তবু,স্বপ্ন দেখার মহড়াও

তমাল রায়



একক উচ্চারণের দিকে। আপাতত বিপ্রতীপে কানার চক্ষু নির্বন্ধ। দুর্লঙ্ঘ শিশিরে ধূলা জমে,শুকনো খটখটে। হেমন্ত আসলে এমনটা হয়। হেমন্ত থেকে ঔপনিবেশিক দূরত্বে বর্ষার পূর্ণতা। যাকে মায়া বা সমাজ,সভ্যতা নামেই জেনেছে পূর্বসূরি,উত্তরপুরুষ যা নিছক ভার্চুয়াল নামক আঠাই। অথচ স্টিকিনেস নেই,দেওয়াল জুড়ে আরশোলার পেছনে টিকটিকি দৌড় নেই,অথচ...তাসের দেশ বা ঘর ভেঙে পড়লে নিঃশব্দে,দুঃস্বপ্নের মত জেগে রয়েছে কেবল দুটি চশমা পরিহিত সমাহিত চক্ষু। কেবল আহ্নিক চলনের চপল বাস্প এসে ঘোলাটে করেছে কাঁচ। আর ফটর ফটর হাওয়াই চপ্পলের শব্দ কি কোনো তাচ্ছিল্যই ছুঁড়ে দিলো,অলক্ষ্যে তবে? দূরে হোম দে ব্রট দ্য ওয়ারিয়র ডেড,মৃত্যু এসে থমকেছে,আঙিনায়। পাখি আসে,শব্দ নেই। নারী আছে,পর্বান্তরের ন্যায়, এ কেবল পুরুষ পৃথিবীর ক্রন্দন,যুদ্ধ ক্ষয়,দীর্ঘশ্বাস...আর ছায়া হ্রস্বতার মিডাস স্পর্শ থেকে স্পর্শক হতে গিয়ে কেন্দ্র বিকর্ষণমুখী ছিটকে পড়া...
অনিশ্চিতে তাকে গালিব বলেই ডেকো,আড়ালে বৃষ্টি নামছে,আচমনে পিতৃ - তর্পণ। স্লো মোশনে গলিতে মিশছে গলি,সিঁড়ি উঠে যাচ্ছে চিলেকোঠায়,আর ফ্রিজড। খোলা চিলেকোঠা বেয়ে চুঁইয়ে নামছে হলুদ রক্ত। এ কি তবে সরিসৃপ জন্ম?

একফোঁটা চোখের জল ঝরে পড়ল মরুভূমিতে
মা আর ছোটো বোন খুঁজতে বেরোলো।

তুলো আর ওষুধপত্র নিয়ে
এলেন ডাক্তারবাবু —
কালো পোশাক পড়ে উকিলমশাই এলেন।

বোবার মতো আমি চুপ করে রইলাম
পাক্কা তিনমাস।
তারপর আবার একদিন ডানা জুড়ে নিলাম শরীরে

উড়তে শুরু করলাম’।‘


ধূসর অক্ষরেখায় আপাতত জেগে উঠছে কুয়াশার মত সাদা অভ্যুত্থান। গান টান নেই । থাকেনা বহুদিন। কিছু আগে বয়ে যাওয়া নদীও মুখ লুকলো । গাছগুলো নেহাতই অকারণ নয়, বিষে নীল । শুকনো, মাথা নীচু। পূর্ব ও উত্তরকথনমালায় কেবল পাহাড়ের ভেঙে পড়ারই কাহিনী শুনে যারা বড় হয়েছি, যারা ভোর দেখবো বলে, সাতসকালেই হিল টিল খুঁজতে বেরিয়েছিলাম, সে কবেই বিফল মনোরথ। রথের রশিতে টান মানে ইন্দ্রিয় সুখের গোড়ায় কালো কাপড় । কিন্তু ইন্দ্রিয় সুখ ব্যতিরেকে বাঁচা, সেও কি সম্ভব ! সন্ত সাধুও তো আকাঙখা নিয়েই পথ চলে। যাদু টুপি থেকে প্রবেশিত রুমাল আর পায়রা হয়ে বেরুচ্ছেনা,যা কিছু দৃশ্যত সুন্দর তার গায়ে লেগে রয়েছে আঁশটে গন্ধ,উঁকিঝুঁকি বেড়াল-সুজন এর পায়চারি ধারাবাহিক,জীবনের পাঁচিল বেয়ে ...এরপর শ্মশান এসে বসবে,নদীর পাশে। কিছু অসংলগ্নতার একক চেসবোর্ডে, ঘোড়ার আড়াই পা চালে কিস্তিমাত হতে গিয়েও,তিনি হবেননা, তিনি কেউ নন,অথচ তিনিই...অথচ বন্দী রাজার আর বেরুনোর কোনো পথ নেই...আগুন জ্বলছে লেলিহান শিখায়, কেউ সে আগুনে সিগারেট ধরিয়ে,ধোঁয়া ছেড়ে দিল উপেক্ষার....যেভাবে আত্মহননের মুখে কেউ কেউ চেপে ধরে সিগারেট ছ্যাঁকা …
‘যে বিকেলে জ্বর আসে সেই বিকেলের মতো তুমি এসে দাঁড়িয়ে রয়েছো। ঘড়ির ভেতর দিয়ে রক্ত রেখার মতো সময় চলেছে। -আমি কি অসুখ থেকে কোনোদিন উঠে দাঁড়াবনা ? আজো রাত জাগাজাগি হয়। শরীর মিলিয়ে যায় নরম শরীরে। -আমি শুধু আমার পৃথিবী দেখে যাই...। চারপাশে কেমন হাজারো আলো জ্বলে আছে, তবু এমন আঁধার আমি জীবনে দেখিনি’।
ছ’ফিটের দীর্ঘ অবয়ব,খালিগায়ে ইতস্তত পায়চারি...ঠোঁটে ঝুলছে সিগারেট। চা দোকান থেকে একটু দূরে রক। একাই সেখানে,চা শেষে,হাতে রয়ে গেছে শূন্যভাঁড়। অন্যমনস্ক, অক্ষর ফুটছে বুঝিবা নিঃশব্দে। সামনে দিয়ে চলে যাওয়া সাইকেলের ক্রিংক্রিং, রিক্সার হর্ন,অথবা মাথা নীচু হেঁটে যাওয়া স্কুল শিক্ষিকার থেকে অনেকদূরে। দূরত্ব যেভাবে রচিতহয়। এই ট্রাজেডি অব এররস-এর তিনিই নায়ক,আর আমরা অনুসরণকারী। অথচ আপাতত খড়কে কাঠির মতই তুচ্ছতা সম্বল করে দীর্ঘ হয়ে উঠছেন কবিতার মত। যা আদতে অন্তর্গত বেদনাময় রক্ত - ফল্গু এক্সটেনশন। এরপর হাওয়াই চটির ফটরফটর, প্রায়ান্ধকার এক সিঁড়ি উঠে এসে ঝাঁপ চিলেকোঠায়,ছাদে শুকোতে থাকা শাড়ির গায়ে লেগে রয়েছে জলকণা…
সায়ানাইড হলুদ আলোটা জ্বলে থাকবে, সারারাত...ছোটো খাটটায় ছ’ফুটিয়া শরীর আঁটেনা,হয়ত এ ভন্ড সমাজেরও তাকে আটকে রাখার ক্ষমতা নেই। চরম তাচ্ছিল্যে শল্য চিকিৎসকের মতই কাটছেন ছিঁড়ছেন এই ,মুখোশ – সমাজকে। তবু না থেমে উপুড় হয়ে জন্ম দিচ্ছেন,কিছুর...সারা ঘর জুড়ে অজস্র মুচড়ানো কাগজের সংখ্যা কেবলই বেড়ে চলেছে, কেন কে জানে! অপছন্দের বেড়ে ওঠাই কি তবে নিত্য ! ঘুম – ঘুম,না-ঘুম রাত জুড়ে ক্রমাগত হাওয়াই চটির ফটর ফটর... সিগারেট থেকে সিগারেটের ক্রমিক ধোঁয়ার বিলীন অথচ শাশ্বত,পাখি ভোরে তার কখনোই ভোর হওয়া হলোনা কখনোই…
কেন কে জানে!
‘আর, দারিদ্র সেও কি কম ঝামেলার হরবকতই তো ধার আর দিদির কাছে হাত পাতা—
তবুও দু – একটা ঘটনা বেশ ঘটে আমাদের যেমন আজ রাত্তিরে তুমি বলে উঠলেঃ ওইতো বৃষ্টিএলো,
আমরা জানলার কাছে এলাম
কিন্তু এতো পাশের বাড়ির ছাদ থেকে কারুর পেচ্ছাবের শব্দ;
অথবা সেদিন যেমন, রাত্তির বেলা আলো জ্বালিয়ে আমি
লিখছিলাম ছোট্ট ঘরে — রাস্তা থেকে কে যে বললঃ এই বাঞ্চোত ঘুমো’।

অতঃপর শক থেকেই জন্ম নিলো ব্রহ্মান্ড! দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠে ধূমকেতু থেকে ধূমকেতুতে বিনিময় হল আলোর, হয়ত ব্যথারও । প্রবল, অথচ নির্ভার স্বপ্নরা এবার তারা হয়ে ফুটে উঠছে একক, অথবা যৌথতায় । যৌথতা আদতে অনেক এককের সংঘবদ্ধতাই! স্বপ্ন যা মূলত আংশিক মেঘলা আকাশের নামান্তর মাত্র, লাকা থেকে ইয়ুং অথবা ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণ এর র্যাপিড আই মুভমেন্ট এর কাঁটাতার মুছে এবার হারিয়ে যাচ্ছি ঠিক উল্টো চলনে...অনুসরণ করছি,অনেক আলো নামক অন্ধকারে তাঁকে ... কয়েকজন অথবা একাই...

‘এবং যে খেতে পায়না সারাদিন, তুমি প্লেট – ভর্তি খাবার পাঠিয়ো তাকে।

এবং রাত্রি বেলা যার ঘুম হয় না

তুমি লিখে জানিয়ো তাকে ঘুমিয়ে পড়ার সহজ উপায়গুলো।

যার কোনো প্রেমিকা নেই, তুমি

অঢেল বন্ধু দিয়ো তাকে___

এবং যে অসুখী আমার মতো, তুমি তাকে চিরকালীন শান্তি দিয়ো’।

দ্রিমদ্রিম দ্রিদ্রিম শব্দে রোদেলা সকাল যখন দুপুর পেরিয়ে রওয়ানা দিলো বিকেলের সাতকাহনে, তখন সন্ধ্যে নামবে,বিষুবরেখায়,উড়ে যাবে পাখি,পাখিরা,বিষণ্ণ গানের পাশে,মৃতদেহের মত শুয়ে থাকা তিনি হয়ত, উঠে দাঁড়াবেন মাথা তুলে,শিমুল তুলোর মতই হাল্কা মাথা,কবিতার ন্যায় আলো আঁধারির আকাশে অক্ষরে অক্ষরে সংঘর্ষ বা নির্মাণঃ-

‘কেউ - কেউ হারিয়ে যেতে চায়, চিঠি লেখে দুটো - একটা, হারিয়ে যায়।

নৌকাগুলো দুলতে – দুলতে ফিরে আসে ---

গাছের নিচে আমরা বসে থাকি --- তবু নিভতে চায়না আগুন ।



কতো রঙের ফুল সকালবেলা বিকেলবেলা ছাদের টবে ফুটে ওঠে।

কথাটা, কথাটা তো সত্যি

ওদের নিয়ে আমাদের আর তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই।



দু-চারজন মানুষ, বলা-কওয়া নেই, কী রকম সটকে পড়ে হঠাৎ।

এলিজি লিখতে বসে আমরা চেয়ে দেখিঃ

কিছু নতুন মুখ

আমাদের জামার হাতা ধরে টানে --- আর, কী মন খুশ হাসিফোটায়’।

হয়তবা এরপরের দৃশ্যে সুবর্ণরেখার মত একখন্ড সকাল,ডাকনামে যাকে আমরা অ-সুখে চিনেছি, নুড়ি আর পাথরে সাদা বালির মধ্যে হারিয়ে যাবে অনিশ্চল পদচিহ্ন, জংলিপুটুশের ঝোপে লেগে আছে কিছু বা প্রাণের ধুকপুক,মায়া-পারাবারকে চিরে দিচ্ছে সার্পেন্টাইন লেন। গলি থেকে গলি,তস্য গলিতে এক মাথা দুঃস্বপ্ন নিয়ে হেঁটে চলেছে যে,সে হয়ত কোনো এক ভারতীয় দুঃখী মহাকাব্যের কুন্তী পুত্র কর্ণ,যার হাতের কলমে ছিঁড়তে চাইছেন,আর পারছেন না,ভাঙতে চাইছেন,অথচ পারছেন না কিছুতেই,আর তাই,নিজেকেই তীক্ষ্ণ ব্যাঙ্গে বিদীর্ণ করছেন...তরবারির আঘাতে ক্ষত আঁকছেন নিজের শরীরে...
‘‘বন্ধুদের হাতগুলোও এমনই কৃপণ যে কাঁধে পড়ে না/…/শাশ্বত শব্দটাকে আমি আলমারিতে চাবি বন্ধ করেছি গতকাল/অস্তিত্ববাদ নিয়েও আমার কোনো মাথাব্যাথা নেই/বাংলা ছবির নায়ক-নায়িকা হয়তো এখন প্রেম করছে শালবনে/সন্ধেবেলা শুয়ে-শুয়ে আমি একটা মোমবাতির মৃত্যুদৃশ্য দেখছি এখন’…’
যাকে বেদনাহত,বিষণ্ণ মনে হয় সে আসলে,ভেতরে ভেতরে হয়ত বিস্ফোরণের মাল মশলা জোগাড় করছে,কখনো কোনো এক নিরীহ সকালে উড়িয়ে দেবেন আপাত এ নিরীহ মেকী শান্ত জনপদ,আর শুরু হবে নতুন এক ভন্ডামীহীন সমাজ,যা সৎ ,শাশ্বত আবেগের মতই ট্রূ টু ফিলিংস।


তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা চলুক। স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্ন আসলে সেতুবন্ধনের দুই মাথায়। দুদিকেই চিরবহমান জীবন… পত্রিকা করার গত ত্রিশ বছরের প্রেক্ষিতে দেখেছি ব্যক্তি নয় সমাজকেই গুরুত্ব দিয়ে আসাই চালু রেওয়াজ। এই প্রথম আমরা তার বিপরীত প্রজ্ঞায় আস্থা রাখলাম। সমাজ কে ব্যক্তির আয়নায় দেখার চেষ্টা করলাম। আর তার আইকন হিসেবে এবং অবশ্যই এ সংখ্যা উৎসর্গ করা হল আজীবন স্বপ্নের মহাসমুদ্রে ডুবে থাকা প্রিয় কবি শ্রী ভাস্কর চক্রবর্তীকে।

‘দুই দীর্ঘশ্বাসের মধ্যিখানে, মৃত্যু, আমি তোমাকে জন্মাতে দেখেছি’

না

‘চলে যাবো,তবু দুটো চারাগাছ পুঁতে দিয়ে যাবো টবে’।
অথবা স্বপ্ন দেখার মহড়ায়...
বেনিয়াপাড়া লেনের চিলেকোঠার ঘরটাতে হয়ত এখনও জড় হচ্ছে আরও অজস্র বাতিল কাগজ,হলুদ আলো জ্বলে আছে,সারা রাত,এবার হয়ত ভোর,
আর সকাল ছড়িয়ে পড়বে আমাদের এই পৃথিবীতে....