স্বপ্নেরা

স্বপন রায়




#
-কাল কাকে দেখলেন
-আমীর খানকে
-এই তো, উন্নতি হচ্ছে। তো, কি বলনেন আমীর খান, কুস্তির প্যাঁচ নিয়ে কিছু?
-না রেওয়াজ করতে বললেন
-রেওয়াজ? আচ্ছা। তো করুন। আখড়ায় যান। ভালই তো
-কুস্তির কথা কেন বলছেন ডাক্তারবাবু?
-আরে আমীরের লেটেস্ট ফিল্ম দঙ্গল, সেতো কুস্তির ইয়ে, চায়নায় ৮০০ কোটির ব্যবসা করেছে, ভাবুন ৮০০ কোটি!
- না না অ্যাক্টর নয়, উস্তাদ আমীর খান....
আমি সাইকিয়াট্রিস্ট। আমীর খান আমার কাছে ওই একজনই, উস্তাদ আমীর খানটা আবার কে? আড়চোখে নীতি’র দিকে তাকালাম।নীতি মালহোত্রা। আমায় অ্যাসিস্ট করে। নীতির চোখেও অসহায়তা। যাইহোক পেশেন্টকে বুঝতে দেয়া চলবেনা।
-কী বললেন ওস্তাদজী?
- বললেন, বসন্ত্‌বাহার ধরো, মালকোষে আটকে থাকলে চলবে?
সেরেছে। রাগ রাগিনী। নীতি অন্যমনস্ক হয়ে গেল। আরে বাঃ, হেভি লাগছে...কিন্তু বসন্ত্‌বাহার আর মালকোষ নিয়ে কি করি?
মুখে বললাম, মালকোষ কেন? মাল কষে গেছে, কনস্টিপিশন?
-কি যে বলেন ডাক্তারবাবু, মালকোষ খুব সুদিং রাগ, রাতে গাইতে হয়
-ও আচ্ছা। তবু উস্তাদ আমীর খান যখন বলেছেন, আপনি বসন্ত্‌বাহারে চলে যান, বসন্তের ইয়ে তো, আপনার যেসব জটগুলো আছে, খুলে যাবে
-জট কোথায় ডাক্তারবাবু, স্বপ্ন দেখছি আর দেখার পরে স্বপ্নের কিছুটা আমার সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে সারাক্ষণ। এই যে আমি কোকিলের ডাক শুনছি সকাল থেকে, ডেকেই যাচ্ছে কোকিলটা...
#
পেশেন্টের নাম অনমিত্র সান্যাল। আমি ‘ইমেজারি রিহার্সাল থেরাপি’ চালাচ্ছি। অনমিত্রর স্বপ্নের কোন নির্দিষ্ট প্যাটার্ন নেই। ‘ননর‍্যাপিড আই মুভমেন্ট’ আর ‘র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট’ এর মধ্যে কোন সীমানা থাকছে না। অনমিত্র ‘স্লিপ টেরর’-এর কথা বলছে যা ‘ননর‍্যাপিড আই মুভমেন্ট’-এ সাধারণত হয়ে থাকে। আবার ‘র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট’-এ যে সব স্বপ্ন তৈরি হয়, সেগুলোও দেখছে।অনমিত্র চলে যাওয়ার পরে আমি নীতার দিকে তাকালাম। ঠোঁটে টেপা হাসি। আজকাল চটজলদি বুঝে যাই নীতি কি চাইছে। অনমিত্রর এরাটিক স্বপ্নের ভুলভুলাইয়া ওকেও বেশ ইনামীনাডিকা সুলভ ক’রে দিয়েছে এখন। আমাদের দীঘা যাওয়ার কথা এই শনিবার। এরাটিক সাইকিয়াট্রি থেকে এরোটিক ছুটির দিকে মন ছুটতেই ‘বসন্তবাহার’ বয়ে গেল। নীতি আমার হাসির আমন্ত্রণে কাছে আসছে, এমন সময় ফোন। তিস্তা। আমার বৌ। নীতি বৌ-এর দূরত্বে দাঁড়িয়ে গেল। ভ্রুয়ে বিরক্তি। আমি ওকে ঈশারা করলাম। চুমু ছঁড়ে দিলাম। আর মুখে বললাম, ইয়েস সুইটহার্ট! তিস্তা খুব হাসল। হাসছে কেন? হাসতে হাসতেই বলল, বাবার টাকাটা পরশু ফেরত দেয়ার কথা। ভুলে গেছ না?
#
আমি ভেতরের টেনশন বাইরে না এনে বললাম, সরি ডার্লিং। সত্যিই ভুলে গিয়েছিলাম। কাল পজিটিভলি জমা করে দেবো। মনে করাবার জন্য থ্যাংকস। নীতা শুকনো গলায় বলল, নেক্সট ইন্সটলমেন্টের কথাও মনে করিয়ে দেবো, তবে ছ’মাস হল আমি মনে করাচ্ছি আর তুমি দিচ্ছ না। যাইহোক, নীতি কোথায়? সেরেছে।তিস্তা কি সন্দেহ করছে নাকি? ওর বাবা আমায় এক কোটি দিয়েছে, তো? সেটা ফেরৎ নিতে হবে? সুদ ছাড়া, ঠিক আছে। কিন্তু নেবে কেন, অ্যান্ড দ্যাট বিচ, যবে থেকে বিয়ে হয়েছে, নিজের বদখত চেহারা আর সন্দেহ নিয়ে আমায় উত্যক্ত করে চলেছে। ফোনে গলা খাদের কাছে নিয়ে বললাম, নীতি বাইরে গেল, পেশেন্ট ঢুকছে। পরে কথা বলি? ফোন নামিয়েই নীতিকে ডাকলাম। ডুবে গেলাম।
#
-আজ কি দেখলেন অনমিত্র?
-আজব স্বপ্ন স্যর। ম্যায় আউর মেরা দো।
-মানে?
-ঘরওয়ালি, বাহারওয়ালি কেস স্যর
বলে কি? এতো আমার কেস মনে হচ্ছে!মুখে কিছু না ব’লে তাকিয়ে রইলাম আপাত পাগলাটে মধ্যবয়েসি অনমিত্রের দিকে। কাল নীতিকে নিয়ে তিস্তার খোঁজ খবর আমায় আজ প্রায় মালকোষে পৌঁছে দিয়েছে। আজকে কি হবে কে জানে? নীতি আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। পারফিউমটা নতুন। অনমিত্র এবার দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, প্রথমে দেখলাম স্যর আমি একটা রেস্টোরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে। বিকেল নামছে। আর তখনই টিয়া এল। টিয়া আমার ইয়ে...অনমিত্র থামল এখানে। আমরা দুজনেই ওর দিকে তাকিয়ে। আর অনমিত্র আমাদের দিকে। বুক পকেটে একটা পেন রাখে ও। সেটাকে হাত দিয়ে নাড়াবার বদভ্যাস। পাগলের সখ। আমিও যখন অনমিত্র পেন নাড়াচ্ছে, নীতির কোমরে হাত দিয়ে তাপ নিতে থাকি। যেন হাতটা চলে গেছে এভাবে। নীতি সামান্য কেঁপে ওঠে।
#
অনমিত্র বলে, তারপর আমি আর ও রেস্টোরেন্টে ঢুকে পড়ি। বেশ মায়াময়। কত রঙ। ছেলেরা ঢাকা। মেয়েরা খোলা। টিয়াও খোলামেলা। টেবিলে বসেই দেখি, পাশের টেবিলে তুলি। আমার বৌ। মিষ্টি হেসে আমায় ডাকল। আমি কাছে যেতেই আমায় বলল, মেরে বাচ্চা ইয়ে তেরা গার্লফ্রেণ্ড হ্যায়? কস্মিনকালেও হিন্দিতে কথা বলতে শুনিনি তুলিকে। আজ বলছে। আর স্যর আমি না, আমি থাকলেও, হয়ে গেছি ষোলো বছরের কিশোর। স্যর ঠোঁটের ওপর রোঁয়া। গোঁফ বেরোবার আগের স্টেজ। তুলি বসে আছে একটা দামড়া মত লোকের সঙ্গে। তুলি খুব ঘরোয়া মেয়ে স্যর। এই লোকটার সঙ্গে ও কেন? আবার আমাদের দেখল অনমিত্র। পেন নাড়ল। অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তখন নীতিই জিগগেস করল, ফির ক্যায়া হুয়া?
-ফির? অনমিত্র হাসি মুছে বলল, ফির তুলি আমার দিকে ঝুঁকে এল। বলল, বাচ্চা, এ হল মেজর রুদ্রপ্রতাপ। আমার বয়ফ্রেণ্ড। তোমার বাবা আমায় ছেড়ে চলে গেছে, ইউ নো ইট। আমি একা। আর কত রাত একা থাকবো? এটা গেয়ে বলল স্যর। তারপর হাসল।রুদ্রপ্রতাপ টাইপের নামগুলো মিলিটারির সঙ্গেই যায় দেখেছি। সেও গলে গলে হাসছে। বেশ কামুক টাইপ। চোখ নাচিয়ে বলল, হেলো বাচ্চা! ভাবুন আমার অবস্থা। এ কিরকম স্বপ্ন স্যর, আমার বৌ মা হয়ে গেল।আমি ষোল বছরে। অধঃপতনটা ভাবুন। টিয়া কিন্তু তেত্রিশ। এতক্ষণ দেখছিল। এবার এগিয়ে এল, হ্যাঁচকা টান মারল আমায়...আর ঘুম ভেঙে গেল আমার...ডাক্তারবাবু এসব কি হচ্ছে অ্যাঁ ...আর অ্যাঁ বলতে বলতেই চোখ উলটে গেল অনমিত্রর। আমি আর নীতি দুজনেই ছুটে গেলাম। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে। সেরেছে, স্ট্রোক ফোক হয়ে গেল নাতো? আমি নীতাকে বললাম, বাইরে গিয়ে দেখো ডঃ সান্যাল আছেন কিনা চেম্বারে। আমিও বাইরে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের খোঁজ করি, দেখি পাই কিনা। আর দীপককেও পাঠাতে হবে ভেতরে।দীপক আমাদের পিওন কাম সিকিউরিটি কাম এভরিথিং। দুজনেই একসঙ্গে বেরিয়ে এলাম। দীপককে কাছে পিঠে দেখলাম না। যাইহোক নীতি ডঃ সান্যালের চেম্বারের দিকে দৌড়ল। আমি এ্যাম্বুলেন্সের জন্য ডায়াল শুরু করলাম ল্যাণ্ডলাইন থেকে। মোবাইলে অনেকসময় লাইন পাওয়া যায়না। আজতো ল্যান্ডলাইনও যাচ্ছেনা। কিরে বাবা। অগত্যা মোবাইল। নাহ, লাগছে না। কিছুক্ষণ পরে নীতি ফিরে এল। হতাশ। ডঃ সান্যাল কলে বেরিয়েছেন। অনমিত্র ওই অবস্থায় ভেতরে পড়ে আছে। আমরা অসহায়। তড়িঘড়ি ভেতরে ঢুকে এলাম। আর ঢুকেই ধাক্কা। অনমিত্র চেয়ারে বসে আছে। আমাদের দেখে দাঁত কেলিয়ে হাসল। বলল, এটাও হচ্ছে আজকাল স্যর। সেন্সলেস হয়ে যাচ্ছি....
#
অনমিত্র চলে গেছে। আমি আর নীতি বসে আছি চুপচাপ। আজ আর পেশেন্ট নেই। অনমিত্র একটা পাজল। শুধু স্লিপ ডিসঅর্ডার হলে তো কথা ছিলনা। নীতিকে বোঝাচ্ছিলাম কি কি টেস্ট আর করা যেতে পারে।পলিসোনোগ্রাম মাস্ট। হিপ্নাগোগিক হ্যালুসিনেশন হচ্ছে কিনা এটাও দেখতে হবে।এসব আবার নারকোলেপসির দিকেও ঈশারা করছে। এই সব ভারী কথা বলতে বলতে আমি নীতিকে কাছে টেনে নিই। আহ্‌, কি শান্তি। শরীর বুদ্ধিকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে এখন, বললাম নীতিকে। নীতি তাকালো, সিডাক্টিভ। বাইরে মেঘ ডাকছে, আজ বৃষ্টি নামবেই......
#
শনিবার দীঘা যাচ্ছি। তিস্তাকে বলেছি একটা কনফারেন্স আছে। তিস্তা আজকাল কেমন ঠাণ্ডা মেরে গেছে। অবশ্য কোনকালেই ও হট ছিলনা। বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনমিত্রকে ভুলেই গেলাম। নীতি এটা পারে। ভেতরে মৃদু হাওয়া বইছে এখন। ঠাণ্ডা কিন্তু আগ্নেয়...
#
ঘরে ঢুকতেই তিস্তা হাসল। ভুল দেখছি নাতো? না। হাসছে। বলল, ভালই পেশেন্ট ছিল আজ মনে হচ্ছে?
-তা একটু ছিল
-ভাল, ও ইন্সটলমেন্টটা জমা করেছ?
ভেতরের ঠাণ্ডা উধাও। তিস্তা কিন্তু হাসছে। বলল, ডার্লিং এত ভুলে যাও কেন আজকাল তুমি, সব ঠিক আছে তো?
ডার্লিং!কি হচ্ছে আজ আমার সঙ্গে? আমিও হাসলাম সোফায় বসতে বসতে।
তিস্তা কাছে এল। অনেকটাই। গলা নামিয়ে বলল, শনিবার নীতির সঙ্গে দীঘা যাওয়ার কথাটা ভুলে যেওনা আবার!
আমি বিধ্বস্ত হতে হতে দেখলাম, তিস্তা হাসিটা ধরে রেখেছে। আমার উল্টোদিকে এবার বসল ও। হাতে একটা পেনড্রাইভ। ওটা দেখিয়েই বলল, এটা দেখছ তো, এটা অনমিত্র আমায় দিয়েছে। ওর আসল নাম পার্থ। পার্থ বসু।প্রাইভেট ডিডেকটিভ। ওর বুকে একটা পেন দেখেছিলে না, ওটা হিডেন ক্যামেরা। আর আজ অজ্ঞান হওয়ার নাটকটা ক’রে ও তোমাদের এবসেন্সে ঘরে বসানো আরো কিছু ক্যামেরা এক্টিভেট করে দেয়।দীপককে আমি আগেই সেট করে নিয়েছিলাম। আজ সকালেই হিডেন ক্যামেরাগুলো তোমার চেম্বারে ইন্সটল করা হয়। দীপক সাহায্য করে পার্থকে। এই পেনড্রাইভে সব ধরা আছে। যাইহোক তুমি কি করবে সেটা তোমার ব্যাপার। ওই চেম্বার কাল থেকে আমি বন্ধ করে দেবো। ওটা বাবা তোমায় টাকা দেয়ার সময় আমার নামেই রেজিস্ট্রি করেছিল, তুমি তো জানো তাইনা? অ্যান্ড নাও, গেটা আউট অফ মাই ফ্ল্যাট। এটা আমার ফ্ল্যাট।সান অফ আ বিচ, ইউ নো ইট বেটার দেন মি..
#
আমি এখন রাস্তায়। অনমিত্রর আজকের স্বপ্নটা মনে পড়ছে। পুরোটাই বানানো যদিও। অনমিত্র নয়, পার্থ। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছি আমি। অনেকক্ষণ। মাথার ওপরে চাঁদ বড় হচ্ছে। রাস্তায় আমার মতই পড়ে আছে জমা জল আর হ্যালোজেনের আলো। আজ সন্ধ্যায় বৃষ্টি হয়েছিল। আমি তাকিয়েই ছিলাম। কতক্ষণ কে জানে। ঘোর কাটলো অনমিত্র..না অনমিত্র নয়, পার্থকে দেখে।পার্থ রাস্তা পেরোচ্ছে। এখান থেকে আমার একতলার ফ্ল্যাট স্পষ্ট দেখা যায়। রাস্তা পেরিয়ে পার্থ আমাদের ফ্ল্যাটের কলিং বেল টিপলো।এখন রাত সাড়ে বারোটার কাছাকাছি। দরজা খুলে গেল। আবছা দেখা যাচ্ছে। হাত ধরে টেনেই নিল সম্ভবত তিস্তা পার্থকে।আর আমি হাঁটতে শুরু করলাম দুঃস্বপ্নের দিকে....