ঘুম -স্বপ্ন -নি:স্বপ্নতা বিষয়ক

শতাব্দী দাশ









চৈতালী কৈশোরের স্বপ্নে একদিন, মা মরে গেল তার।


অথচ কোনো কষ্ট ছিল না।


ঈষৎ খালি খালি, তেমন কিছু নয়। বাতাস বইছিল আগের মতোই। মায়ের চুল উড়ছিল। কোকিল ডাকছিল কোথাও। কোকিলকে ভেঙিয়ে ফেলছিল সে কৈশোরের অভ্যেসে। বেদনা ছিল না। কোত্থাও। চরাচরে।


কান্না পাওয়া বড় উচিত ছিল। তবু পেলনা বলে অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল।


মা তখন অকাতরে ঘুমোচ্ছে। পাশে। শবসমা মায়ের পাশে বসে বোধ হল , মাকে ভালবাসে না। বাসে না আর। বাসত কি? নাকি শুধু সমীহ শুধু ভয় কিছু নির্ভরতা প্রয়োজনীয়তা অভ্যেস আর কিচ্ছুটি নয়?


আত্মঘৃণা। অপরাধবোধ। এইসব হল বটে। ক্রমে ‘অপরাধ’ ঘুচে গিয়ে বোধটুকু রয়ে গেল।


মায়ের জন্য ভালবাসা নেই।


ঘৃণা নেই দ্বেষ নেই ক্ষোভ নেই রাগ নেই কোনো কিছু নেই আর ভালবাসা নেই।


ভালবাসা তবে ছিল না কি, টলটলে? ভায়ের জন্য, কালো-পানা বেড়ালের জন্য, পাড়াটা, বাড়িটা, ভাঙা সাইকেল, জামগাছ , নিমগাছ সবার সবার জন্য প্রেম ছিল না কি? ভালবাসা না পেলে ভালবাসা মরে যায়। ‘এই বুঝি মরে যাব’ করে করেও সন্তর্পণে সঙ্কোচে বেঁচেছিল ভালবাসারা।

তবু সবচেয়ে আগে মায়ের জন্য ভালবাসা মরে গেল । বড় নি:শব্দে মরে যায় ভালবাসা। টের পাওয়া যায় শুধু অযাচিত স্বপ্নে।


স্বপ্নের মুখোমুখি হতে মিশেল অনুভূতি তার। তবে থেকে। এপিফ্যানি। অবিশ্বাস।
গ্লানি। ভয় , বড় ভয়। কিন্তু ঘোর-ও।


সত্য তো ঘোরের মত। গাঢ় ঝিম নেশার মত। খাব না খাব না করেও দুইখানি বরফ ভাসিয়ে টক গিলে ফেলা পানীয়র মত। অপ্রতিরোধ্য। সত্য।
স্বপ্নও তাই।


*****************


স্বপ্নে রিনরিনে জ্বর বয় নাড়ি দিয়ে তার। প্রথমে তেমন জ্বর নয়। শামুকখোলে পা কেটে যেমন জ্বর আসে, বা জ্বরের আবেশ। জ্বর এলে নিরাকার প্রেমের আঙুল খোঁজে সে। ‘স্বপ্নে পাওয়া আঙুল’-এর কথা পড়েছিল কোথাও। খোঁজে , খোঁজে আর বোঝে, খোঁজা আর ‘পাওয়া’-র মধ্যে দূরত্ব কয়েক আলোকবর্ষ। স্বপ্ন-জ্বর বাড়ে। বাড়তে বাড়তে শরীর তার চড়কের আগুনবেদী হয়ে যায়। নিজেই সে হাঁটে সেই আগুনের উপর দিয়ে। হামা দিয়ে স্বপ্ন থেকে জ্বর নেমে আসে তার কলমকারি বিছানায়। খাটের এক পাশে বসে। জ্বর তার জ্বোরো মাথায় হাত বোলায়। মায়ের মতো জ্বর। ঘুম ভেঙে দ্যাখে, সত্যি গা পুড়ে যাচ্ছে ।


এইভাবে নির্জনতর হতে থাকে স্বপ্নরা । স্বপ্নে মানুষ দেখলে ভিড় মনে হয়। ভিড় মনে হয় আর পাহাড়ে ফিরতে ইচ্ছে করে। যেমন কুয়াশায় দুহাত দূরের মানুষ দেখা যায়না, পাহাড়চূড়া আরোই না- তেমনটা তার পছন্দসই। কুয়াশা মাতৃজঠরের মত ঘিরে ধরে। ছুরি দিয়ে ডাল কেটে নেয় সে, ঝোপেঝাড়ে বাড়ি মেরে এগোয়, এগোয়। বেখেয়ালের ফাঁকফোকর দিয়ে জোঁকেরা গায়ে উঠে বসে, রক্ত খায়, পড়ে যায়। কোথাও পৌঁছনোর নেই,সূর্যোদয় দেখার নেই, গিগাবাইট ভরার নেই। তাও খাড়াই উঁচু পথ চড়া। হয়ত এমন বাঁক এলেও আসতে পারে, যেখানে হঠাৎ পর্দা সরলেই প্যানোরামা! নানা শেডের সবুজ, দূরে দূরে সাদা ঝোরা, আট দশ ঘরের গাঁও ইতিউতি। সেই বাঁক গাইড বলে দেয়না, ম্যাপে থাকেনা। নিজেই খুঁজে পেতে হয়। সেই পথ, সেই পথ চলা, সেই কুয়াশা, জোঁকগুলো, রক্ত আর বাঁকটা- মগজের তাক থেকে একে একে নেমে আসে। স্বপ্নে হেঁটে চলে বেড়ায়।


******************


এইরকম এক বাঁকে হঠাৎ হয়ত দেখা হয়ে গেল, না চেয়েও দেখা হয়ে গেল, হয়ত, কোনো জলজ্যান্ত মানুষের সাথে। তুমিও বুঝি কুয়াশাবিলাসী? নীলগাইয়ের গলার ঘন্টিতে জাগো আর ঘুমাও? সবুজ অন্ধকারে হাঁটো? আয় ভাই বুকে আয়, গলা জড়াই, চুমো খাই, আদর করি কুয়াশাকেবিনে। ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াই, জিভে জিভ। স্বপ্ন গাঢ় হোক।


কুয়াশার আশ্রয় সরে যায় তারপর। হঠাৎ যোনিপথ পিছলে অনেক আলোয় বেরিয়ে আসে যেন সে । অসহনীয় আলো। সাদা আলোর ঘোড়া সবুজ ক্ষেতে লাফিয়ে বেড়ায়, দেখা যায় । তার খুরের টকাটক টকাটক আওয়াজ শোনা যায় স্বপ্নে। স্পষ্ট। চোখ বাঁধা সে ঘোড়ার গতি এলোমেলো, কিন্তু ক্ষিপ্র। রোদেলা ঘোড়ার স্বপ্নে কুয়াশা থাকেনা,পাহাড় থাকেনা। এমনকি কোনো নির্জন সৈকতও থাকেনা । চোখজ্বলা সবুজ সমতল পরিধি শুধু। বৃত্তাকারে ছুটছে ঘোড়া আর বৃত্ত ছোটো হচ্ছে, ছোটো হচ্ছে, ছোটো হচ্ছেই যতক্ষণ না ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে পড়ে আর লাগাম ছিঁড়ে কষ বেয়ে রক্ত ঝরে তার। রক্তের নোনা স্বাদ নিজের জিভে পায় সে।


*******************


এইসব দৃশ্যশব্দস্পর্শঘ্রাণ স্বাদময় স্বপ্নের স্টপগ্যাপে স্বপ্নহীনতাও আসে। স্বপ্নহীনতা নাকি স্বপ্নস্মৃতিহীনতা? ঘুম আর ঘুম ভেঙে যাওয়া ছাড়া কিছু থাকেনা তখন। স্বপ্নদের মনে পড়ে না । সাদা কালো কিছু ছায়া সরে যায় মাথা থেকে শুধু। চোখ চেপে শুয়ে থাকে সে, স্বপ্ন আসবে বলে। আসে না। আসে না। বড় কঠিন এ বাস্তবযাপন। লাল কালি দিয়ে মগজে Do not day-dream খোদাই করতে গিয়ে এমন গভীরে ছেনি হাতুড়ি সেঁধিয়ে গেছিল যে রাতের স্বপ্নরাও আর আসে না।


শুধু একবার ভারি বিশ্রী স্বপ্ন এসেছিল। মায়ের মৃত্যুর স্বপ্নের মতোই অনায়াস বিভৎসতা। দাঁড়কাকের মত প্রাজ্ঞ একটা ধরণ ছিল তার। ঠুকরে ঠুকরে ঘুম ভেঙে দেওয়ার পরও মনে ছিল, অনুপুঙখ মনে ছিল, শন-সাদা চুলের বৃদ্ধার প্রতিধ্বনিত স্বর- ‘খুউউব শখ? পারবি তুই? পারবি ভেবেছিস? সন্তানস্নেহ জেনেছিস কখনো, মেখেছিস গায়ে? সন্তানখাগী হবি । পারবি না।’


******************


সে এলে সব একাকী স্বপ্নপট একটু করে পালটে যায়। মহাশূন্যে, বেশি নয়, একটা তারা ফোটে। স্বপ্নে ফেরা হয়। বেলাভূমিতে খুদে পায়ের লক্ষ্মীছাপ পড়ে। পাহাড়ি পোস্টবাক্সের আড়াল থেকে খুদে মুখ উঁকি দেয়। নীল পাহাড় যা কাছে গেলে সবুজ, আরো কাছে গেলে বন্ধুর বাদামী হয়ে যায়- তারা আর একার থাকে না। জীবনকে, সন্তানকে,স্বপ্নকে নিরালম্ব ছুঁয়ে থাকে সে। যেমন ভাবে মহাশূন্য ছোঁয় পৃথিবীকে।


******************


স্বপ্নেরা শান্ত হয়েছে আজকাল। উচাটন করে না, ঘুম ভাঙায় না। অথচ সকালে উঠলেই নিখুঁত রিপ্লেতে মনে পড়ে। সমুদ্রে ভাঁটা এসেছে। মোহনায় চর জেগেছে। শোনা যায় ওদিকেই সূর্যাস্ত হয়।


সমুদ্রতীর অবশ্য জনশূন্য নয়। দুচারজন কালো পোষাকের লোকজন থাকে। আর চৌকো কাঠগড়া । কাঠগড়ায় সে নিজেই। সমুদ্রের গর্জনে বাদী বিবাদী সওয়াল জবাব অশ্রুত থেকে যায়। বিচারক নেই কোনো। আসলে সওয়াল জবাব বা সেরকমই কিছু একটা, শুনছে না কেউ। হচ্ছেও কি আদৌ? কাঠগড়ার স্বপ্ন বড়ই আসে আজকাল।


মানুষের জন্মই অকৃতকর্মের আসামী সাব্যস্ত হতে। শুনানি চললে তাই সে সূর্যাস্ত দেখে। মোহনার সূযার্স্তে রঙের যে খেলা, দেখতে জানলে এপার্টমেন্টের মাথা থেকেও সূর্যাস্তে সেই একই রঙের স্ট্রোক । শিশুর প্যাস্টেল আর ক্রেয়নের বাক্সেও তাই- একই, একই, একই রঙের সঞ্চয়।


******************


রাত নামলে পরে স্বপ্ন নেমেছিল। অথচ স্বপ্নেও সূর্য ডুবে গিয়ে রাতই নামে। ঘুমের মধ্যে আবার ঘুমিয়ে পড়া যায় কিনা -এইসব গহীন প্রশ্ন নিয়ে সে এক বিচিত্র মেইজ-এর গভীরে, আরো গভীরে ঢুকে যায়। ঘুরতে ঘুরতে , খুঁজতে খুঁজতে একদম কেন্দ্রে ঘুমই রাখা আছে, জানে। সেই ঘুম স্বপ্নহীন হয় যদি, হোক। ক্ষতি নেই।