স্বপ্নে কী দোষ হল!

সরোজ দরবার




স্বপ্নের কোনও ভোটার কার্ড নেই। ভাগ্যিস! ফলত সে ইচ্ছেমতো বয়স প্রাপ্ত হয় প্রাপ্তবয়স্ক না হয়েও। একদিন তাই নাবালক সব স্বপ্নের মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে অচেনা যুবতীর দল। আদল চেনা হয়তো। তবুও নয়। স্বপ্ন তো তাদের মুখ দেখে না। দেখে শুধু চেনা পোশাকটিকে। আস্তে আস্তে সেই যুবতীদের একজন তার সর্ষেরঙা দোপাট্টাটি সরিয়ে দেয়। উড়িয়ে দেয় হাওয়ায় হাওয়ায়। অনেক নিসংকোচ সে। তার সারা শরীরে যেন যৌবনের জোনাকি। সে দিকে তাকিয়ে থাকে আড়ষ্ট নাবালক স্বপ্ন। কোথায় দেখেছে যেন সে এই যুবতীকে। তার মেঘের মতো চুল খুব চেনা। হয়তো কোনওদিন আলগোছে পুকুরঘাট থেকে ফিরছিল স্নান সেরে। গায়ের উপর ফেলা ভিজে গামছাখানা। শরীরে জড়িয়ে জড়িয়ে ধরা পোশাকটাকে ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে সে চলেছে। আর তার মেঘচুল থেকে বিন্দু বিন্দু ঝরেছে জলকণা। দেখেছে স্বপ্ন এই যুবতীকে হয়তো, দূর থেকে, একটু তফাৎ রেখে। কাছে গেলেই আলগোছে ফেলা পা ত্বরিত পদক্ষেপে সচেতন হয়ে উঠত হয়তো। অথবা স্বপ্ন তাকে দেখেছিল বিকেলের গান শেখানোর ক্লাসে। এই এলোচুল তখন একদিকে মেলা থাকে। সামনে খোলা খাতায় স্বরলিপি। আর তার চোখ দু’টো বোজা, যেন কোন অথৈ সুরে ডুব দিয়েছে। নাবালক স্বপ্ন সেদিন দাঁড়িয়েছিল গানের ওপারে। পাশে বসা গানের মাস্টারকে অভিসম্পাত দিয়েছিল মনে মনে। অথবা এর একটাও নয়। স্বপ্ন একে দেখেছিল কোন গরমের বিকেলে ছাদের ওই কোণাটায়। তখন সবে সন্ধের হাওয়া দিচ্ছে। মেঘচুল সে টানটান করে বেঁধে চুড়ো খোঁপা করেছে। যেতে যেতে দিনের শেষ রশ্মি দু'দণ্ড জিরিয়ে নিচ্ছে তার ফর্সা গলায়। কয়েকবিন্দু ঘাম হাওয়ার টানে উড়ে যাবে যাবে করেও এখনও যায়নি। আলো পেয়ে চিকচিক করছে। নাবালক স্বপ্ন দেখেছিল, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, সেই অপার্থিব। আর যখন বৃষ্টি নামল। এক ফোঁটা দু-ফোঁটা... সে মেলে দিল তার দু’হাত...নির্লোম বাহু থেকে জল গড়িয়ে গেল বাহুমূলের দিকে...চোখ ছুঁয়ে দু-ফোঁটা জল এসে দাঁড়াল ঠিক তার ঠোঁটের উপরে...আর তার সারা শরীর জুড়ে স্বস্তির কালবোশেখি... স্বপ্ন দেখেছিল। নাবালক সে, তাও বাস্তবিকই দেখেছিল এই সব পরাবাস্তবকে। আজ চোখের উপর ঝুঁকে পড়া যুবতীর সে মুখ দেখেনি, শুধু অবিরত মনে পড়েছে এইসব কথা। আর তার কেবলই মনে হয়েছে, এই কি সেই! যত মনে হয়েছে তত বেড়েছে সন্ধান। কিন্তু কী লাভ খুঁজে! নাবালক স্বপ্ন যেন এই দ্বিধা-সন্ধিতে, তখনই সেই যুবতী ঘটাল অপ্রত্যাশিত। তার পলাশ ঠোঁট এনে মেশাল স্বপ্নের ঠোঁটে। স্বপ্ন জানল কী অনাস্বাদিত সেই মুহূর্ত! অথচ তার মনে হল যেন তাতে লেগে আছে গত রাতের মাছের ঝোলের সোয়াদ। তবুও এক আকস্মিক জোয়ার আসে। চাঁদের টান যেমন লাগে সমুদ্রে। সে টানে যেমন আছাড়ি-বিছাড়ি ঢেউ মাথা কুটে মরে পারে। আত্মসমর্পণের সুতীব্র সুখানুভূতিতে। সেই টানেই এক হ্যাঁচকায় সন্ধির সীমানা পেরিয়ে সাবালক হল স্বপ্ন।
ভাগ্যিস স্বপ্নের কোনও ভোটার কার্ড নেই। আঞ্চলিকতার অঞ্চল অনায়াসে কাটিয়ে তার তাই উড়ান। যেমন বলেন গুলজার, ‘...স্বপ্নোকি সরহদ হোতি নেহি/ বন্ধ আঁখো সে রোজ ম্যাঁয় সরহদ পর চলা যাতা হুঁ/ মিলনে মেহদি হাসান সে’ । আর মাঝবয়েসি এক ঝুলবারান্দা থেকে স্বপ্ন প্রতত হয় ঘাসে মোড়া শৈশব জাজিমে। দেখে, আজও সজনে ফুলের খই ফুটেছে। কুয়াশাঘেরা সকালে আকাশের মুখ ঢাকা। মাটিতেই যেন নেমেছে তারারা। স্বপ্ন নিষ্পাপ, তাই আজও সে মানে না শপিং মলে ঢেকে গেছে তার সবুজ আকাশ।
এদিকে ফিতের মাপে কবেই ভাগ বাঁটোয়ারা হয়ে গিয়েছে গেরস্থালী। ইটের দেওয়াল এসে ভেঙে দিয়েছে শৈশবের সাজানো উইকেট। স্বপ্ন এসব মানে না তাই, মনে করে এখনও স্কুলবাড়ি সেই আগের মতোই আছে। ঝাউয়ের সারি থেকে ভেসে আসছে হাওয়ার সানাই। আর ওই কোন অষ্টম শ্রেণির চিরকুট নীলপাড় সাদা জমির গায়ে পড়ার বদলে, নিবেদিত হচ্ছে রাশভারী শিক্ষকের শ্রীচরণে। বাকিটা চাপা উদ্বেগের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প যেন, আর কানমোলায় লেখা উপসংহার। ফেসবুকের দেওয়াল বলছে সে সব আর নেই। স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন বলেই প্রগাঢ় বিশ্বাসে ভাবতে পারে আছে, সব একই রকম আছে।
বয়সের প্রমাণপত্র নেই তবু অল্পবয়েসি স্বপ্নের সঙ্গে একদিন দেখা হয় অভিজ্ঞ স্বপ্নের। তখন রাত পুরো শেষ হয়নি, দিন আসেনি পূর্ণ হয়ে। এ সময়েই যত অলৌকিক ঘটে। অভিজ্ঞ স্বপ্ন মুচকি হেসে প্রশ্ন করে, কী হে, একদিন যে ভেবেছিলে মা মনসা বস্ত্রালয় এসে নামী ব্র‍্যাণ্ডকে ছেয়ে দেবে, তার কী হল? কী হল, সেই কফিহাউস অভিযানের, যেখানে কয়েকটা তরুণের কম্পাসটা ঠিক করে দেওয়ার কথা ছিল? অধোবদনে অল্পবয়েসি স্বপ্ন বোঝে, ‘Our wills and fates do so contrary run ... We can have our little dreams, but the fates decide our futures.’ অতএব হাল ছাড়বে কি, হাল কখনও হাতেই ছিল না তার, পানিও পায়নি। শুধু মুড়িতে মিশেছে ইউরিয়া। আর সভ্যতা ফুলেফেঁপে ফুলকো, বহিরাঙ্গে সাফসুতরো ধবধবে হয়ে বলতে শিখেছে ইউরেকা। এই ফ্যালাসির ভিতরই একদিন স্বপ্নের বয়স বেড়ে যায়।
তবু স্বপ্ন দেখার অধিকার নিয়ে কেউ ফতোয়া জারি করে না, এই রক্ষে। স্বপ্ন গো-মাংস, শুয়োরের মাংস পারলে এক পাতে খায়। এখনও সে স্বাধীনতা আছে তার। আছে কি! খটকা জাগে, মিথ্যে বলা হচ্ছে না তো! এবং উত্তর আসে হচ্ছে। কেননা আজ সব স্বপ্নই ভীষণভাবে শেপড। ওই যে ফ্ল্যাটবাড়ি যেখানে মিউজিক অ্যাকাডেমিতে থাকবেন তানসেন, চিত্রকলার দায়িত্বে পিকাসো, খেলায় ধ্যানচাঁদ, ওটাই তোমার স্বপ্ন হওয়া উচিত। লার্জার লার্জার... কিং সাইজ ফ্যাব্রিকেটেড স্বপ্ন এসে বিদ্রূপ করে স্বপ্নের নিজস্ব সৃষ্টিশীলতাকেই। স্বপ্ন ক্রমে ভুলতে বসে, তার ঠিক কী হওয়া উচিত ছিল। অমলকান্তির রদ্দুরের কথা স্বপ্ন শুধু দেখে স্বপ্নেই। আর বিজ্ঞাপনের বর্ণমালা ঠিক করে দেয় তার রঙ-রূপ।
এবং অবশেষে একদিন মনে হয়, স্বপ্ন বলে কিছু কক্ষণও ছিলই না। স্বপ্ন আসলে সেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, না রাখার জন্যই যা ছাপা হয়। স্বপ্ন বিষাদগ্রস্ত হয়। আর একদিন মেঘকালো এক দিনে ফিরে আসে সেই যুবতীর দল। অঙ্ক বলে এতদিনে তাদের বয়স্কা হওয়ার কথা। কিন্তু কী আশ্চর্য তাদের বয়স আর কিছুতেই বাড়ে না! সেদিনের সেই যুবতী আবার এগিয়ে এসে মুখ নামায় স্বপ্নের চোখের উপর। স্বপ্ন দেখে, এখনও মদনদেব তার ষষ্ঠ শরটিকে যেন ভুলে ফেলে রেখে গিয়েছে এই যুবতীর। কোথাও তার এতটুকু অপচয় নেই। আজও অয়স্কান্ত আকর্ষণীতে সে একইরকম সম্মোহনী। আর সে এসেই সাবালক এক স্বপ্নকে, বিষাদে-হতাশায় ভেঙে যাওয়া এক স্বপ্নকে ভুলিয়ে নিয়ে যায় ছেলেমানুষির খেয়ালখুশিতে। কী এক জাদুতে এই বিষাদের ভিতরই ফের নাবালক হয়ে ওঠে স্বপ্ন। স্বপ্নই শুধু সম্ভব করে তুলতে পারে এই যাবতীয় অসম্ভবকে। জাগরণ বলে তা ঘোরতর দোষের, তবে স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন বলেই, আজ এড়িয়ে যেতে পারে পঙ্কিলতা। নাবালক স্বপ্ন যে কুহকিনীকে দেখে দোষে পড়েছিল, এই বড়বেলায় সে ফিরে আসে স্বপ্নের ভিতর স্বপ্ন হয়ে। বলে আসলে এ জীবন এক মরিচীকা ছোঁয়ার দৌড়। তবু জীবনের ক্ষমতা নেই তাকে ছোঁয়। স্বপ্নই শুধু পায় সে সোনার হরিণকে। নাহ, জাগরণের বাস্তবেও তাতে কোনও দোষ লেগে থাকে না।