিউশন বই তো কিছু নয়। জেগে দেখা আর ঘুমিয়ে দেখা, এই যা পার্থক্য। মেয়েটি আধাখেঁচড়া স্বপ্নে গেল মিলিয়ে অথচ তার সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতিটা নাছোড়বান্দা হয়ে সঙ্গে থেকে গেল। সে যেন আমার পাশে আজও বসে আছে। চলে গেছে দিন তবু আলো রয়ে গেছে। গানের মধ্যে কেন লেখা হয় এসব ইলিউশনের কথা? মানুষকে স্কিটজোফ্রেনিক করতেই তো? নিজের জিদের প্রকোপে নিজেরই হাসি পায় রিফাতের। অথচ ঘুমের আক্রমনে হাসাও যায় না ঠিকমতো। চিন্তাশক্তি যেন বড়ো বৃত্ত থেকে পরিধি মুছে মুছে ধীরে ধীরে ছোটো, আরো ছোটো বৃত্ত হতে থাকে। একসময় কেবল বিন্দুতে এসে ঠেকে।
রিফাত দেখে সে ঘুমিয়ে আছে, নিজের ঘরে। চেনা পরদা উড়ছে, লেকের পচা গন্ধসমেত পরিচিত বাতাস নাক দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে সমানে। দেখে সে স্বপ্ন দেখছে। দেখে স্বপ্নে সে নির্দিষ্ট সেই স্বপ্নটি দেখতে চেষ্টা করছে। নিজেই নিজের পাশে দাঁড়িয়ে সেই উঁচু বারান্দার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে... মনে করিয়ে দিচ্ছে মেয়েটির মসৃণ গালের স্পর্শ। তারপর কী হলো, তারপর? দেখে কিছুতেই নিজের মতো করে স্বপ্ন দেখতে পারছে না। হাজার চেষ্টাতেও পারছে না। নিজের পাশে দাঁড়িয়ে মনে করিয়ে দিতে দিতে একসময় চেষ্টায় ইতি টানে সে। কী করে যেন জেনে যায়- সে স্বপ্নের একটা চরিত্র মাত্র। স্বপ্নে তার বিচরণ অন্যের চাওয়ায়। তাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখছে অন্য কেউ!
........................................................... ......................